| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
অনেকগুলো বছর ধরে লেখালেখির চর্চা একেবারেই নেই বিধায় শুরুটা কিভাবে করবো ভাবতে ভাবতেই অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলো। সময় তখন রাত ১টা পেরিয়ে ২টার পথে ধাবমান। উত্তর জার্মানির ছোট্ট শহর Braunschweig ততক্ষণে রাতের সব আলো জ্বালিয়ে ঘুমুতে চলে গেছে। পুরোটা শহর এখন সোডিয়াম আলোর দখলে। এরই মাঝে মাঝে কিছু উচ্ছল তরুন তরুণীদের হাসি ঠাটটার শব্দ যে একেবারেই কানে আসছে না তা কিন্তু নয়। তবে তাদের এই আড্ডা এর বোধয় বেশীক্ষণ টিকবেনা। অনেকেরই সকালে ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস থাকে বিধায় শনি ও রবিবার ছাড়া এখানকার আড্ডাগুলো স্থায়ী হয় না। অবশ্য স্প্যানিশদের ক্ষেত্রে গল্পটা একটু ভিন্ন প্রকৃতির। জার্মানিতে আসার পর থেকে সাপ্তাহের প্রতিদিনই তাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন পার্টি, আমোদ ফুরতি নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে দেখেছি।
গতকাল দুপুর থেকে হঠাৎ করেই ইন্টারনেট এর লাইন কাজ করছে না আমার রুম এর। এরই মধ্যে ভার্সিটি থেকে কয়েক দফা মেইল করেও কোন লাভ হয়নি। যদিও বুঝতে পারছি সোমবারের আগে আর কাজ হবে না। আমার ডরমিটরির ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞরা শুধু সাপ্তাহের প্রতি সোমবারই বিভিন্ন অভিযোগ অনুযোগ গুলো আমলে আনে।
একটু আগেই বন্ধু ফয়সালের ডরমিটরি থেকে ফিরেছি। বন্ধু আমার খুবই আন্তরিক মানুষ। এককথায় অসাধারন। CSE তে মাস্টার্স করছে। পুরো Braunschweig শহরে মনে হচ্ছে আমরাই দুজন বাঙালী। এখন পর্যন্ত আর কাউকে চোখে পরেনি। আমার ভাগ্য খুবই ভালো বলতে হবে, এখানে এসে এমন একজনের বন্ধুত্ব পাওয়া নিতান্তই ভাগ্যের ব্যাপার। পাশের বড় শহর Hannover এ কিছু বাংলাদেশী স্টুডেন্ট থাকে। তারা সংখ্যায় অনেক। শরীফ ভাই, খালেদ ভাই, নুর ভাই, খোকন ভাই, বন্ধু ওয়াজেদ। এরা সবাই Leibniz University of Hannover এর ছাত্র। কেউ PHD করছে, আবার কেউ মাস্টার্স। আমি আর ফয়সাল এখানে একা একা থাকি বলে উনারা আমাদের খুবই মায়া করেন।
ফয়সালের ডরমিটরিতে খেলার জন্য সুন্দর একটা মাঠ আছে। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলাটার প্রতি আগ্রহ বরাবরই অটুট থাকায় এখানে এসে ও খুজে নিয়েছি ক্রিকেট খেলার গ্রুপটাকে। অধিকাংশই অবশ্য ইন্ডিয়ান, একজন পাকিস্তানী আর আমরা দুজন। আর হ্যাঁ, বন্ধু পাওউলকে ই বা বাদ দেই কীভাবে? স্প্যানিশ ফুটবল স্ট্রাইকার ও যে আমাদের দেখাদেখি ফুটবল বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে ব্যাটিং বোলিং করতে চলে আসে। সে এক মজার দৃশ্য।
