| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কোনো কোনো ঘটনা স্বীকৃতি বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা রাখে না। কবিতার অবিস্মরণীয় পঙিক্তর মতো স্বমহিমায় প্রকাশিত হয়।
৬ এপ্রিল হযরত আলী দিবস। ২০১২ সালের এই দিনে প্রাতর্ভ্রমণে বের হওয়া রাজধানীর মিরপুরে রাইনখোলা সড়কে যুবক হযরত আলী প্রত্যক্ষ করেন একদল ছিনতাইকারীর সঙ্গে তিন মহিলার ধস্তাধস্তি। তিনি ইট হাতে নারীর জীবন ও সম্ভ্রম রক্ষায় দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধে এগিয়ে এলেন। কিন্তু নরপিশাচগুলো আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে তাঁর বুক ঝাঁজরা করে দিয়ে প্রাইভেট কারে করে চম্পট দিল। অসংখ্য খবরের ভিড়ে দৈনিকের একক কলামে ছাপা হওয়া এক যুবকের এই বীরত্বপূর্ণ ঘটনা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সাতক্ষীরা সদরের বল্লির শেখপড়া সাকিনের মৃত ওমর আলীর আট সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান হযরত আলী ছিলেন তেজগাঁও শিল্প এলাকার একটি প্রাইভেট কোম্পানির বিক্রয় পরিদর্শক। দলীয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সমবেদনা জানানো বা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার রেওয়াজ আছে। অথচ হযরত আলীর বিপন্ন পরিবারের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। এমনকি ময়নাতদন্তের পর তাঁর লাশ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছা সম্ভব হয়েছে তাঁর নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠান ও সুহূদদের সহযোগিতায়।
ঘটনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার বলেছিলেন, ‘হযরত আলী যদি উন্নত কোনো দেশের নাগরিক হতেন, তাহলে তাঁর আত্মদানকে রাষ্ট্র অভিনন্দিত করত। তিনি জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি পেতেন।’ পুলিশের দায়িত্ব হলো অনুদ্ঘাটিত ঘটনা তদন্ত সাপেক্ষে উদ্ঘাটন করে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা। সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী ও চোর-ডাকাতদের তালিকা হালনাগাদ সংরক্ষণ করে পুলিশ। এমনকি উঠতি বয়সী সন্ত্রাসীদের তালিকাও সংরক্ষিত থাকে বিশেষ শাখা বা থানার পুলিশের হাতে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে জিজ্ঞাসা, বিগত একটি বছরেও কি ছিনতাইকারী গংকে গ্রেপ্তার করা গেল না? এ অবস্থায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতেই থাকবে এতিমের মিছিল। যে মিছিলে শামিল হবে হযরত আলীর দুই ছেলে প্রিন্স আর প্রীতির মতো সন্তানেরা। পুড়ে পুড়ে ছাই হতে থাকবে নাইমুর নামের শিশু কাহালুর ইটের ভাটায়। কুকুর-আতঙ্কে আর হিমাদ্রির বাড়িফেরা হবে না। আর পরাগের জীবন চিরকালের জন্য ছেয়ে ফেলবে আতঙ্ক নামের এক কৃষ্ণভালুক রাত। ত্বকীর মতো প্রাণহীন পদ্মরা বারবার ভাসতে থাকবে শীতলক্ষ্যার জলে।
মিরপুরের রাইনখোলা সড়কটির ‘হযরত আলী সরণি’ নামকরণে কি বিশাল অর্থের প্রয়োজন? অথবা মিরপুর সড়কের কোথাও হযরত আলীর একটি আবক্ষমূর্তি স্থাপনে শূন্য হয়ে পড়বে রাজকোষ? কোথায়, কীভাবে দুটি এতিম শিশুসহ জীবনযাপন করছেন তাঁর স্ত্রী সালমা সুলতানা, সে খবর কি সরকার রাখে?
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানসহ অধিকার সংরক্ষণের কর্তাব্যক্তি ও টক শোর পণ্ডিতদের কত কিছু নিয়ে হইচই করতে দেখি। ত্যাগ ও সততার এই আকালের দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা আপসহীন মানুষ হযরত আলীর জীবনদানে বিরল ঘটনাটি সভা-সমাবেশ সেমিনার বা টক শোর মাধ্যমে জাতির সামনে কি একটি ধ্রুব নক্ষত্র হিসেবে দাঁড় করানো গেল না? তাঁর জন্য জারি হলো না কোনো সুয়োমোটো রুল।
ভাবতে কষ্ট হয়, ছিনতাইকারীদের কবলে পড়া তৌহিদা বেগমসহ তিন নারী বা তাঁদের কারও পরিবার প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষণিকের জন্য অসহায় সালমা সুলতানার পাশে দাঁড়াননি বা তাঁকে সহমর্মিতা জানানোর সৌজন্যটুকুও দেখাননি।
একসময়ের অবহেলিত সাতক্ষীরার যাত্রীদের পদভারে টিকে আছ যশোর বিমানবন্দরটি। বর্তমান সাতক্ষীরায় ধনাঢ্য ব্যক্তির সংখ্যা অনেক, যাঁদের বদান্যতায় বিগত দুই দশকে এই জেলার চেহারা পাল্টে গেছে। শুধু বলতে চাই, নিহত হযরত আলী এই সাতক্ষীরার সন্তান, যাঁকে নিয়ে গর্ব করা যায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক সাতক্ষীরার মানুষ। তিনিও কি এইচএসসি পাস সালমা সুলতানার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন না?
শত কষ্টের মধ্যেও এটাই সান্ত্বনা, কল্লোল গ্রুপ হযরত আলীর মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা মাস শেষে তাঁর স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খুন-খারাবি বেড়েছে। হযরত আলীও এই কাফেলার একটি মুখ হলেও তাঁর মৃত্যুর ঘটনা অন্য সব মৃত্যুর ঘটনার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পৃথিবীর সব ধর্মে নারীকে দেওয়া হয়েছে আলাদা সম্মান। সেই নারী যখন ধর্ষণসহ নানা ধরনের সহিংসতার শিকার, তখন ছুটে গিয়েছিলেন হযরত আলী। তাঁর পরিবারের প্রতি এই সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায় আছে।
প্রজন্মের প্রতি আমাদের আস্থা অশেষ। আজ হোক কাল হোক, আমাদের প্রজন্ম আবেগে-উচ্ছ্বাসে একদিন হযরত আলীকে বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত করবে। তারাও হযরত আলীর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্য কোনো বিপন্ন নারীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে।
এ মুহূর্তে সরকারের কাছে আমাদের দাবি, হযরত আলীর খুনিদের খুঁজে বের করা হোক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। তাতে তাঁর পরিবার যেমন সান্ত্বনা পাবে, তেমনি সমাজে মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে। কেননা অপরাধীর বিচারই পারে অপরাধের দৌরাত্ম্য কমাতে। হযরত আলীর পিতৃহারা দুই সন্তানের লেখাপড়া ও জীবন গড়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। বড় হয়ে তারা বুঝতে পারবে, তাদের বাবা আরেকজন বা একাধিক মানুষের জীবন বাঁচাতেই জীবন দিয়েছিলেন। আদর্শ বাবার সন্তানেরাও আদর্শবান হবে। হযরত আলী, প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আপনাকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।
প্রথম আলো
©somewhere in net ltd.