| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দুপুরের এই সময়টায় সিটি কলেজের সামনের রাস্তাটায় জ্যাম লেগে থাকে প্রায়ই। বাইরে ভ্যাপসা গরম। আনিলা বাসের ভিতরে বসে আছে বাস ছাড়ার অপেক্ষায়। একেকবার মনে হচ্ছে বাসে উঠে না বসলেই বোধহয় ভাল হত। গরমে কেমন আঠা আঠা হয়ে যাচ্ছে শরীর। আজকাল আনিলার প্রায়ই মন খারাপ হয়। তার খুব ইচ্ছে করে, একটা মানুষ তার সাথে আঠার মতো লেগে থাকুক। কিন্তু, মনের মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া তো আর সহজ না! অবশ্য, আজকের এই গরমে কেউ আঠার মতো লেগে থাকতে চাইলে আনিলা খুব বিরক্ত হতো। পাশে তাকিয়ে দেখে রাফি সিটে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। তন্ময়েরও একই অবস্থা। নিপা পাশে থাকলে গল্প করা যেত। কিন্তু, আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও নিপাকে দেখতে পেলনা আনিলা। তবে শুভ যে ওর পিছনে বসেছে এটা ঠিকই খেয়াল করেছে। শুভকে অন্যরকম লাগে আনিলার। যাকে মানুষ বুঝতে পারেনা তার প্রতি আকর্ষণটা অন্যদের চেয়ে বেশি হয়। হঠাৎ আনিলা খেয়াল করলো, বাসের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলে মাঝে মাঝেই চোরা চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। ছেলেটার একটু মোটার ধাত আছে। তবে মুখটা মায়া মায়া। আজকালকার ছেলেগুলোর চেহারায় কেমন যেন রুক্ষ রুক্ষ ভাব। কারণ তারা জানে, আজকালকার মেয়েরা শার্টের বোতাম খুলে রাখা খসখসে দাড়িওয়ালা ছেলেদের বেশি পছন্দ করে। কিন্তু, এই ছেলেটা অন্যরকম। ছেলেটা ট্যারা নাকি? বোঝাই যাচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ, চোখটা একটু বামে সরানো। তবুও আড়চোখে চারপাশে তাকিয়ে নিল আনিলা। কই, নাহ! তার আশেপাশে আর কোন মেয়ে নেই। পিছনের জানলায় মাথা রেখে শুভ হেডফোনে গান শুনছে। ইশশ! এত্ত সুন্দর একটা ছেলে ট্যারা! আনিলার বুক থেকে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।
রাতুলের খুব পানি পিপাসা হচ্ছে। অনেক দিন এরকম হয়না তার। কাউকে ভাল লাগা কেন দোষের হবে বুঝতে পারেনা রাতুল। তার ডাক্তার বারবার বলেছেন এসবের মধ্যে না যেতে। সে ডাক্তারের কথা অমান্য করেনা কখনো। কিন্তু, আজ কি যেন হয়ে গেল তার। ওই তো, একটা সিট খালি হয়েছে। ভীড় ঠেলে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকে রাতুল। সিটে বসার সময় সে খেয়াল করে, মেয়েটা ঘাড়ের চুল সরানোর অজুহাতে তার দিকে একটু তাকিয়ে নেয়। রাতুল জানে কেন মেয়েটা তার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। কিন্তু কী করবে সে? নাহ! রাতুল আজ এসব নিয়ে ভাববে না। আজকের দিনটা অন্যরকম। মনের সাথে অনেকক্ষণ যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত হাত বাড়ায় রাতুল তার পাশের হাতটার দিকে। তার মনে ক্ষীণ আশা, আজ হয়তো সবকিছু অন্যরকম হবে। রাতুল জানেনা, শুধু বিশ্বাস করতে চায়। শুভর হাতের সাথে তার হাত লেগে যেতেই শুভ চমকে ওঠে। পাশে তাকিয়ে রাতুলকে দেখে শুভ প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনা। শুভর চোখে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে রাতুল। শুভর সমস্ত শরীর রি রি করে ওঠে। সে হাত সরিয়ে নেয়, শুধু চোখ সরিয়ে নেয় না। শুভর চোখে তাকিয়ে রাতুলের কেমন ভয় হয়।
