নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কেনাবিস ইনডিকা

লেখার চেয়ে পড়তে ভাল লাগে । কিন্তু নিজের লেখা পড়তে আরও বেশি ভাল লাগে । তাই লিখি । কেউ না পড়লে কষ্ট পাইনা । আমি পড়ে আমিই বাহবা দেই ।

কেনাবিস ইনডিকা › বিস্তারিত পোস্টঃ

অপ্রাপ্তি

০৫ ই মার্চ, ২০১৪ রাত ১:২২

একটা বিকট শব্দে ঘুম ভাঙল । প্রথমে মনে হয়েছিল বিল্ডিংটা বুঝি কেউ উড়িয়ে দিল! তারপর ধীরে সুস্থে বিছানা থেকে উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল রাস্তায় জনসমাবেশ । তাহলে সম্ভবত টায়ার ফেটেছে গাড়ির ..



এমনিতে এমন শব্দ খুব বিরক্ত লাগে সুতপার ।

কিন্তু আজ দরকার ছিল । কাল ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে সে- আজ ঘুম থেকে ওঠার জন্য বিধ্বংসী কিছু দরকার ছিল ।



জানালা থেকে চোখ সরিয়েই চারপাশ দেখে বুঝল ঘরে কেউ নেই -সবাই ক্লাশে । ৭টার ক্লাশ টা করা হলনা ,ধ্যাত!

বিরক্ত চোখে তাকালো ঘড়ির দিকে- এখনও হসপিটালে যাওয়ার সময় আছে ।

মাথা ঘুরছে ।

বিদ্যুতবেগে ড্রেস চেন্জ করে ব্রাশ করতে করতে খাতা ঢুকিয়ে নিল ব্যাগে, মুখটা ধুয়েই দিল দৌঁড় ..দৌড়াতে দৌড়াতে একটুর জন্য কলেজ বাসটা ধরা গেল ।

এখনও মাথা ঘুরছে । মাথা ঘোরাকে পাত্তা দেয়না সে ।এর আগে শরীরের উপর অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা গেছে তার । সব সয়ে গেছে এখন । আজ তার খুশির দিন, আবার কিছুটা কষ্টের দিনও । তার আত্নীয় অসুস্থ । দুইদিন আগেই কেবল ঢাকা থেকে এসেছে সে, আবার যেতে হচ্ছে আজ । তার ক্লাশ ওয়ার্ড সবকিছু মিস যাচ্ছে, কিন্তু কিছু করার নাই । যখনই কেউ অসুস্থ হয় তাকে ঢাকায় চলে যেতে হয় । চিকিত্সা না দিতে পারলেও বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি এবং এসিউরেন্স টুকু তাকেই দিতে হয় ।



সুতপা বগুড়া মেডিকেল কলেজে ফিফথ ইয়ারে পড়ে ।

বাসা ঢাকায় । মায়ের আঁচল ছাড়তে না পারার অভ্যাসটা তার ছোট্টবেলার । কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস -তাকে বগুড়া মেডিকেল কলেজে পড়তে হচ্ছে প্রায় চার বছর ধরে । কিন্তু ক্যাম্পাসে মন মানেনা তার, তাই ঘুরেফিরে বারবার ঢাকা চলে যেতে হয় । আর আত্নীয়স্বজন কেউ অসুস্থ হলে তো কথাই নাই ।



আজ তার মন ভাল থাকার কথা না । মন ভাল অন্য একটা কারণে । আজ মহাখালি বাসস্ট্যান্ডে শিশির তাকে নিতে আসবে । ওখান থেকে শিশির ওকে বাসায় দিয়ে আসবে ।

শিশিরের সাথে তার পরিচয় এক বছর । পরিচয়টা খুব আকস্মিক এবং খুব অদ্ভুত । সুতপা কখনো ভাবতেও পারেনি নতুন একটা মানুষ তার দুনিয়াতে জায়গা করে নিবে । সে বরাবরই প্রেম বিদ্বেষী এবং বিয়ে নামক বিষাক্ত জিনিস সেবনের পরে কারও সাথে মনের বিপরীতে মিলেমিশে থাকতে হবে এটাকেই সে ভাগ্য বলে মানতো । কিন্তু হঠাত্ করেই শিশির নামের এক ছেলের অনধিকার প্রবেশ এবং স্থায়ী বসবাস সুতপার হৃদয়ে । এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হসপিটালে যায় সুতপা । আজ ওটি । খুব অদ্ভুত দুইটা অপারেশান দেখতে হল ওকে । একটা আইলিওস্টোমি ক্লোজ করে দিলেন ডক্টর । আরেকটা এনোরেক্টাল ম্যালফরমেশান । দুইটা অপারেশান ই আগে দেখেছে ও তবুও কেমন অবাক লাগে ।



