নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ছেঁড়া মানচিত্র

এই ধরণীর ধূলি মাখা তব অসহায় সন্তান মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদি-_পিতা ভগবান!_

কাল পুরুষ কোরাস

আপাতত কিছু বলার নেই। আমি মানুষ, আমি মানবতায় বিশ্বাসী

কাল পুরুষ কোরাস › বিস্তারিত পোস্টঃ

পাত্রী

০৩ রা আগস্ট, ২০১৩ দুপুর ১২:৪৯



রওনকের রাতে একদমই ঘুম হয়নি। কেন ঘুম হয়নি তা রওনকের চিন্তার বাইরে। ঘুমানোর ভান করে অনেকক্ষণ বিছানায় পড়ে ছিল। তাতে কোন কাজ হয়নি। কান খোলা ছিল তাইফজরের আযান শুনতেও সে ভুল করেনি। রাতের অন্ধকার কেটে সকালের আলো যখন জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে তখনই রওনকের চিন্তা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সকালের সিগ্ধ ঠাণ্ডা পরিবেশেও রওনকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। রওনকের আজ ভালো থাকার দিন। আজ জীবনে একটা নতুন কিছু পেতে যাচ্ছে সে। বিয়ের পাত্রী দেখতে যাবে। বিয়েটা হবে কি হবে না তাই নিয়ে রওনক বেশ চিন্তিত। খাট থেকে নেমে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ভোরের সৌন্দর্য আসলেই মনোরম। ভোরের প্রকৃতিকে সবাই উপভোগ করতে পারে না। এই ইট পাথরের শহরে বুড়োরা ভোরে উঠে ব্যায়ামের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। সকালের সিগ্ধতা তারা উপভোগ করতে চায় না। তারা জানে, সকালের আবহাওয়ায় শরীরচর্চা করা উত্তম। সকালে বুড়োদের সঙ্গী গার্মেন্টস কর্মী ও রিক্সাচালকরা। ভোর হতে না হতেই তাদের চোখের পাতা খুলে যায়। সারা দিনের বিরামহীন পরিশ্রম শেষে রাতের বেলায় বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়েই মৃতের মতো ঘুমায়। সকালে উঠে সময়ের আগেই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। অনেকটা যন্ত্রতে পরিনত হয়ে গেছে। ভোরের সকালটা তারাও উপলব্ধি করে না। আসলে তাদের করার সময় কথায়! তারা তো আর রওনকের মতো ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে সন্দিহান না। চলছে, চলবে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। এসব চিন্তা করতে করতে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে রওনক। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তার খেয়াল নেই।



এ রনক! রনক।

চোখ মেলে দেখে দুলাভাই দাঁড়িয়ে আছে। ঘরভর্তি মানুষের কল-রব শোনা যাচ্ছে। বাবা ডাকছে। তুমি ফ্রেশ হয়ে টেবিলে আসো – দুলাভাই কথাগুলো বলে উত্তরের আশা না করে চলে গেলেন। সন্ধ্যায় পাত্রী দেখতে যাবে ওরা। সাথে রওনকও থাকবে। রওনক অনেক বলেছে যাবে না। মেয়ে তোমাদের পছন্দ হলে আমারও পছন্দ। কেউ রওনকের কথায় কর্ণপাত করেনি। বিয়ে বলে কথা। জামা কাপড় নয় যে হুট করে কিনে আনলাম, পছন্দ হয়নি ফেরত দিয়ে দেও। খাবার টেবিলে বাবা দুলাভাই অনেকক্ষণ আলাপ করেন। দুলাভাই রওনককে নিয়ে কেনাকাটার জন্য বেরিয়ে পড়েন। বিয়ের বাজার বলে কথা। অনেক কিছু কিনতে হবে।



