নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কৃত্তিবাসের নির্বাসন

ইয়াসির ইউনুছ

ইয়াসির ইউনুছ › বিস্তারিত পোস্টঃ

মাঝেমাঝে

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১:৫৭




ডিভিডিতে একটি হাসির নাটক হচ্ছে । ঘরভর্তি মানুষ । মিথিলাদের বাসায় যে মহিলা কাজ করে তার নাম সখিনা বেগম। সখিনা বেগমের দুই ছেলেমেয়ে মেঝেতে বসে নাটক দেখছে। দৃশ্যটি হাসির হলেও তার হাসি পাচ্ছে না । এই নাটকটি সে আগেও কয়েকবার দেখেছে । হাসির জিনিসগুলোর একট বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো কয়েকবার দেখলে আর হাসি পায় না। কিন্তু কষ্টের জিনিসগুলো সবসময়ই কষ্ট দেয়। নাটকটি মিথিলার কাছে ভাল লাগছে না। সে উঠে নিজের ঘরে এল।

মিথিলার ঘরের সাথেই একটা ছোট বারান্দা আছে। তার ধারনা, এই ঢাকা শহরের মধ্যে তাদের বাসাটিই সবথেকে খারাপ। পানির টেপ দিয়ে অনবরত পানি পড়ে, জোড়ে বন্ধ করতে গেলে প্যাচ কেটে যায় , জানালার কাচ ঝনঝন করে নিচে পড়ে , মাঝেমাঝে পরিষ্কার পানির বদলে নোংরাপানি বের হয়। তবে একটামাত্র ভাল দিক হলো এই বারান্দা । বারান্দায় আসলেই মিথিলার মন ভাল হয়ে যায়। রাতের বেলা কিরকম একটা সুন্দর বাতাস আসে, শরীর জুড়িয়ে দিয়ে যায়। মিথিলার যখনি মন খারাপ হয় কিংবা রাগ হয়, বারান্দায় এসে কিছুটা রাগ কমিয়ে নেয়।

মিথিলার ছোট বোন শারমিন মিথিলার সাথে একঘরে ঘুমায়। কিন্তু মিথিলার ইচ্ছে করে নিজের মতো একটি ঘর সাজাতে। রাতে ঘুমাতে মিথিলার অনেক দেরি হয়। মিথিলার একটি ডায়েরি আছে। ডায়েরিটি কেনা হয়েছিল ক্লাস এইটে পড়ার সময়। কিন্তু আজ সাত বছর পরেও ডায়েরিটি ভরে উঠেনি। মিথিলার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই এই ডায়েরিতে লেখা আছে। সে ঠিক করেছে, বিয়ের পর এটি সে তার স্বামীকে উপহার দেবে। ডায়েরির কথাগুলো সে বারবার পড়েছে। তবুও পড়তে ইচ্ছা করে।

" আজ ১লা জুলাই। আমার জন্মদিন। এই দিনে একজন বিখ্যাত মহিলা জন্ম নিয়েছেন। তার নাম প্রিন্সেস ডায়না! আমার প্রতি জন্মদিনেই আমি নিজে থেকে কিছু উপহার কিনি। নিজের জন্য। এবার এই ডায়েরিটা কিনেছি। এই ডায়েরির একটা নাম দেয়া যাক। আচ্ছা, ডায়েরিটার নাম দিলাম- টুকটুক। "

" আজ ২৬শে আগস্ট । এই দিনে কোন বিখ্যাত মানুষ জন্ম নিয়েছেন তা আমার জানা নেই। আজামার ভাইয়া একটা কাজ করেছে। মামুলী কাজ না। ভাইয়া একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলেছে। বাংলা সিনেমার মতো দাঁড়িরে বাবা মাকে সালাম করেছে। আমি আশা করেছিলাম সিনেমার স্টাইলে বাবা মা পা সরিয়ে নেবে। কিন্তু মায়ের কাছে মেয়েটাকেপছন্দ হয়েছে। বাবা অবশ্য এখনো কিছু বলেনি। ভাইয়ার পছন্দ এতো ভাল হলো কবে থেকে? ভাবি হিসেবে মেয়েটাকে আমার খারাপ লাগছে না। "

" ২রা অক্টোবর । ভাইয়া একটা ভাল চাকরি পেয়েছে। পোস্টিং হয়েছে কুমিল্লায়। এ সপতাহেই চলে যাবে। ভাবীকেও নিয়ে যাবে। ভাবির নাম বলেছি? না , বলিনি। ভাবির নাম হলো মিলি। ভাবীর নামের সাথে ভাইয়ার নামের মিল রয়েছে। ভাইয়ার নাম মিলন। মিলন আর মিলিতে মিলে একাকার করা অবস্থা! বাবা ভাবিকে মেনে নিয়েছে। চাকরির কথা শুনে ভাবি কান্নাকাটি শুরু করেছে। ভাইয়াকে বলেছে- তুমি যাও তোমার চাকরিতে । আমি সবাইকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবো না ( আবার কান্না) । ভাইয়া আমাকে বোঝানোর দায়িত্ব দিয়েছে। আমি ভাইয়াকে বলেছি -টেনশন নাই। বুঝিয়ে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেব। আবার ভাবীকে বলেছি- ভাবি, প্লিজ তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না! "

মিথিলা ডায়েরিটা রেখে দিল । তার ঘুম ঘুম লাগছ। ঘুমে সে সবকিছু ভুল দেখতে শুরু করে। ডায়েরির কথাগুলোও ভুল লাগছে। লাইট নিভিয়ে শারমিনের জন্য জায়গা করে ঘুমিয়ে পড়লো।






