| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
চীনের প্রস্তাবিত কুনমিং-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর এবং দেশের উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা খ্যাত তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী সেই সাথে চরম সংবেদনশীল অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত জুনের শেষ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিন দিনের চীন সফর এবং বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই দুই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি দেশের নীতিনির্ধারণী ও কৌশলগত মহলে এক নতুন গতি পেয়েছে। বেইজিং ও ঢাকার পক্ষ থেকে এই সফরকে " দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত " সম্পর্কের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করা হলেও এর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ভূ-রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় অতিক্রম করে রাখাইনের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এই রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক মূলত দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিকে একই সুতোয় বাঁধার এক মহাপরিকল্পনা। তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু অভ্যন্তরীণ সীমান্ত কেন্দ্রিক এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, যা বাংলাদেশকে এক কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
কুনমিং করিডোরের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক আঞ্চলিক প্রস্তাব নয়। ২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও প্রথম এই কৌশলগত ভাবনার বীজ বপন করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে চীনের " মালাক্কা ডিলেমা " বা মালাক্কা উভয়সংকট নামে সুপরিচিত।চীনের মোট বৈশ্বিক আমদানি-রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আগত অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই পরিবাহিত হয় অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল মালাক্কা প্রণালী দিয়ে, যা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের কারণে চীন মনে করে যে কোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকটে মালাক্কা প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে চীনের অর্থনীতি সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়বে। এই " মালাক্কা ডিলেমা " থেকে মুক্তি এবং বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চীন বিগত দুই দশক ধরে বিকল্প রুটের সন্ধানে মরিয়া। সেই লক্ষ্যেই ২০১৩ সালে চীন তার ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (বিআরআই) উদ্যোগের অধীনে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে " বিসিআইএম " অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের তীব্র কৌশলগত আপত্তি, মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও অনাগ্রহের কারণে দীর্ঘ এক যুগেও সেই বহুপাক্ষিক পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান বাস্তবতায় চীন ভারতকে বাদ দিয়েই মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে নিয়ে এই নতুন উপ-আঞ্চলিক করিডোর এগিয়ে নিতে চাইছে।
চীনের " বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) " এর আওতায় চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ( সিপিইসি) এর ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ করিডোরের মাধ্যমে আরব সাগরের গোয়াদর পোর্টে পৌঁছানোর চেয়ে কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের এই ২০০০ থেকে ২২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটটি চীনের জন্য প্রায় এক হাজার কিলোমিটার কম দূরত্বের, সাশ্রয়ী ও ভৌগোলিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে বলেই বিশ্বাস। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সাথে সরাসরি স্থল ও রেল যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে প্রবেশাধিকার সুগম হবে। পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ায় চট্টগ্রামের আনোয়ারার চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের ঢল নামতে পারে, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী অবদান রাখবে। তবে এই অর্থনৈতিক স্বস্তির সমান্তরালে যে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়া কোন ভাবেই সম্ভব না। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাম্প্রতিক বক্তব্য এক গভীর কূটনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে তিনি এই করিডোরের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের যোগসূত্র তৈরি করেছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকটের পর বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি শরণার্থীর দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটকে বেইজিং একটি বার্গেইনিং চিপ বা রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে নিজের অক্ষবলয়ে টানতে চায়। চীন এখন হয়তো প্রকারান্তরে এই বার্তাই দিতে চাচ্ছে যে, বাংলাদেশ করিডোর প্রস্তাবে সায় দিলে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ওপর বেইজিং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তরান্বিত করবে, অন্যথায় এই সংকট অনন্তকাল ঝুলে থাকবে। কিন্তু ট্রানজিট দেশ মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, জান্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সশস্ত্র সংঘাত এবং রাখাইনের সিংহভাগ এলাকার ওপর বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ এই করিডোরের বাস্তব অবকাঠামো নির্মাণ ও নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। তদুপরি ভারতের অর্থায়নে নির্মিত ও ব্যবহৃত রাখাইনের সিতওয়ে বন্দরের কার্যকারিতা এই করিডোরের ফলে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কায় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণটি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
