| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ধর্ষণ শুধু ব্যক্তির বিকৃতি নয়, এটি একটি সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের প্রতিফলন।
যে সমাজ অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ায়, ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করে এবং নারীকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়- সেই সমাজ ধীরে ধীরে ‘ধর্ষণপ্রবণ’ সমাজে পরিণত হয়। প্রতীকী সহিংসতা, ধর্ষণ-মিথ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এই অন্ধকার আরও গভীর হবে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নারী-পুরুষের ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হয়, কেন কিছু সমাজে ধর্ষণের মতো অপরাধ বাড়ে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ১৫০টি নৃগোষ্ঠী সমাজ নিয়ে গবেষণা করেন। তার গবেষণায় দেখা যায়, যেসব সমাজে যৌন সহিংসতাকে সামাজিকভাবে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে দেখা হয় এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়, সেসব সমাজ তুলনামূলকভাবে ‘ধর্ষণমুক্ত’। বিপরীতে, যেসব সমাজে ধর্ষণকে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা, পৌরুষ বা নারীকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, সেসব সমাজ হয়ে ওঠে ‘ধর্ষণপ্রবণ’।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই ‘ধর্ষণপ্রবণ’ সমাজের বহু লক্ষণ স্পষ্ট। ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাওয়া, ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা, পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে নারীদের হেনস্তা করা- এসব এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কোথাও নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও ওড়না বা পোশাক নিয়ে নারীদের অপমান করা হচ্ছে, আবার কোথাও নির্যাতনকারীকেই সামাজিকভাবে “নায়ক” বানানোর চেষ্টা চলছে। এসব শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নারীর বিরুদ্ধে একটি ভয়ভীতি ও দমনমূলক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করছে।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এই ধরনের অদৃশ্য দমনকে বলেছেন “প্রতীকী সহিংসতা” অর্থাৎ, নারীকে নিয়মিত হেয় করা, নির্ভরশীল বা দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করা এবং সামাজিকভাবে অসম মর্যাদায় ঠেলে দেওয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয় “ধর্ষণ-মিথ” -যেখানে অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীর চরিত্র, পোশাক বা আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ফলে অপরাধীরা পরোক্ষ সামাজিক প্রশ্রয় পায়।
অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানী ও দেখিয়েছেন, সমাজ যখন ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজে নৈরাজ্য বা “অ্যানোমি” তৈরি হয় এবং অপরাধ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র ও সমাজ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ধর্ষণ সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করছে।
তাই ধর্ষণ শুধু ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়; এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। যতদিন পর্যন্ত প্রতীকী সহিংসতা, ধর্ষণ-মিথ এবং অপরাধীদের প্রতি সামাজিক-রাজনৈতিক সহানুভূতি বন্ধ না হবে, ততদিন এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।
©somewhere in net ltd.