নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

সত্যপথিক শাইয়্যান

আমি একজন চিন্তুক, সমাজ নিয়ে চিন্তা করি! সমাজের ভালোর জন্যে গান-গল্প-ছড়া লিখি ও আইডিয়া শেয়ার করি। আপনি?

সত্যপথিক শাইয়্যান › বিস্তারিত পোস্টঃ

লংইউ গুহা - চীনে মাটির নিচে প্রাচীন এক আশ্চর্যজনক পৃথিবী

১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৪



চীনের ঝেইজিয়াং প্রদেশের শিইইয়েন বেইসুয়েন গ্রামের মাটির নিচে আধুনিক বিশ্বের লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে আছে প্রাচীন পৃথিবীর এক নিদর্শন। আজ থেকে ৩৪ বছর আগেও বাইরের দুনিয়া তো দূরে থাক, খোদ চীনের নাগরিকরাও এগুলোর খোঁজ জানতেন না। ১৯৯২ সালের দিকে গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা হঠাৎ করেই ২০০০ বছরেরও পুরোনো এই কৃত্রিম গুহাগুলোর খোঁজ পেয়ে যান। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোন প্রত্নতত্ত্ববীদ, স্থাপত্যবীদ, প্রকৌশলী কিংবা ভূতত্ত্ববীদ এগুলো কে বা কারা তৈরী করেছে সে সম্পর্কে খোঁজ দিতে পারেননি। এমনকি এটাও অজানা যে এগুলো কিভাবে বা কেন তৈরী করা হয়েছিলো, সেটাও অজানা আজকের পৃথিবীর মানুষের কাছে।

লঙ্গিউ গুহার মোট সংখ্যা ৩৬টি। এই গুহাগুলো ৩০,০০০ বর্গমিটারের বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কঠিন সিল্ট পাথরের মাঝে খোদাই করে বানানো এই গুহাগুলো মাটির ৩০ মিটার নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত। এগুলোর প্রতিটিতে পাথরের তৈরী ঘর, সেতু, নালা, এমনকি পুলও আছে। সেই সাথে আছে উপরের ছাদকে ঠেকা দেওয়ার জন্যে পাথরের থাম। এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গুহাকে পর্যটকদের জন্যে খুলে দেওয়া হয়েছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, গবেষকদের কাছেও লঙ্গিউ গুহাগুলো এক ধাঁধা। এর কিছু কারণ আজ তুলে ধরবো।




গুহাগুলো কিভাবে বানানো হয়েছে তা কারো জানা নেই

লঙ্গিউ গুহাগুলো বানাতে যে পরিমাণ শ্রমের দরকার হয়েছে, তা সত্যিই আতংকিত করে। এই কৃত্রিম গুহাগুলো খোদাই করে তৈরি করার সময় প্রায় ১০ লক্ষ কিউবিক মিটার পাথর অপসারণ করা হয় বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতি দিনে একজন শ্রমিক কতটুকু পাথর খোদাই করতে পারে হিসাব করে বিজ্ঞানীরা বের করেছেন যে, যদি ১০০০ মানুষ দিন-রাত কাজ করে তাহলে এই গুহাগুলো বানাতে সময় লেগেছে প্রায় ৬ বছর। বিজ্ঞানীরা প্রত্যেক শ্রমিক সমান হারে শ্রম দিয়ে কাজ করেছে অনুমান করে হিসাবটি করেছেন। কিন্তু, তা যদি সত্যি না হয়ে শ্রমিকদের শারীরিক শক্তি কম-বেশি হয়ে থাকে আর গুহাগুলোর শৈল্পিক গঠনশৈলীর কথা চিন্তা করা হয়, তাহলে গুহাগুলো বানাতে আরো অনেক বেশি সময় লাগার কথা। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর আশে-পাশে নির্মানকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু, লঙ্গিউ গুহাগুলো এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এগুলোর নির্মানকাজে ব্যবহৃত কোন যন্ত্রপাতিই এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই নয়, একটা গুহার সাথে আরেকটা গুহার যে সামঞ্জস্যতা, নির্মানশৈলী'র নির্ভুলতা আর গঠনে সাদৃশ্যতা এতো নির্ভুল ভাবে কিভাবে করা সম্ভব হলো, আধুনিক কালের বিজ্ঞানীরা এখনো বের করতে পারেননি।


গুহাগুলো নির্মানের কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না

এই যে ১০ লক্ষ কিউবিক মিটার পাথরের ভিতর খনন করা হলো, সেই পাথরগুলো কোথায় গেলো! গুহাগুলো যে এলাকায় অবস্থিত, তার আশে-পাশে সেগুলোর কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত। কোন চীনের কোন ইতিহাস বইতেও এর কোন রেকর্ড পাওয়া যায় না। অথচ, এমন কাজ করার জন্যে যে বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন, তা লুকিয়ে করা সম্ভবপর নয় বলে মনে করা হচ্ছে। তাহলে!


