| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি নতুন যুগের সূচনালগ্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের একচ্ছত্র ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানে চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহিমান্বিত গণ-অভ্যুত্থানের রক্তস্নাত পথ পেরিয়ে এদিন বসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এই সংসদ কোনো সাধারণ সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নয়, বরং হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ এবং পঙ্গুত্ববরণকারী অগণিত মানুষের আজন্ম হাহাকারের ওপর দাঁড়িয়ে এক " নতুন বাংলাদেশ " বিনির্মাণের অঙ্গীকার। তবে এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে রাষ্ট্রপতির ভাষণটি কেবল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকেনি বরং তা হয়ে উঠেছে চরম রাজনৈতিক নাটকীয়তা এবং আদর্শি ভোলবদলের এক নজিরবিহীন দলিল। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্ভবত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ও রহস্যময় ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন এক সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন, যখন দেশ তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষ করেছে। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল যখন তিনি শপথ নেন, তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ আস্থার প্রতীক। তৎকালীন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত আবহে তিনি বিরোধীদের কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা সরকারকে "জননন্দিত " আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন কি তিনি শেখ হাসিনার প্রতি এতটাই অনুগত ছিলেন যে তিনি শেখ হাসিনার পদধূলি বা চরন ধুলি নেওয়া মত কথা বলতে কুণ্ঠা বোধ করেন নাই। অথচ সেই একই ব্যক্তি আজ ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার শাসনকালকে " ফ্যাসিবাদী " হিসেবে অভিহিত করছেন। তিন বছর আগে যিনি বঙ্গভবনের চাবিকাঠি পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের একক পছন্দে, এক সময় যিনি বিএনপি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে নিয়ে নানা কটুক্তি করতে দ্বিধা করেন নাই আজ তাঁর কণ্ঠেই যখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে "স্বাধীনতার ঘোষক" হিসেবে যখন বন্দনা করেন তখন তা কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নয়, সাধারণ মানুষকেও গভীর নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপিত রাষ্ট্রপতির ১৬ পৃষ্ঠার লিখিত ভাষণটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার এক সুনিপুণ প্রতিচ্ছবি। ভাষণে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে গণতন্ত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অত্যন্ত সুচারুভাবে সেখানে পূর্ববর্তী সরকারের গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে রাষ্ট্রপতি কয়েক দিন আগেও ওইসব প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছিলেন, আজ তিনিই সেগুলোকে স্বৈরাচারী বলে নিন্দা জানাচ্ছেন। তাঁর ভাষণে বেগম খালেদা জিয়ার " আপসহীন " ভূমিকার প্রশংসা এবং বক্তব্যের শেষে " জয় বাংলা" এর পরিবর্তে " বাংলাদেশ জিন্দাবাদ " উচ্চারণ করা ছিল তাঁর নৈতিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুসঙ্গত রাখার ই পয়তারা। এই দৃশ্যপটে সংসদ নেতা তারেক রহমানসহ সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে স্বাগত জানালেও, সংসদীয় কক্ষের অন্য প্রান্ত থেকে আসা প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। বিরোধী বেঞ্চে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই ভোলবদলকে সহজভাবে নিতে পারেনি। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে বিরোধী দলের ওয়াকআউট এবং প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ প্রমাণ করে যে, কেবল লিখিত ভাষণ পরিবর্তন করলেই অতীতের দায় মুছে ফেলা যায় না। জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে সেই রূঢ় সত্য শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির এই দ্বিমুখী অবস্থানের পেছনে ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক স্বার্থের সংশ্লিষ্টতাও আজ জনসমক্ষে আলোচিত। এস আলম গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান থাকা বা জেএমসি বিল্ডার্সের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা মো. সাহাবুদ্দিনকে অনেকেই এস আলমের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন সেই করপোরেট সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, তখন নিজের অবস্থান সংহত করতে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মেলানোই হয়তো তাঁর টিকে থাকার একমাত্র কৌশল।
সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সাধারণত মন্ত্রিসভা কর্তৃক প্রস্তুত করা হয়, রাষ্ট্রপতি তা কেবল পাঠ করেন এটিই সাংবিধানিক রেওয়াজ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রধানের কি নিজস্ব কোনো বিবেক বা নৈতিক অবস্থান থাকতে নেই? যখন একজন ব্যক্তি তাঁর পূর্বের অবস্থানের ঠিক ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তোলা প্রশ্নগুলো আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যাঁদের আস্থায় তিনি রাষ্ট্রপতি হলেন, আজ তাঁদেরই তিনি " ফ্যাসিবাদী " বলছেন আবার যাঁদের ভয়ে তাঁর গদি টলোমলো ছিল, তাঁদের মন জয় করতে তিনি ইতিহাসের নতুন বয়ান দিচ্ছেন। একে রাজনীতির ভাষায় " কৌশল " বলা হলেও নৈতিকতার মানদণ্ডে এটি একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপট আমাদের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে। যখন রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়, তখন সেই ব্যক্তি সংকটের সময় রাষ্ট্রের অভিভাবক না হয়ে স্রেফ ক্ষমতাকেন্দ্রের মুখপাত্রে পরিণত হন। মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণটি হয়তো বর্তমান সরকারকে সাময়িক তুষ্ট করেছে, কিন্তু এটি মহান জাতীয় সংসদের গরিমাকে কতটুকু সমুন্নত রেখেছে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মো. সাহাবুদ্দিন এক রহস্যময় ও গিরগিটিসম আচরণের প্রতীক হয়ে থাকবেন। সময়ের প্রয়োজনে তিনি যেমন " জয় বাংলা " কে ধারণ করেছিলেন, ঠিক তেমনি অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে " বাংলাদেশ জিন্দাবাদ " কেও আলিঙ্গন করেছেন। তবে ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, যারা সব সরকারের লোক হতে চায়, শেষ পর্যন্ত তারা কোনো পক্ষেই প্রকৃত আস্থার জায়গা পায় না। ত্রয়োদশ সংসদ হয়তো তাঁর এই ভাষণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিতর্ক করবে, কিন্তু মহাকাল তাঁকে বিচার করবে তাঁর সুবিধাবাদী অবস্থানের ভিত্তিতে। সত্যের অপলাপ এবং আদর্শিক স্খলনের এই অধ্যায়টি আগামী প্রজন্মের কাছে সংসদীয় রাজনীতির এক ট্র্যাজিক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
©somewhere in net ltd.