| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কলি যুগে নাম সংকির্ত্তন ইশ্বর উপাসনার একটি মাধ্যম। হিন্দুরা নাম কির্ত্তনের মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা করে থাকেন। চৈতন্য যুগে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূ নিত্যানন্দ, অদৈত, গদাধর, শ্রীবাস প্রমুখ ভক্তবৃন্দ সঙ্গে নিয়ে নদীয়ার রাস্তায় রাস্তায় এই কির্ত্তন গান করে বেরাতেন। মহাপ্রভুর সুরে মোহিত হয়ে অনেকেই নাম কির্ত্তন সুধা পান করার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠেন। আজও বৈষ্ণবগন বিভিন্ন স্থানে নাম সংকির্ত্তনের ব্যবস্থা করে ভক্ত হৃদয়কে আনন্দ দান করে থাকেন। কির্ত্তন শুরুর আগে অধিবাস করতে হয়।
পঞ্চতত্মাকম্ কৃষ্ণ ভক্তরূপ স্বরূপকম্ ।
ভক্তাবতারং ভক্তাঞ্চৈবং নমামি ভক্ত শক্তিকম্
গৌরচন্দ্র
জয় রে জয় রে গৌরা শ্রী শচীনন্দন,
মঙ্গল নটন সুঠাম।
তোমরা জয় দাও জয় দাও
শচীনন্দন গৌরা নাচে তোমরা জয় দাও জয় দাও
জগৎ কে নাচাবে বলে শচীনন্দন গৌরা নাচে...
শ্রীমম্মহাপ্রভুর সংকীর্তন লীলাটি, প্রেমসুধা রসের অক্ষয় মহাসমুদ্র। এই পরম সম্পদের সহিত ব্রজভাব বিতরনকারী গৌরহরির মহিমানন্দে মোহিত গীতকর্তা বলতে লাগলেন, আমার শ্রীশচীনন্দন গৌর সুন্দরের জয়, তার জগন্মঙ্গল সুঠাম নৃত্য বিলাসের জয়, তৎপ্রবর্ত্তিত শ্রী সংকীর্ত্তনানন্দের জয়।
জয়রে জয়রে গৌরা..............
তারপর গীতকর্তা মহাপ্রভুর সংকীর্ত্তন লীলা মানসে দর্শন করে বলতে লাগলেন, দেখ-
কীর্তন আনন্দে, শ্রীবাস রামানন্দে
মুকন্দ বাসু গুন গান
আজ ভক্তবর্ঘ্য শ্রীবাস পন্ডিত, শ্রীরামানন্দ বসু, শ্রী মুকুন্দ দত্ত, বাসুদেব ঘোষ প্রমুখ পার্ষদ ভক্তগন আনন্দে কৃষ্ণ গুনগান করতে লাগলেন-
(আজ) কীর্তন আনন্দে শ্রীবাস রামানন্দে
মুকুন্দ বাসু গুন গান
বলি কৃষ্ণ কথা মধুর কথা
সে কথা শুনলে যায় ভব ব্যাথা- কৃষ্ণ কথা
ও তার ত্রিতাপ জ্বালা দূরে যায়রে-
মধুর কৃষ্ণ কথা শুনলে পরে
দ্রাং দ্রিমিকি দ্রিমি দ্রিমি, মাদন বাজত
মধুর মঞ্জীর রসাল
দ্রাং দ্রিমিকি দ্রিমি দ্রিমি- এই সুললিত তালে
মৃদঙ্গ বাজছে- সুরসাল মন্দিরা বাজছে-
আর- শঙ্খ করতাল, ঘন্টা রব ভেল,
মিলল পদতলে তাল
শঙ্খ, করতাল ও ঘন্টার কর্নানন্দি ঐকতান ধ্বনি চতুর্দিকে সুনাদিত হচ্ছে, আর রসের নাটুয়া ‘গৌরা’ আমার মধ্যস্থলে মধুর নৃত্য করে জগৎ কে নাচাচ্ছেন। কি গায়ক কি বাদক সকলেই সে তরঙ্গে চঞ্চল হয়ে প্রভুর বদন মাধুরী ও নৃত্য মাধুরী দেখতে লাগলেন।
বোলের তালে গৌর নাচে