মিথিলা এক ঘন্টা যাবত একটা ঘরে একা একা বসে আছে। এয়ারকন্ডিশনেড ঘর। কিন্তু যন্ত্রটা বন্ধ। মাথার উপর ঘরঘর শব্দ করে একটা সিলিং ফ্যান ঘুরছে । কিন্তু মিথিলার গায়ে বাতাস লাগছে না। অপরিচিত একটা বাড়িতে খুব অস্বস্তি লাগছে। সে এ বাড়িতে পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। দশ বছরের একটি মেয়েকে সারবক্ষণিক দেখে রাখার জন্য একজন গাইড দরকার। এ বাড়িতে আসার পর একজন লোকের সাথে তার কথাও হয়েছে। লোকটি তাকে অদ্ভুত কিছু প্রশ্ন করেছে।
প্রশ্নকর্তাঃ বৃষ্টি কেমন লাগে?
মিথিলাঃ ভাল।
প্রশ্নকর্তাঃ ভিজেন নাকি?
মিথিলাঃ না। আমার ঠান্ডার সমস্যা আছে।
প্রশ্নকর্তাঃ গল্পের বই পড়েন?
মিথিলাঃ মাঝেমাঝে। শেষ কবে পড়েছি, মনে করতে পারছি না।
প্রশ্নকর্তাঃ আপনি কি সবসময়ই এমন চুপচাপ থাকেন?
মিথিলা উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসলো। লোকটি বললো, আপনি বসুন। আমি আসছি।
লোকটি আর আসে নি। মিথিলা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে দেখলো মাত্র দশ মিনিট হয়েছে। অথচ তার কাছে মনে হয়েছে আধা ঘন্টা। একটু পর সে আবিষ্কার করতলো, দেয়ালেই সুন্দর একটা ঘড়ি টয়ানানো আছে। কস্ট করে মোবাইল বের করার কোন দরকার ছিল না। নিজের উপরই একধরনের বিরক্তি অনুভব করলো সে। অনেকটা সময় কেটে যাবার পর লোকটি ফিরে এল। তার হাত ধরে আসছে গোলাপি রঙের ফ্রক পড়া একটি মেয়ে। মেয়েটির গায়েও গোলাপী রঙের আভা পরেছে। মিথিলার মোনে হলো এরকম কাওকে সে আর আগে কোনদিন দেখেনি। সরি আপনাকে বসিয়ে রাখার জন্য। তিন্নি ঘুমিয়ে ছিল। উঠিয়ে আনতে দেরি হয়ে গেল। ঠিক আছে। তিণ্ণী নামের মেয়েটা মিথিলার কাছে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটা মিথিলাকে দেখছে । মিথিলা চোখ দিয়ে তাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। চোখ দিয়ে মানুষ অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে- কথাটি সবাই জানে না। তিন্নি লোকটিকে নিয়ে আবার ভিতরে চলে গেল। মিথিলা হতাশ হলো। আবারও লোকটি দীর্ঘ সময় পর ফিরে এল। লোকটির মুখ হাসি লাগানো। বললো, তিন্নি আপনাকে পছন্দ করেছে। আপনি কি চাকরিটা করবেন? সে চাকরিটা করবে কি না সেটা জানতে চাওয়ার দরকার ছিল না। চাকরির জন্যই সে এসেছে । মিথিলা বললো, হ্যা। করবো। তাহলে কালকে থেকে চলে আসুন। এই চিঠিটা রাখুন। এটাতে তিন্নির সব কথা লেখা আছে। ঠিক করা ছিল, যে তিন্নিকে দেখাশোনা করবে তাকে এটা দেয়া হবে। বেতন নিয়ে ভাববেন না। চিঠিতে সব লেখা আছে। লোকতি তাকে দরজা অব্দি এগিয়ে দিল। মিথিলা বাগানের ভেতর দিয়ে বের হতে হতে তার মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো। একটি চাকরি পাওয়ার জন্য এতো কম তথ্য নিয়ে কাজ করাটা কি নিরাপদ। লোকটি কি পাগল? লোকটি নিজের নাম পর্যন্ত বলেনি। তার ধারনা েচাকরিতে ঘাপলা আছে। সে চাকরি করবে না।

রাতে সে লোকটির দেয়া চিঠিটা বের করলো।

মিস,
আমি শফিক । তিন্নি আমার বড় ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে । বাড়ির অবস্থা দেখে নিশ্চয়ই বুঝগতে পেরেছেন ভাইয়ার অনেক টাকা। ভাইয়ার নাম রফিক আহমেদ। ভাইয়া বারো বছর আগে বিয়ে করেছে। ভাবী আর ভাইয়ার মধ্যে কোনদিন ভালবাসা নামক জিনিসটি আমি দেখি নি। আমার কাছে মনে হয়, তাদের বিয়ে হওয়াটাই ছিল বড় ভুল। তাদেরই ভুলের কারনে কষ্ট পাচ্ছে তাদেরই একমাত্র মেয়ে। ডিভোর্স না হলেও ভাবী আলাদা বাসায় থাকে। ভাবী তিন্নিকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তিন্নি তার বাবাকেই বেশি ভালবাসে। ভাইয়া নানা কাজে ব্যাস্ত থাকে। তাই তিন্নিকে দেখাশোনার জন্য একজন মানুষ প্রয়োজন। তিন্নি খুবই ভাল মেয়ে। শান্ত এবং চুপচাপ। আপনাকে এই চিঠিটা দেয়ার অরথ হচ্ছে তিন্নি আপনাকে পছন্দ করেছে। আমি সোজাসাপ্টা করেই বলছি। আপনাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে হবে। আমার যা বলার ছিল, আমি বলে দিয়েছি। এবার আপনি বিবেচনা করে দেখুন।
ইতি,
শফিক আহমেদ

চিঠিটা পড়ে মিথিলার মনে হলো, এ চাকরিটা সে নিতে পারে।





মিথিলা আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছে। তার মা মনিরা বেগম সকাল থেকেই ভ্রু কুঁচকিয়ে আছে। গাইড করতে হলে সকাল-সন্ধ্যা থাকতে হবে কেন? গার্মেন্টসের মেয়েরাও তো নয়টায় যায়, পাচটায় আসে। তোর বেলা কোন দেশী সিস্টেম? মা, একটু চুপ কর না। ভাল লাগছে না শুনতে। আমার কথা ভাল লাগবে কেন? আমি তো তোদের শত্রু। সকাল-বিকাল তোদের যন্ত্রনা দেই। মিথিলা আস্তেকরে বললো, তা তো দাও ই । কিছু বললি? না। রুটি হয়ে থাকলে দাও। খেয়ে বের হবো। মনিরা বেগম বিরক্তি নিয়ে দুটো রুটি দিল।

মিথিলা এসে দেখলো তিন্নি স্কুলে চলে গিয়েছে। আজকেও সেই লোকটা উপস্থিত । চিঠিতে লোকটির নাম ছিল- শফিক। শফিক বললো, তিন্নির স্কুল আটটায় শুরু হয়। ওকে উঠিয়ে রেডি করে দিতে হয়। বুঝতেই পারছেন, দায়িত্বটা আপনার! জি। আমি ভেবেছিলাম অর স্কুলের আগেই আসতে পারবো। সমস্যা নেই। আজ তো প্রথম দিন। আপনি বরং গাড়ি নিয়ে অর স্কুলেচলে যান। আপনাকে দেখে মেয়েটা খুশি হবে। সেটাই ভাল। চা খাবেন? না, ধন্যবাদ। আমি নাশতা করে এসেছি। শফিক তবুও চা নিয়ীল। চায়ে চুমুক দিয়ে শফিক বললো, আপনি কি রাতেও থাকতে পারবেন? না শফিক সাহেব। সেটা সম্ভব নয়। ও আচ্ছা । চা পর্ব শেষ হলে শফিক বললো, আসুন আপনাকে বাড়িটা ঘুড়িয়ে দেখাই।