গতকাল রাতে ও ফয়সালের ডরমিটরি থেকে আমার ডরমিটরিতে ফিরেছিলাম ঠিক এই সময়ে। ঠিক ১১.৪৫ এ ফয়সালের বাসার সামনের ষ্টেশন থেকে রাতের শেষ ট্রাম ছাড়ে Rathaus এর উদ্দেশে। সেখান থেকে ৪১৬ নম্বর বাসে করে আমার বাসায়। ট্রামের জন্য অপেক্ষা করছিলাম আর ঠাণ্ডায় অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। জার্মানিতে এখন গ্রীষ্মকাল হলেও রাতের ঠাণ্ডা যে আমাদের দেশের শীতকালকেও হারিয়ে দিচ্ছে তা এরই মধ্যে বুঝা হয়ে গেছে। যাত্রী ছাউনিতে বসে অপেক্ষা করছিলেন আমার মতই কিছু অপেক্ষমাণ যাত্রী। তারা সবাই একই পরিবারের মনে হচ্ছিল। কোন আরব অথবা তুর্কী পরিবার। সবার অবস্থাই আমার মত। একজন ভদ্রমহিলা অবশ্য মোবাইলে কথা বলছিলেন। কিন্তু লাইন বারবার কেটে যাচ্ছিলো বলে বিরক্ত মুখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন। এরই মাঝে একজনের দিকে চোখ পরতেই দৃষ্টি কিছুটা আটকে গিয়েছিল। বয়স্ক এক জার্মান ভদ্রলোক। ষ্টেশনের সোডিয়াম আলোতে মুখটা পরিষ্কার দেখতে না পেলে ও বয়স ৭০ থেকে ৭৫ এর মত হবে বলে আন্দাজ করতে ভুল হচ্ছে না। কালো জিন্সের প্যান্ট, ভারী একজোড়া বুটের সাথে কালো মোটা জ্যাকেট পরেছেন। দৃষ্টি অবশ্য এইজন্য আটকায়নি। আটকে গেলো কারন, ভদ্রলোক ঘুরে দাড়িয়ে আছেন ষ্টেশনের উল্টো দিকে ফিরে। একমনে তাকিয়ে আছেন দূরের কিছু ঝোপঝাড়ের দিকে। গভীর কিছু ভাবছিলেন বোধয়, তাই ট্রামের আগমন উনি টেরই পেলেন না। আমি সহ প্রায় সকল যাত্রীই ট্রামের উঠে পড়েছিলাম। কিন্তু ভদ্রলোক তখন ও ঠায় দাড়িয়ে ছিলেন। উনাকে ডাক দেবো কিনা ভাবতে ভাবতে চোখ পড়েছিল ছাউনিতে বসা আরেকজনের দিকে। উনি ছিলেন একজন জার্মান ভদ্রমহিলা। বয়স ৬৫ থকে ৭০ এর মত হবে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম উনারা ট্রাম মিস করে ফেলে কিনা। কারন এই পথের এটাই রাতের শেষ ট্রাম। ভাবতে ভাবতেই ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়ালেন । কি যেন বললেন ভদ্রলোকে উদ্দেশ্য করে। চিন্তায় বাধা পরতেই ভদ্রলোক ঘুরে দাঁড়ালেন। তাড়াহুড়ো করে দুজনই ঢুকে পড়লেন ট্রামের শেষ কম্পারটমেনট এ।
তিন কম্পারটমেনট বিশিষ্ট রাতের শেষ ট্রামের শেষ কম্পারটমেনট এ আমরা তিনজন। আমি, সেই জার্মান ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা। আমার মনে হচ্ছিল উনারা স্বামী স্ত্রী। হবারই কথা। প্রায় খালি কম্পারটমেনট। উনারা আমার পাশ দিয়ে সামনে চলে গেলেন বসার জন্য। ভদ্রমহিলার চুলের রঙ লাল। অনেকটা পাকা চুলে মেহেদী দিলে যেমনটা হয় ঠিক তেমন। গায়ে বাদামি রঙ এর ভারী ওভারকোট। উনারা বসেছিলেন আমার কয়েকটা সিট সামনে। দুইজন অবশ্য আলাদা দুইপাশে। ভদ্রমহিলা বসেছিলেন বাম পাশের দুই সিট নিয়ে। আর ভদ্রলোক ডান পাশের দুই সিট নিয়ে। ব্যাপারটা নিতান্তই স্বাভাবিক। পুরো কম্পারটমেনটই তো খালি। একটু আরাম করে বসলে অসুবিধা কোথায়? ততক্ষণ এ ট্রাম চলতে শুরু করেছিল। আমি তাকিয়ে ছিলাম ট্রামের