নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সুন্দর দেশ গড়ার সপ্ন দেখি

এমডি ছালা উদ্দিন

দেশ ভালো থাকুক

এমডি ছালা উদ্দিন › বিস্তারিত পোস্টঃ

গুম-হত্যা : ‘সিরিয়াস’ কিছু না!

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সকাল ১০:৪৫

Click This Link

শুভ কিবরিয়া: আমি বলেছিলাম, ‘ভাইয়া, যদি খুব বেশি টর্চার করে?’ ভাইয়া বলেছিল, ‘তুই তো জানিস আমি কত টাফ। ওরাও সেটা বুঝে গেছে। ওরা আমাকে ব্রেক করার জন্য এমনভাবে টর্চার করেছে বাইরে কোথাও কাটেনি, ভাঙেনি। কিন্তু ভেতরটা মনে হচ্ছে চুরচুর হয়ে গেছে! দেখিস, আম্মাকে যেন বলিস না এসব কথা।’ মা, তুমি জোর করলে, তাই বলে দিলাম। ভাইয়া কিন্তু বারণ করেছিল।

৩ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

একজন মা তার ডায়েরিতে এসব কথা লিখছেন। না, তার সেই ছেলে আর কখনই ফেরত আসেনি। যে হন্তারকরা তার কোল খালি করেছিল, বহু বছর তাদের বিচারের কথা বলা যায়নি। বরং তারাই একসময় রাষ্ট্র চালিয়েছে। তাদের এই অপরাধের শাস্তি চাওয়ার পুরস্কার এসেছে নিজেকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসামি হিসেবে দেখতে পাওয়া। কিন্তু সেটাই কি শেষ কথা? বিচার কি কোনোদিন হবে না! খুনিরা কি দম্ভভরেই ঘুরবে, ফিরবে, রাজত্ব চালাবে! ইতিহাস কী বলে?



২.

জোহরাকে কয়েক দিন পর আমি একদিন সবার অলক্ষ্যে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মেট্রন যখন জেলারকে বলল যে, সে তোমাদের মাত্র দুটো চড় মেরেছে তখন কেন তোমরা বললে না যে, সে তোমাদের জানোয়ারের মতো মেরেছিল।’ মøান হেসে জোহরা বলেছিল, ‘আপা গো, আপনার এত বুদ্ধি, কিন্তুক এইডা বুঝলেন না যে, মাইরের কথা কইলেই তো চলত না, চিহ্ন দেহাইয়া পরমান দিতে হইত। নাইলে আমাগো চোর-ডাকাইতের কথায় বিশ্বাস কী? আর গায়ের কাপড় না খুইলা মাইরের দাগ দেখাইতে পারতাম না। খেয়াল কইরা দেইখ্যেন মেট্রন মা কুন সময়ও হাতে-পায়ে বাড়ি মারে না। ’

সত্যিই, হাত-পা বাদ রেখে যে এমনিভাবে গরুপেটা করা সম্ভব সেটা আমার বুদ্ধিতে কুলোয়নি।

১৯৬৭-১৯৬৮

এই অভিজ্ঞতা জেলখানার। এই পৈশাচিকতা যিনি বয়ান করছেন তিনি তখন জেলখানার কয়েদি। তার তখন দেশ-জাতি বদলানোর বিপুলতর প্রণোদনা। দেশের মানুষ ভালো থাকবে, ন্যায়বিচার পাবে, তার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মুক্তি আসবে। কিন্তু শাসক তা মানবে কেন? তাই শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চলছে অগ্নিমূর্তি লড়াই। তার নিজের বয়ান, ‘উনিশশো সাতষট্টি সালের জুন মাসের আট তারিখ সকালবেলা কয়েক মাস আগে নেত্রকোনার এক মিটিংয়ে সরকারের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক এক বক্তৃতা দেবার জন্য গ্রেপ্তার হলাম। ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবার পর বিকেলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছতে-না-পৌঁছতে দেশরক্ষা আইনের ৩২ ধারা বলে বিনা বিচারে তিন মাসের আটকাদেশ আমার উপর জারি করা হলো। আটকাদেশ স্বাক্ষর করে নেবার সময়ই বুঝলাম যে, নির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার করেও যখন বিনা বিচারের আটকাদেশ দেয়া হলো তখন এই তিন মাস তিন বছরে গিয়ে ঠেকলেও অস্বাভাকি কিছু হবে না।’

