| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মাঝে মাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই... আমার সেদিনের সেই ছোট্ট টুকটুকে ফুটফুটে মেয়েটা আজ কতো বর হয়েছে। এই সেদিনও যেখানে সেখানে খেলতে বসে যেত, আব্দারের কিছু না পেলে চিৎকার করে বাড়ি মাথাই তুলত, আর বাবাকে দেখলে সব রাগ কোথাই যে চলে যেত... ঝাপিয়ে পড়তো বাবার কোলে, ঝাল খেয়ে ঠোঁট লাল করে কাঁদতে থাকতো ফুঁপিয় ফুঁপিয়ে আর রাতের বেলা একটু শব্দ শুনলেই শক্ত করে ধরে রাখতো আমার আঁচলের কোণা। ওর নাম টুম্পা; বড় আদরের মেয়ে আমার।
আজ সে ইউনিভার্সিটি তে পড়ে... অনেকে বলে দেখতে নাকি ঠিক আমার মতন হয়েছে। ওর বাবা কিন্তু একদম মানতে চাইনা। তার ধারণা মেয়ে দেখতে একদম তার মতন। ওর কথা শুনে আমি হাসি। ও ত একটু আহ্লাদ করবেই মেয়ে নিয়ে... এই একটামাত্র মেয়ে আমাদের।মাসের পর মাস আমরা ওর প্রতিক্ষাই থাকি... ঢাকাই থাকে যে ও! আর আমরা থাকি দেশের এক কোণাই... একটা ছোট্ট মফঃস্বলে।
কিন্তু এবার ও শীতের ছুটিতে আসার পর থেকে আমার মনে কেমন যেন একটা ভয় কাজ করছে... অজানা আশঙ্কাই মন কেঁপে উথছে বারবার। পাশের বাড়ীর নতুন ভাড়াটিয়ার ছেলেটা সবসময় তাকিয়ে থাকে আমাদের বাড়ীর দিকে, চায়ের দকানে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে ছুড়ে দেই অশ্লিল মন্তব্য, হাসির ফোয়ারা ছোটাই যখন তখন, এমনকি গভীর রাতে মদ খেয়ে মাতলামি করতেও ছাড়ে না মাঝে মাঝে। আমার বড্ড ভয় হই... একটাই সন্তান আমার... বড় আদরের টুম্পা।
গভীর রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে যাই... মেয়ের ঘরে যেয়ে শান্ত ঘুমন্ত মুখটা দেখি। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি... ও কে যেন জগতের সব অকল্যাণ থেকে দূরে রাখে, অপাপবিদ্ধ রাখে সারাটি জীবন, কোন রকম দুঃখ যেন স্পর্শ করেনা কখনো, কোন কালো ছায়া যেন ওর পবিত্র অন্তর কে কলুষিত না করে। একটাই মেয়ে আমার... আমার নাড়ি ছেরা ধন টুম্পা।
সেদিন ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গেল... কাছেই একটা নদীর ধারে। ওখানে নাকি কি একটা মেলা বসেছে। চরকি, নাগরদোলা, হাওয়াইমিথাই, চটপটি, ফুচকা, চুরি, রঙ বেরং এর খেলনা আরও কতো কি সব এসেছে। আমার মেয়ে মন থেকে এখনো সেই ছোট্টটি আছে... সব কিছু ওর চাই ই চাই। আমার খুব ইচ্ছা করছিল সেই ছোট্টবেলার মতন ওকে আঙ্গুলটা ধরে নিয়ে যাই... চোখের আড়াল না হতে দি এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু বন্ধু অন্ধ প্রাণ তার... ছোট বেলার সেই প্রিয় মানুষগুলির সঙ্গ ছাড়বে কেন! আর আমাকেই বা সাজে নাকি কচি কচি ছেলেপুলের সাথে মেলাই ঘুরতে যাওয়া! ও কে যেতে দেখি হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে... আমি বারান্দার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে থাকি! উৎকণ্ঠাই, দুশ্ছিন্তাই আমার ভাল লাগেনা কিচ্ছু। এই প্রিয় পরিচিত ছোট্ট শহরটিকে বড্ড অচেনা লাগে ইদানিং। আশে পাশের সবাইকে হঠাৎ করেই খুব অচেনা লাগে। আমি একইভাবে বারান্দাই দাড়িয়ে অপেক্ষা করি আমার মেয়ের জন্য। বড় আদরের মেয়ে আমার... আমার একমাত্র সম্পদ।
আমার মেয়ে সেদিন আর ফিরে আসেনি... আমরা নিঃস্ব দম্পতি এখন অন্য এক ছোট শহরের বাসিন্দা!
সেদিনের পরের দিন খবরের কাগজে বড় করে ছাপা হয়েছিল “খুলনাই আবারো সংখালঘুদের ওপর অত্যাচার এবং তরুণী গুম”।
©somewhere in net ltd.