বাড়িটা বিশাল। বাংলা সিনেমাতে বড়লোক নায়িকাদের এমন বাড়ি থাকে। মানুষের এত টাকা হয় কিভাবে? মিথিলা বুঝতে পারে না ঠিক। বাড়ির দেয়লে বিখ্যাত সব পেইন্টিং। সব ঘর দেখা শেষ হয়ে গেল। কেবল তিন্নির ঘরটা বন্ধ। শফিক বললো, তিন্নি খুব সহজে এ ঘরে কাউকে ঢুকতে দেয় না। বেশ কয়েকজন কাজের লোক আছে। কেউ রান্নার কাজে, ঙ্কেউ বাড়ি দেখাশোনার কাজে। তিন্নির বাবা কোথায়? ভাইয়া দেশের বাইরে গেছে। সপ্তাখানেকের মধ্যে চলে আসবে। আপনার কোন সমস্যা হবে না। আমিও একদিন আছি, একদিন নেই। মানে? মানে, আমার বাড়ি পালানোর অভ্যাস আছে। বলে শফিক হাসলো। শফিক ফ্যামিলি এ্যালবাম বের করে দেখালো। ছোট্ট মেয়ে তিন্নি, মায়ের কোলে, তার পাশে হাসিখুশি মুখে তার বাবা।অনেক ছবি। কিছু দেশে, কিছু দেশের বাইরে। মিথিলার খুব জানতে ইচ্ছা হলো কি এমন কারন, যে জন্য তারা আলাদা থাকেন?

তিন্নির স্কুলে যাবার পর মিথিলা চুপচাপ ওয়েটিং রুমে বসে রইলো। আরও অনেক মহিলা আছে । মিথিলার মনে হলো এদের স্কুলে ঢুকতে দেয়াই উচিৎ না। সকালবেলা কি কোম্পানির চা খেয়ে এসেছে থেকে শুরু করে রাস্তা দিয়ে আসার সময় কয়টা উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েকে রিক্সা করে ঘুরতে দেখেছে – সবই তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। “জানেন ভাবি, আপনার ভাই সেদিন যে শাড়িটা দিয়েছে...না না। নীল রঙ্গেরটা না। গোলাপি। একদম জঘন্য। ইচ্ছা করে কিনেছে। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না ও কিরকম বদ। আর আপনার সাহেবের কথা কি আর বলবো। ভাইয়ের তুলনা হয় না”

মিথিলা ছুটি পর্যন্ত একা চুপ করে বসে রইলো। মহিলাদের কথায় তার মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে। একগ্লাস শরবত থেকে ইচ্ছা করছে। লাচ্ছি হলে সবথেকে ভাল।

ছুটির পর আরও একটা সমস্যা দেখা দিল। এতো বাচ্চার মাঝে তিন্নিকে সে কিভাবে খুঁজে বের করবে? মেয়েটা জানেও না যে মিথিলা এখানে অপেক্ষা করছে। তিন্নি নিশ্চয়ই তাদের গাড়ির কাছে যাবে। মিথিলাও এগিয়ে গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। তার ধারনা সত্যি। তিন্নি এসেছে। নেভি ব্লু রঙের জামা পড়া। এই মেয়েটাকে দেখে কালকেও মিথিলার মন ভাল হয়েছে, আজকেও হলো। কিছু মানুষের চেহারা বোধহয় বানানোই হয় অন্যের মন ভাল করে দেয়ার জন্য। মিথিলা হেসে বললো, কেমন আছো?
ভাল।
আমরা কি এখন বাসায় যাব?
হ্যাঁ।
গাড়িতে বসে তিন্নি মিথিলার সাথে অনেক খোলামেলা হয়ে গেল। কোন ক্লাসে কোন কোন টিচার পড়িয়েছে, কোন টিচার তাকে সবথেকে বেশি আদর করে, কোন মিসের গা দিয়ে সবসময় মিষ্টি গন্ধ বের হয়, কোন ছেলে সবথেকে ফাজিল- সব বললো একনাগাড়ে। মিথিলা সবকিছুই মন দিয়ে শুনল।
জানো আমাদের ক্লাসে তানিয়ার এক পুচকু ভাই আছে। সে কি করেছে শুনবা? তানিয়া ড্রয়িং করছিল আর ওর ভাই এসে দিল রঙ ঢেলে। তারপর তানিয়া কি করলো জানো?

মিথিলা উৎসাহ নিয়ে বললো, কি করলো?
ঠাস করে একটা চড় মেরে দিল।
তুমি থাকলে কি করতে?
কিছু করতাম না। ছেড়ে দিতাম।
ছেড়ে দিতে? কিছুই বলতে না?
না।
তুমি তো খুব ভাল মেয়ে তিন্নি!
তিন্নি কিছু বললো না। মিথিলা বললো, আমার একটা পাখি আছে যেটা কথা বলতে পারে। আজ গিয়ে বলবো তিন্নি খুব ভাল মেয়ে।
তিন্নি উৎসাহ নিয়ে বললো, তোমার পাখি আছে?
হ্যাঁ।
কি নাম?
নাম তো নেই।
কথা বলে?
হ্যাঁ!
কি বলে?
বলে, সবাই ভাল থেকো।
এই বলে?
হ্যাঁ।

মিথিলার খুব খারাপ লাগলো। তার কোন পাখি নেই। সে তিন্নির সাথে ভাব জমাতে এটা বলেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা বলা ঠিক হয়নি।
তিন্নি বললো, আমাকে দেখাবে পাখিটা?
আচ্ছা। একদিন নিয়ে আসবো।
তিন্নি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। তার চোখে একটা কথাবলা পাখির স্বপ্ন যে পাখিটা বলে-সবাই ভাল থাকুন।

মিথিলার বাকি দিন কাটলো খুব ভালভাবে। তার একমাত্র কাজ হলো তিন্নির সাথে গল্প করা। তিন্নির ছবি আঁকার অনেক নেশা। আজকে বিকালেই সে চারটা ছবি এঁকেছে। মিথিলা ঠিক করে দিয়েছে কোন ছবিতে কোন রঙ দেয়া হবে। সবগুলো ছবি আঁকা হয়ে গেলে তিন্নি একটা ছবি মিথিলাকে দিয়ে দিল। সন্ধ্যা হবার পর মিথিলা বিদায় নিল। তিন্নি তাকে এগিয়ে দিতে দরজা পর্যন্ত এল। মিথিলা টের পেল তিন্নির নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়েছে।