এটুকু পড়ে থামলাম। ভাবলাম রাষ্ট্র কি মধ্যযুগীয় নিপীড়ক ছিল! স্বাক্ষর করে আটকাদেশ বুঝে নিচ্ছেন, কিন্তু জানেন না তিন মাসের আটকাদেশ ক’বছরে শেষ হবে? আচ্ছা, যিনি এই অভিজ্ঞতার কথা লিখছেন, ভাবিকালে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার যদি তার হাতে পড়ে, তিনি কি রাষ্ট্র বদলাবেন? জেলখানার ভয়ঙ্কর, পৈশাচিক, রীতিহীন, অরুচিকর, বিনা বিচারে আটক কি বন্ধ হবে?



৩.

‘কিল-ঘুষি মুখে, পাঁজরের দু’পাশে, বুকে, পিঠে ও ঘাড়ে মারতে লাগল। আমার এক কষা থাপ্পড় পড়ল লম্বা লোকটির বাম গালে। তাদের লাথি পড়ল আমার তলপেটে, হাঁটুতে আর গোড়ালিতে। বিপর্যস্ত, আহত আমি মেঝের ওপর ছিটকে পড়লাম। লাথি খাওয়া খাটো লোকটি তখন ফিরে এসে ৯-১র্২র্ লম্বা একটি কাচ বা প্লাস্টিকের বোতল কালো ব্যাগ থেকে বের করে আমার পিঠে ও পাছায় আঘাত করল। আমি যখন বাধা দিতে বা তাকে আঘাত করতে পারছি না, তখন সে বোতলটি আমার পায়ু পথে ঢোকাতে চেষ্টা করল, আমি নিরুপায় হয়ে দু’হাত দিয়ে আমার লিঙ্গ ও অন্ডকোষ ঢেকে রাখতে চাইলাম। খানিক পরে আমি মেঝেতে ঘুরে পড়ে গেলাম।...’

২১ মার্চ দিবাগত রাত, ২০০২

যার পায়ুপথে বোতল ঢোকানোর চেষ্টা চলছিল, সেই ভদ্রলোকটি যদি কোনো দিন, কখনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, তিনি কি বদলে যাবেন? যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর মতো একজন গণ্যমান্য মানুষকে রাতের আঁধারে এই বর্বরতার শিকার হতে হলো, তিনি যদি কখনো এই মন্ত্রণালয়ের অধিকর্তা হন, তিনি কী করবেন? প্রতিশোধ নেবেন। আরও নৃশংস হবেন। তার প্রতিপক্ষ রাজনীতির সমর্থকদের, নেতাদের প্রতি আরও পৈশাচিক হবেন? নাকি এই সিস্টেমকে বদলে দেবেন? এটুকু দেখার জন্য সময় নিতে হবে মাত্র এক দশক।...



৪.

‘... দুই পট্টি কালো কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা হয়। আমার পেছনে দাঁড়িয়ে রক্ষী দুই স্কন্ধে ধরে সামনের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। কখনও বলে, পা একটু উঁচু করুন, ডানে, বাঁয়ে যান ইত্যাদি। এরপর একটি কক্ষে কাঠের বেঞ্চে বসায়। চারদিক শান্ত। হঠাৎ পদশব্দ, চেয়ার টেনে বসার শব্দ। জিজ্ঞাসা শুরু হয়। সবচেয়ে খারাপ নমুনাÑ “এই বল, তোর নাম কী?” বলি, ড. মো. ........। বল, তোর নামের অর্থ কী? উত্তর দেই না। বলে, ডক্টর অর্থ কী। বলি পিএইচডি। ডক্টর অফ ফিলোসফি। চিৎকার করে গালি দেয়। অবাক হই যখন ডান বাহুতে ব্যাটনের আঘাত আসে। আমার চোয়াল শক্ত হয়, আঙুল শক্ত হয়, দাঁতে দাঁত চাপি।’