আজ জগৎ কে নাচাবে বলে
তালের তালে সবাই নাচে
রসের নাটুয়া গৌর, ভক্তগন সঙ্গে নাচে
ভক্তগন নাচতে নাচতে আর কি করছেন দেখুন,-
কো দেই গৌরা অঙ্গে সুগন্ধি চন্দন
কো দেই মালতি মাল।
পিরিতি ফুলশরে, মরম ভেদল
ভাব সহচরী ভাল
নাচতে নাচতে ভক্তগন সহচরী ভাবে অর্থাৎ রাস রঙ্গিনী ব্রজাঙ্গনাভাবে বিভোর হয়ে কেহ সংকীর্ত্তনবিহারী গৌর সুন্দরের শ্রীঅঙ্গে সুগন্ধি চন্দন বিলেপন করছেন। কেহ বা মালতি ফুলের মালা পরাচ্ছেন। ব্রজের রাস বিলাস আজ নবদ্বীপে সাক্ষাৎ সমুদিত। তাই-
(আজ) নাচিতে লাগিল
শ্রীরাধার ভাবে বিভোর গৌরা নাচিতে লাগিল
ব্রজের রাস বিলাস উদয় হলো
(তোমরা) বদন ভরে হরি বল
কোই কহত গৌরা জানকী বল্লভ
রাধার প্রিয় পাঁচ বাণ।
দর্শকগনের মধ্যে যারা শ্রী রঘুনাথের উপাসক, তারা আজকের লীলা মাধুরী দর্শন করে আমার গৌরহরিকে সাক্ষাৎ জানকীবল্লভ বলে প্রকাশ করতে লাগলেন।
রাধার প্রিয় পাঁচ বাণ, পাঁচ বাণ মানে কী?
সম্মোহন, উন্মাদন, শোষন, তাপন, স্তম্ভন, এই হলো পাঁচ বাণ। অর্থাৎ ইহাদের ব্যবহার কর্তা বৃন্দাবনের সেই অপ্রাকৃত নবীন মদন।
আর ব্রজভাবের উপাসকগন বলতে লাগলেন- ব্রজের অপ্রাকৃত কন্দর্প শ্রীরাধাকান্ত ব্যতীত এমন অপরূপ রাসকেলী প্রকটন কখনো হতে পারে না।
গীতকর্তা কি বলেছেন শুনুন-
নয়নানন্দের মনে আন নাহিক জানে,
আমার গদাধরের প্রাণ
গীতকর্তা নয়নানন্দ মিশ্র; শ্রীগুরু গদাধর পন্ডিতের ভ্রাতুস্পুত্র এবং শিষ্য। তিনি বললেন যিনি যাহাই বলুন না কেন ‘‘গৌরহরি কিন্তু আমার গদাধরের প্রাণ’’ ইহা ব্যাতিত আমার প্রাণে আর কোন কথাই জাগে না। তাই-
গৌর আমার গদাধরের প্রাণ রে (২)
বন্দেহহং শ্রীগুরোঃ শ্রীযুতঃ পদকমলং শ্রীগুরুন বৈষ্ণবাংশ্চ
শ্রীরূপং সাগ্রজাতং সহগন রঘুনাথান্বিতং সজীবম্
সাদ্বৈতং সাবধৃতং পরিজন সহিত কৃষ্ণ চৈতন্য দেবং
শ্রীরাধাকৃষ্ণপাদান্ সহগন ললিতান্ শ্রীবিশাখান্বিতাংশ্চ
আজানুলম্বিত ভূজৌ কনবাদাতৌ
সংকীর্ত্তনৈক পিতরৌ কমলায়তাক্ষৌ বিশ্বম্ভরৌ
অধিবাসের পদ
একদিন পহুঁ আসি, অদ্বৈত মন্দিরে বসি
বলিলেন শচীর কুমার।
নিত্যানন্দ করি সঙ্গে, অদ্বৈত বসিয়া রঙ্গে
মহোৎসবের করিলা বিচার
(ওগো) বিচার করিলা
মহোৎসব করবার লাগি বিচার করিতে লাগিলা,
তিন প্রভু মিলে বসি, মহোৎসব আনন্দে ভাসি, মহোৎসবের করিলা বিচার
শুনিয়া আনন্দে আসি, সীতা ঠাকুরাণী হাসি,
বলিলেন মধুর বচন।
আনন্দ ধরে না
সীতা ঠাকুরাণীর আজ আনন্দ ধরে না,
মহোৎসবের কথা শুনে তার আনন্দ আর ধরে নারে
তা শুনি আনন্দ মনে মহোৎসবের বিধানে
বলে কিছু শচীর নন্দন।
ওগো বলিতে লাগিলা