তিন্নিদের গাড়ি মিথিলাকে বাড়ি অব্দি দিয়ে গেল। সে ঘরে ঢুকে খেয়াল করলো তিন্নির আঁকা ছবিটা আনা হয়নি।






মিথিলার বাবা আফজাল হোসেন বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে তার স্ত্রী মনিরা বেগম।আফজাল হোসেনের চোখে ঘুম নেই। কিছুক্ষন আগে তার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। মাথার উপর পুরনো ফ্যানের চক্কর চলছে। ঘরঘর শব্দ। এমনিতেই রাতের বেলায় তার ঘুম আসতে চায় না। তবুও আজ ঘুমঘুম লাগছিল। হঠাত একটা প্রানীর ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। আফজাল হোসেন ভাবলো কিসের ডাক হতে পারে? শেয়াল? না। শেয়ালের ডাক ঢাকা শহরে শোনা যাবে না। ঢাকা শহরে আছে কুকুর।

প্রথম জীবনে সে অনেক খোলামেলা জীবনযাপন করলেও বিয়ের পর তার দম কমে গিয়েছে। এর কারন তার স্ত্রী।
সে পাশ ফিরে বললো, মনিরা।
মনিরা বেগম নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। মাঝেমাঝে তার ইচ্ছা হয় মনিরার মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলতে। তবুও দিতে পারে না। হাজার হোক, নিজের বউ।
মনিরা ঘুমের মাঝেই জবাব দিল, কি?
ঘুমিয়ে আছো?
কি বল?
বলি ঘুমিয়ে আছো?
মনিরা বেগম চোখ খুললো। তার প্রচন্ড জিদ লাগলো। বললো, কি ব্যাপার?
কুকুর ডাকে কই?
মনিরা রেগে বললো, আমি কি করে বলবো? আমি জানি? বলেই আবার চোখ বন্ধ করলো।

আফজাল হোসেন উঠে বসলো। মিথিলার কথা মনে হলো। মেয়েটা আজ কাজ করতে গিয়েছিল। ভালই হলো। সংসারে টাকা আসবে। সে একটু কম চাপ নেবে। মেয়েটাকে বিয়ে দেবার কথা চিন্তা করা দরকার। ভাল একটা ছেলে অবশ্য হাতে আছে। নাম- জহির। কিন্তু বিয়ে হলে এ সংসারে টাকা দিবে কিভাবে?
সে উঠে একগ্লাস পানি খেয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। মনে হচ্ছে এবার তার ঘুম হবে।

সকালবেলা সে উঠলোও সবার আগে। মিথিলার সাথে নাস্তা করলো। মিথিলাকে বললো, জহিরকে কেমন লাগে?
মিথিলা বললো, কোন জহির?
ওই যে, তোর নজরুল কাকার ছেলে। ভাল না?
হুম। ভালই তো। কেন?
মানে আমাকে বলেছিল ও নাকি বিয়ে করবে। দেখতে শুনতে ভালই। টাকাও আছে। আর বলতে গেলে ঘরের ছেলেই। তোকেও তো বিয়ে দিতে হবে। তাই ভাবছিলাম...

মিথিলা নির্বিকার ভাবে বললো, ও।

আফজাল হোসেন আর কোন কথা না বলে নাশতা শেষ করলো। মিথিলা যাবার সময় বললো, বাবা শোন? আমার বিয়ের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি নিজেই ভাববো। বুঝেছো?
হ্যাঁ।
বাইরে গাড়ির হর্ন বাজলো। মিথিলা বের হয়ে এলো।


মিথিলার গাড়ি জ্যামে আটকে আছে। সাধারণত সকালবেলা রাস্তায় জ্যাম থাকে না। আজ এত গাড়ি কেন? মিথিলা তার বাবার কথাটা ভাবছে। তার বিয়ের বয়স ঠিকই হয়েছে। কিন্তু সে এখন বিয়ে করবে না। রুবী নামের তার এক বান্ধবী ছিল। ইন্টারে পড়ার সময় তার বিয়ের প্রস্তাব এল। কিন্তু রবী বললো সে এই কম বয়সে বিয়ে করবে না। তার বাড়ি থেকে নানাভাবে চাপ দিতে শুরু করল। মা প্রতিদিন প্রেশারে বিছানায় থাকলো। কিন্তু রুবী নির্বিকার। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে জীবনসঙ্গী নিবে না। এতে কে কি বলল, রুবীর কাছে কোন ব্যাপার না। একসময় রুবীর মা এসে বলল, মা আমার, আমরা তো ভালই চাই তোর। ছেলে তো ভালই তো কি সমস্যা?
কোন সমস্যা নেই।
তাহলে বিয়েতে রাজি?
না।
কেন?
আমি এখন বিয়ে করব না।
কবে করবি?
জানি না।
রুবীর মা গেল রেগে। রেগে বললেন, দ্যাখ, এমন করবি তো আমাকে আগে মেরে তারপর কর। আমাকে বিষ দিয়ে মেরে ফ্যাল।

রুবী শান্ত ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা, বিষ আনো।

রুবীর মা হতাশ হলো তবু হাল ছাড়লো না। একপর্যায়ে রুবী বাসা ছেড়ে চলে এল মিথিলাদের বাসায়। রুবীর বাবা মেয়েকে নিতে এল। রুবী শান্ত ভঙ্গিতে বাবার সাথে চলে গেল। যাবার সময় বলল, বাবা, আমাকে বিয়ে দিতে চাও?

হ্যা,চাই।
কেন?
আমরা চাই তুই যেন বাকি জীবন সুখে থাকিস হাতে যে ছেলেটা আছে খুবই ভাল। তোকে অনেক সুখে রাখবে।”
আমি কি পেলে সুখী হব, সেটা আমি জানি। আর কারো জানার কথা না। বলতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও বলছি, তুমি আমার নিজের বাবা হয়েও জানোনা। জানি তোমরা আমার ভাল চাও। কিন্তু আপাতত বিয়ের কথা থাকুক। কেবল জেনে রাখো আমি বিয়ে করছি না। দরকারে বিষ খাব। তুমি কি বুঝতে পারছো আমি কি বলছি?
হ্যাঁ।
আমি সত্যিই বিষ খাব। যে জীবনে আমার কথার কোন দাম নেই, সে
জীবনের কোন মুল্য আমার নেই। চলো বাসায় যাব।

রুবীর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,চল। আর, তোকে বিয়ে করতে হবে না।
মিথিলা ঠিক করেছে, সে রুবীর মতো “কাঠি” হবে। ভাঙ্গবে, তবু মচকাবে না।