গুহাগুলোর দেয়াল আর ছাঁদে খাঁজ কাটা ওসব কিসের চিহ্ন?



প্রত্নতত্ত্ববীদ আর স্থাপত্যবীদরা অবাক চোখে দেখেছেন প্রতিটি গুহার মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কি রকম যেন খাঁজ কাটা। এরকম একই প্যাটার্নে খাঁজ কাটতে প্রয়োজন বিপুল জনশক্তি আর অফুরন্ত সময়। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে- কেন? কিসের উদ্দেশ্যে এরকম খাঁজ কাটা হলো? এগুলো কি শুধুই ডেকোরেশনের জন্যে করা হয়েছিলো? নাকি, খাঁজকাটা লাইন বা প্যাটার্নের মাঝে কোন নক্সা লুকিয়ে আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে এখন পর্যন্ত যা পাওয়া গিয়েছে তা হচ্ছে- এই খাঁজ কাটা লাইনগুলো সাথে স্থানীয় একটি মিউজিয়ামে থাকা খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৮০০ বছরের পুরানো কিছু মৃতশিল্পের উপরের দাগের অনুরূপ।


গুহাগুলোতে কোন মাছ পাওয়া যায়নি

মাটির নিচে গুহাগুলো যখন প্রথম আবিস্কার হয়, তখন সেগুলোতে পানি ছিলো। ধরা হয়, সেগুলো অনেক দিন ধরেই গুহাগুলোতে ছিলো। পানিগুলো সেঁচে ফেলে দেওয়ার সময় ভাবা হয়েছিলো এগুলো এলাকার অন্যান্য তলাহীন পুকুরগুলোর মতোই কিছু হবে। চীনের দক্ষিণের এলাকাগুলোর বাসিন্দারা এরকম অনেক পুকুর খনন করে রাখেন। জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে এগুলো 'তলাহীন পুকুর' নামে এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত। সেগুলোতে মাছও পালন করা হয়। কিন্তু, গুহাগুলো থেকে যখন পানি সরিয়ে ফেলা হয়, তখন সেগুলোতে কোন মাছ ছিলো না, ছিলো না আর কোন প্রাণের অস্তিত্ব। সত্যিই অবাক করা বিষয়!



গুহাগুলো ২০০০ বছর ধরে অক্ষত অবস্থায় টিকে রয়েছে

ব্যাপারটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতোই। গুহাগুলোর বয়স ২০০০ বছরেরও বেশি। তার উপর পানির নিচে ছিলো অনেক দিন। অথচ, একটি দেয়াল ধসে পড়েনি। পিলারগুলো অক্ষত অবস্থায় রয়ে গিয়েছে এখনো। গুহাগুলোর কোন কোন দেয়াল মাত্র ৫০ সে,মি, পুরু। তারপরও, সেগুলোর কিছু হয়নি এতো কাল পরেও। গত দুই হাজার বছরে, চীনের ঐ এলাকার উপর দিয়ে অনেক গিয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে, বন্যায় প্লাবিত হয়ে অনেক পর্বতের আকৃতি পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়েছে। অথচ, লঙ্গিউ গুহা এর ব্যতিক্রম। যেন গতকালকে কেউ ওগুলো বানিয়েছে।


নির্মানকারীরা আলো ছাড়া কিভাবে কাজ করলেন!

গুহাগুলো এতোটাই গভীর যে উপর থেকে সেগুলোর নিচে মেঝের দিকে তাকালে আলকাতরার মতো কালো অন্ধকার চোখে পড়ে। এটা সত্যিই খুবই অবাক করা বিষয় যে, এতোটা গভীরেও গুহাগুলোর মেঝে, কলাম আর সিলিং-এ খাঁজ কাটা সমান্তরাল লাইনগুলো খোদাই করা হয়েছে। এ নিয়ে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের অধাপক জিয়া গ্যাং-এর সাথে আলাপ করা হলে তিনি বলেন যে- গুহাগুলোর মুখ এতোটাই ছোট যে সেগুলো খনন করে বানানোর সময় অবশ্যই লন্ঠনের প্রয়োজন। দিনের একটা বিশেষ সময়ে, তেরছা ভাবে যখন সূর্যের আলো গুহাগুলোতে পড়ে, শুধু তখনই গুহাগুলো আলোকিত হয়। গুহাগুলোর যত নিচের দিকে যাওয়া যায়, সূর্যের আলো তত কমতে থাকে। একদম নিচে পৌঁছার পর প্রায় আর কিছুই দেখা যায় না। তাহলে, দুই সহস্র বছর পূর্বে চীনে যখন আলোকিত করার কোন যন্ত্র ছিলো না, তখন কিভাবে অন্ধকারে ঐ গুহা আর 'নক্সা'-গুলো বানানো সম্ভব হলো!