প্রভু বলিতে লাগিলা
সীতা ঠাকুরাণীর আনন্দ দেখে প্রভু বলিতে লাগিলা
মহোৎসবের বিধি প্রভু আজ বলিতে লাগিলা
শুন ঠাকুরাণী সীতা, বৈষ্ণব আনিয়া হেথা
আমন্ত্রন করিয়া যতনে।
যে- বা গায় যে বাজায়, আমন্ত্রন করি তায়
পৃথক পৃথক জনে জনে
এই বলি গৌরা রায়, আজ্ঞা দিল সবাকায়
বৈষ্ণব করহ আমন্ত্রনে।
তোমরা অমন্ত্রন করবে গো।
পৃথক পৃথক জনে জনে আমন্ত্রন কর গো।
গায়ান বায়ান বৈষ্ণব গনে, এ গ্রামে ঐ গ্রামে,
বৈষ্ণব করহ আমন্ত্রনে
খোল করতাল লৈয়া, অগুরু চন্দন দিয়া
পূর্ণঘট করহ স্থাপনে
স্থাপন করিবা,
গঙ্গাজলে মঙ্গল ঘট স্থাপন করিবা
খোল করতালের বাদ্য সাথে, অগুরু চন্দন দিবে
প্রভু বললেন- আর কি করতে হবে জান,-
আরোপন করি কলা তাহে বাঁধ ফুলমালা
কীর্তন মন্ডলী কুতুহলে।
মালা চন্দন গুয়া, ঘৃত মধু দধি দিয়া
খোল মঙ্গল সন্ধাকালে
শুনিয়া প্রভুর কথা, প্রীতে বিধি কৈল যথা
নানা উপহার গন্ধ বাসে।
সবে হরি হরি বলে, খোল মঙ্গল করে
পরমেশ্বর দাস রস ভাগে
একবার বদন ভরে হরি বলো (২)
প্রেমানন্দে বাহু তুলে একবার বদন ভরে হরি বলো
নানা দ্রব্য আয়োজন, করি করে নিমন্ত্রন
কৃপা করি কর আগমন।
তোমরা বৈষ্ণবগন, মোর এই নিবেদন
দৃষ্টি করি কর সমাপন
একবার দয়া করে এসো এসা
আমি করজোরে মিনতি করি
একবার দয়া করে এসো এসা
তোমরা আসিলে আনন্দ হবে নিরানন্দ দূরে যাবে
এত করি নিবেদন, আনিল মহান্তগন
কীর্তনের করি অধিবাস।
অনেক ভাগ্যের ফলে, বৈষ্ণব আসিয়া মিলে
কালি হবে মহোৎসব বিলাস
এবার মহান্তগন আসিল-
কীর্তনের অধিবাস করবার লাগি, মহান্তগন আসিল
মহোৎসব বিলাস হবে বলে, বহু ভাগ্যে বৈষ্ণব মিলে
শ্রীকৃষ্ণের লীলাগান, করিবেন আস্বাদন
পুরিবে সবার অভিলাষ।
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যচন্দ্র, সকল ভক্ত বৃন্দ
গুন গায় বৃন্দাবন দাস
তারাই তো এসেছে।
ভক্ত বাঞ্ছা পূর্ণ করবার লাগি
বলি তারাই তো এসেছে।
ব্রজরস আস্বাদিতে আমার গৌর-এ যে গোবিন্দ ভজে
গুন গায় বৃন্দাবন দাস
আগে রম্ভা আরোপন পূর্ণ ঘট স্থাপন
আম্র পল্লব সারি সারি
দ্বিজ বেদ ধ্বনি করে, নারীগণ জয় জয় করে
আর সবে বলে হরি হরি
তোমরা বদন ভরে হরি বল।
প্রেমানন্দে বাহু তুলে একবার বদন ভরে হরি বল
দধি ঘৃত মঙ্গল, করি সবে উতরোল
করয়ে আনন্দ প্রকাশ
আনিয়া বৈষ্ণবগন, দিয়া মালা চন্দন
কীর্ত্তন মঙ্গল অধিবাস
সবার আনন্দমন, বৈষ্ণবের আগমন
কালি হবে চৈতন্য কীর্ত্তন
শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য নাম, নিত্যানন্দ গুন দাম
গুন গায় দাস বৃন্দাবন
বলি ইহাই তো বৃন্দাবন,
