নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো।

তৌহিদুল ইসলাম শাওন

ভবঘুরে পাঠক

তৌহিদুল ইসলাম শাওন › বিস্তারিত পোস্টঃ

উন্নত জীবনঃ ডা লুৎফর রহমান যা বুঝতেন

৩০ শে জুন, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:৪৩

আজকে আমার অফিসের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সারাদিন কাজের চাপে চারপাশ ভুলে থাকি। ছুটির দিন আসলেই বুঝতে পারি আসলে চারদিক কেমন অর্থহীন, ফাঁপা। এমন অস্থির মন নিয়ে দাঁড়ালাম বইয়ের শেলফের সামনে। চোখে পরল লুৎফর রহমানের শ্রেষ্ঠ রচনাসমগ্র। পাতা উল্টাতে লাগলাম। "উন্নত জীবন" বইয়ের প্রবন্ধ পড়তে পড়তে কিছুক্ষন পরেই বুঁদ হয়ে গেলাম বইয়ের মধ্যে। ভিতরে ভিতরে যেই অর্থহীনতার বোধ অস্থির করে দিচ্ছিল, তা আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে যেতে লাগল। খাতা কলম নিয়ে বসলাম নোট করতে উন্নত জীবন বলতে লেখক কী বুঝতেন।

১। "বড় হও" এই কথাটা মানুষকে বললেই মানুষ বড় হতে পারে না। তাকে পথ দেখাতে হয় কীভাবে বড় হতে হয়। লেখকের মতে, মানুষের মধ্যে যখন জ্ঞানের জন্য একটা স্বাভাবিক ব্যাকুলতা থাকে, তখন মানুষ বড় হবার দিকে তার সফর শুরু করে। মানুষ জানার প্রবল ইচ্ছা থেকে জগতের মহান মনীষীদের রচনা পাঠ করে তাদের স্বপ্ন, আদর্শ, কৌশল, সাধনা ইত্যাদি থেকে অনুপ্রাণিত হয়। লেখক বলেন, মাতৃভাষায় সাহিত্য উন্নত করলে দেশের জনগণ সহজেই এইসব উন্নত আদর্শ, উন্নত স্বপ্ন দ্বারা প্রভাবিত হতে পারবে। বিশ্বের বড় বড় জাতি, যেমন গ্রিক, রোমান, আরব, ইংরেজ সবাই জাতীয় সাহিত্যে জ্ঞান সহজলভ্য করেই উন্নত হয়েছে।

২। জীবনের যে কোন অবস্থা থেকেই বড় হওয়া যায় - এই আত্মবিশ্বাস রাখা। কীভাবে বড় হওয়া যায়? শিক্ষা, জ্ঞানালোচনা, চরিত্র ও পরিশ্রমের দ্বারা। খেয়াল করবার ব্যাপার, আমরা সবাই ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি পরিশ্রম করলেই সফল হওয়া যায়। লুৎফর রহমান এই কথাকে অর্ধেক সত্য মনে করতেন। পরিশ্রমের সাথে জ্ঞানের যোগ থাকলে সেই পরিশ্রম সফলতা নিয়ে আসে। কর্মজীবনে এই কথাটার সত্যতা পাওয়া যায়। আপনি কত পরিশ্রম করছেন তা বিবেচ্য নয়। আপনি কতটুকু পরিশ্রম করে কত বেশি ফল বেশি নিয়ে আসছেন তা বেশি প্রাধান্য পায়। উৎপাদন থেকে উৎপাদনশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন পরিশ্রমের সাথে জ্ঞান যুক্ত হয় তখন আপনার উৎপাদনশীলতা বাড়ে। লেখক এখানে জ্ঞানের খাতিরে জ্ঞান অর্জন করতে বলছেন না, বাস্তব দুনিয়ার খাতিরে জ্ঞান অর্জন করতে বলছেন।

৩। ভালো রকম কাজ করতে হলে ধৈর্য ধরতে হবে। বর্তমানে আমরা সবাই হাতে নাতে ফল চাই। কিন্তু লেখক পুরো জীবনের দিকে তাকিয়ে জীবনের উন্নতির কথা ভেবেছেন। তিনি পাঠককে বলছেন, কাজ কর, ধীর শান্ত হয়ে তুমি তোমার কর্তব্য করে যাও, প্রতিভা তোমাকে দেখে সঙ্কোচ বোধ করবে। তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, আনন্দ নিয়ে তোমার কাজ করে যাও। যখনই ফলের কথা ভাববে, কাজে ক্লান্তি চলে আসবে। "আনন্দে ভরা সাধনা, নিয়ত ফল সম্বন্ধে উদাসীন তোমান মন, ধীরে ধীরে অজ্ঞাতসারে তোমার গন্তব্যস্থানে নিয়ে যাবে।"