তিন্নিদের বাড়িতে এসে দেখলো তিন্নি এখনো ঘুমিয়ে আছে। মিথিলা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলো একটি পরী ঘুমাচ্ছে। দরজার উপর তিন্নির নিজের হাতে লেখা- প্রবেশ নিষেধ। মিথিলা তবুও ঢুকলো। তিন্নির মাথার কাছে বসল। ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো, তিন্নি? তিন্নি?
তিন্নি ঘুমের মাঝেই বললো, উঁহু, উঠব না। যাও।
মিথিলা তবুও চেষ্টা চালাতে লাগল। একসময় সফলও হল। তিন্নিকে স্কুলের জন্য রেডি করালো, নাস্তা করালো। তারপর স্কুলে যাবার জন্য গাড়িতে উঠল। তিন্নি তখন মিটমিট করে হাসছে। মিথিলা বললো, হাসো কেন?
আজ শুক্রবার! হি হি হি!
আজ শুক্রবার নাকি?
ইয়েস! টুডে ইজ ফ্রাইডে!
তিন্নি মিথিলার সাথে এমনভাবে মজা করবে, সেটা মিথিলা ভাবতেই পারে নি। বললো, আজ স্কুল নেই?
শুক্রবারে স্কুল থাকে?
তাহলে যে বাসায় থাকতে কিছু ব্ললে না?
ভাব্লাম তমার সাথে মজা করি!
তিন্নি আবার হাসছে। মিথিলা কেন যেন রাগ ক্রতে পারছে না।
চল, তাহলে বাসায় যাই।
তিন্নি মাথা নারলো। বললো, না, যাব না। আজ ঘুরব। চিড়িয়াখানায় যাব।



চিড়িয়াখানায় ঢুকে তিন্নি প্রথমে গেল বানরের খাঁচায়। মিথিলার মনে হল বানরগুলো আসলেই মহা ফাজিল। তিন্নি বানর গুলোর সাথে কথা বলতে চাইছে। মেয়েটা আনন্দে লাফাচ্ছে। একপর্যায়ে টিফিন বক্স থেকে পাউরুটি বের করে ছিঁড়ে বানরদের দিকে ছুঁড়ে দিল। বানরগুলো ফিরেও তাকালো না। এরপর তিন্নি গেল বাঘ দেখতে। বাঘটা নেতিয়ে আছে। কে বলবে এতা সত্তিকারের বাঘ? বিড়ালের মতো ঝিম মেরে আছে। তিন্নি ভয় দেখিয়ে বললো, হালুম!

একটু দূরে পাখির খাঁচা। এই পাখিগুলো মিথিলার অনেক ভাল লাগে। কত রকমের পাখি। কিচিরমিচির ক্রছে সারাক্ষন। সবথেকে ভাল লাগে ময়ূর ।যখন পাখাগুলো ছড়িয়ে দেয়। তারা দুজনেই ময়ূরের সামনে গিয়ে আগ্রহ নিয়ে দেখছে। যদি নাচে! তাদের কপাল খারাপ।

মাইকে কোথায় যেন বলছে, একটা গরুর দুইটা মাথা। তিন্নি দৌড়ে সেখানে গেল। জাদুঘরের মতো একটা জায়গা। ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হয়ে গেল। তবুও ‘একটা গরুর দুইটা মাথা’ চোখে পড়লো না। সাপের খাঁচা দেখতে গিয়ে তিন্নি বললো, চল, যাব। সাপ দেখব না। কি বিচ্ছিরি! ইয়াক!


ওরা বেরিয়ে এল চিরিয়াখানা থেকে। মিথিলা বললো, ক্ষিদে পেয়েছে?
হ্যাঁ। তোমার?
আমারও।
চল, কোথাও গিয়ে খাই।


মিথিলা আর তিন্নি বসে আছে একটা ফাস্টফুডের দোকানে। তিন্নি একটা পিৎজা খাচ্ছে। মিথিলা খাচ্ছে চিকেন পরোটা। মিথিলা বলল, তিন্নি?
কি?
মাকে ছাড়া খারাপ লাগে না তোমার?
না।
কেন?
জানি না।
তিন্নি খাচ্ছে। একবার পিৎজা মুখে দিচ্ছে আর একবার কোক। দৃশ্যটা দেখে মিথিলার মায়া লাগল খুব। কেন, কে জানে?







রাত দশটা। মিথিলা বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। হালকা বাতাস গায়ে লাগছে। আজ আকাশভরা তারা। মিথিলার তারা দেখতে খুব ভাল লাগে।
শারমিন এসে দাড়াল বারান্দার এক পাশে। মিথিলা বলল, কি ব্যাপার?
কই? কোন ব্যাপার তো নাই।
ভাল।
একা একা কই করিস?
কিছু না। এমনি।
ও।
শারমিন চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। মিথিলার মতো আকাশে চোখ ওর ও। একটু পর বলল, আজ নীরব ভাইয়া এসেছিল।
কেন?
এমনি।
ও।
জিজ্ঞেস করলো তুই কোথায়?
কি বললি?
বললাম তুই চাকরি পেয়েছিস। বড়লোকের বাড়িতে গাইড।

শারমিন চলে গেল। মিথিলা আকাশের দিকেই চেয়ে রইল। নীরব নামের ছেলেটি তাদের পরিবারের কেও না। সে একসময় শারমিনকে পড়াত। এখন পড়ায় না। তবুও মাঝে মাঝে আসে। কেন আসে মিথিলা সেটা টের পায়। তাকে ছেলেটার ভাল লাগে। হয়তো ভালও বাসে। কিন্তু মিথিলাকে এই বিষয়ে সরাসরি কোনদিন কিছু বলেনি। মিথিলার বাবা নিরবের আসা-যাওয়া মতেও পছন্দ করে না। ওকে দেখলেই বিড়বিড় করে বকা দেয়। ‘এই ছেলের এখানে কি? মানুষজন কি বলবে? এখন সে এইবাড়ির কে হয়? বাড়িতে দুটো মেয়ে।’ মিথিলার মা অবশ্য কিছু বলে না। না বলার কারন আছে। ছেলেটা মানুষ হিসেবে খারাপ না। নানা বিপদে আপদে কাজে আসে। এই তো সেদিন মিথিলার খালার বাড়ি যাবার খুব দরকার হল একটি জিনিস পাঠাতে হবে। কিন্তু বাড়ি সেই কুমিল্লা। মিথিলার বাবাকে একলা ছাড়া ঠিক হবে না। সোনাদানার ব্যাপার। কখন কোন বিপদ হয়, কে জানে? কিন্তু নীরবকে তার বিশ্বাস হয়। আফজাল হসেনের সাথে নীরব কুমিল্লায় গেল। আসবার সময় নিজের পকেট থেকে রসমালাই নিয়ে এল। এতে মনিরা বেগম কষ্ট পেয়েছে। এমনিতেই বেকার ছেলে। বড় মায়া লাগে। আর মিথিলার বাবাও। কেন ছেলেটাকে কিনতে দিল?


