নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

দূরের জানালা

দূরের জানালা › বিস্তারিত পোস্টঃ

এক অবিশ্বাসী বিশ্বাসীর গল্প

০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ৯:০০

আসুন একটা গল্প শুনি। সত্যিকারের গল্প। বদলে যাওয়া দিনের গল্প। উত্তপ্ত মরুভুমির মাঝে এক পশলা ঝড়ো বৃষ্টি কিংবা অবারিত অশান্ত হৃদয়ের মাঝে এক মুঠো শান্তির গল্প। এ এমন গল্প যা পাঠকের মনে দাগ রেখে যাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য।
.
গল্পের শুরুটা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রুবেনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষের হাত ধরে। আমাদের গল্পের মূল ভুমিকা তারই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম বর্ষেই রুবেনের জীবনে ঘটে যায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। মা বাবার বৈবাহিক জীবনের বিচ্ছেদ, প্রিয় কুকুরের মৃত্যু, পরপর দুবার গাড়ি দুর্ঘটনার পর খুব কাছের এক বন্ধুর মৃত্যুতে ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে রুবেন। একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো রুবেনকে কিছু প্রশ্নের মুখে প্রথমবারের মত দাড় করিয়ে দেয়।
.
কে আমি? এই পৃথিবীতে কেন আমার অবস্থান? আমার জীবনের উদ্দেশ্যই বা কি?
.
নিজের সাথে নিজের কথোপকথনের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি তাকে ধর্মের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। শুরু হয় ধর্মের গভীর থেকে গভীরের অনুসন্ধান। বাল্যকাল থেকে কোনো বিশেষ ধর্মের অনুসারী না হলেও বাবা মা এবং একজন অস্ট্রেলিয় নাগরিক হবার সুবাদে খ্রিস্টান ধর্মের পথটা রুবেনের পরিচিতই ছিল। সেখান থেকেই পথের শুরু। নিজের মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলো নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হতো বিভিন্ন জনের সাথে। কথা হতো খ্রিস্টান ধর্মের বিভিন্ন শাখা যেমন ব্যাপ্টিজম, ক্যাথোলিজম, অর্থোডক্স কিংবা প্রটেস্টান্ট এসব নিয়ে। যখনই কাউকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতো রুবেন, উত্তরগুলো পেত যার যার নিজের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে। এক চার্চের পুরোহিতদের ধ্যানধারনা, বিশ্বাস অন্য চার্চের পুরোহিতদের থেকে অনেকটাই আলাদা। স্বাভাবিকভাবেই রুবেনের মনে প্রশ্ন জাগলো, বাইবেল যদি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত একটা মহাগ্রন্থই হবে, তবে তার ব্যাখ্যায় কেন এত ভিন্নতা? কেন এত বিভ্রান্তি?
.
প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার খোঁজ তাকে নিয়ে চললো একের পর এক ধর্ম অনুসন্ধানে, ক্লান্তিহীন। অতঃপর বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। এরই মাঝে একে একে হিন্দু, ইহুদী ও বুদ্ধধর্ম নিয়ে কিছু বিস্তর পড়াশুনা করে ফেলেছে রুবেন। কিন্তু কোন ভাবেই অশান্ত মনকে সান্ত্বনা দেবার মত প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা কোনো ধর্মের মাঝেই খুঁজে পায়নি সে। বলাবাহুল্য, ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে রুবেনের কোনো আগ্রহ কোনো কালেই ছিল না। আর দশজনের মত সেও ইসলামকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদের ধর্ম বলেই জানতো।
.
কিছুকাল পরের কথা। কর্মসূত্রে লেবানন চলে আসে রুবেন। ব্যাস্ততার মধ্যে সময় ও চলে যাচ্ছিলো খুব দ্রুত। অবশেষে সেই দিনটি এসে উপস্থিত হল, যে দিনটির জন্য সে অপেক্ষা করেছিল দীর্ঘদিন। লেবাননের যে শহরে রুবেনের বসবাস, সে শহরের প্রতিটা মসজিদ থেকে ভেসে আসা আযানের সুমধুর ধ্বনিই কি তার মনের মাঝে এরুপ পরিবর্তন এনেছিল কিনা কে জানে? তবে নিজের উৎসাহটুকু ধরে রাখতে না পেরে সত্যি সত্যিই একদিন চট করে সে ঢুকে পড়ে শহরের কোনো এক মসজিদে। সেখানেই পরিচিত হয় আবু হামজার সাথে। লম্বা দাঁড়ির আড়ালে ঢাকা পড়া হাসি হাসি মুখখানা দেখে প্রথম দেখাতে রুবেনের মনে হয়েছিল আবু হামজা বুঝি এইমাত্র সাহারা মরুভুমি থেকে উঠে এসেছে। আবু হামজা ও আন্তরিকভাবে রুবেনকে স্বাগত জানায় মসজিদে কিছু সময় কাটানোর জন্য।