গুহাগুলো একটার সাথে আরেকটির কোন সংযোগ নেই কেন!

আগেই বলা হয়েছে, লঙ্গিউ গুহাগুলোর সংখ্যা ৩৬টি। এই সবগুলো গুহাই কিন্তু মাত্র এক বর্গ কিলোমিটার জায়গার মধ্যে বিস্তৃত। এতো ঘন করে থাকা এই গুহাগুলোর একটার সাথে আরেকটির তো সংযোগ থাকার কথা। অথচ, সেগুলোর মাঝে তা নেই। প্রতিটি গুহাই আলাদা আলাদা। অনেক গুহার দেয়ালই মাত্র ৫০ সে,মি, পুরু। তারপরো, সেগুলো কেটে পাশের গুহার সাথে কোন পথ করা হয়নি বলেই সেগুলো ইচ্ছেকৃত ভাবে করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কিন্তু, কেন এমন করা হয়েছিলো সেটার উত্তর আজ অবধি পাওয়া যায়নি।




কারা গুহাগুলো বানালো?

আজ পর্যন্ত কেউ জানে না কে ওগুলো বানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন সম্রাট বা নেতার নির্দেশ ছাড়া সাধারণ গ্রামবাসীদের পক্ষে এমন বিশাল কর্মকান্ড চালানো সম্ভব নয়। যেমন- বাইরের শত্রুদের থেকে রক্ষা পেতে চীনের তৎকালীন সরকার চীনের প্রাচীর তৈরীর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু, কোন সম্রাট তা করে থাকলে তো ইতিহাস বইয়ের রেকর্ডে তা থাকার কথা! অথচ, তা নেই।

গুহাগুলো আবিস্কার হওয়ার পর অনেক বছর পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ, এখন পর্যন্ত এসব প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর কেউ বের করতে পারেনি। এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু, আমাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি এই গুহাগুলো আজও রহস্যের আবর্তে ঢাকা।


গুগল ম্যাপে লঙ্গিউ গুহাঃ
আপনি যদি লঙ্গিউ গুহাগুলোর অপার সৌন্দর্য দেখতে চান, তাহলে গুগল ম্যাপে Longyou Caves লিখে সার্চ দিতে পারেন।

মূলঃ April Holloway, Ten Enduring Mysteries of China’s Longyou Caves, Click This Link



সূত্রঃ

১) চীনের সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয়ের 'ওয়ে ব্যাক মেশিন'
২) Longyou Caves-Quzhou Tourist Attractions-Chinahotel". vhotel.org
৩) Engineering geological characteristics, failure modes and protective measures of Longyou rock caverns of 2000 years old". inist.fr. 24 (2).
৪) Longyou Grotto's, ancient-wisdom, http://www.ancient-wisdom.com/chinalongyou.htm

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:৪০

মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন:



লংইউ গুহা নিয়ে আপনার এই তথ্যবহুল লেখাটি পড়ে সত্যিই বিস্মিত হলাম। প্রাচীন মানুষের স্থাপত্যজ্ঞান, প্রকৌশলদক্ষতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে এ ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ কীভাবে কঠিন পাথর কেটে বিশাল ভূগর্ভস্থ স্থাপনা তৈরি করেছিল, কী উদ্দেশ্যে সেগুলো নির্মাণ করেছিল এবং এত দীর্ঘ সময় পরও সেগুলোর কাঠামো কীভাবে টিকে রয়েছে—এসব প্রশ্ন নিঃসন্দেহে কৌতূহলোদ্দীপক।

লংইউ গুহার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক আমার কাছে এর বিশালতা ও নির্মাণের পরিকল্পনা। পাথরের নিচে এমন স্থাপনা তৈরি করতে শুধু শারীরিক শ্রম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ছিল পরিকল্পনা, পরিমাপ, শ্রমিকদের মধ্যে সমন্বয়, আলো-বাতাসের ব্যবস্থা এবং ছাদ ও স্তম্ভের ভার বহনের বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান। নির্মাতারা লিখিত প্রকৌশলবিদ্যা জানতেন কি না, তা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কিন্তু তাঁদের কাজের মধ্যে যদি পরিকল্পিত নকশা ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য দেখা যায়, তবে স্বীকার করতেই হবে যে তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নির্মাণদক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য।