২৪ আগস্ট ২০০৭

এই যে অপমান আর অশেষ নির্যাতন হলো, তিনি যদি কখনো স্বদলীয় সরকার পান। প্রতিপক্ষকে কি এমন করেই নির্যাতন করতে চাইবেন। কিংবা রাষ্ট্র যদি সেই নিপীড়ন পদ্ধতিই টিকিয়ে রাখে, তবে তিনি তার প্রতিবাদ করবেন? যদি তার হাতে কোনো রাষ্ট্রিক দায়িত্ব আসে, ধরা যাক নিদেনপক্ষে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকর্তার পদ মেলে, তখন সেখানে কি তিনি গণতান্ত্রিক, রীতিবদ্ধ, মানবিক হবেন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি!



৫.

‘আমাকে আবার সেই বন্ধ প্রকোষ্ঠে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এটা ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠল এবং মনে হলো আমার শিরায় গতিও ক্রমশ অচেতন হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল এবারকার অবস্থা হবে আগের চাইতেও ভয়াবহ, সামনে পেছন থেকে আসবে উপর্যুপরি লাঠির আঘাত, আমাকে অর্ধনগ্ন করে অবিরত চড়, কিল, ঘুষি ও থাপ্পড় মারা হবে; অচেতন হয়ে গেলে রক্তাক্ত মুখ ও দেহে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দেয়া হবে। চেতনা ফিরে এলে আবার আমার উপর একই ধরনের অত্যাচার চালিয়ে আমাকে অচেতন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হবে অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে।’

এপ্রিল ২০০৭

এই বয়সী মানুষটির ওপর এরকম অত্যাচার বিবেকী নয়। যদি ভবিষ্যতে কখনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মেলে তিনি কি শোধরাবেন এসব বেআইনি নিপীড়ন? প্রশ্নটা আরও একটু উল্টে, পেছন ফিরে করলে কেমন হয়! তিনি যখন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তখন কী এসব অন্যায্য, বেআইনি, বিভীষিকাময় নিপীড়ন বন্ধ করার কোনো আইন বানিয়েছিলেন? তার প্রয়োগ করেছিলেন?



৬.

১৯ শে এপ্রিল ২০০৯।

আব্বুকে আজ আবার জেলে নিয়ে গেছে। আব্বু ভালোভাবে হাঁটতেও পারছে না। আমাদের স্কুলের ইতিহাসের স্যারকে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। তিনি গতকাল আমাকে গোপনে রোমের দাস বিদ্রোহের উপর একটি বই দিয়েছেন। আমাকে ফিসফিস করে বলেছেন, আমার আব্বু একজন গ্ল্যাডিয়েটর। যারা যারা বিদ্রোহ করেছে, তারা সবাই গ্ল্যাডিয়েটর। আমি রাসেল ক্রোর সিনেমাটা দেখেছি। গত ঈদেই তো আব্বুই না ডিভিডিটা এনেছিল? আমার টিচার বলেছেন, আমি যেন এই বইটা ভালোমতো পড়ি। তিনি আরও বলেছেন স্পার্টাকাসদের কখনো মৃত্যু হয় না। বইটা স্যারকে কয়েক দিন পর ফেরত দিতে হবে। ক্লাসের বইয়ের বাইরে অন্য বই ফটোকপির টাকা চেয়ে আম্মুর উপর এখন চাপ দেয়া যাবে না। বরং হাতে লিখে তুলি।

এপ্রিল ২০০৯

বিডিআর বিদ্রোহে অভিযুক্ত এক বিডিআর জোয়ানের সন্তানের ডায়েরির ভাষ্য এটি। আচ্ছা এই ছেলেটি যখন বড় হবে, পিতার মৃত্যু এবং শাস্তির ন্যায্যতা-অন্যায্যতা খুঁজবে, তখন সে কী করবে? রাষ্ট্রের কোনো বড় দায়িত্ব যদি সে পায়, সে কি প্রতিশোধপরায়ণ, জিঘাংসাপ্রবণ, হিংস্র কোনো নীতিতে আকণ্ঠ ডুববে। নাকি, ন্যায্যতা আর নিষ্ঠতায় রাষ্ট্রকে তৈরি করতে চাইবে?