ডিজিটাল লোকেশান বোর্ডের দিকে। যা ক্ষণেক্ষণে জানিয়ে দিচ্ছিল পরবর্তী ষ্টেশনের নাম। আমাকে নামতে হবে Rathaus । হাতে সময় মাত্র ১৫ মিনিট। যদিও জানি, ট্রাম সময়মত তার গন্তব্য তে গিয়ে হাজির হবে। তারপর ও মনে মনে একটু অস্থির হয়ে আছি। যদি সময়মত না যেতে পারি, রাতের শেষ গাড়ি ৪১৬ নম্বর আমার জন্য কোন ভাবেই অপেক্ষা করবেনা। অর্থাৎ ডরমিটরি ফিরতে হবে পায়ে হেটে। দুপর থেকে নেট এর লাইন না থাকায় বাংলাদেশ এ কথা বলতে পারিনি। তাই নেট এর লাইন ঠিক হয়েছে কিনা দেখার জন্য ও অস্থিরতা বাড়ছিলো।
উল্টোপাল্টা নয় ছয় ভাবতে ভাবতে একটা সময় খেয়াল করলাম ভদ্রলোক একাই কথা বলে যাচ্ছিলেন ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু ভদ্রমহিলা কোন কথারই উত্তর দিচ্ছেনা। অল্প কিছুদিন হল জার্মানিতে আসার কারনে এই ভাষাটা এখনও খুব একটা বুঝতে পারিনা। কিন্তু এতোটুকু বুঝতে আমার কোন অসুবিধা হচ্ছেনা যে, মান অভিমান চলছিলো ওই বয়স্ক দম্পতির মাঝে। কি যেন বোঝাতে চাইছেন ভদ্রলোক। কিন্তু ভদ্রমহিলা নির্বাক। তিনি শুনছেন, তাকিয়ে আছেন, কিন্তু কোন উত্তর দিচ্ছেন না। একটা সময় পর আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক হরহর করে কেঁদে ফেললেন। তিনি কাঁদছিলেন আর জ্যাকেটের হাতা দিয়ে চোখ মুছছিলেন। ভদ্রমহিলা তখনও নির্বাক। পেছনে বসেছিলাম বলে আমি মহিলার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার খুব ইচ্ছে করছিল ভদ্রমহিলার মনের অবস্থা বোঝার জন্য। কিন্তু ট্রাম ততক্ষণ এ Rathaus চলে এসেছিল। আমি নেমে যাচ্ছি । নামার আগে আমি আরও একবার তাকালাম মহিলার দিকে। কিন্তু উনি তাকিয়ে ছিলেন জানালা হয়ে অন্ধকাররে দিকে। ভদ্রমহিলার চেহারা আর দেখা হলনা আমার।
আজ দুপরে ক্লাস থেকে ডরমিটরিতে ফিরেই শুয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড মাথা ধরেছিল। শোয়া মাত্রই ঘুম। শেষ বিকেলে বন্ধু ফয়সাল এসে হাজির। ওর ওখানে যেতে হবে। কঠিন খাওয়া দাওয়া হবে। বন্ধুর আবদার ফেলি কি করে? গেলাম তার সাথে। আসলেই ভরপেট খাওয়া দাওয়া। নড়ার উপায় নেই। একটু বিশ্রাম নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরছি।
স্থানঃ ফয়সালের বাসার সামনের ট্রাম ষ্টেশন।
সময়ঃ ১১.৪৫ বাজতে ১ মিনিট বাকি।
ষ্টেশনে এসে দাড়াতেই দেখি ট্রাম আসছে। যাত্রী ছাউনিতে আমার মত অপেক্ষমাণ কয়েকজন। লক্ষ করলাম, গতকালের সেই আরব / তুর্কী পরিবারটি। একদিন বাদেই আবার দেখা হয়ে গেল তাদের সাথে। ভাবতে ভালো লাগলো। ট্রাম এসে দাঁড়ালো প্লাটফর্ম এ। দরজা খুলতেই উঠে পড়লাম। সিটে বসতে বসতে লক্ষ্য করলাম, আমার পাশ দিয়ে দুজন মানুষ চলে যাচ্ছে সামনের সিটে বসার জন্য। দুজনে একই সাথে বসলেন, পাশাপাশি । এরই মধ্যে একজন মাথায় মোড়ানো শীতের কানটুপি খুলতেই বেড়িয়ে পড়লো একমুঠো লাল