মাথা ঘোরাতে থাকে সুতপার ।

ও ! সকালে খাওয়া হয়নি কিছু !

দ্রুতবেগে বেরিয়ে পড়ে হসপিটাল থেকে হোস্টেলে যেয়ে কিছু খেয়ে নেয় ।



শিশিরের অনেকদিন যাবত জ্বর । দুশ্চিন্তা হচ্ছে ওর । শিশিরকে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য অনেকবার বলেছে ও ।ছেলেটা কেমন যেন- ডাক্তার পছন্দ করেনা । "এজন্যই হয়তো আল্লাহ আমাকে আর ওকে এক রাস্তায় মিলিয়েছে" -দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর ভাবে সুতপা ।



ব্যাগ গুছাতে লাগল সুতপা । শিশিরের জন্য কি কি নিবে সেগুলো ঢুকালো আগে । 'শিশির তো অসুস্থ -ওকে মহাখালি আসতে নিষেধ করা উচিত্' আনমনে ভাবল সুতপা ।

ফোন দিল শিশির কে,

: শিশির, শরীর কেমন তোমার?

: এই তো, ভাল ।

: শোনো, তোমার মহাখালি আসার দরকার নেই । তুমি কিছুদূরে আসো ? ওখানে দেখা করে আমি বাসায় চলে যাব, হুম ? যতই হোক তুমি অসুস্থ ।

: না, না, তুমি বগুড়া থেকে আসো তো! মহাখালি আমি যেভাবেই হোক যাব ।

: তুমি কখনই বুঝতে চাওনা ।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন রেখে দেয় সুতপা ।

ও জানে শিশির সবসময় বাড়িয়ে বলে । ও এতটা বাড়িয়ে চায়না । ও অল্প চায় কিন্তু ঐ অল্পটুকু না পেলে যে ও বেঁচে থাকতে পারবেনা !

অল্পটুকু পেতে যা কিছু করা দরকার সবকিছু করতে রাজি ও ।

ও শুধু শিশিরকে একটা বার দেখতে চায় । কিন্তু মন বলছে দেখা হবেনা ।

ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিল ও ঢাকার উদ্দ্যেশে ।





শিশিরের আজ কয়েকটা মেডিকেল টেস্ট করানোর কথা । সুতপা বারবার ওকে যেতে বলছে টেস্ট করানোর জন্য । অবশেষে শিশির দুপুরের দিকে টেস্ট করাতে বের হল ।

বারবার সুতপার জিজ্ঞাসা,

: শরীর ভাল তোমার ?

: হ্যাঁ ,ভাল ।

বাসে বসে সময় গুনতে থাকে সুতপা -কখন শিশিরের হাসিমুখটা দেখবে ! ..সেই মায়াভরা গজদন্ত ।



..আর ভয় হয় যদি দেখাই না হয় ! তাই তো বারবার বলেছিল, "আসতে হবেনা এত দূরে, থাকো কাছে কোথাও , আমি আসবো ।" ..ভাবে সুতপা 'বোধকরি দেখা হবেনা ।'

শিশিরের ফোন,

: তোমাদের এলাকায় যাচ্ছি ,বুঝলে ? পিজ্জা খেতে ..

: আচ্ছা যাও । তোমার শরীর কেমন,শিশির? উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে সুতপা ।

: এই তো, ভাল ।

: আচ্ছা খাও তাহলে ।

: তুমি কাছাকাছি এলে ফোন দিও, আমি আসবো ।

: আচ্ছা । দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন রেখে দেয় সুতপা ।

বাসায় বলেছে, 'বাসস্ট্যান্ডে নিতে আসতে হবেনা, ফ্রেন্ডরা আসবে নিতে ।' কিন্তু অজানা ভয় হচ্ছে মনে । খুব করে চিন্তা হচ্ছে, 'ও সুস্থ তো !



