নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সুহৃদ আকবর

Do Well, Be Well

সুহৃদ আকবর › বিস্তারিত পোস্টঃ

শহীদ কাদরী, তোমাকে অভিবাদন

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ দুপুর ১২:০১

শহীদ কাদরী একটি নাম। সাহিত্যে কাননের অতি মূল্যবান একটি ফুল। শহীদ কাদরীকে বাদ গিয়ে আমাদের বাংলা সাহিত্য অস্পূর্ণ থেকে যাবে। বিউটি বোডিংয়ে এক সময় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ আর শহীদ কাদরী চুটিয়ে আড্ডা দিতেন। তারা ছিলেন একে অপরের খুবই নিকটতম বন্ধু। সাহিত্যের এই তিন বরপুত্রকে বাদ দিয়ে বিউটি বোডিংয়ের আড্ডা কল্পণাই করা যেত না। শহীদ কাদরী বেশি লিখেননি, তবে যা লিখেছেন তা সুন্দরভাবে লিখেছেন। সুন্দরভাবে, সুসামঞ্জস্যভাবে, শব্দের গাঁথুনি দিয়ে, শৈল্পিক বোধ দিয়ে তিনি তার প্রতিটি কবিতার শরীর নির্মাণ করেছেন। তার কবিতার বিষয়বস্তু দেশপ্রেম, নারীপ্রম আর প্রকৃতিপ্রেম। তার কবিতা রচনার একটা নিজস্বতা আছে। কবিতা পাঠের সময় তা পাঠকের চোখে পড়বে। তার এক একটি কবিতা যেন আমাদের সাহিত্যের হীরকখন্ড। যা তার আপন মহিমায় জ্বলজ্বল করছে সাহিত্য ভূবণে। তার কবিতার রয়েছে একটা অন্য রূপ, রস, স্বাদ আর ঠঙ।

শহীদ কাদরীর নাম অনেক শুনেছি। সাহিত্যের সাথে যোগাযোগের সূত্র ধরেই প্রথম তার নামের সাথে আমার পরিচয় হয়। আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, বেলাল চৌধুরীর অনেক সাক্ষ্যাৎকারে ঘুরে ফিরে চলে আসে শহীদ কাদরীর নাম। সেই থেকে একটা টান অনুভূত হতে লাগল আমার মনে। তার জন্য হৃদয়ের ভেতরে একটা ভালবাসাও তৈরী হয়ে গেল এমনিতেই। তার উপর সাহিত্যের ছাত্র হওয়াতে সেই টান সেই আগ্রহ সেই ভালবাসা যেন বাড়তে লাগল। হতে লাগল প্রবল থেকে প্রবলতর। তাই শহীদ কাদরীর উপর আমার জানার অগ্রহ বাড়তে লাগল।

সেই সূত্র ধরেই গত ২৭ সেপ্টেম্বর গোধূলির এক পড়ন্ত বেলায় পাবলিক লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলাম। আমার মাথার উপর শরতের খন্ড খন্ড মেঘ এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। পাখিরা আপন নীড়ে ফিরছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে প্রকৃতিতে। এরকম মনোরম এক বিকালে গিয়ে হাজির হলাম লাইব্রেরীতে। একজন প্রয়াত ছোট ভাইয়ের জীবনী নিয়ে একটা উপন্যাস লিখছি; অর্ধেক লিখার পর আর লিখতে পারছিলাম না। হাতে আর মনে একটা জড়তা চলে এলো। তাই সেদিন টেবিলে গিয়ে চুপটচাপ বসে থকলাম। এমনি আমার চোখে পড়লো শহীদ কাদরীর লেখা একটি বইয়ের মলাটের উপর যার নাম, ‘তোমাকে অভিবাদন, হে প্রিয়তমা’ বইটি হাতে নিয়ে এক নজরে বইয়ের ভূমিকা আর লেখকের পরিচয় পড়ে ফেললাম। লেখক সম্পর্কে আগেই আমার কিছুটা হলেও জানাশোনা আছে পড়ার পর আরও সমৃদ্ধ হল সে জানার পরিধি। এই লেখাটি লেখার ইচ্ছে আমার ছিল না। তবে তার জীবনীটি পড়ার পর লিখতে বাধ্য হলাম। বিশেষ করে তার ছন্নছাড়া ভবঘুরে ভাবটা আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে। ‘তোমাকে অভিবাদন, হে প্রিয়তমা’ বইয়ের উপর ভিত্তি করে শহীদ কাদরীর জীবনীর যৎকিঞ্চিৎ এখানে তুলে ধরছি।

শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রগণ করেন। কবিতা লেখার শুরু পঞ্চাশের দশক থেকেই। ১৯৫৬ সালে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। পঁচিশ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার’ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন, হে প্রিয়তমা’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। এর চার বছর পর ১৯৭৮ সালে তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ প্রকাশিত হয়। এরপরই ১৯৭৮ সালে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। যান জার্মানিতে। সেখানে মাস তিনেক থাকার পর চলে যান লন্ডনে। প্রায় চার বছর ইংল্যান্ডের রাস্তাঘাটে, শহরে-বন্দরে ঘুরে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। দেশে এসে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৮২ সালের কুয়াশ মোড়া কনকনে শীতের কোন এক রাতে আবার পাখির মত উড়াল দেন দেশ থেকে। যান লন্ডন। সেখান থেকে যান মার্কিন মুল্লুকে। ২০ বছর বস্টনে থাকার পর কবি শহীদ কাদরী ২০০৪ সাল থেকে নিউইয়র্কে বসবাস করে আসছেন। বলা যায় না সেখান থেকে আবার কখন কোন মহাদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। তার এভাবে দেশ ছেড়ে যাবার পিছনে কোন বেদনা কাজ করছিল কিনা তা জানা যায় না।