একদিন মিথিলাকে শারমিন বলেছিল, আপু শোন?
কি?
আমার কি মনে হয় জানিস?
কি ?
নীরব ভাইয়া তোকে পছন্দ করে।
ও।
তোর কেমন লাগে?
ওভাবে ভাবিনি।
ও।


এরপর একদিন মিথিলা ছেলেটির সামনে গিয়ে দাড়িয়েছিল। সরাসরি বলল, শুনুন?
নীরব অপ্রস্তুত হয়ে গেল একদম। কিছু বলবেন?
মিথিলা বলল, হ্যাঁ বলবো।
জি বলুন। বলেই চোখটা মেঝের দিকে নামিয়ে ফেললো নীরব।
আমাকে আপনি ভালবাসেন?
শুনে নীরব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
ওভাবে তাকাবেন না। বিশ্রী লাগে। আমার উত্তর দিন।
নীরব তবুও চুপ করে রইল।
মিথিলা বললো,আপনার নামের সাথে তো চরিত্রের খুব মিল। এত চুপ কেন?
নীরব বলল, শারমিন অংকে খুব কাচা। প্র্যাকটিস করা দরকার।
কথা ঘুরাবেন না। যা বলছি তার উত্তর দিন।
নীরব এরপর বোবা রইল।
দেখুন নীরব সাহেব, কাউকে কারো ভালও লাগতেই পারে। আমাকে যদি আপনার ভাল লাগে সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আমি আপনাকে ভালবাসি না। আপনি কি আপনার হাত কেতে আমার নাম লিখতে পারবেন? বলতে হবে না। জানি, পারবেন না। কারন আপনি খুব ভিতু। আপনি কি ছাদ থেকে আমার জন্য ‘ভালবাসি’ বলতে বলতে লাফ দিতে পারবেন? জানি তাও পারবেন না। আপনি এখন আসতে পারেন।
নীরব উঠে চলে গেল।

মিথিলা ভেবেছিল হয়তো নীরব কথাগুলো শুনে মিথিলাকে দেখানোর জন্য হাত কেটে ‘মিথিলা’ লিখবে। অথবা তার কাছে খবর আসবে যে নীরব ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে।
কিন্তু মিথিলার ধারনা ভুল ছিল। নীরব কিছুই করেনি। ব্লেট দিয়ে হাত কেটে নাম লেখা তো দুরের কথা, কলম দিয়েও ‘মিথিলা’ লিখেনি।
বরং বেহায়ার মত মিথিলার সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করেছে।


মিথিলা বারান্দা থেকে ঘরে এল। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে। তাই সে শুয়ে পড়লো। শুয়ে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। সে জহিরকে বিয়ে করেছে। তাদের সুন্দর একটা পরিবার হয়েছে। একটা সুন্দর ছেলে হয়েছে। একদিন তারা শপিং করতে বের হয়েছে। হঠাৎ করে এক দোকানে নীরবের সাথে দেখা। নীরব সেইদিনের মতোই বোকার মতো তাকিয়ে আছে। জহির বলছে, আপনি তো নীরব?
নীরব হ্যাঁ-সুচক মাথা নাড়লো।
আপনি মিথিলাকে ভালবাসতেন?
হ্যাঁ।
তো বিয়ে করলেন না কেন?
মিথিলাকে জিজ্ঞেস করুন।
জহির মিথিলাকে জিজ্ঞেস করলো । মিথিলা চিৎকার করে বলল, আমি ওকে ভালবাসিনি।
কেন?
জহিরের উপর রাগ লাগল। মিথিলা বলল, বাসায় যাব। কেনাকাটা করব না।

মিথিলার ছেলেটা ভয় পেয়ে কাঁদছে। সেই কান্নার শব্দ একসময় কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।






তিন্নি আজ স্কুলে যায়নি। মিথিলা বলল, শরীর খারাপ লাগছে?
না।
তাহলে কেন যাবে না?
আজ বাবা আসবে।
ফোন করেছেল?
না আমি বুঝতে পারি।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। বাবা ফিরে আসলে আমি তা বুঝতে পারি।

তিন্নি একটা ঘড়ি কোলে নিয়ে সোফায় বসে আছে।

রফিক সাহেব এলেন দুপুরের দিকে। তিন্নি তার বাবা ফিরে আসার আগে যতোটা আগ্রহ প্রকাশ করেছে তার ছিটেফোঁটাও সে প্রকাশ করলো না।
রফিক সাহেব বললেন, কেমন আছো মামনি?
ভাল আছি।
এতদিন একা একা থাকতে কষ্ট হয়েছে?
না।
ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করেছো?
হ্যাঁ।
এইতো আমার লক্ষ্মী মা।
তিন্নি বললো, ঘুম পাচ্ছে বাবা।
এই সময়ে?
পাচ্ছে।
আচ্ছা ঘুমিও। আগে বলতো তোমার জন্য কই এনেছি?
কি?
অনুমান করে বল।
অনুমান করতে পারছি না। ঘুম দিব বাবা।
রফিক সাহেব হতাশ হলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আচ্ছা। যাও।


মিথিলাকে দেখে রফিক সাহেব বললেন, আপনার পরিচয় মনে হয় ধরতে পারছি। আপনি কি তিন্নির দেখাশোনা করছেন?
হ্যাঁ। আমি মিথিলা।
শফিক ফোনে আমাকে অবশ্য বলেছে আপনার কথা। আমার মেয়েটা অনেক লক্ষ্মী না?
হ্যাঁ। তিন্নি অনেক লক্ষ্মী মেয়ে।
রফিক সাহেব হেসে বললেন, আমি একটু রেস্ট দিব।
আপনার খাবারের ব্যাবস্থা করবো?

