নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিদ্রোহীরাই কি বিএনপির গলার কাঁটা?

০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৪

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক বিশেষ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন নির্বাচনী সমীকরণে নিজেদের একক আধিপত্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছে , ঠিক তখনই দলটির সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক স্থবিরতা, নেতৃত্ব নিয়ে অস্পষ্টতা এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক আগ্নেয়গিরি সদৃশ বহিঃপ্রকাশ। দলটির এই " ঘরপোড়া " রাজনীতি এখন আর কেবল তাদের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই বরং এখন তা ব্যালট পেপারের জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে। বিএনপির এই নির্বাচনী সংকটের মূলে রয়েছে তাদের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া। দলের অনেক হেভিওয়েট ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন না দেওয়া শুরুতেই জনমনে ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছিল । তখন দলের একপক্ষ প্রচার করেছিল যে, এটি একটি ‘" স্ট্র্যাটেজিক গেম " সেই সময় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দুটি মত লক্ষ করা গিয়েছিল। একদল মনে করেছিলেন যে বিএনপি হয়তো জনপ্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে " আত্মহননের " পথ বেছে নিচ্ছে। অন্যদলের ধারণা ছিল, এটি হয়তো দলটির কোনো সুগভীর কৌশল। তারা ভেবেছিলেন প্রভাবশালী মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রাখা হচ্ছে যাতে তারা জয়ী হয়ে পুনরায় দলে ফিরে আসতে পারেন। এতে একদিকে যেমন জোটের শরিকদের সন্তুষ্ট রাখা যাবে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে নিজেদের জনসমর্থনও প্রমাণ করা যাবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রমান হচ্ছে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক কৌশল এখন দলটির জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর ও দেখা গেল ৭৮টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা অনড় অবস্থানে রয়ে গেলেন ২০ জনকে পরে বুঝিয়ে শুনিয়ে নির্বাচনের মাঠ থেকে পিছু হঠানো সম্ভব হলেও ব্যালট পেপারে ঠিকই ৯৮ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি বিএনপির জন্য এক অস্বস্তিকর এবং ভয়াবহ বাস্তবতা তৈরি করেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের এই চিত্রটি প্রমাণ করে যে এটি কোনো পরিকল্পিত ছক ছিল না বরং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে তৃণমূলের যোজন যোজন দূরত্বের ই ফল। এই বিদ্রোহের সবচেয়ে করুণ প্রভাব পড়ছে বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ভোট ব্যাংকের ওপর। আদর্শিক ভোটাররা যখন দেখবেন তাদের প্রিয় স্থানীয় নেতা এবং দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ আলাদাভাবে লড়ছেন তখন তারা এক চরম বিভ্রান্তির সম্মুখীন হবেন । রাজনৈতিক দর্শনের চেয়েও অনেক সময় স্থানীয় উন্নয়ন ও নেতার প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য ভোটারদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায়। এই ভোট বিভাজনের ফলে বিএনপির যে সুসংহত শক্তি থাকার কথা ছিল, তা খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। আর এই খণ্ডিত শক্তির ফাঁক গলিয়েই নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল জামায়াতে ইসলামীর জন্য গত তিন দশকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুযোগটি এনে দিয়েছে। জামায়াত সম্ভবত এই মুহূর্তটির জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল দীর্ঘদিন । বিশেষ করে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের মতো অঞ্চলগুলোতে, যেখানে জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল না, সেখানে বিএনপির বিদ্রোহীরা তাদের জন্য সম্ভাবনার স্বর্ণদুয়ার খুলে দিয়েছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন । পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৯৪টি আসনের মধ্যে জামায়াত আগে সর্ব সাকুল্যে পাঁচ থেকে ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা রাখত কিন্তু বর্তমান চিত্র তার সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপির বিদ্রোহীরা যদি জয়ী নাও হন, তবুও তারা অনেক ক্ষেত্রেই ধানের শীষের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোট নিজেদের ঝুলিতে টানতে পারেন এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় আর তাতেই জামায়াতে ইসলাম জোটের প্রার্থীরা অনায়াসেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে আসবেন। মাঠপর্যায়ে জামায়াত কর্মীদের মধ্যে যে চাপা উল্লাস দেখা যাচ্ছে তা মূলত বিএনপির এই রাজনৈতিক অদূরদর্শিতারই ফল।