এই যে শহীদ কাদরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী এর সবটাই আমাকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট, আনন্দ এবং প্রভাবিত করেছে। কারণ আমিও কিছুটা ঘবঘুরে প্রকৃতির। এক জায়গায় বেশিদিন থাকলে আশপাশের মানুয়ের উপর থেকে কেন যেন আমার একটা বিতৃষ্ণা আর বিরক্তিকর একটা ভাব চলে আসে। কারণ আশে পাশের মানুষরা অবয়বে মানুষের মত লাগলেও জ্ঞান গরিমা মর্যাদা আর যোগ্যতায় তারা মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। অধিকাংশ মানুষের ভেতর ফাঁক ফাঁকি, চাপাবাজি আর দুষ্কর্মের কীটরা বাসা বেঁধে আছে।

‘তোমাকে অভিবাদন, হে প্রিয়তমা’ কাব্যগ্রন্থে ৩১ টি কবিতা রয়েছে। প্রথম কবিতার নাম রাষ্ট্র মানেই ‘লেফ্ট রাইট লেফ্ট রাইট’ সে কবিতায় তিনি রাষ্ট্রের নির্মম পরিচয় তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে কবিতাটির এক জায়গায় তিনি রাষ্ট্রের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এভাবে-

‘রাষ্ট্র বললেই মনে হয় মিছিল থেকে না-ফেরা

কনিষ্ঠ সহোদরের মুখ’

এই কাব্যগ্রন্থের ৩১ টি কবিতার সব কয়টি কবিতাই দিনের সূর্যের মত আপন আলোয় উজ্জ্বল। স্ব-মহিমায় ভাস্বর। তবে আমার মনে ‘এই সব অক্ষর’ কবিতাটি বেশি দাগ কেটেছে। আসন পেতেছে বুকের গহীন জায়গায়। কবিতাটির শব্দের বুনন, রচনাশৈলী, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন আমাকে বিমোহিত করেছে। কবি যখন লিখেন-

‘আমি এখন তোমার নাম লিখবো,

আমি এখন তোমার নাম লিখবো;

তোমার নাম লেখার জন্যে আমি

নিসর্গের কাছ থেকে ধার করেছি বর্ণমালা-

আগুন, বৃষ্টি, ঝড়-আর,

সভ্যতার কাছ থেকে-একটি ছুরি

-এই সব অক্ষর দিয়ে তোমার নাম আমি লিখছি, তোমার নাম:

অগ্নিময় বৃষ্টিতে তুমি ঠান্ডা, হিম, সোনালি ছুরি প্রিয়তমা।’

‘অন্য কিছু না’ কবিতায় ফুলের ঢালি সাজিয়ে রাখার আবেগময় প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

‘জুঁই, চামেলি, চন্দ্রমল্লিকা ওরা সব দাঁড়িয়ে রয়েছে

তোমার পলক না পড়া কিশোর চোখের জন্যে,’

আর ‘তোমাকে অভিবাদন, হে প্রিয়তমা’ যখন তিনি বলেন-

ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো

চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো

প্যারাট্রুপারদের মতো ঝ’রে পড়বে

কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।

তখন আমাদেরকে থ হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কি করে সম্ভব এভাবে কবিতা লেখা। সম্ভব তবে এক জনের জন্য তিনি হলেন -শহীদ কাদরী।

শহীদ কাদরী তার অসাধারণ সৃজনীশক্তি, রচনাশৈলী, দেশপ্রেমের দরূণ আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। বিশেষ করে তার দেশপ্রেম আর প্রিয়মানুষকে উদ্দেশ্য করে লিখা কবিতাগুলো যেন মণিমুক্তার মত মূল্যবান। যা পাঠে আমাদের চিত্ত হয় বৃষ্টির মত মসৃণ, কুয়াশার মত ঠান্ডা আর কাশফুলের মত নরম। শেষবেলায় আবার বলি ‘তোমাকে অভিবাদন, হে শহীদ কাদরী’। আপনি আবার লিখুন না প্লিজ প্লিজ প্লিজ! আমাদের মত নবীন সাহিত্য পাঠকদের জন্য আপনরা কি কোনই দায়িত্ব নেই। আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না দয়া করে। আপনি আবার দেশে আসুন, বাংলার সবুজ প্রকৃতি, দিগন্ত বি¯তৃত মাঠ, পদ্মার শাপলা, হাওরের বালি হাঁস, নদীর কুলুধ্বনি,শরতের শিরিরভেজা শিউলি আপনাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ দুপুর ১২:১৬

রেজওয়ান তানিম বলেছেন: ভাল লাগল লেখাটি

২| ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ দুপুর ১২:৩১

রেজোওয়ানা বলেছেন: সুন্দর লিখেছেন...

৩| ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ দুপুর ১:৫৬

নোমান নমি বলেছেন: শহীদ কাদরী আমার অত্যন্ত প্রিয়।
সুন্দর লিখেছেন। ভালো লাগছে।

৪| ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ দুপুর ২:৫৫

মিঠেল রোদ বলেছেন: চমৎকার পোস্ট।ভাল লাগল।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.