| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এতক্ষণে মীমের আসার সময় হয়ে গেছে। যাওয়ার আগে যা যা গুছিয়ে রেখে গিয়েছিল একে একে সব অগুছালো করে নিতে হবে! যা গুছানো ছিল সেগুলো সাথে আরও নতুন কিছুও এড করে নিতে হবে! তাহলেই হয়তো সফল ভাবে আমার কাজের পরিণাম দিতে পারবো!
আজ টানা তিন দিন মীম আমার সাথে কথা বলে না। অবশ্য কথা না বলার কারণটা আমিই বানিয়ে দিয়েছি। আর রাগ করবেই বা না কেন? মীমের জায়গায় যদি আমায় বসানো হত তাহলে হয়তো এর থেকে বেশি রাগ আমারই হত! আজ যদি কারও স্বামী চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাসায় শুয়ে বসে নাকে তেল দিয়ে ঘুমায় আর বউয়ের টাকায় দিন কাটায় এখানে যে কেও বাধ্য রাগ করার জন্য। আর মীমের তো কথাই নেই তার রাগ ওঠেই থাকে!
চাকরি ছেড়ে দিয়েছি বলতে ছাড়তেও চাইনি! এক প্রকার বাধ্য হয়েছি। এত চাপ কি আর ভাল লাগে! তার মধ্যে আছে আবার বস! মেয়ে বস! নাম লাভলি! আজ পর্যন্ত বিয়ে করেননি তিনি। তার বিষয়ে আর কিছু না জানলেও এইটা সবাই জানে যে সে কোন ছেলে মানুষকেই দেখতে পারে না!
সেইদিন বস লিফট থেকে নামতেছিল আর আমি ওঠতেছিলাম কিছুটা ধাক্কা লাগার ফলে তিনি পরে যাচ্ছিলেন। তখন তাকে বাঁচিয়েছিলাম। কোথায় তিনি আমায় ধন্যবাদ জানাবেন তা না গিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে দিল নালিশ করে। আমি নাকি তাকে ইচ্ছে করে ছুঁয়েছি! আজব! বাঁচালেও দোষ। আর বাঁচানোর খেসারত পেতে হল আমায়। এ বিষয় এমন হল যে বড় ধরনের ঝামেলা। যদিও আমার মত ইমপ্লয়ি হাত ছাড়া করতে চায় না। তবুও পর দিন গিয়ে ঠিকই রিজাইন করে আসলাম। লাগবে না আমার এমন চাকরি!
বাসায় এসে এ বিষয়ে মীমকে জানালাম। ও তেমন গায়ে মাখল না যে এমনটা আমি করতে পারি। আমার ওপর বিশ্বাস আছে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটল তার একটু পরে।
-রাফসান! এখানে আসো তো!
কথার মাঝে যে অন্য কিছু একটা ছিল বুঝতে পারলাম।
-হ্যাঁ কি হয়েছে বল!
-এইটা কি? ও ওর হাতটা উঁচু করে দেখিয়ে বলল
প্রথমে কিছুই দেখতে পেলাম না যে কি দেখাতে চাচ্ছে ও। একটু ভাল করে দেখলাম যে একটা চুল। লম্বায় কোন মেয়েদেরই চুল হবে এমন আকারের। তাও আবার মেয়েটা হয়তো বয় কাটিং করা। যেমন টা লাভলি ম্যাডামের! কিন্তু কথা হল এইটা আমার শার্টে কেন! কিভাবে আসল?
-আরেহ এইটা তো তোমার চুল দেখ ভাল করে! জানি কাজে লাগবে না তবুও কথাটা বললাম। এছাড়া কোন উপায়ও ছিল না।
-আমার চুল কখনও এতটুকু হতেই পারে না তা তুমি ভাল করেই জান!
কিন্তু এইটা কোন ধরনের থিউরি যে ওইটা ওর চুল হতেই পারে না বা ওর চুল ছিঁড়ে অতটুকু হতে পারে না! আজব! তখন কিছু বলার রইল না আমার কেবল মাথা নিচু করে চলে আসলাম সেখান থেকে।
একেতে বউয়ের জ্বালা অযথাই সন্দেহ করবে তার ওপর অফিসে মিথ্যে অপবাদ। তাই দিলাম ছেড়ে। এর পর থেকে আর কোন ঝামেলাই থাকবে না। আমি এবার টোটালি নিশ্চিন্ত!
