| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সত্যপথিক শাইয়্যান
আমি একজন চিন্তুক, সমাজ নিয়ে চিন্তা করি! সমাজের ভালোর জন্যে গান-গল্প-ছড়া লিখি ও আইডিয়া শেয়ার করি। আপনি?
চীনের আধুনিকায়নে মাও সে তুং-এর নেওয়া সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল কৃষির সমবায়িকরণ এবং "পিপলস কমিউন" ব্যবস্থা, ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন চাষাবাদের অবসান ঘটিয়ে যৌথ শ্রমের মাধ্যমে কৃষ উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। কীভাবে তাঁর মতো একজন বড় নেতার এই আইডিয়া ব্যর্থ হলো তা জানতে কৃষি সমবায় এবং পিপলস কমিউন ব্যবস্থার ক্রমান্বয়িক বিকাশ ও এর প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
প্রাথমিক ধাপ: মিউচুয়াল এইড টিম
১৯৪৯-১৯৫২ সালের ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন করার পর মাও সে তুং লক্ষ্য করেন যে, ছোট ছোট জমিতে এককভাবে চাষ করার কারণে আশানুরূপ ফসল উৎপাদন হচ্ছে না english.scio.gov.cn。 তাছাড়া দরিদ্র কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত লাঙল, বীজ বা গবাদিপশু ছিল না। এই সংকট কাটাতে ১৯৫১ সাল থেকে "মিউচুয়াল এইড টিম" গঠন করা হয়। এখানে সাধারণত ৪ থেকে ১০টি পরিবার মিলে একটি দল তৈরি করত এবং চাষের মৌসুমে একে অপরকে শ্রম, যন্ত্রপাতি ও গবাদিপশু দিয়ে সাহায্য করত, তবে জমির মালিকানা কৃষকের নিজেরই থাকত।
দ্বিতীয় ধাপ: কৃষি উৎপাদন সমবায় (APC)
১৯৫৩ সাল থেকে চীন সরকার এই প্রক্রিয়াটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে আনুষ্ঠানিক সমবায় (APC) ব্যবস্থা চালু করে।
প্রাথমিক সমবায় : এখানে ৩০ থেকে ৫০টি পরিবার তাদের জমি ও যন্ত্রপাতি একীভূত করে যৌথভাবে চাষাবাদ শুরু করে। ফসলের একটি অংশ কৃষকেরা পেতেন তাদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী এবং বাকি অংশ পেতেন তাদের দেওয়া শ্রমের ভিত্তিতে।
উচ্চতর সমবায়: ১৯৫৫-৫৬ সালের মধ্যে প্রায় সব সমবায়কে উচ্চতর সমবায়ে রূপান্তর করা হয়, যেখানে ২০০ থেকে ৩০০টি পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ধাপে জমির ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে তা সমবায়ের যৌথ সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। কৃষকেরা কেবল তাদের শ্রমের ভিত্তিতে লভ্যাংশ পেতে শুরু করেন।
চূড়ান্ত ধাপ: পিপলস কমিউন
১৯৫৮ সালে মাও সে তুং তাঁর বিখ্যাত ও বিতর্কিত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" অর্থনৈতিক আন্দোলন শুরু করেন, এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে শত শত সমবায়কে একত্রিত করে বিশাল আকৃতির "পিপলস কমিউন" গঠন করা হয়। একেকটি কমিউনে প্রায় ৫,০০০ থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে ২০,০০০-এরও বেশি পরিবার অন্তর্ভুক্ত থাকত।
কমিউন ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:
ক) সবকিছুর যৌথকরণ: জমি, যন্ত্রপাতি, গবাদিপশু তো বটেই, এমনকি কৃষকদের ঘরের হাঁড়ি-পাতিল ও রান্নার সরঞ্জামও কমিউনের সম্পত্তি হয়ে যায়।
খ) যৌথ রান্নাঘর (Mess Halls): পরিবারে আলাদা রান্নার ব্যবস্থা বন্ধ করে বিশাল যৌথ রান্নাঘর তৈরি করা হয়, যেখানে সবাই একসাথে বিনামূল্যে খাবার খেত।
গ) বহুমাত্রিক দায়িত্ব: কমিউনগুলো কেবল কৃষিকাজ করত না; তারা স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা (স্কুল), চিকিৎসা (বেয়ারফুট ডক্টরস), ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা এবং স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলার (মিলিশিয়া) দায়িত্বও পালন করত।
ঘ) বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ: এই বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে শীতকালে দেশজুড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ ও সেচ ব্যবস্থার কাজ করা হয়, যা চীনের ইতিহাসে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ ছিল।
এই ব্যবস্থার ফলাফল এবং বিপর্যয়
মাও সে তুং-এর এই কালেক্টিভ ইকোনমি বা যৌথ অর্থনৈতিক মডেলের উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও, এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি চীনের জন্য একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল:
কাজের অনুপ্রেরণা হ্রাস: ব্যক্তিগত মালিকানা না থাকায় এবং সবার জন্য সমান খাবারের ব্যবস্থা করায় অলস ও পরিশ্রমী উভয়ই সমান সুবিধা পেত। ফলে কৃষকদের কঠোর পরিশ্রম করার ব্যক্তিগত আগ্রহ কমে যায়।
ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ: স্থানীয় কর্মকর্তারা কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপদস্থ নেতাদের খুশি করার জন্য কাগজের কলমে ফসলের অবাস্তব ও কাল্পনিক উৎপাদন হিসাব দেখাতে শুরু করেন। সরকার সেই ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে প্রায় সব খাদ্যশস্য কর হিসেবে শহরে নিয়ে যায়। এর সাথে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের তীব্র খরা ও বন্যা যুক্ত হলে চীনে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যায়।
অবসান ও এ থেকে শিক্ষা
এই মহাবিপর্যয়ের পর ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কমিউন ব্যবস্থার কঠোরতা কিছুটা শিথিল করা হয় এবং কৃষকদের বাড়ির পাশে ছোট টুকরো জমিতে নিজেদের জন্য সবজি চাষের অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ডেং শিয়াওপিং এসে এই ব্যর্থ কমিউন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেন এবং "হাউজহোল্ড রেসপনসিবিলিটি সিস্টেম" চালু করেন, যার মাধ্যমে জমি আবার পরিবারের ভিত্তিতে চাষাবাদের জন্য লিজ দেওয়া শুরু হয়।
মাও সে তুং-এর এই কালেক্টিভ ইকোনমি আধুনিক চীনের অর্থনীতিবিদদের জন্য একটি বড় শিক্ষা ছিল যে, জোরপূর্বক সবকিছু রাষ্ট্রীয়করণ বা যৌথকরণ করলে উৎপাদন বাড়ে না, বরং কৃষকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা জরুরি।
©somewhere in net ltd.