৭.

ক্স আপনার সন্তানদের ধরে নিয়ে গেলে আপনি কী করতেন?

কাজী আবদুল মতিন

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কাজী রকিবুল হাসানের বাবা

ক্স আমার ছেলেকে যদি মেরে ফেলা হয়, তাহলে কোথায় পুঁতে রেখেছেন বলেন। আমি সবাইকে নিয়ে জিয়ারত করতে যাব।

মো. শামসুদ্দিন

বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মিজান উদ্দিন মোল্লার বাবা

ক্স যে মা সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন, যে সন্তান পিতার জন্য অপেক্ষা করছেন, যে স্বজন আপনজনদের জন্য অপেক্ষায় আছেন, তাঁদের ফেরত দিন। না হয় আমাদেরও গুম করে ফেলুন।

ঝর্না খানম

শামীম আক্তারের স্ত্রী

ক্স দেশে অনেকের স্বজনেরা এখনও গুম হয়ে আছেন। অনেকেই জানেন না তাঁদের স্বজনেরা কী অবস্থায় আছেন, কোথায় আছেন। সে হিসেবে তাঁদের চেয়ে আমরা ভাগ্যবান, অন্তত আমরা আমাদের বাবার মরদেহটা পেয়েছি।

উজমা কাওসার

লক্ষ্মীপুরে র‌্যাবের হাতে নিহত চিকিৎসক ফয়েজ আহমদের মেয়ে

ক্স নিজের দেশেই নাগরিকেরা গুম হচ্ছেন। তাহলে কী লাভ হলো স্বাধীন হয়ে?

মাশরুফা ইসলাম

লাকসামের সাবেক সাংসদ সাইফুল ইসলামের মেয়ে

[সূত্র : ৩১ আগস্ট ২০১৪, রোববার। স্বজনদের ব্যথা, গুম-খুন আর না ॥ দৈনিক প্রথম আলো।]



৮.

৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১, শুক্রবার যার ডায়েরির পাতা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোতে এই রক্তখুন করে যারা পার পেতে চেয়েছিল, তাদের কেউ কেউ যুদ্ধাপরাধের অপরাধের দায় নিয়ে জেলখানাতেই মরছে। কারও কারও দণ্ড কার্যকর হবার অপেক্ষায়। মাঝখানে চলে গেছে ৪২ বছর।

১৯৬৭-১৯৬৮ সালে জেলের স্মৃতি লিখেছেন বেগম মতিয়া চৌধুরী। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর লেখা ‘দেয়াল দিয়ে ঘেরা’ বইয়ের ১১৩ পৃষ্ঠায় যে জেলস্মৃতি বয়ান করেছেন তার উল্লেখ করেছি ২ নম্বর প্যারায়। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়ে পাকিস্তানি জমানার সেই চলমান অন্যায় আর পৈশাচিকতার কোনো প্রতিকার কী করতে পেরেছেন? প্রতিদিন অকথ্য ভাষায়, অশালীন বডি ল্যাঙ্গুয়েজে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করার যে কথা-কামান তিনি দাগেন, তার কি মনে পড়ে নিজের লেখার কথা? মনে কি পড়ে ১৯৬৭-৬৮ সালের রাজনৈতিক জীবনে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতার কথা? ২০০১-২০০৬ জমানায় বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে পুলিশের হাতে বেধড়ক লাঠিপেটা খাবার স্মৃতিকেও কি তিনি মনে রেখেছেন? নাকি এসব মনে পড়ে বলেই আরও অধিকতর জিঘাংসা কাজ করে তার মনে?