চুল। হঠাৎই চমকে উঠলাম আমি। যেন মেহেদীর রঙ দেয়া পাকা চুল। ঠিক যেন গতকালের সেই ভদ্রমহিলার মত। এবার পাশের জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে আর বাকি রইল না যে, উনারাই গতকালের সেই বয়স্ক দম্পতি। হ্যাঁ, সেই ভদ্রলোকই তো। দুজনের পরনেই গতকালের পোশাক। কিছুটা অপ্রস্তুত ও ঘোরলাগা দৃষ্টিতে ট্রামের পেছনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই এবং নিজেকে আবিষ্কার করি চলমান ট্রামের শেষ কম্পারটমেনট এ। নিজের দিকে তাকাই আমি। আমার পরনেও গতকাল রাতের পোশাক। সেই ময়লা আকাশী জিন্সের প্যান্ট ও হলুদ জ্যাকেট। এতোটুকু বদলায়নি কিছু। সেই ট্রাম, সেই সময়, সেই ষ্টেশন, সেই শেষ কম্পারটমেনট, সেই আমি আর আমার সাথে পুরো কম্পারটমেনট জুড়ে সেই দুজন দম্পতি। হুবহু যেন গতকালেরই একটা জলজ্যান্ত প্রতিচ্ছবি। বিস্ময়ে ভরা এই পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তার সকল বিস্ময়ের মানে বোঝার ক্ষমতা হয়তো আমার নেই। কিন্তু বয়স্ক দম্পতির পিছনে বসে আমি বুঝতে পারছি আজ উনারা খুবই সুখী। দুজনই জোরে জোরে হাসছেন। হাসতে হাসতে বৃদ্ধ ভদ্রলোক হঠাৎ পেছনে ফিরে তাকান আমার দিকে। চোখে চোখ পড়তেই আমি দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। আমি চাইনা উনাদের নির্মল আনন্দ আমার উপস্থিতিতে বাধাগ্রস্ত হোক। গতকালের কালো মেঘ উনাদের জীবন থেকে সরে গেছে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরছেন একজন আরেকজনের উপর।
ট্রামের ডিজিটাল লোকেশান বোর্ডের যান্ত্রিক গলা ক্ষণে ক্ষণে জানিয়ে দিচ্ছিল পরবর্তী ষ্টেশনের নাম। আমি তাকিয়ে রইলাম জানালার বাইরে। রাস্তার সোডিয়াম লাইট গুলোকে আজ খুব জীবন্ত মনে হচ্ছে। সোডিয়াম লাইটের আলোতে Braunschweig শহরকে আজ আরও সুন্দর মনে হচ্ছে। আমি অপেক্ষা করে আছি ট্রাম Rathaus থামবে। কারন আমাকে ফিরতে হবে আমার ডরমে। হাত এ মাত্র আর ৫ মিনিট বাকি।
[পুনশ্চঃ ভদ্রমহিলার চেহারা আমার আজ ও দেখা হলো না ।]
Braunschweig, Germany থেকে।
২৩ শে নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১:৪২
দূরের জানালা বলেছেন: সত্যি রাকিব ভাই, জীবনটা বড় অদ্ভুত। শুভ রাত্রি।
২|
২৩ শে নভেম্বর, ২০১৫ ভোর ৬:১১
আমি ০০০ বলেছেন: ৩ বছর ২ মাস: ১টি পোস্ট।
কিন্ত অনেক ভালো লাগলো।
এখন থেকে নিয়মিত হওয়ার অনুরোধ রইল,লিখা অনেক ভালো হয়েছে অবষ্য।
২৪ শে নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৩:২৯
দূরের জানালা বলেছেন: ঠিকই ধরেছেন আপনি। চুপি চুপি অন্যের লেখা পড়ি। কিন্তু নিজে লেখার সাহস পাই না। তাই একটু দেরি হয়ে গেলো পোস্ট করতে। লিখব ইন শা আল্লাহ্। ভালো থাকবেন।
©somewhere in net ltd.
১|
২৩ শে নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১:৩৪
Raqeeb বলেছেন: জীবনটা বড়ই অদ্ভুত