কাছাকাছি প্রায় চলে এসেছি তাই ভাবলাম ওকে ফোন দেওয়া যায় ...রাতও প্রায় বাজে ৮.৩০

ফোন দিয়েই সুতপা বলল,

"বাসে এসোনা, অসুস্থ তুমি.. সি এন জি তে করে চলে আসো ।"

: সুতপা, শরীরটা খারাপ লাগছে । অসুস্থ কণ্ঠে বলল শিশির ।

: 'আচ্ছা, আমি আমার ছোট ভাইকে আসতে বলতেছি শিশির । ইটস ওকে । তুমি বাসায় যেয়ে রেস্ট নাও ।' বলতে গিয়ে গলা ভারি হয়ে এল সুতপার ।

: ঠিক আছে যাও তাইলে । রাগ করোনা, হুম?

: আমি পারব যেতে ,তুমি চিন্তা করোনা । বলে ফোন কেটে দেয় সুতপা ।



নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে কিছুক্ষণ । "পুরোটাই আসতে বলেছিল কে তোমাকে ! একনজর দেখতে চেয়েছিলাম তোমাকে ..সেই দেখাটুকুর দাম দিলেনা!" মনে মনে ভাবল সুতপা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলল ।

এখন অসুস্থতা নিয়ে শিশিরকে আসতে বলা অমানবিকতা । কিন্তু ও তো পারতো নিজের উপর প্রেসার কম নিয়ে একটুখানি দেখা করার ব্যবস্থা করতে ! এত বেশিই কে চাচ্ছিলো আর এত কষ্টই বা কার পাওনা ছিল! খুব রাগ হচ্ছে সুতপার -সে জানেনা তার রাগটা কার উপরে ! শিশিরের উপর হয়তো না, হয়তো তার ভাগ্যের উপর, হয়তো তার সস্তা আবেগের উপর, হয়তো শিশিরের অসুস্থতার উপর ,হয়তো সারা বিশ্বের সব ভালবাসার উপর ।





মাঝে মাঝে তাই সুতপার ভয় হয় শিশিরের অনেক স্বপ্নের কথা শুনলে । দরকারই কি এত স্বপ্ন দেখার ! অল্প স্বপ্ন দেখে ওটাই পূরণ করিনা কেন । বেশি স্বপ্ন দেখে পরে কিছুই না পেলে সে কষ্টটা যে অসহনীয়!



ছোট ভাইকে ফোন করল সে, "শাকের, তুই কি একটু নিয়ে যেতে পারবি আমাকে বাসস্ট্যান্ড থেকে?" কণ্ঠের কম্পন কে অনেকটা থামিয়ে রিকোয়েস্ট করল সে ।



তারপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘন্টার পর ঘণ্টা বাসস্ট্যান্ডে । একজন পুলিশ জিজ্ঞেস করল, "কার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন ?"

বললাম, 'ভাই' ।

কোন পুরুষকে তো জিজ্ঞেস করলনা ! কেন মেয়েদেরকেই জিজ্ঞেস করতেই হবে ! কেন মেয়েরা অবলা ! ......সবকিছু মিলিয়ে সুতপার ইচ্ছে হচ্ছিল মরে যেতে ।



সবার জীবনের যে অংশটুকুতে তাকে দরকার সুতপা সবার সে অংশটুকুতেই আছে, কারও জীবনের বাকি অংশে তার জায়গা নাই



কিছুক্ষণের জন্য সুতপার মনে হতে থাকে সে আসলেই অকর্ম্য ,অবলা । নাহয় তার অনুরোধ, ইচ্ছা, ভালবাসার কোন গুরুত্বই নাই কেন ! অবশেষে শাকের আসে । ভাইবোন বাসায় যায় । সারারাস্তা সুতপা বুকে পাথর বেঁধে শিশিরের মেসেজের রিপলাই দিতে থাকে । সে দোয়া করে শিশির সুস্থ হোক ।

সে দোয়া করে শিশির সারাজীবন তার পাশে থাকুক ।

যেভাবেই সুতপাকে রাখুক তবুও শিশির তাকে পাশে রাখুক ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.