রওনক এখন শান্তিনগরের একটা বাসার ড্রয়িংরুমে বসে আছে। সাথে তার দুলাভাই, বাবা, মা, বড়বোন রয়েছে। পাত্রীর বাবার সাথে পাত্রীর ছোট ভাই উপস্থিত রয়েছে। শুধু পাত্রী নেই। পিচ্চি ছেলেটা বার বার রওনকের দিকে তাকাচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। হাসিটা রওনককে আরো বিব্রত করছে। সে জানে বিয়ে করতে গেলে পাত্রদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানি করা হয়। মনে মনে হয়তো এই ছেলেটা তাই পরিকল্পনা করছে। খুব সম্ভবত পাত্রী বাবা মা’র পছন্দ হলে এই ছেলেটা তার শালা হবে। পর্দার ওপাশে চুড়ি আর জুতোর শব্দ শুনে বুঝতে পারলো হয়তো পাত্রী আসছে। একটু নড়ে চড়ে বসল রওনক। কিছুক্ষণ পরেই পাত্রীর আগমন। যথারীতি হাতে নাস্তার ট্রে। পাত্রীর সাথে সাথে পাত্রীর মা’র প্রবেশ। রওনক একবার শুধু আড়চোখে পাত্রীর দিকে তাকালো। এতেই সে দেখে নিয়েছে পাত্রীকে। পরনে কুমকুম রঙের শাড়ী, চুলগুলো খোঁপায় বাঁধা, চারপাশে তার সাদা ফুলের মালা জড়ানো। কপালে ছোট্ট একটা নীল টিপ। হয়তো মেয়েটা অত্যাধিক সাজা পছন্দ করে না বা ইচ্ছে করেই এভাবে সেজেছে। রওনকের কেন জানি মনে হল মেয়েটা আসলেই অনেক সুন্দর। এই রকম মেয়েই রওনকের পছন্দ। বালতি বালতি আটা ময়দা মাখা মেয়ে ওর পছন্দ না। মেয়েদের এই রকম সাজই ভালো দেখায়। ২য়বার তাকানো ভালো হবে কিনা ভেবেই আর তাকালো না। বাবা মা পাত্রীর সাথে কথা বলছে। কথার মাঝেই রওনক জানতে পারে পাত্রীর নাম তমা। রওনকের দুলাভাই এক রকম জোর করেই রওনককে তমার সাথে কথা বলার জন্য একটা রুমে পাঠিয়ে দেয়। একটা বন্ধ ঘরে এখন দুটো মানব মানবী। রওনকের কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। কিছু বলতে চেষ্টা করল সে, পারলো না। প্রথম কথাটাই তমাই বলল, কেমন আছেন আপনি?

জ্বি ভাল, আপনি? – এবার সে মেয়েটাকে ভালো করে দেখল। আসলেই মেয়েটা অনেক সুন্দর।

- ভালো আছি। - তমার উত্তর ।

ও আচ্ছা। রওনক কি জিজ্ঞেস করবে খুঁজে পেল না। মেয়েটাও কিছু বলছে না। রওনক কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল, আপনি কিসে পড়েন?

- এইতো, আছাড় খেয়ে খেয়ে পড়ছি। বর্তমানে ইডেনে আছাড় খাচ্ছি। - বলেই ফিক করে হেসে দেয়।

ভূতুড়ে পরিবেশটা এখন অনেকটা শান্ত মনে হচ্ছে রওনকের। নিজেও স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে। অনেক কথার পর তমা ও রওনক রুম থেকে বের হয়ে আসে। তাদের দুজনের উপরই সবার চোখ। ছেলে মেয়ের চোখে মুখে আনন্দ দেখে তাদের বুঝতে বাকি রইল না একে অপরকে পছন্দ করেছে। তমাকে আংটি পরিয়ে রওনকরা রাতে বাসায় এসে পড়ে। নিজের রুমে ঢোকার আগে দুলাভাই রওনককে বলে, তোমরা দুজন যে রুমে হাসাহাসি করছিলে না তা আমরা শুনতে পেয়েছি। বাবা আর মা মিটিমিটি হাসছিলেন। বুঝলে শালা একটু সাবধানে...। দুলাভাইও মুখ টিপে হেসে চলে গেলেন। রওনক খুব লজ্জা পেল সাথে একটু ভয়ও পেল। পাছে কেউ জেনে গেলে ব্যাপারটা।



পরদিন দুপুরে রওনকের ছোটভাইটা এসে বলে গেল ভাইয়া তোমার ফোন এসেছে। ড্রয়িংরুমে গিয়ে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা রিসভারটার দিকে তাকালো রওনক। সহসা বুঝতে পারলো না এই সময় কে তাকে মোবাইলে ফোন না করে টিএনটিতে ফোন করতে পারে।

হ্যালো।

- হ্যালো। - অন্য প্রান্ত থেকে মিহি কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো।

বিব্রত রওনক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আড়চোখে একপলক রুমটা দেখে নিলো। বড় আপা ও মা বসে বসে আলাপ করছেন।

হ্যালো, আপনি কে বলছেন? (জোরে সবাইকে শুনিয়ে) সাহস সঞ্চয় করে মেয়েটার নাম জানতে চাইল রওনক। অন্য পক্ষের হাসির শব্দ শোনা গেল।

- আমাকে চিনতে পারছেন না বুঝি?

না। না-তো।

- একটু চিন্তা করুন, ঠিকই চিনতে পারবেন।

রিসিভারটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে রইলো রওনক। চিন্তা করলো, কিন্তু চিন্তা করে সময়-সময় সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় না। পেলেও সকল ক্ষেত্রে তা সত্য হয়না।

- হ্যালো, অন্য পক্ষ আবার ডাকল।

রওনক এবার জিজ্ঞেস করলো আপনি কাকে চান,

- আপনাকে। মেয়েটা আবার হেসে উঠল।

আপনাকে? বলতে গিয়ে বার কয়েক ঢোক গিলল রওনক। এ কার পাল্লায় পড়লো সে?

- হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো – চুপ করে রইলেন যে?

চুপ না থেকে কি করব বলুন।

- বললাম তো একটা কবিতা আবৃত্তি করুন।

রওনক আরেকবার তাকাল রুমের দিকে। এবার সে দেখতে পেল বড় বোনের সাথে মা’ও তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।

- হ্যালো। অন্য পক্ষ আবার ডাকল।

বলুন।

- আমি তমা কথা বলছি।

তমা। যার সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যাবেলায় আলাপ হয়েছিল। আপনি কোথা থেকে বলছেন?

- কলেজ থেকে।

ক্লাস নেই বুঝি।

- না।

তাহলে বসে বসে একটা কবিতার বই পড়লেই পারেন। - রওনকের মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

- শুনুন। আপনাকে এখনই নিউমার্কেটের মোড়ে আসতে হবে। অন্য পক্ষের কড়া গলার আওয়াজ শোনা গেল।

আমি পারব না। রওনকের নির্লিপ্ত জবাব।

- আচ্ছা, না আসলে আমিই আপনার বাসায় চলে আসবো।

কি সাংঘাতিক মেয়ে। কয়দিন পর এমনেই বউ হয়ে আসবে তখন এ বাড়িতে থাকতে থাকতে অসহ্য হয়ে পড়বে তা না আগেই আসতে চায়। এত বড় হুমকি শুনে রওনক কি করবে বুঝতে পারলো না। শুধু বলল আচ্ছা, আমি আসছি।

- হুম। তাড়াতাড়ি।

হুম।

লাইনটা কেটে গেল।



রওনক এখন নিউমার্কেটের সামনে দাড়িয়ে রয়েছে। রাস্তার ওপর প্রান্ত থেকে তমার আগমন।

- তুমি এলে তাহলে। আমি তো ভেবেছিলাম আসবে না।

তুমি ডেকেছ আর আমি আসিনি কবে শুনি? – রওনক রেগে যাচ্ছে।

- তমা হেসে বলে, আচ্ছা! বাবা হয়েছে। চল একটু হেটে আসি।

চল।

তমা ও রওনক ব্যস্ত রাস্তায় হেটে চলছে।

তুমি আমার বাসায় টিএনটিতে ফোন দিলে কেন? – রওনকের জিজ্ঞাসু প্রশ্ন।

- দিলাম। চিন্তা করলাম যদি তোমার পরিবারের কাছে ভালো সাজা যায়। হাসিসুলভ জবাব তমার।

ও। তাই। মজা কর তাই না। এত বণিতা না করলেও পারতে।

- তুমি আমাকে চিনতে পারো নি, তাই না। - হাসিমুখে তমা বলল।

এভাবে কথা বললে কেউ চিনে। আগে বল কাল তুমি আর আমি যখন রুমে গেলাম, তুমি এমন ভাব করলে কেন। যেন আমাকে চিনই না। আমিতো ভড়কে গিয়েছিলাম তোমার কথা শুনে।

- স্মান হেসে তমা বলল, শুন, বিয়ে তো আমরা করবই, তাই না। যদি সামান্য

কারনে কেউ জেনে যায় আমি তোমার পূর্বপরিচিত তাহলে তো অনেক সমস্যা সৃষ্টি হবে। সে জন্য এক্সট্রা প্রোটেকশন বলতে পারো।

আচ্ছা। তবে কি জান আমি না হাসান কে নিয়ে একটু ভয়েই ছিলাম। ও আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসছিল। আমি টেনশনে ছিলাম যদি তোমার বাবাকে মুখ ফসকে বলে দেয় বাবা এই হারামিটা আপুর প্রেমিক।

কথাটা বলে উভয়ই হাসতে লাগল। ব্যস্ত রাস্তার কিছু অলস মানুষ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। কি হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টায়।

- আচ্ছা, আমাদের বিয়ে হবে তো! তমার উদ্বিগ্নতা প্রকাশ পেল।

হবে। যেভাবে প্ল্যান করেছি হতেই হবে। সব কাজ তো দুলাভাই করলেন সব পাপ্য তার। আর তো মাত্র কিছু দিন। - আশ্বাসের সুরে রওনক বলল।

চলো। আবেগ ভরা তমার কণ্ঠে।

চলো।

কেউ কোন কথা বলছে না। আজ থেকে হয়তো অনন্তকাল একসাথে হাটার প্ল্যান রয়েছে ওদের। মাস্টার প্ল্যান। কেউ কখন কাউকে ক্লান্ত হতে দিবে না। মানুষ মাঝে মাঝে অনেক কিছু ভাবে। কখনো তার অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। কখনো যায় না। তবুও তার ভাবনার শেষ হয় না। যেমন ওদের ভাবনার শেষ হয়তো কখনই হবে না।

ভালো থাকুক ওরা।

ভালো।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.