আপনার লেখায় গুহাগুলোর নির্মাণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এখানে একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: কোনো স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি মানেই যে সেগুলো নির্মাণের কৌশল অজানা ছিল, এমন নয়। কাঠ, ধাতু কিংবা অন্য কোনো উপকরণের যন্ত্রপাতি সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, অন্য কাজে পুনর্ব্যবহৃত হতে পারে, অথবা এখনো প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের বাইরে থেকে যেতে পারে। তাই যন্ত্রপাতির অনুপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার প্রশ্ন হলেও একে সরাসরি নির্মাণকৌশল ব্যাখ্যা করার অসম্ভবতার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

গুহাগুলোর দেয়াল ও ছাদে একই ধরনের খাঁজ থাকার বিষয়টিও বিশেষ আগ্রহের দাবি রাখে। এই খাঁজগুলো নির্মাণের সময় পাথর কাটার পদ্ধতির চিহ্ন হতে পারে, আবার এগুলোর পেছনে নান্দনিক বা অন্য কোনো ব্যবহারিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ছাড়া কোনো একটি ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। খাঁজের দিক, গভীরতা, ব্যবধান এবং বিভিন্ন গুহায় তার বিন্যাস তুলনা করে গবেষণা করলে নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

একইভাবে, গুহাগুলোতে বিপুল পরিমাণ পাথর অপসারণ করা হয়েছিল বলে যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেই পাথর কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আশপাশে পাথরের স্তূপ পাওয়া যায়নি বলেই পাথরগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সেগুলো অন্য স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে, অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে, কিংবা সময়ের সঙ্গে ভূপ্রকৃতি ও মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের চিহ্ন পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।

গুহাগুলোর ভেতরে আলো পৌঁছানোর সমস্যা নিয়েও ভাবার বিষয় রয়েছে। আধুনিক বৈদ্যুতিক আলো না থাকলেও প্রাচীন মানুষ প্রদীপ, মশাল কিংবা অন্য ধরনের আলোর উৎস ব্যবহার করতে পারত। তবে কোন ধরনের আলোর ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছিল, তা নির্ধারণের জন্য কালি বা ধোঁয়ার চিহ্ন, পোড়ার অবশেষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্নবস্তু পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, কোনো কাজ আজ আমাদের কাছে কঠিন মনে হচ্ছে বলেই প্রাচীন মানুষের পক্ষে তা করা অসম্ভব ছিল—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।

আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন হলো, এই গুহাগুলো আসলে কী কাজে ব্যবহৃত হতো? এগুলো কি সংরক্ষণাগার, কোনো বিশেষ ধরনের কর্মস্থল, সামরিক বা প্রশাসনিক স্থাপনা, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল? সব গুহার ব্যবহার একই ছিল, নাকি সময়ের সঙ্গে ব্যবহার পরিবর্তিত হয়েছিল—সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়। নির্মাণের সময়কাল নির্ধারণ, আশপাশের বসতির ইতিহাস, মাটির স্তর, সম্ভাব্য জৈব অবশেষ এবং গুহাগুলোর অভ্যন্তরীণ বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: কোনো স্থাপনার নির্মাতা বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঐতিহাসিক নথি না পাওয়া মানেই যে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই, তা নয়। প্রত্নতত্ত্বে অনেক সময় সরাসরি লিখিত প্রমাণের পরিবর্তে স্থাপত্যের ধরন, নির্মাণের চিহ্ন, পরিবেশগত তথ্য এবং তুলনামূলক গবেষণার মাধ্যমে অতীতকে পুনর্গঠন করা হয়। লংইউ গুহার রহস্য উন্মোচনেও এই বহুমাত্রিক পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।

এই ধরনের প্রাচীন স্থাপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছিল, যার সবকিছু আজও আমাদের জানা নেই। প্রাচীন মানুষকে অজ্ঞ বা অদক্ষ ভাবার কোনো কারণ নেই। তাঁদের প্রযুক্তি আধুনিক প্রযুক্তির মতো না হলেও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং হাতে-কলমে অর্জিত জ্ঞানের সাহায্যে তাঁরা বিস্ময়কর স্থাপনা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন।

আপনার লেখার জন্য ধন্যবাদ। তবে রহস্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে অজানা বিষয়গুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত তথ্য এবং সম্ভাব্য ব্যাখ্যার পার্থক্যটিও তুলে ধরা প্রয়োজন। কোন তথ্য প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, কোনটি গবেষকদের অনুমান, আর কোনটি এখনো অমীমাংসিত—এগুলো আলাদা করে দেখালে পাঠক শুধু বিস্মিতই হবেন না, বিষয়টি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবেন।

লংইউ গুহার প্রকৃত রহস্য হয়তো একদিন উন্মোচিত হবে, আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানাও থেকে যেতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানের মূল্য এখানেই—আমরা যা জানি, তাকে যাচাই করা; যা জানি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা; আর পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোনো অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য বলে ঘোষণা না করা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.