২১ মার্চ দিবাগত রাত ২০০২, ঘৃণ্য-পৈশাচিক বর্বর অত্যাচারের বর্ণনা দিয়েছেন ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর তার লেখা ‘জেলের কথা মানুষের কথা’ বইয়ের ২৪ পৃষ্ঠায়। ৩ নম্বর প্যারায় লিখেছি সে কথা। ড. ম. খা. আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কী করেছেন তখন? তখন কি তার জিঘাংসাই জেগেছে? এই অকথ্য-অবৈধ-বিরাষ্ট্রিক-নৃশংস নির্যাতন ব্যবস্থা পাল্টানোর কথা মনে হয়নি? হয়ত হয়নি। ভেবেছেন, কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়।

২৪ আগস্ট ২০০৭ যে নির্যাতনের শিকার হন ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি সে কথা লিখেছেন তার রিমান্ড ও কারাগারের দিনলিপিতে (৪ নম্বর প্যারা)। কিন্তু জোট সরকারের সহগামী দলের সমর্থক হিসেবে ড. আনোয়ার হোসেন সেই পৈশাচিকতা আর বর্বরতার ধারাবাহিকতা চালিয়ে যাওয়ার বিপক্ষে কি কিছু করেছেন?

এপ্রিল ২০০৭ সালে নিজের ওপর অত্যাচারের কথা লিখেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ‘কারাগারে কেমন ছিলাম’ বইয়ে (৫ নম্বর প্যারা)। তার কি তখন মনে হয়েছে, এই ধারাবাহিকতার কারিগরদের তিনিও একজন। বিএনপি-জামায়াতে জোট শাসনামলের রাষ্ট্রিক নিপীড়নের আইনি বৈধতা তার হাতেই ঘটেছিল। নাকি তিনি অতীতের প্রতিশোধ নিয়েছেন রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছেন জিঘাংসা নেভাতে! কিন্তু যে ব্যবস্থা তিনি রেখে এসেছেন তাই তো বিপুল বিক্রমে, সবলে, সজোরে আবার আঘাত হেনেছে তার দলকে, দলের কর্মীদের বিরুদ্ধেই!

১৯ এপ্রিল ২০০৯ বুকভাঙা আর্তনাদের কাহিনী লিখেছে এক কিশোর (৬ নম্বর প্যারা)। বিডিআর বিদ্রোহে অভিযুক্ত এক জওয়ানের মৃত্যু ঘটেছে বিচারকালীন অবস্থায় জেলখানাতে। এই ‘গ্ল্যাডিয়েটর’পুত্র যখন বড় হবে, যদি কখনো তার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা যায় তাহলে কী হবে? জিঘাংসা না ক্ষমা মিলবে তার কর্মকাণ্ডে?



৯.

৩০ আগস্ট ২০১৪ একই দিনে ঘটছে তিনটি বড় ঘটনা।

এক. ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হয়ে বক্তৃতা করছেন শেখ হাসিনা। ১৫ ও ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের কথা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। নিজের পরিবারের সদস্যদের বীভৎস হত্যার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা পিতার হত্যাকারীদের বিচার করে শাস্তি দিয়েছেন। আর কোনো অন্যায্য পক্ষ যাতে রাষ্ট্রক্ষমতায় না যায়, সেইজন্য সংবিধান সংশোধন করেছেন। যারা একসময় ভাবত বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে আওয়ামী রাজনীতি নিধন সম্ভব, তাদের যোগ্য প্রত্যুত্তর দিয়েছেন। দিয়ে চলেছেন। তিনি খুবই আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেছেন, ‘অনেকেই আমাদের দোষ টুকছেন। টুকতেই থাকবেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই বাংলাদেশে পরাজিত শক্তির উত্থান আর কখনোই ঘটবে না। বাংলাদেশের মানুষ ঘটতে দেবে না।’