এই করিডোরের চেয়েও বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি তাৎক্ষণিক এবং জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা। ভারত থেকে আসা ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর অন্যতম এই তিস্তা ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বিরোধিতার অজুহাতে ঝুলে রয়েছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরবঙ্গের রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা মরুভূমিতে রূপ নেয় এবং বর্ষায় দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন। উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর এবং এই সুযোগেই চীন এই প্রকল্পের কারিগরি সমীক্ষা ও অর্থায়নের প্রস্তাব নিয়ে জোরালোভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু ভারতের বুক চিরে আসা একটি আন্তর্জাতিক নদীর ওপর চীনের অর্থায়নে ব্যারেজ ও জলাধার নির্মাণ এবং নদী শাসন করার বিষয়টিকে ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য (সেভেন সিস্টার্স) এর প্রবেশদ্বার বা চিকেনস নেক খ্যাত শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। বিগত সরকারের আমলে ভারতের তীব্র আপত্তির মুখে চীন কিছুটা পিছু হটলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা এই প্রকল্পকে বাংলাদেশে তাদের প্রভাব বিস্তারের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে দেখছে। ঢাকা যদি এই প্রকল্পে বেইজিংকে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেয়, তবে তা দিল্লির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক ফাটল তৈরি করতে পারে।
আঞ্চলিক দ্বৈরথের এই বৃত্তকে আরও জটিল করে তুলেছে বৈশ্বিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। সম্প্রতি ওয়াশিংটনের সাথে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, যার একটি সুনির্দিষ্ট শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সাথে এমন কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে না যা যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের পরিপন্থী। ওয়াশিংটন ও দিল্লির যৌথ কৌশলগত লক্ষ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্প্রসারণকে সংকুচিত করা। মালাক্কা প্রণালীর বাইরে বঙ্গোপসাগরে চীনের এই বিকল্প প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। ফলে চীনের এই করিডোরে যুক্ত হলে ওয়াশিংটনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়া এবং রপ্তানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার অর্থনৈতিক ঝুঁকিও বাংলাদেশকে বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে এই ত্রিমুখী সমীকরণের মাঝে সম্ভাবনার এক নতুন জানালা উন্মোচন করেছেন ঢাকার সাবেক মার্কিন ডেপুটি চিফ অব মিশন জন এফ ড্যানিলোভিচ। সম্প্রতি গনমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার নানাদিক নিয়ে তিনি বেশ ইতিবাচক মন্তব্য করেন। ড্যানিলোভিচের মতে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের এই মুহূর্তে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, যেখানে চীন একটি বিশাল বাজার এবং বড় উৎস হতে পারে। তিনি মনে করেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে দেশটির সাথে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো ঢাকার জন্য একটি স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এই অর্থনৈতিক করিডোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে ফাটল ধরাবে না বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিকের স্পষ্ট বার্তা বাংলাদেশ যদি চতুর, দূরদর্শী ও দক্ষ কূটনীতির পরিচয় দিতে পারে, তবে চীনের সাথে এই অর্থনৈতিক যোগাযোগ ওয়াশিংটনের সাথে কোনো বিরোধের কারণ হবে না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান অবশ্য জানিয়েছেন যে, সরকার চীনের এই প্রস্তাবকে গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথটি অত্যন্ত পিচ্ছিল হলেও জন এফ ড্যানিলোভিচের মন্তব্য ঢাকাকে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি দেবে। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে বলা যায়, একদিকে চীন বনাম ভারত এবং অন্যদিকে চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র এই ত্রিমুখী বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সুবিধা এবং রোহিঙ্গা সংকটের সম্ভাব্য সমাধানকে গ্রহণ করার পাশাপাশি দিল্লি ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত নিরাপত্তা ওজর গুলোকে দূরদর্শিতার সাথে সামলাতে হবে। এটি মূলত বাংলাদেশের@ ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ওপর নির্ভর করছে। একবিংশ শতাব্দীর এই সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষায় কেবল সুউচ্চ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও সমদূরত্বের দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমেই এই বহুমাত্রিক সমীকরণকে দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থে রূপান্তর করা সম্ভব।
©somewhere in net ltd.