রফিক সাহেব হাসলেন। বললেন, আপনি আমার মেয়ের গাইড। আমার না। আপনি তিন্নির ঘরে গিয়ে দেখুন তো তিন্নি ঘুমিয়ে গিয়েছে নাকি।
মিথিলা দেখলো তিন্নির ঘরটা বন্ধ। টোকা দিতেই তিন্নি দরজা খুলে দিল।
মিথিলা বললো, কি ব্যাপার তিন্নি? তোমার কি মন খারাপ?
মন খারাপ হবে কেন?
হতেও তো পারে কোন কারনে?
আমার আমার মন ভাল।
সত্যিই ভাল?
না। মিথ্যা মিথ্যা ভাল।


মিথিলা হাসলো।
গল্প শুনবে তিন্নি?
না।
কই করতে ইচ্ছা করছে?
নাচতে।
নাচতে?
হ্যাঁ। আমি নাচবো। আর তুমি সেটা রেকর্ড করবে।
আচ্ছা।
তুমি নাচ জানো?
নাহ!
কেন? না জানার কি হলো? আসো। আমার সাথে নাচবে।

মিথিলা তিন্নির সাথে নাচতে শুরু করেছে। তার নাচ হচ্ছে হাস্যকর এবং ভয়াবহ। তিন্নি মজা পাচ্ছে। সে যতো নাচছে, বাবার উপর থেকে অভিমান ততো কমতে শুরু করেছে।

রাতে খাবার সময় রফিক সাহেব বললেন,
এতদিন রাতে একা একা ছিলে?
হ্যাঁ।
তোমার চাচ্চু তোমার সাথে থাকতে চেয়েছিল।
হ্যাঁ। কিন্তু তাকে আমার ভাল লা।
সে তোমাকে অনেক ভালবাসে তিন্নি।
জানি। কিন্তু...
কিন্তু কি?
কিছু না।
খাচ্ছ না যে?
খেতে ইচ্ছা করছে না বাবা।
আমি খাইয়ে দেই?
না।
বাবাকে ভালও লাগে না?
লাগে।
তুমি না খেলে আমিও খাব না।
আচ্ছা।
কি আচ্ছা?
আচ্ছা মানে না খেয়ে থাক।
তিন্নি উঠে গেল। রফিক সাহেব হতভম্ব হয়ে আছেন। তাঁর মেয়ে এরকম করছে কেন? অবশ্য দুশ্চিন্তা করার কারন নেই। তিন্নির মায়েরও এরকম অভিমান করার স্বভাব ছিল। রফিক সাহেব খাবার রেখে উঠে গেলেন।





নীরব ঘামের শরীর নিয়ে মেসে ঢুকলো। ইলেক্ট্রিসিটি নেই। হয়তো টেবিলের উপর মোম রাখা আছে। এই অন্ধকারের মধ্যে খুঁজে বের করাও মুশকিল। যাক, পাওয়া গেছে। নীরব মোম জালালো। এক মিনিটের মধ্যে ইলেক্ট্রিসিটি চলে এল। মোম্বাতি নিভাতে হবে। সে ঠিক করলো ফু দিয়ে মোমবাতি নেভাবে না। টেবিলের উপর একটা কাঁচের গ্লাস ছিল। সেই গ্লাসটা উলটো করে মমের টুকরোর উপর রাখবে। অক্সিজেনের অভাবে মোমটি নিভতে থাকবে, আর সে সেটি দেখবে। এই পদ্ধতি সে খুব ছোটবেলায় এক বন্ধুর বড় ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছিল। তখন সে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। ক্লাস ওয়ানে পড়া ছেলের কাছে বিষয়টি মনে হল ম্যাজিক। সে সবাইকে আগ্রহ নিয়ে ম্যাজিক দেখানো শুরু করে দিল। মোমবাতিটি নিভে গেছে। নীরব পোশাক পাল্টে নিল। আজ সে চাকরির ইন্তারভিউ দিয়েছে।তার ইন্টারভিউ কখনই ভাল হয় না। উত্তর দিতে গেলে তোতলামি শুরু হয়। সে নিশ্চিত, এবারেও তার চাকরিটা হবে না। এখন সে যাবে মিথিলাদের বাড়িতে। মিথিলার মা তাকে ডেকেছে। কেন ডেকেছে সেটি সে সহজেই অনুমান করতে পারে। অবশ্যই কোন কাজ করতে হবে। নীরব ঐ পরিবারের কেউ না। তারপরেও সে পরিবারটির সাথে মিশতে চায়। কারণ, মিথিলাকে তার খুব ভাল লাগে। মিথিলাদের বাসায় এসে সে কলিং বেইল চাপলো। যদিও সে জানে এ বাড়িতে কলিং বেইল নেই। এরপর সে দরজায় কড়া নাড়লো।দরজা খুলে দিল শারমিন। শারমিন একসময় ওরই ছাত্রী ছিল। ক্লাস নাইন পর্যন্ত সে শারমিনকে পড়িয়েছে।
কেমন আছো শারমিন?
জি ভাল। আসুন।
নীরব সফায় গিলে বসলো। বললো, তোমার মা কই?
ভিতরে আছে। ডেকে দিচ্ছি।
শারমিন চলে গেল। আগে মেয়েটা নীরবের সাথে অনেক কথা বলতো। এখন কেমন যেন চাপা হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বসে থাকতে নীরবের অস্বস্তি লাগে। যদি হথাত মিথিলা এসে পড়ে? মিথিলা তাকে দেখতে পারে না। অবশ্য তাকে ভাল লাগার কোন কারণ নেই। সে শাহ রুখ খান নয়। মিথিলা একদিন তাকে বলেছে, আপনি হচ্ছেন ভীতু।
মিথিলার মা ঘরে ঢুকলো।
কেমন আছেন আন্টী ?
এইতো, এক রকম চলছে।
মিথিলার মা নীরবের কানের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে কথা বলা শুরু করলো। মহিলাদের এই স্বভাব কেন হয় কে জানে।
শোন বাবা। আমার কিছু টাকা লাগবে। কুমিল্লায় আমার বান্ধবীর সাথে কথা হয়েছে। সে বলেছে কালকেই টাকা দিতে পারবে। তুমি যদি একটু কষ্ট করে এনে দাও, খুব উপকার হয়।
আচ্ছা। সমস্যা নেই। আমি যাব।
কাল সকালেই যেতে পারবে?
হ্যাঁ।
আচ্ছা, কাল এখানে নাশতা করে যেও।
আজ আসি আন্টী?
আচ্ছা বাবা এস!

