| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সম্প্রতি ময়মনসিংহের ভালুকায় সন্ত্রাসীদের হাতে হিন্দু যুবক দিপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সংহতি ও মানবিক চেতনার মূলে এক বড় আঘাত। এই হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বসে নেই। তারা দ্রুততার সাথে এই হত্যার সাথে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনেছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেফতারে জোর অভিযান চালাচ্ছে। একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপরাধীকে আইনের মুখোমুখি করা, যা বাংলাদেশ সরকার সক্রিয়ভাবে পালন করছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই শোকাবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অনেক নেতা যে ধরনের অপরাজনীতি এবং উসকানিমূলক প্রতিহিংসাপরায়ণ বক্তব্য দিচ্ছেন, তা কোনোভাবেই কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে তো পড়ে ই না এমন কি কোন সুষ্ঠু রাজনৈতিক রীতিতে ও পরে না।
খোদ ভারতেই যেখানে প্রতিনিয়ত ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং নিম্নবর্ণের দলিত শ্রেণির মানুষ নানা ধরনের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশের একটি অপরাধকে কেন্দ্র করে ভারতীয় নেতাদের আগ্রাসী ভূমিকা হাস্যকর ও দ্বিচারিতার নামান্তর। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিজেপি নেতা ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি ইসরাইলের গাজা আগ্রাসনের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশকে ‘সবক শেখানোর’ যে হুমকি দিয়েছেন, তা কোনো অসতর্ক রাজনৈতিক মন্তব্য নয়। বরং এটি ভারতীয় রাজনীতিতে ক্রমাগত উগ্র হয়ে ওঠা এক বিপজ্জনক মানসিকতার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার মুখে একটি চলমান মানবিক বিপর্যয় এবং গণহত্যাকে যখন ‘শিক্ষণীয় মডেল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেটি কেবল রাজনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করে না, বরং আন্তর্জাতিক আইন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোর ওপর সরাসরি আঘাত বলে গণ্য হয়।
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যে মাত্রার মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, তা আজ বিশ্ববিবেকের সামনে এক ভয়াবহ প্রশ্ন। হাজার হাজার শিশু, নারী ও বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু, অবরুদ্ধ জনপদের ওপর নির্বিচার বোমাবর্ষণ এবং মৌলিক মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী গুরুতর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এমন এক বাস্তবতায় সেই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত’ হিসেবে হাজির করা নিছক উগ্র জাতীয়তাবাদ নয়, বরং এটি সহিংসতাকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার এক ভয়ংকর প্রচেষ্টা। এই বক্তব্যের মাধ্যমে শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশকে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি শাস্তিযোগ্য ভূখণ্ড বা ‘শিক্ষা পাওয়ার যোগ্য শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি বিশুদ্ধ ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্যের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে যখন একে সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক উসকানিমূলক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে বিচার করা হয়। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের মাত্র কয়েক দিন আগেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বাংলাদেশের সংকটের ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে ‘সার্জিক্যাল অ্যাটাক’ এর মতো সামরিক ভাষা ব্যবহার করেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের উদাহরণ টেনে তিনি মূলত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কূটনৈতিক সংলাপের বদলে সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে বিচার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই দুই বক্তব্য মিলিয়ে একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট ভারতের শাসকদল ঘনিষ্ঠ নেতাদের একাংশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে আর সমান মর্যাদার রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কল্পনা করছে। এই মানসিকতা কেবল বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়, এটি ভারতের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় চরিত্রের জন্যও গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে একটি বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু যখন উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে বিদেশনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ভারসাম্যও ভেঙে পড়তে শুরু করে। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে ‘ একশো কোটি হিন্দুর দেশ’ ও ‘হিন্দু হিত’ এর যে পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, তা ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ভারত কোনো ধর্মরাষ্ট্র নয় এই মৌলিক সত্যকে অস্বীকার করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একমাত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের ঐক্য ও স্থিতিশীলতাকেই বিপন্ন করবে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এমন বক্তব্যের বিরুদ্ধে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া প্রায় অনুপস্থিত। শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল বিরোধী দলগুলোর আনুষ্ঠানিক নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তৃণমূল কংগ্রেস এই বক্তব্যকে ‘নগ্ন ঘৃণামূলক ভাষণ’ ও ‘গণহত্যার আহ্বান’ হিসেবে অভিহিত করলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি। প্রবীণ আইনজীবী ও কংগ্রেস নেতা কপিল সিব্বল প্রশ্ন তুলেছেন, এত স্পষ্ট উসকানিমূলক বক্তব্যের পরও কেন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? এই