দুই. মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু দণ্ডিত আবদুল আলীম মারা গেছেন। একাত্তরে যে নিষ্ঠুর অপরাধ করেছেন তারা সাজা ভোগকালীনই তার মৃত্যু ঘটে। এই আবদুল আলীম এক সময়ে মন্ত্রীও হয়েছেন। ১৯৭১ এর মূর্তিমান আতঙ্ক আবদুল আলীম বহু পরিবারের অনিঃশেষ দুঃখ কষ্টের কারণ হয়েছেন। একসময় ভেবেছেন তাদের ক্ষমতা অসীম। এ বাংলাদেশে কেউ তাদের ছুঁতে পারবে না। অথচ চার দশকের বাংলাদেশেই ঘটল তাদের উত্থান ও পতনের ঘটনা।

তিন. এদিনেই আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা কাঁদলেন। জনসম্মুখে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অনেককে কাঁদালেন। যারা এই গুম, খুনের, নির্যাতনের শিকার, তাদের অধিকাংশ বিএনপি কিংবা জামায়াত দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বিরোধী দলের কর্মী হওয়ার অপরাধেই তাদের ভাগ্যে ঘটেছে এই নির্মমতা। প্রিয়জনকে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চোখের সামনে তুলে নিয়ে গুম করছে অথচ তার কোনো প্রতিকার নেই। রাষ্ট্র নির্বিকার। সরকার নিশ্চুপ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন ৫০ বা ৬০ ভাগ গুমের খবর সঠিক নয়।

একই দিনে তিনপক্ষের দেখা মিলল। একপক্ষ অপরাধের শাস্তি দিচ্ছেন। অপরপক্ষ অপরাধের শাস্তি নিচ্ছেন। আরেকপক্ষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এরা সবাই কোনো না কোনো সময় ক্ষমতাদণ্ড হাতে পেয়েছেন। ক্ষমতা হাতে পেয়েই ভুলে গেছেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। তাই এরা কেউ বিকৃত রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলানোর চেষ্টা করেননি। বরং রাষ্ট্রকে অধিকতর নিপীড়ক করে তুলতে চেয়েছেন। কেননা তাদের মনে হয়েছে, রাষ্ট্র নিপীড়ক হলেই প্রতিপক্ষকে দমন করা সহজ হবে।



১০.

সবচেয়ে বিপজ্জনক কথা হলো দায়িত্ববানরা আর কোনো কিছুতেই তোয়াক্কা করছেন না। কোনো ঘটনাকেই আমলে নিচ্ছেন না। দেশের মানুষ নিজ পরিবারের সদস্যদের গুম-হত্যার বিচার চাইছে, নিদেনপক্ষে লাশ ফেরত চাইছে, কিন্তু সরকার একে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ভাবছে না। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা একে স্বাভাবিক ঘটনা বলেই ভাবছেন। একের পর এক পৈশাচিক ঘটনা ঘটছে। একটার পর একটা নতুন কায়দায় খুনের ঘটনা ঘটছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার তদন্ত, বিচারের কাজ লম্বা হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে। নূর হোসেনকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীতে দিনে-দুপুরে নৃশংস সব ঘটনা ঘটছে। পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অথচ সরকার নির্বিকার। বন্যার পানির তোড়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন দুঃসহ হয়ে উঠছে। লঞ্চডুবি হলো, লঞ্চ এখনও উদ্ধার হলো না। লাশগুলো পেল না স্বজনরা। সরকার নির্বিকার। সরকারের নির্লিপ্ততা-সীমাহীন। হত্যা-খুন-গুমে ভরে উঠছে দেশ, কিন্তু সরকার কোনো কিছুতেই গা করছে না। আমলে নিচ্ছে না। জনগণের ভোটে সরকারের আস্থা নেই। দুর্দশায় সহানুভূতি নেই। শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার দুর্মর আকাক্সক্ষা। জনগণকে এড়িয়ে, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তির ওপর ভর করে এই অগ্রাহ্যতার রাজনীতি চলছেই। সরকারকে যে নির্লিপ্ত, নির্বিকারত্বের তত্ত্বের ওপর ভর করে এগিয়ে চলেছে, তা কি খুব স্বাভাবিক? তা কি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে সহায়ক! নাকি বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস এটি।



মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৩:২৮

মোঃ মাহমুদুর রহমান বলেছেন: খুবই ভাল লিখেছেন ভাই।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.