সাধু গুরুর আগমন- ইহাই তো বৃন্দাবন
সংকীর্ত্তনযজ্ঞে হবে কৃষ্ণ আরাধান
মধুর মধুর এই বৃন্দাবন
জয় জয় নবদ্বীপ মাঝ। (৩/৪)
তোমরা জয় দাও জয় দাও
শচীনন্দন গৌরার নামে তোমরা জয় দাও জয় দাও
শ্রী গৌরাঙ্গের বদন হেরে-
নইদে বাসী গনে জয়ধ্বনি করে
গৌরাঙ্গ আদেশ পাঞা, ঠাকুর অদ্বৈত যাঞা
করে খোল মঙ্গলের সাজ
তারা সাজিতে লাগিল,
শ্রী গৌরাঙ্গের আজ্ঞা পেয়ে তারা সাজিতে লাগিল
জগত মঙ্গল খোল করতালে’র তালে
আজি জগতকে নাচাবে বলে,
করে খোল মঙ্গলের সাজ
আসিয়া বৈষ্ণব সব, হরিবোল কলরব
মহোৎসবের করে অধিবাস
তারা অধিবাস করে গো
মঙ্গল দ্রব্যাদি সংস্কার করে
মহোৎসবের অধিবাস করে
ওগো সকল বৈষ্ণবে মিলে
বদন ভরে হরি বোল বলে
আপনি নিতাই ধন, দেই মালা চন্দন
করে প্রিয় বৈষ্ণব সম্ভাষ
মালা চন্দন পরায়ে দিলো,
নিজের হাতে দয়াল নিতাই
মালা চন্দন পরায়ে দিলো
ওগো বৈষ্ণব গনের গলায় মালা
নিজের হতে পরায়ে দিল
গোবিন্দ মৃদঙ্গ লৈয়া, বাজায় তা তা থৈয়া থৈয়া
করতালে অদ্বৈত চপল
হরিদাস করে গান, শ্রীবাস ধরয়ে তান
নাচে গোরা কীর্ত্তন মঙ্গল
বল হরি বোল বলে আমার গৌর নাচে রে
ওগো গৌর নিতাই দু ভাই নাচে ভক্ত সঙ্গেরে
বল হরি বোল বলে আমার গৌর নাচে রে
চন্দ্র নাচে, সূর্য নাচে আরও নাচে তারা
পাতালে বাসুকি নাচে, বলে গৌরা গৌরা
বল হরি বোল বলে আমার গৌর নাচে রে
চারিদিকে মঙ্গল, শ্রীহরি কীর্ত্তন।
মাঝে নাচে জগন্নাথ মিশ্রেরও নন্দন
যার নাম শ্রবনে সংসার বন্ধন ঘুচে।
হেন প্রভু অবতার কলিযুগে নাচে
সর্ব মহাপ্রায়শ্চিত্ত, যে প্রভুর নাম।
সে প্রভু নাচয়ে দেখে যত ভাগ্যবান
নিজ আনন্দে নাচে মহাপ্রভু বিশ্বাম্বর।
চরনের তালি শুনি অতি মনোহর
ভাবাবেশে মালা নাহি রহয়ে গলায়।
ছিড়িয়া পরয়ে গিয়া ভক্তের গায়
যার নাম লইয়া শুক নারদ বেড়ায়।
সহশ্র বদন প্রভু যার গুণ গায়
ব্রহ্মান্ডে উঠিল ধ্বনি পুরিয়া আকাশ।
চৌদিকে অমঙ্গল সব যায় নাশ
যার নামানন্দে শিব বসন না জানে।
যার রসে নাচে শিব সে নাচে আপনে
যার নামে বাল্মীকি হইল তপোধর।
যার নামে অজামিল পাইল মোচন
আজি নাচেরে নাচেরে
জগতে মঙ্গলের লাগি প্রভু নাচেরে নাচেরে
অমঙ্গল নাশিবারে মহাপ্রভু নৃত্য করে
চৌদিকে বৈষ্ণব গন, হরি বলে ঘন ঘন।
কালি হবে কীর্ত্তন মহোৎসব
আজি খোল মঙ্গলি, রাখিয়ে আনন্দ করি।
বংশী বলে দেহ জয় রব
তোমরা জয় জোকাড়ে হরি বলো,
প্রেমানন্দে বাহু তুলে, বদন ভরে হরি বলো
হরি বোল হরি বোল হরি বল হরি বল
বলি আজ এর মত এমনি থাকুক (২)
ভাবুক যারা তারা বসে ভাবুক
-‘‘অতঃপর নামকীর্ত্তন’’
©somewhere in net ltd.