| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ছেলেটি একটুও অসাধারণ ছিল না। কেউ তাকে চিনত না। তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল ক্লাসে এসে সবচেয়ে কোণার সিটটা খুঁজে নেয়া। মাথার চুল একদিকে আঁচড়ানো এই ছেলেটি এতই অদৃশ্য ছিল যে, তাকে নিয়ে কেউ কখনো ঠাট্টা করার কথাও ভাবেনি। সেই ছেলেটি একদিন একটা ভুল করে বসলো।
স্কুলের মেয়েদের নিজেদের মতো করে সেজে আসার নিয়ম ছিল না। কেউ কেউ বাসা থেকে বের হওয়ার আগে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টিপ পরলেও, চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই সে টিপ ফিরে যেত আয়নার কাঁচে। শুধু বৃষ্টির দিনগুলোতে লাল নীল ছাতাগুলো তাদের সাদামাটা স্কুল ইউনিফর্মে না আসা যৌবনের ঢেউ তুলত। সামনে বাহারি রঙের ছাতা নিয়ে ঠাট্টা করলেও ছেলেগুলো নিজের মনের কাছে পছন্দের ছাতার ডাঁটি হবার গোপনতম ইচ্ছেগুলো লুকোতে পারতনা কিছুতেই। এমনি কোন এক ছাতাঘেরা দিনে ছেলেটি ভুল করে বসলো। একটা গাঢ় নীল ছাতা তার পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ কিভাবে যে পিছলে গেল, তা দেখার মতো অবস্থা তখন ছাতার মালিকের ছিল না। সে তার নরম হাত দিয়ে মুখে লেগে থাকা কাদা মোছার চেষ্টা করতে গিয়ে শুধু আরও মাখিয়েই ফেলছিল। তাতে কিন্তু ভুল করতে কোন অসুবিধা হয়নি। ছাতা কুড়িয়ে নিয়ে যখন ছেলেটি ছাতার মালিকের কাছে ফিরে এল, তখন তার মনে হচ্ছিল, নিজের সৌন্দর্য রক্ষায় প্রতিটি মেয়ের প্রতিদিন দুবেলা করে কাদা মাখা উচিৎ। ছাতা ফিরে পেয়ে মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে চলে গেল। তখন তার মনে হল কাদা মাখার এই থিয়োরি কোন জার্নালে প্রকাশ হলে নোবেল প্রাইজ পাওয়াটা হয়তো একদম অসম্ভব হবে না। ছেলেটি তার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ভুলটি করে বসলো।
এরপর শুরু হল স্কুলের করিডরে আর বারান্দার কোণায় নির্ঘুম চোখের প্রতীক্ষা। রাতে ঘুমুতে গেলে কখন সকাল হবে এই উত্তেজনায় ঘুম আসতো না। আর তাকে দেখার পর ছেলেটির ছোট্ট শরীরের শিরায় শিরায় এমনভাবে অ্যাড্রেনালিন প্রবাহিত হতো যে, তার মনে হতো, বোধহয় আরও হাজার বছর সে না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারবে। তাই কখন ছেলেটি ঘুমাতো, সেটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমি সময় নষ্ট করিনি। মাঝখানের কেটে যাওয়া দু’বছরে ছেলেটি কিন্তু কিছুই হয়ে উঠতে পারেনি। সে পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়নি, গান গাইতে শেখেনি, এমন কি নির্মলেন্দু গুণের দুটো লাইন আবৃত্তিও করতে শেখেনি সে। এখনো সে ক্লাসের সবচেয়ে কোণার সিটটা খুঁজে বেড়ায়। তবে, সে এতটুকু দৃশ্যমান হয়েছে যে, মেয়েটিকে জড়িয়ে টিটকারির লাইনগুলো তাকে এখন সহজেই খুঁজে পায়।
সে কোনদিন মেয়েটিকে কিছু বলার সাহস করে উঠতে পারেনি। ক্লাসের অন্য ছেলেগুলো যখন মেয়েটির সাথে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলতো, ছেলেটি তখন প্রাণপণে মেয়েটির বাতাসে উড়তে থাকা একলা চুলের দিকে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করতো। সে মেয়েটিকে কল্পনা করতো একটি বিশাল কদম গাছের নিচে, যেখানে মেয়েটির দাঁড়িয়েছে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য। তবু তার গায়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে। বাতাসে উড়ছে তার একলা চুলগুলো, শুধু তার হাতে কদম ফুল নেই।
পাঁচ মাসের টিউশনির টাকা জমিয়ে ছেলেটি একদিন একটা বাইসাইকেল কিনে ফেলে। শহরটা তখন বাইসাইকেল চালানোর নেশায় আকণ্ঠ ডুবে আছে। সে দেখেছিল, যে ছেলেটা মেয়েটিকে প্রায়ই বাড়ির দিকে এগিয়ে দেয়, তারও একটি বাইসাইকেল আছে। ছেলেটি কি ভাবছিল, আমি জানি না। শুধু এটুকু জানি, সে একটি সাইকেল কিনে মেয়েটিকে পাওয়ার আশা করেনি। তবুও ছেলেটি ভুল করে। কোন এক বর্ষার শেষে একদিন সে কলেজ ছুটির পর সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটির জন্য। একপাশে আঁচড়ানো মাথার সিথি এলোমেলো করার চেষ্টা করে অযথাই। মেয়েটি যখন তার বান্ধবীদের সাথে কলেজের গেট দিয়ে বের হচ্ছিল, তখন সে খামোখাই মেয়েটির সামনে দিয়ে সাইকেল ঘুরিয়ে আনতে চায়। সে শুধু মেয়েটিকে জানতে দিতে চায়নি, গত তিনটি মাস সে তার বাসার সামনের মাঠে দুই ঘণ্টা করে সাইকেল চালিয়েছে, যখন তার পাড়ার ছেলেগুলো ব্যাট আর বল হাতে এলাকার সুন্দরী মেয়েদের সামনে ছক্কা পিটিয়ে গেছে। তবু মেয়েটি জেনে যায়। রাস্তায় পড়ে থাকা একতাল গোবরে পিছলে পড়ে তার সাইকেলের চাকা। চোখের সামনে পুরো পৃথিবী ঝাপসা হয়ে আসার আগে ছেলেটির মনে হয়, কাদা না মাখলেও মেয়েটার দাঁত সুন্দর লাগে। মেয়েটার সাথে খিল খিল করে হেসে ওঠা কোন বান্ধবীর দাঁতই এত সুন্দর লাগে না তার। রাস্তার ধুলো আর গোবরে মাখা একটা সাইকেল ছেলেটাকে নিয়ে রওনা দেয় শহরের অন্য প্রান্তে। কেন যে অযথাই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, ছেলেটি বুঝতে পারেনা।
আমি জানিনা ছেলেটি কখনো জানবে কিনা, সেই রাতে মেয়েটিও কেঁদেছিল তার জন্যে। কেন কেঁদেছিল, তা সে জানলেও বলতে চায়না। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে করে, এই গোপন কথাটা ছেলেটির কাছে পৌঁছে দিতে। কখনো কখনো কিছু নিষেধ শুনতে নেই।
©somewhere in net ltd.
১|
০৯ ই জুলাই, ২০১৩ রাত ১২:৪৯
এহসান সাবির বলেছেন: বেশ...!