একই চিত্র ফুটে উঠেছে দেশের পশ্চিমাঞ্চলেও। রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩১টিতে জামায়াত সরাসরি লড়াই করছে। এই অঞ্চলগুলো বরাবরই জামায়াতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার বিএনপির বিদ্রোহীদের কারণে সেই দুর্গ আরও সুরক্ষিত হয়েছে। রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের ৪টি এবং খুলনার ৩৬টি আসনের ১১টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা ধানের শীষের ভোটে ভাগ বসাচ্ছেন যা জামায়াত জোটের ভেটের পথকে আরো মসৃন করে দিয়েছে। এমনকি ময়মনসিংহ বিভাগে যেখানে জামায়াতের জয়ের রেকর্ড নেই সেখানেও শেরপুর-১ ও ময়মনসিংহ-৬ আসনের মতো জায়গায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ ছায়াযুদ্ধ জামায়াত প্রার্থীদের বাড়তি অক্সিজেন দিচ্ছে। ঢাকা-১৪ আসনের পরিস্থিতি আরও চরম সেখানে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ ভোটারদের কাছে জামায়াত প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিএনপির এই সংকটের প্রভাব কেবল দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি বিএনপি জোটের রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২৯২টি আসনে বিএনপি নিজের প্রার্থী দিয়ে শরিকদের জন্য মাত্র আটটি আসন বরাদ্দ রাখায় মিত্রদের মধ্যে আগে থেকেই অসন্তোষ ছিল। তার ওপর অভিযোগ উঠেছে যে, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের পরিবর্তে প্রবাসী কিংবা দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ঝালকাঠি, নাটোর, শেরপুর কিংবা কুমিল্লার মতো জেলাগুলোতে এই ক্ষোভের আগুন এখন দাবানল হয়ে জ্বলছে। যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে কিছু বিদ্রোহীকে শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তবে অধিকাংশ আসনেই তারা এখন আর দলের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিএনপির এই " মনোনয়ন বিলাস " বলি বা ভুল কৌশলই বলি এর পুরোপুরি সুবিধাভোগী এখন পুরো জামাতের নেতৃত্বাধীন এগারো দলীয় জোট বিএনপির বিদ্রোহীদের ওপর ভর করে বৈতরণী পার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তারা। মুন্সীগঞ্জ - ১, মুন্সীগঞ্জ -৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২, মৌলভীবাজার-৪, হবিগঞ্জ বা চট্টগ্রামের আসনগুলোতে ধানের শীষের একনিষ্ঠ সমর্থকরা আজ দিশেহারা। তারা বুঝতে পারছেন না যে, তারা দলীয় প্রতীক বা দলের সমর্থনে জোটের প্রার্থীকে ভোট দেবেন নাকি তাদের প্রিয় সেই নেতাকে যিনি বছরের পর বছর তাদের বিপদে-আপদে পাশে ছিলেন তাকে ভোট দিবেন । পরিশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির সামনে যেমন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, তেমনি জামায়াতের জন্য নিজেদের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুবর্ণ সুযোগ। আওয়ামী লীগহীন এই নির্বাচনী মাঠে বিএনপি যদি তাদের অভ্যন্তরীণ এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পারে, তবে ভোটের দিন শেষে দেখা যেতে পারে যে, তারা তাদের সবচেয়ে পুরনো মিত্রের কাছেই মাঠ পরাজয় স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে । ইতিহাসের পাতায় বিএনপির এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া এবং বিদ্রোহী দমনে ব্যর্থতা একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকবে। ব্যালট গণনার দিনই হয়তো নির্ধারিত হবে, বিএনপি কি তাদের দুর্গ রক্ষা করতে পারবে, নাকি তাদেরই ছেড়ে দেওয়া জায়গায় জামায়াতে ইসলামী জোট নিজেদের বিজয় নিশান ওড়াবে।


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.