| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত " স্বনির্ভর গ্রাম সরকার " ব্যবস্থা একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যখন চরম দারিদ্র্য, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং অতি-কেন্দ্রীয় করণের সংকটে জর্জরিত তখন একটি বাস্তবসম্মত ও গণমুখী দর্শনের প্রয়োজন ছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নেওয়া সিদ্ধান্ত দিয়ে সারা বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামের ভাগ্যবদল মোটেও সম্ভব নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশের আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে গ্রামে আর গ্রামের সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন কখনোই টেকসই বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও গ্রামীণ দর্শন থেকেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজ গঠন এবং স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে " স্বনির্ভর গ্রাম সরকার " ব্যবস্থার সূচনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালের ২৪ মে " স্বনির্ভর গ্রাম সরকার অধ্যাদেশ- ১৯৮০ " জারির মাধ্যমে এটি শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু আমলাতন্ত্রের ফাইল থেকে সরিয়ে সরাসরি গ্রামীণ জনপদের দোরগোড়ায় নিয়ে আসা হয়েছিল।
এই ব্যবস্থার মূল দার্শনিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত চমৎকার “গ্রামের উন্নয়ন গ্রামের মানুষের হাতেই।” অর্থাৎ গ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা তৈরি তার বাস্তবায়ন এবং চুলচেরা তদারকির সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে স্থানীয় জনগণের ওপর। এর ফলে সাধারণ মানুষ কেবল সরকারের দেওয়া কোনো অনুদান বা উন্নয়নের নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগী থাকেনি, বরং তারা নিজেদের এলাকার রূপকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অংশীদারে পরিণত হয়েছিল। প্রশাসনিক কাঠামোটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে প্রতিটি গ্রাম সরকার গঠিত হয়েছিল ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি সুনিপুণ কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে। একজন " গ্রাম প্রধান " এর নেতৃত্বে এই কমিটির গঠন পদ্ধতি ছিল তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো স্থানীয় সরকার কাঠামোর চেয়ে প্রগতিশীল ও ব্যতিক্রমধর্মী। সমাজের সকল স্তরের মানুষের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে এতে কোটা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ১১ জন সদস্যের মধ্যে ১ জন গ্রাম প্রধান ছাড়াও ২ জন নারী প্রতিনিধি, ২ জন কৃষক, ২ জন ভূমিহীন শ্রমজীবী, ২ জন যুবসমাজ এবং ২ জন অন্যান্য পেশাজীবীর অন্তর্ভুক্তি ছিল আইনি বাধ্যবাধকতা। এর ফলে গ্রামীণ সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষটিও সমাজের বড় বড় নীতি নির্ধারণী আলোচনায় টেবিলের ওপাশে বসার সুযোগ পেয়েছিল।
এই ব্যবস্থার আরেকটি অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল দলীয় রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত প্রতিনিধিত্ব। গ্রামীণ জনপদে দলাদলি, সংঘাত ও সামাজিক বিভাজন এড়ানোর জন্য প্রথাগত ব্যালট পেপারের নির্বাচনের চেয়ে গ্রাম সভা বা সর্বসম্মতি ও সামাজিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হতো। এর ফলে গ্রামীণ সমাজে রাজনৈতিক হানাহানির বদলে পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক আস্থা এবং এক অভূতপূর্ব সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। গ্রাম সরকারের দায়িত্বও কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না তা ছিল একাধারে বহুমাত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, গ্রামের ছোটখাটো চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে নৈশ পাহারার ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ ছোটখাটো পারিবারিক বা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ স্থানীয় পর্যায়ে শালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। গ্রামের মানুষ সামান্য কারণে থানা বা জেলা আদালতে গিয়ে অর্থ ও সময়ের অপচয় থেকে রেহাই পেত, যার ফলে দেশের উচ্চ আদালতগুলোর ওপর মামলার বিশাল পাহাড় জমার সুযোগ কমে গিয়েছিল।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে গ্রাম সরকারকে বিশেষ চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কৃষকদের মাঝে উন্নত বীজ, সার এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণে তারা সরাসরি ভূমিকা রাখত। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পতিত জমিকে চাষের আওতায় আনা এবং খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গ্রাম সরকার কাজ করত। বিশেষ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক " জাতীয় খাল খনন কর্মসূচি " দেশব্যাপী সামাজিক বনায়ন বা বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জাতীয় উদ্যোগে এই গ্রাম সরকারই তৃণমূলের জনশক্তিকে একত্রিত করেছিল। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও এই ব্যবস্থার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। নিরক্ষরতা দূরীকরণে নৈশ বিদ্যালয় ও গণশিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মাতৃস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক টিকাদান কর্মসূচির মতো জনস্বাস্থ্যমূলক উদ্যোগগুলোকে গ্রামের মানুষের ঘরের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল এই কাঠামো। অর্থনৈতিকভাবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল " স্বেচ্ছাশ্রম " এবং স্থানীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সংস্কৃতি। সরকারি বরাদ্দের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে না থেকে গ্রামীণ জনগণ নিজেদের শ্রম ও সম্পদ দিয়ে রাস্তাঘাট নির্মাণ, সাঁকো বা কালভার্ট মেরামত এবং স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে অংশ নিত। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক অর্জন ছিল জনগণের মধ্যে একটি গভীর " মালিকানাবোধ " তৈরি করা যা স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশ, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধিতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক ট্র্যাজেডি হলো, এই সম্ভাবনাময় স্বনির্ভর উদ্যোগটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক নির্মম সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর দেশের সামগ্রিক রাজনীতি ও প্রশাসনে এক বড় ধাক্কা আসে। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লেঃ জেনারেল এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন এবং একই বছরের জুলাই মাসে এক সামরিক আদেশের মাধ্যমে এই দূরদর্শী " গ্রাম সরকার " ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। ফলে এই ব্যবস্থার যে পূর্ণাঙ্গ বিকশিত রূপ দেখার সুযোগ ছিল, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
বর্তমান সময়ে এসে যদি আমরা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাই তবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই গ্রাম সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা চার দশক আগের চেয়ে আরো অনেক বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে । আজকের বাংলাদেশ চরম প্রশাসনিক কেন্দ্রীয়করণ এবং তীব্র ঢাকা কেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যাধিতে আক্রান্ত। সমস্ত অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, উন্নত চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে ঢাকার ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে, যা রাজধানীতে জনসংখ্যার প্রচণ্ড চাপ এবং গ্রামীণ জনপদে মেধার শূন্যতা তৈরি করছে। বর্তমান যুগে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম মূল শর্তই হলো " তৃণমূল থেকে উন্নয়ন " যা কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা। আজকের প্রেক্ষাপটে যদি গ্রামীণ স্তরে সেই রাজনৈতিক ও সামাজিক দলনিরপেক্ষ অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো থাকত, তবে স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হতো এবং দুর্নীতি বহুলাংশে কমে যেত। বর্তমান সময়ে মেগা প্রজেক্ট বা বড় বড় সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের কোনো প্রত্যক্ষ মতামত বা অংশীদারিত্ব থাকছে না, যার ফলে প্রকল্পগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি দেখা দিচ্ছ। গ্রাম সরকারের সেই স্বেচ্ছাশ্রম এবং মালিকানা বোধের দর্শন যদি আজ বাঁচিয়ে রাখা যেত, তবে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ অনেকাংশেই কমে যেত এবং গ্রামীণ অবকাঠামোগুলো অনেক বেশি টেকসই হতো। তদুপরি বর্তমানের সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং কালচার এবং গ্রামীণ ছোটখাটো কোন্দল নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে একটি দলনিরপেক্ষ সর্বজনগ্রাহ্য প্রশাসনিক কাঠামোর অভাব তীব্রভাবে দৃশ্যমান। থানা-পুলিশের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষের নিঃস্ব হওয়া এবং আদালতের লাখ লাখ মামলার জট কমাতে গ্রাম সরকারের মতো একটি স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামোর প্রাসঙ্গিকতা আজ অনস্বীকার্য। তাই বলা চলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের " স্বনির্ভর গ্রাম সরকার " ব্যবস্হা কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল না এটি ছিল একটি স্বনির্ভর, আত্মমর্যাদাশীল ও আমলাতন্ত্রের শেকলমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দূরদর্শী সামাজিক দর্শন। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যদি আমরা প্রকৃত অর্থে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সুশাসন, অংশগ্রহণমূলক টেকসই উন্নয়ন এবং তৃণমূলের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাই তবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই " স্বনির্ভর গ্রাম সরকার " ব্যবস্থার মূল চেতনাকে ধারণ করে একটি যুগোপযোগী স্থানীয় সরকার কাঠামো পুনর্গঠন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
©somewhere in net ltd.
১|
১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:০৮
রাজীব নুর বলেছেন: আমি আপনাদের মতো এতশত বুঝি না।
আমি দেখতে চাই পরিবর্তন। আমি দেখতে চাই দেশের উন্নয়ন।