৪। প্রতিদিনকার ছোট ছোট সময়কে কাজে লাগাতে হবে। কোন একটি দক্ষতা অর্জন করতে হলে প্রতিদিন ৪-৫ ঘন্টা দেবার দরকার নেই। আমরা শুরুতেই কোন একটি কাজে বেশি সময়, বেশি পরিশ্রম দিয়ে পরে আর তা চালু রাখতে পারি না। লেখক বলছেন, বেশি না প্রতিদিন এক ঘন্টা সরিয়ে রাখো কোনো একটা জিনিশ শেখার জন্য। কম হোক কিন্তু প্রতিদিন তা চালু রাখো, এক দুই বছর পর দেখবে তুমি ঐ বিষয়ে কতটুক এগিয়ে গিয়েছ। ধরুন আপনি প্রতিদিন ৩০ মিনিট সরিয়ে রাখলেন কম্পিউটার স্কিল শেখার জন্য। প্রতিদিন ৩০ মিনিট এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল শিখুন। এক বছর পর আপনার দক্ষতা দেখে আপনি নিজেই অবাক হয়ে যাবেন। অথবা ধরুন, প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট সরিয়ে রাখলেন অর্থনীতি বা দর্শন শেখার জন্য। প্রতিদিন চর্চা করুন। দুই তিন বছর পর দেখবেন অর্থনীতি আর দর্শনে আপনি যে কোন অধ্যাপককে টেক্কা মারতে পারছেন। তাই একটি বিষয় বা স্কিল ঠিক করুন, প্রতিদিন তাতে কিছু করে সময় দিন, এক বছর পর নিজেই বুঝতে পারবেন আপনি অন্যদের থেকে কতটা এগিয়ে।

৫। টাকা পয়সা উপার্জন করতে হবে, টাকা পয়সা ব্যবহার করা জানতে হবে। লুৎফর রহমান যখন উন্নত জীবনের কথা বলেন তিনি কোন অলীক, অবাস্তব জীবনের কথা বলেন না। তিনি বাস্তবতার উপর ভিত্তি করেই তার উন্নত জীবনের কথা বলছেন। তাই তাঁর উন্নত জীবন বইয়ের একটি প্রবন্ধের নাম হোল "পয়সা কড়ি"। লেখক বলছেন, উন্নত জীবন পেতে হলে তোমাকে দরিদ্র হলে চলবে না। দরিদ্র মানুষ তার মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। পদে পদে অপমান সহ্য করতে হয়। তাই টাকা পয়সা উপার্জন করতে হয়, সেই টাকা ব্যবহার করাও জানতে হবে। মিতব্যয়ী হওয়ার চেষ্টাকে লেখক চরিত্রবান হওয়ার মতই মূল্যবান মনে করেন। লুৎফর রহমান বলেন, "যদি খরচপত্র সম্বন্ধে সতর্ক থাক, যে আয়ই হোক তোমার সংসার এক রকম চলবেই।" অথবা "মানুষ যদি হিসেবী হতো তাহলে জগতের পনের আনা দুঃখ কমে যেতো।"

৬। চাকরি বা ব্যবসা যেটাই কর নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে তা সুন্দর ভাবে করতে হবে। চাকরি করলে এমন চিন্তা রাখতে হবে যে, আমি হব সবচেয়ে দক্ষ কর্মী আর ব্যবসায়ী হলে বিশ্বাস রাখতে হবে, আমি হব সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী। চাকরি বা ব্যবসা যেটাই হোক করতে হবে। গুণ আছে কিন্তু চেষ্টা নেই এমন লোকের জীবন ফলবান হয় না। "চেষ্টা কর - নাড়াচাড়া কর - এমন কি কিছু না'র ভিতরে কিছু ফলাতে পারবে। কুকুরের মত চিৎকার কর - সিংহ হয়েও ঘুমিয়ে থাকলে কী লাভ?" সব সময় চেষ্টা করতে হবে যে কাজ করব, সেটা যেন সকল দিকে সকল রকমে সুন্দর হয়। কারন উন্নতির প্রধান কারন দৃষ্টি আর মনোযোগ।

৭। শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। মাথার কাজের সাথে সাথে শরীরের কাজও জানতে হবে। নিজের কাজ নিজে করতে হবে। প্রতিদিন চলার জন্য যেসব ব্যাসিক স্কিল লাগে - কাপড় ধোয়া, বাজার করা, ঘর মোছা, রান্না করা - ছেলে হলেও তা শিখতে হবে। "সংসার-যাত্রা নির্বাহের জন্য যত প্রকার কাজ শেখা সম্ভব, সে সব শিখে রাখায় আদৌ অমর্যাদা নেই।"

লুৎফর রহমান বিশ্বাস করতেন, মানুষের অনন্ত সম্ভাবনা আছে। সে যদি তার বুকে বিশ্বাস নিয়ে প্রতিনিয়ত জ্ঞানচর্চা করে, নিয়মিত তার কাজ করে যায়, চারদিক দেখে শুনে টাকা পয়সা উপার্জন আর খরচ করে, নিজের কাজ নিজে শিখে স্বাবলম্বী হয়, তাহলে সে যেই অবস্থাতেই থাকুক না কেন, সবচেয়ে জঘন্য অবস্থা থেকেও নিজেকে তুলে ধরতে পারবে। কারন, জ্ঞানচর্চা করে তার সে বুঝতে শিখেছে, দেখতে শিখেছে। সেই বুঝা আর দেখার উপর ভিত্তি করে সে প্রতিদিন সাধনা করে যাচ্ছে। মিতব্যয়ী হয়ে জীবন ধারন করছে, ফলে ঋণ নিতে হচ্ছে না। সবশেষে, নিজের কাজ নিজে করে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে। যাদের মধ্যে এমন গুণ গড়ে উঠছে, লেখক বিশ্বাস করেন, তারা কখনোই নিচে পরে থাকতে পারে না। তাদের উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.