তিনদিন পরের কথা।
সিটি কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল শুভ। হঠাৎ সে খেয়াল করে রাতুল সামনের বাসটায় উঠছে। বাস ছাড়তে তখনো কিছুটা দেরী আছে। শুভ চটপট কয়েকটা নাম্বারে ফোন করে। দু’ মিনিটের মাঝখানে কয়েকটা ছেলে প্রায় ভর্তি বাসটায় উঠে পড়ে। শুভর কাজ শেষ। সে ঘড়ি দেখে। এই বাসটায় না গেলে বাসায় ফিরতে আজ দেরী হয়ে যাবে। থাক। আজ এই বাসে না থাকাই ভালো।
জ্যামে পড়ে বাস খুব ধীরে ধীরে চলছে। সাতমসজিদ রোডের কাছে আসতেই রাস্তা ফাঁকা হয়ে আসে। রাতুল খেয়াল করেনি তার সামনে পিছনে কয়েকটা ছেলে তাকে ঘিরে ধরছে একটু একটু করে। হঠাৎ বাসের লোকজন দেখে দরজার একটু পাশেই কারা যেন একটা ছেলেকে মারছে। তাদের কথাগুলো টুকরো টুকরো কানে আসে সবার।
“চুতমারানি!”
“পোলা হইয়া পোলাগো গায়ে হাত দেস! তোরে...”
বাসের অনেকেই ছেলেগুলোকে থামানোর কথা ভাবে। কিন্তু, প্রত্যেকে অপেক্ষা করে তার পাশের জনের জন্য। ছেলেগুলো হিংস্র হয়ে উঠছে আরও।
“প্লিজ, আপনারা এরকম করছেন কেন?”
“মুসলমানি হইসে না করান লাগবো বাইনচোত?”
“হেল্প! প্লিজ, কেউ হেল্প করেন!”
ছেলেটার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে একটু একটু করে।
“গে হইছোস?”
বাসের হেল্পার এগিয়ে আসছিল ঠেকানোর জন্য। হঠাৎ একটা ছেলের ঘুসিতে রাতুল ছিটকে পড়ে দরজার বাইরে। পাশের যে ছেলেটা লাথি মারার জন্য পা তুলছিল সে তাড়াতাড়ি রাতুলকে ধরার জন্য হাত বাড়ায়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। বাসের চাকার নিচে কিছু একটা পড়ে বাস দুলে ওঠে সামান্য। কড়া ব্রেক কষে ড্রাইভার। যে ছেলেটা ঘুসি মেরেছিল, সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। বাকিরা তাকে টানতে টানতে বের করে নিয়ে যায় রাস্তায়। ব্যস্ত রাস্তায় কেন যেন তাদের পায়ের শব্দ বড় বেশি হয়ে কানে বাজে। বাসের ভিতরে মধ্যরাত্রির নীরবতা।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। আনিলা আজ একটা নীল শাড়ি পড়েছে। টিপটা কিছুতেই জায়গা মতো বসছে না। মা নির্ঘাত বৃষ্টিতে বেরুতে নিষেধ করবে। কিন্তু, সবদিন কি নিষেধ শুনলে চলে? শুভকে আনিলা একটা সবুজ পাঞ্জাবি পরতে বলেছে আজ। নীলের সাথে সবুজ খুব মানায়। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে খবরের কাগজ দেখছিল আনিলা। পিছনের পৃষ্ঠার ডান কোণায় বক্স করা ছোট্ট খবরটায় আনিলার দৃষ্টি আটকে যায়। নিষিদ্ধ আর অশ্লীল জিনিসের প্রতি মানুষের একটা অন্যরকম আগ্রহ আছে। খবরটার হেডলাইন ছিলঃ
“সমকামী সন্দেহে যুবক খুন!”
আনিলার সমস্ত শরীর রি রি করে ওঠে। নাহ! আনিলা আজ এসব নিয়ে ভাববে না। আজকের দিনটা অন্যরকম। আজ আনিলার জন্মদিন। ওইতো, শুভ ফোন করেছে!
হয়তো এই মানুষগুলোর কেউ কোনদিন জানবেনা রাতুল তার মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল।
©somewhere in net ltd.