২.
মীমকে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে দেখে একটু সোজা হয়ে বসলাম। হাতের কাছে যা যা ছিল তা গুছানোর চেষ্টা করলাম। ওর চোখ যে আমার উপর তা আমি ভাল করেই জানি। কেননা ঢুকার পর মীম যা দেখেছে তা ও কখনও আশা করে নি যে ঘরের অবস্থা এমন হয়ে থাকবে! অন্য যে কোন দিন হলে আমায় এতক্ষণে ঝাড়ি শুনতে হত একগাদা। তবে আজ যে ও আমায় বকবে না আমি জানি। এর কারণটা তিন দিন আগের ঘটনাই যথেষ্ট।
কোন কথা না বলে সোজা চলে গেল। প্রত্যেকদিনের মত যে এখন সাওয়ার নিতে যাবে আর বের হয়ে খাবার গরম করে একা একাই খেতে বসবে তা আমি জানি। তবে খাওয়া শেষ হলে আমার জন্য সব বেড়ে রেখে তারপর তার অন্য কাজ করে।
কিন্তু আজ আর দেরি করলাম না। সাওয়ারে ঢোকার সাথে সাথেই প্লান মতো খেতে বসলাম। টেবিলে বসে ভাতের থেকে তরকারিটাই বেশি গিললাম। ওর বের হওয়ার আগেই সব করে নিলাম।
-রাফসান! এই রাফসান এখানে আসো!
একটু দূরেই বসে ছিলাম আমি। টিবিতে টম জেরি দেখতেছিলাম। যদিও দেখার বয়স পার করে এসেছি অনেক আগেই তবে টেনশন থেকে মুক্তি বা ফ্রি ফিল করতে চাইলেই আমি এমনটা করি! বসে বসে টিবি দেখি।
দ্বিতীয় বার ডাকার আগেই ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
-কি এসব! আঙ্গুল দিয়ে টেবিলের দিকে দেখিয়ে কথাটা বলল
তাকিয়ে দেখি যে কোন বাটিতেই তরকারির ছিটে ফোটাও নেই! কিছু পরিমাণ যে বেঁচে থাকবে তাও নেই! ডালটা পর্যন্ত নেই! কেবল সাদা ভাতগুলোই আছে খাবার জন্য! তাও খেতে হবে এখন লবণ দিয়ে তা ছাড়া উপায় নেই!
মীম আবারও বলল,
-এখন আমি কি খাব!
কিছুটা বিরক্তি ভাব কথায় ফুটে ওঠল। তবে শান্ত গলায় কথাটা বলেছে। আমায় কিছু না বলতে দেখে রাগটা হয়তো আরও বেড়ে গেছে।
-কিছু খেতে হবেনা আমায়
রাগ দেখিয়ে এই কথাটা বলে চলে গেল শোবার ঘরে। আসলে আমিও জানি অফিস থেকে আসার পর খালি পেটে থাকলে কেমন লাগে! ওর অবস্থাটা ফিল করার চেষ্টা করলাম! কিন্তু কিছু বললাম না।
(বাকিটুকু মীমের ভাষায়...)
কলিং-বেলটা কয়েকবার ধরেই বেজে চলেছে। যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন রাফসান যে দরজাটা খুলবে না আমার জানা আছে! গত তিন দিন ধরে ওর রুটিন আমার জানা হয়ে গেছে!
আজব! কেও নেই এখানে! তাহলে বাজালো কে? এখন রাফসান নেই যে ওর মুখের দিকে তাইকে বুঝার চেষ্টা করব যে কি হয়েছে! যে এসেছিল সে কে ছিল বা কেন এসেছিল! নাকি রাফসানের সাথে কথা বলে চলে গেছে! দরজাটা লাগিয়ে চলে আসবো এমন সময় ছোট একটা খাম চোখে বাধল। সম্ভবত চিঠি। হয়তো এইটা দিতেই এসেছিল। কিন্তু বেদবটা কই গেল!
