| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ছাত্র-জনতার ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও " জুলাই সনদ " বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে তার চূড়ান্ত জনসমর্থন অর্জিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, দেশের ভোটারদের একটি বিশাল অংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের প্রতি তাদের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানিয়েছে। এই রায় কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং এটি একটি গতানুগতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পরোয়ানা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি ভোটার " হ্যাঁ " ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন, যা স্পষ্ট করে দেয় যে এ দেশের মানুষ আর পুরনো পথে হেটে স্বৈরাতান্ত্রিক কাঠামোতে ফিরে যেতে চায় না। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ সহ কিছু এলাকায় " না " ভোটের আধিক্য দেখা গেছে, যা আমাদের বৈচিত্র্যময় জনমতের প্রতিফলন, তবে জাতীয়ভাবে" ‘হ্যাঁ " ভোটের বিপুল জয়জয়কার প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা ছিল প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা । প্রচলিত সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিমাণ নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তা কার্যত সংসদীয় একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবে এই ক্ষমতার ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন থেকে রাষ্ট্রপতি কেবল আলঙ্কারিক পদ নন বরং মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, আইন কমিশন এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পথে একটি মাইলফলক। যদিও বিএনপি এই বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে, তবে গণভোটের রায় এই সংস্কারকে আইনি বৈধতা প্রদান করেছে। জুলাই সনদের অন্যতম বৈপ্লবিক প্রস্তাব হলো বাংলাদেশের সংসদকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করা। ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সংসদীয় কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্চকক্ষ বা আপার হাউস জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আনে। ভারতে যেমন লোকসভা ও রাজ্যসভা এবং পাকিস্তানে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেট রয়েছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১০০ সদস্যের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষটি গঠিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে। এর ফলে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সরাসরি নির্বাচনে অংশ না নিয়েও নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারবেন। এটি সংসদের গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে এবং কোনো হঠকারী আইন পাসের পথে একটি কার্যকর ফিল্টার হিসেবে কাজ করবে।
বিগত দশকগুলোতে আমরা দেখেছি একজন ব্যক্তি দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে দলীয়করণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় ভেঙে পড়ে। জুলাই সনদ এই ব্যাধি নিরাময়ে এক ব্যক্তি " ১০ বছরের বেশি বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয় " এই নীতি প্রবর্তন করেছে। এর ফলে নেতৃত্বে নিয়মিত পরিবর্তন ও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক বিকাশের পথ সুগম হবে। পাশাপাশি, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল করার প্রস্তাবটি সংসদ সদস্যদের তাদের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ করবে। বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে এমপিরা এখন থেকে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এটি সংসদকে কেবল " হ্যাঁ সূচক " যন্ত্র হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং এলাকাভিত্তিক জনদাবি ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সংসদ সদস্যদের সাহসী ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেবে।
সংবিধানে বর্তমানে ২২টি মৌলিক অধিকার থাকলেও জুলাই সনদে ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে, যা আধুনিক ডিজিটাল যুগের প্রেক্ষাপটে অপরিহার্য। এছাড়া জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের নেতার অনুমোদনের শর্তারোপ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় এনেছে। নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটির বদলে যে সমন্বিত কমিটির প্রস্তাব করা হয়েছে, তা দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর জনগণের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা এবং প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব প্রদান বিচারিক অঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করবে।
এই সংস্কারের ভিত্তি রচিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল, " জুলাই সনদ " তারই একটি লিখিত বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা। প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে দীর্ঘ সংলাপের পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছিল, তার মধ্যে সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাবই ছিল এই গণভোটের মূল বিষয়। এটি কেবল একটি আইনি নথি নয়, বরং এটি শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি নতুন সামাজিক চুক্তি।
গণভোটের ফলাফল প্রকাশের পর এখন মূল দায়িত্ব বর্তাবে নবনির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ওপর। যেখানে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যখন শপথ নেবেন, তারা একই সাথে " সংবিধান সংস্কার পরিষদ " এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে এই সংস্কার সম্পন্ন করা তাদের জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এমন একটি ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে যেখানে কেবল নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রশ্ন ছিল। " হ্যাঁ " ভোটের এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ একটি ভারসাম্যপূর্ণ, জবাবদিহিমূলক এবং বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ চায়। জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কারগুলো যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে রোল মডেল হয়ে দাঁড়াবে। আগামী ছয় মাস হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। জনগণের দেওয়া এই " জুলাই সনদ " যদি সংসদীয় মারপ্যাঁচে বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তা হবে গণরায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। আশা করি, নতুন সংসদ ইতিহাসের এই দায়ভার যথাযথভাবে পালন করবে এবং একটি টেকসই ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো উপহার দেবে।
২|
১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৬
নিমো বলেছেন: দুঃকিত এনসিপি দিয়েছে, কিন্তু ৫ শতাংশের ধারেকাছেও নাই।
©somewhere in net ltd.
১|
১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৩
নিমো বলেছেন: তা ভাইজান, এজটা কথা বলেনতো, নারী প্রার্থী ৫ শতাংশওতো জুলাই সনদের সংস্কারের মধ্যে আছে। অথচ জামায়াত একজনকে দেয় নি কিন্তু হ্যাঁ ভোটের লাফালাফি করেছে। অন্যদিকে এনসিপিও একজনকেও দেয় নি, উপরন্তু সাক্ষরও করে নও, কিন্তু হ্যাঁ ভোট নিয়ে লাফালাফি। এহেন দ্বিচারিতার রহস্যটা যদি দয়া করে ব্যাখ্যা করতেন।