প্রশ্ন ভারতের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর এক গভীর ছায়া ফেলেছে। কারণ, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভারতের কোনো মুসলিম বা সংখ্যালঘু নেতা সামান্য সমালোচনামূলক মন্তব্য করলেও রাষ্ট্রযন্ত্র কঠোর আইন প্রয়োগে দ্বিধা করে না। অথচ প্রতিবেশী দেশে গণহত্যার ইঙ্গিতপূর্ণ হুমকি দেওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় নীরবতা অনেকের কাছে ‘মৌন সম্মতি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই নীরবতার সামাজিক প্রতিফলন আরও ভয়াবহ। ভারতের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক সহিংসতা ও নিপীড়নের চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা মূলত এই উগ্র রাজনৈতিক ভাষারই বাস্তব রূপ। ‘বাংলাদেশি’, ‘রোহিঙ্গা’, ‘লাভ জিহাদ’ এই শব্দগুলো আজ ভারতে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এগুলো কার্যত সহিংসতার ট্রিগারে পরিণত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ থেকে বিহার, আসাম থেকে ওড়িশা সর্বত্রই বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে হেনস্তা, গ্রেপ্তার বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের ১৯ বছর বয়সী নির্মাণ শ্রমিক জুয়েল রানাকে পিটিয়ে হত্যা কিংবা আসামের শিলচরে রিঙ্কু শেখের ওপর হামলা এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উগ্র বয়ানের ই অশুভ ফল।
আইনগতভাবে বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও কেন এই মানুষগুলো রক্ষা পাচ্ছেন না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে রাষ্ট্রীয় ভাষার দিকে তাকাতে হয়। যখন মুখ্যমন্ত্রী বা প্রভাবশালী নেতারা প্রকাশ্যে ‘সবক শেখানো’ বা ‘সার্জিক্যাল অ্যাটাক’ এর কথা বলেন, তখন মাঠপর্যায়ের উগ্রপন্থীরা সেই ভাষাকেই সহিংসতার লাইসেন্স হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে বিচারহীনতার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় হয়ে ওঠে কারো বেঁচে থাকা বা মরার প্রধান নির্ধারক।
এই প্রেক্ষাপটে গাজার উদাহরণ টানা বিশেষভাবে কুৎসিত। ইসরাইল যেমন ‘আত্মরক্ষা’র অজুহাতে একটি জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছে, ঠিক তেমনি ভারতের উগ্রবাদী রাজনীতিও ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও ‘হিন্দু সুরক্ষা’র নামে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক শান্তিকে বিপন্ন করছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), এনআরসি, ওয়াকফ সংশোধন বিল এবং তথাকথিত ‘বুলডোজার রাজনীতি’ সব মিলিয়ে ভারতে মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া দৃশ্যমান। এই প্রক্রিয়া কেবল মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও এর শিকার হচ্ছে। বড়দিন উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা বা উৎসব ব্যাহত হওয়ার ঘটনাগুলো এই অসহিষ্ণুতার নগ্ন প্রমাণ। কেরালার পালাক্কাড় জেলায় শিশুদের ক্যারল গান গাওয়ার সময় হামলা, উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে বড়দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হওয়া কিংবা দিল্লির লাজপত নগরে নারী ও শিশুদের হুমকির ঘটনাগুলো কোনো আকস্মিক প্রবণতা নয়, বরং একটি ক্রমবর্ধমান কাঠামোগত সহিংসতা।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে এক বড় সতর্কবার্তা। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও অর্থনীতির সুতোয় গাঁথা বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক আজ এক জটিল মোড়ের মুখে। এই সম্পর্ককে যদি সংকীর্ণ নির্বাচনী রাজনীতি বা সাম্প্রদায়িক আবেগের হাতিয়ার বানানো হয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উভয় দেশের জনগণের ওপর। কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনো ব্যক্তিগত হুমকি বা উগ্র স্লোগানের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে না; এটি পরিচালিত হয় আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ভিত্তিতে। শুভেন্দু অধিকারী বা হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো নেতাদের আগ্রাসী ভাষা ভারতের ঘোষিত ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গাজার মতো পরিস্থিতির হুমকি দেওয়া মানে গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে এক স্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া। এই অঞ্চলের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সামরিক আগ্রাসন বা উগ্র জাতীয়তাবাদ কখনো টেকসই শান্তি আনতে পারেনি। বরং এটি দারিদ্র্য, শরণার্থী সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার জন্ম দিয়েছে। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, সচেতন বিশ্বসমাজ এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা প্রগতিশীল নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো এই বিষাক্ত ভাষাকে স্বাভাবিক হতে না দেওয়া।
পরিশেষে, প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার নয়, এটি চরম মানবিক ও নৈতিকতার। কোনো রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তি কি কখনো গণহত্যাকে তার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে? ইতিহাসের উত্তর স্পষ্ট না। ফ্যাসিবাদ সবসময় ভাষাগত আগ্রাসনের মাধ্যমেই তার যাত্রা শুরু করে। প্রথমে ভাষায়, তারপর আইনে এবং শেষে অস্ত্রের প্রয়োগে। আজ যদি এই ঘৃণার রাজনীতিকে থামানো না যায়, তবে এর পরিণতি কেবল বাংলাদেশ বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য নয়, এটি ভারতের নিজস্ব গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও ভেঙে দেবে। ঘৃণা কখনো শান্তি আনে না এটি কেবল আরও ঘৃণা ও ধ্বংসের জন্ম দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত সহাবস্থান, সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে, কোনো ইসরাইলি মডেলের আগ্রাসনের অনুকরণে নয়।
©somewhere in net ltd.
১|
০৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১০
রাজীব নুর বলেছেন: পড়লাম। সেটা জানিয়ে গেলাম।