চিঠিতে ঠিক এরকম লেখা ছিল-
“দেখ মীম আমি আসলে তোমায় এতটাও রাগ ওঠাতে চাই নি! আমি জানতামও না যে বিষয়টা এমন পর্যায়ে চলে আসবে! গেছে। তাই আমি কিছুটা সময় বাইরে কাটিয়ে আসি। তুমি চিন্তা করো না আমি ঠিক সময় বাসায় ফিরে আসবো! তুমি বরং খেয়ে নাও। দেখ টেবিলে খাবার দেওয়া আছে।”
আমার সাথে মজা করছে ও! নিজে সব খেয়ে নিয়ে আমায় বলতেছে টেবিলে খাবার দেওয়া আছে! সব কিছুর একটা লিমিট আছে! আমি জানি ও আমায় ইচ্ছে করে রাগ ওঠানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এরকমটা আর একদম সহ্য হয় না!
কেন যেন মনে হল যে যাই গিয়ে একবার দেখে আসি যে কথাটা সত্যি কি না! এমনও তো হতে পারে ও বাইরে থেকে খাবার আনিয়েছে! এতে তো ওর আবার অভ্যাস আছে! কিন্তু বেদবটা কোথায়? চোখে পরছে না কেন? ছাদে নয়তো!
কোথাও তো নেই! সব জায়গাতেই তো খুঁজে দেখলাম কোথাও নেই! তাহলে কি সত্যি সত্যিই হয়তো বাসার বাইরেই গেছেন! হতে পারে! কিন্তু নিজেরই খারাপ লাগতেছে অন্যদিন হয়ে এখন ও ঘুম দিতো। আমার কারণে তা পারল না! আমি বুঝি না ছেলেটা এত কিছু কিভাবে সহ্য করে!
৩.
সত্যিই তো! টেবিলটা একদম সাজানো গুছানো! এত খাবার!
ওয়েট এ সেকেন্ড, এসব তো বাইরের খাবার না! রং দেখে তো অন্তত যে কেও বলে দিতে পারবে এইটা বাইরের খাবার না! তাহলে! এগুলো কি রাফসান করেছে? নিজে করেছে?
ছেলেটা এত কিছু করল কখন? এত অল্প সময়ে তো পেরে ওঠার কথা না! তাহলে কি আমি আসার আগেই সব করে রেখেছিল! হয়তো বা তাই হবে! কিন্তু এত কিছু পেরে ওঠল কিভাবে?
নিজের অজান্তেই কেন যেন মনের ভেতর কেমন এক ভাল লাগা কাজ করতে শুরু করেছে। নিজেই কিছুটা চমকে ওঠলাম নিজের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পেরে! কিছুক্ষণ আগেও যার প্রতি আকাশচুম্বী রাগ জমা ছিল তার এখন ছিটে ফোটাও নেই! কেবল অনেকখানি ভাল লাগা! ছেলেটা আসলেই একটা পাগল!
কাচের প্লেটটা উপর করা ছিল। যার কারণে অস্পষ্ট হলেও নিচের খাঁজের ভেতর দিয়ে বুঝা যাচ্ছে যে এর ভেতরে নীল কিছু একটা আছে! কিছু একটা বলতে কাগজ। আরও একটা চিঠি! তবে আগেরটা থেকে বড়!
“আমি জানি রাগটা তোমার এখন অনেক কমে গেছে! একটা কথা বলার ছিল যার কারণে এমনটা করলাম। আসলে আমি চাকরি ছেড়ে দেয়নি!”
ছেড়ে দেই নি মানে! রাফসান কি বলতে চাচ্ছে?
“আসলে গতবারের প্রেজেন্টেশনটা বসের অনেক ভাল লেগেছে। তাই খুশি হয়ে এক সপ্তাহের ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। আর বড় কথা হল আজ পর্যন্ত আমাদের অফিসে কোন মেয়ে মানুষ ছিল বা নতুন করে আছে! ওইটা তোমারই চুল ছিল। আসলে আমি দেখতে চেয়েছিলাম তুমি কেমন রিয়েক্ট কর! বিশ্বাস কর আমি বিষয়টা কয়েকবার বলতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি আমার সাথে কোন কথাই বল নি! আমি জানি আমার এমনটা করা ঠিক হয়নি। সরি বাবু! সব কিছুর জন্য।“
তার মানে রাফসান আমার সাথে এই কয়েকদিন আমার সাথে মজা করল, গেইম খেলল আমার সাথে! আর আমিও বোকার মত এতদিন বুঝতেও পারলাম না যে এই সব কিছুই বানানো! আমার সাথে মজা করা তাই না! একবার বাসায় আসো তারপর তোমায় দেখাচ্ছি মজা!..
©somewhere in net ltd.