.
সময় বয়ে যায় তার মতো। এরপর মসজিদে আসা যাওয়া প্রায়ই হতো রুবেনের। সেখানেই পরিচয় আবু হামজার মত আরও কিছু ভাইদের সাথে। ব্যাপক আলোচনা হতো তাদের মধ্যে। বিশেষ করে রুবেন জানতে চাইতে ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে। আলোচনার ফাকে ফাকে আবু হামজাদের কাছে জানতে চাইতো সেই সব প্রশ্নের উত্তর যা সে কিছুকাল পূর্বে চার্চের পুরোহিতদের করেছিল। মজার ব্যাপার হল, তারা সবসময় সব প্রশ্নেরই উত্তর দিত কোরআন কে অবলম্বন করে। কখনো নিজেদের কোনো মতামত প্রকাশ করেনি। এই বিষয়টি তখন রুবেনের মনে ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল। লেবানন থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসার সময় আবু হামজাদের কাছ থেকে কোরআনের একটা কপিও (অনুবাদ) সাথে করে নিয়ে এসেছিল রুবেন। কথা দিয়েছিল কোরআনের যথাযথ মর্যাদা সে রক্ষা করবে।
.
অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর কোরআনখানা ধীরে ধীরে পড়া শুরু করলো রুবেন। যতই পড়ছিল ততই মনে হচ্ছিলো অদৃশ্য কে যেন তাকে আদেশ করছে কিছু বিষয়ে, মনে হচ্ছিলো কে যেন তাকে জীবনের পথ নির্দেশনা দিচ্ছে কোরআনের মাধ্যমে।
.
এমনি করে চলে গেলো আরও কিছু সময়। অতঃপর আসলো সেই রাত। তারা ভরা গ্রীষ্মের সেই রাতে মেলবোর্ন শহরের নিজ বাসার আলো সব নিভিয়ে দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলে বসে আছে রুবেন। জানালা খোলা, পর্দা নামানো। বাইরে ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। হাতের নিচে সজত্নে রাখা কোরআন খানা। আলোআধারি আলোকছয়টায় কিছুটা স্পিরিচুয়াল পরিবেশ। যে করেই হোক, আজকে যে একটা সিদ্ধান্ত নেবে রুবেন। কোরআন দ্বারা বিজ্ঞানের বহু জিনিসের ব্যাখ্যা ইতিমধ্যে রুবেনের জানা হয়ে গেছে। এখন রুবেন জানে কোরআন মাতৃগর্ভে ভ্রুনের বিকাশকে কিভাবে ব্যাখ্যা করে কিংবা কোরআনে কিভাবে পাহাড়গুলোকে খুঁটির সাথে তুলনা করা হয়েছে ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। তবুও মন থেকে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবার আগে শেষবারের মত একটা ধাক্কার প্রয়োজনীয়তার অভাব সে বোধ করছে। অবচেতন মন চাচ্ছে ঘরের মধ্যে এই মুহূর্তে এমন কিছু ঘটুক যা কিনা সে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বলে ধরে নেবে। এটাই হবে তার জন্য সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সিগন্যাল।
.
অনেক্ষন অতিবাহিত হয়ে গেছে এমনিভাবে। ঘরের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক কিছু চোখে পরেনি রুবেনের। হাতে রাখা কোরআন পড়তে শুরু করলো সে। থামলো এক সময়। মনে মনে বললো, “হে আল্লাহ্‌, এটাই আমার মুহূর্ত। এটাই সেই সময় যখন আমি ইসলামে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত, শুধু দরকার তোমার পক্ষ থেকে একটু নিদর্শন। হতে পারে একটু বিদ্যুৎ চমকানি কিংবা তারচেয়ে ও ক্ষুদ্র কিছু। তুমি তো এই দুনিয়া সৃষ্টি করেছো। তুমি কি পারো না আমাকে একটু নিদর্শন দেখাতে?”
.
আরও কিছুক্ষণ অতিবাহিত হয়ে গেলো এরই মাঝে। কিছুই ঘটলো না। সবকিছু যা ছিল তেমনি রইলো। নিশ্চুপ, নিঃশব্দ। যেন কোনো প্রানের স্পন্দন নেই রুমের ভেতর। মনে মনে খুবই হতাশ হল রুবেন। মনে মনে বললো, “হে আল্লাহ্‌, তোমাকে আর একটা সুযোগ দিচ্ছি, হতে পারে তুমি অনেক ব্যস্ত, কিন্তু প্লিজ কিছু সংকেত দাও”।
.
এবারো কিছুই হলো না। কোনো সংকেত এলো না সৃষ্টিকর্তার কাছে থেকে। ভীষণ হতাশ হয় পড়লো রুবেন। আর বুঝি ইসলামে আসা হল না। সারা দুনিয়ার বাদশাহের কাছে চেয়ে এই ছোট্ট আশা টুকু ও পূরণ হল না।
.
টলটলে চোখে হাতে রাখা কোরআন খানা আবার তুলে নিল রুবেন। শুরু করলো সেখান থেকে যেখানে একটু আগে এসে থেমেছিল। এবারের লাইনগুলো ছিল

“তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্যে আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। এই পানি থেকে তোমরা পান কর এবং এ থেকেই উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়, যাতে তোমরা পশুচারণ কর। এ পানি দ্বারা (তিনি) তোমাদের জন্যে উৎপাদন করেন ফসল, যয়তুন, খেজুর, আঙ্গুর ও সর্বপ্রকার ফল। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। তিনিই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি, দিন, সূর্য এবং চন্দ্রকে। তারকাসমূহ তাঁরই বিধানের কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। নিশ্চয়ই এতে বোধশক্তিসম্পন্নদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে। তোমাদের জন্যে পৃথিবীতে যেসব রং-বেরঙের বস্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেগুলোতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্যে যারা চিন্তা-ভাবনা করে।” (সুরাহ নাহল, আয়াত ১০ – ১৩)
.
সুবহানআল্লাহ। আল্লাহু আকবর। ভীষণ ভয় পেলে গেলো রুবেন। ভয় পেয়ে গেলো তার দাম্ভিক, অহংকারী আচরণের জন্য, যে কিনা নিজের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে নিদর্শন খুঁজে বেড়াচ্ছে, অথচ তার আশেপাশে নিদর্শনের সমারোহে ভরপুর।
.
ছয় মাস পরের কথা। কর্মসূত্রে রুবেন কে আবার লেবানন যেতে হয়েছিল। সেখানেই সে ইসলাম ধর্ম কবুল করে। আলহামদুলিল্লাহ্‌। রুবেনের নাম বদলে রাখা হয় আবু বকর। রুবেনের ভাষ্যমতে, ইসলাম গ্রহণের সময় তার খুব ভয় হচ্ছিল। কিন্তু যখনই সে কালেমা পড়া শুরু করেছিল মনে হচ্ছিল কে যেন তার মাথার উপর ঠাণ্ডা পানির ধারা খুলে দিয়েছিল এবং তা ধুয়ে মুছে নিয়ে নিয়েছিল সকল ভয় ভীতি।
.
পরিশিষ্টঃ উপসংহারে এসে কি লিখবো বুঝতে পারছি না। কিছু আয়াত দিয়েই তাহলে শেষ করি। সময় নিয়ে পড়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।
.
“তিনি আল্লাহ; যিনি নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের সবকিছুর মালিক। কাফেরদের জন্যে বিপদ রয়েছে, কঠোর আযাব। যারা পরকালের চাইতে পার্থিব জীবনকে পছন্দ করে, আল্লাহর পথে বাধা দান করে এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করে, তারা পথ ভুলে দূরে পড়ে আছে। আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, পথঃভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন। তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা ইব্রাহীম, আয়াত ২ – ৪)

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.