নীরব এই মহিলাকে বুঝতে পারে না ঠিক। এতটুকু বলার জন্য বাড়িতে না ডাকলেও হত। মোবাইলেই বলা যেত।নীরব ভাবল, মিথিলা নিশ্চয়ই তার আসার কথা জানে। তাই সে ঘর থেকে বের হয় নি। নীরব একবার মাত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বের হয়ে এল।

নীরবের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। তাঁর বাবার একটা ফার্মেসি আছে। নীরবের ছোট ভাইয়ের নাম সরব। তাদের নামকরন সার্থক। সরব সবসময় কথা বলতেই থাকে আর নীরব সবসময়ই চুপচাপ থাকে। সামনে সরবের এসএসসি পরীক্ষা। টেস্ট পেপার কিনতে হবে। হাজার টাকার মামলা। নীরবের একটা চাকরি দরকার। ঢাকায় এসে পড়াশোনা করেছে টিওশনি করে। তারপর একটা পার্টটাইম চাকরি করেছে। সেই অফিস গত সাতমাস ধরে বন্ধ। মেস ভাড়া জমে আছে। এজন্য সে সকাল বেলা সবার আগে বেড়িয়ে যায় আর রাতে চোরের মতো ফিরে আসে। তবু মেস মালিক তাগাদা দেয়। নীরব কিছু টাকা জমিয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে সে মিথিলার জন্য একটা ব্রেসলেট কিনেছে। সেটা সে মিথিলাদের বাসায় রেখে এসেছে। মিথিলা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে এটা তাঁর জন্য। তবে নীরবের ধারনা ব্রেসলেটটি মিথিলা পায়নি। পেলে অবশ্যই সে নীরবের সামনে এসে রাগি রাগি মুখে বলতো, দেখুন নীরব সাহেব। সবকিছুর একটা সীমা আছে।

মিথিলা সেরকম কিছুই করে নি। কাজেই ধরে নেয়া যায়, ব্রেসলেটটি সে পায় নি।







শফিক বললো, কেমন আছেন?
মিথিলা হেসে বললো, জি ভালও। আপনি?
ভালও আছি। তারপর? কেমন লাগছে তিন্নিকে?
তিন্নি অনেক ভাল মেয়ে।
শফিক হাসলো। মিথিলা বললো, কোথাও গিয়েছিলেন?
হ্যাঁ। একটু চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। আপনার কোন অসুবিধা হচ্ছে নাতো?
না।
আজ নাকি ভাবি আসবে?
মিথিলা অবাক হয়ে বললো, ভাবী? মানে তিন্নির মা?
হ্যাঁ। সে মাঝেমাঝে তিন্নিকে দেখতে আসে।
একটি কথা জানতে পারি শফিক সাহেব?
কি কথা?
আপনার ভাই আর ভাবীর মধ্যে আসলে সমস্যাটা কোথায়?

শফিক একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
ঘরের কথা বাইরের কাউকে বলতে হয় না। তবু আপনাকে বলতে দোষ নেই। ভাবীর একটু সমস্যা আছে। তার ধারনা অনেক মেয়ের সাথে ভাইয়ার সম্পর্ক আছে। আপনাকে দেখেও সে বাজে কথা ভেবে বসতে পারে।
ও।

বিকেলে তিন্নির মা শাহানা এই বাড়িতে এল। প্রথমেই তিন্নিকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষন কাঁদল।
কেমন আছো মা?
তিন্নি মাথা নাড়লো। সে ভাল আছে।
মাকে ছাড়া কষ্ট হয় না?
তিন্নি জবাব দিল না।
খেয়েছো?
হ্যাঁ।
কখন?
দুপুরে।
এখন তো বিকাল, খিদে পায়নি?
না।
তোমার জন্য আইসক্রিম এনেছি। খাবে না?
না।
কেন?
বাবা নিষেধ করেছে।
চোখ মুছতে মুছতে শাহানা বললো, তোমার বাবা কোথায়?
বাইরে।
একা একা আছো বাড়িতে?
না। এই আপু আছে।


এই প্রথম শাহানা মিথিলাকে খেয়াল করলো। ভ্রু কুচকে তিন্নিকে বললো, তোমার নতুন গাইড ও?
হুম।

মিথিলা ঠিক করেছে সে হাসিমুখে কথা বলবে। সে তাই করলো। হেসে বললো, কেমন আছেন ?
ভাল। তোমার নাম কি?
মিথিলা।
কতদিন আছো এই বাড়িতে?
খুব বেশিদিন হয় নি।

মিথিলার মনে হলো এই পৃথিবীর কিছু মানুষকে তৈরি করা হয় সন্দেহের প্রলেপ দিয়ে। তারা সবকিছুতেই সন্দেহ খুঁজে পায়। শাহানা সেই শ্রেণির মানুষ।

রফিকের সাথে তোমার কথা হয়েছে?
হ্যাঁ।
লোকটা মানুষ হিসেবে কেমন?
ভাল।
শাহানা হাসলো।
তিন্নিকে ভেতরে যেতে বলে মিথিলাকে বললো, এখন বল রফিক তোমার গায়ে হাত দিয়েছে?
সরি?
যা বললাম তা তো শুনতেই পাচ্ছ?
উনি আমার গায়ে হাত দিতে যাবেন কেন?
সেটা তোমরাই জানো। এমনও হতে পারে সে তোমাকে অনেক টাকা বেতন দেয়। তাই তুমি তাকে ছেড়ে যেতে পারছো না।

মিথিলা কোন উত্তর দিল না।

এখন বল মেয়ে, তুমি কি রাতে এখানে থাকো?
না।
শুনে খুশি হলাম। ও কি তোমাকে অফিসে ডাকে? একা?

মিথিলা উঠে দাঁড়ালো। বললো, আমি আসি।

প্রতিদিন সে এ বাড়ির গাড়িতে করে যায়। আজ সে সোজা গেট দিয়ে বের হয়ে এল।

শফিক ঠিকই বলেছিল। মিথিলার চোখে পানি চলে এসেছে।

বাড়ি ফিরে মিথিলা দরজা বন্ধ করে রাখলো। সে চাকরীটা ছেড়ে দেবে। কিন্তু তিন্নির জন্য মায়া লাগছে। অতি অল্পতেই মানুষের উপর মানুষের মায়া পড়ে যায়। মায়া না থাকলে কেমন হতো?

রাতে শফিকের ফোন আসলো। মিথিলা মোবাইল কানে দিয়ে বললো, হ্যালো?
হ্যালো আমি শফিক।

মিথিলা কোন কথা বললো না।
শফিক বললো, আমি সরি। ভাবিকে দেখলাম রেগে আছে। আপনিও নেই। ভাবি কি আপনাকে কিছু বলেছে?

মিথিলা চুপ করেই রইলো। একটু পর বললো, তিন্নি কেমন আছে? কি করছে?
তিন্নি ভালও আছে। ভাবির সাথে আছে।
ও।
আসলে আমি আপনার কাছে ভাবির পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইছি। আপনি কাল আসবেন। আচ্ছা মন ভালও হলেই আসবেন। মন ভালও না হলে আসার দরকার নেই।
একটি কথা বলবো শফিক সাহেব?
হ্যাঁ বলুন?
কেবল আমি না, অন্য যেকোন মেয়েই যদি তিন্নির কাছে থাকতে যায় তাকেই আপনার ভাবি এক কথাই বলবে। তাই আপনিই তিন্নিকে দেখে রাখুন।
বলে সে লাইনটা কেটে দিল।




মিথিলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। আজ আকাশে চাঁদ ধুরে থাক, তারার দেখাও নেই। মিথিলার যেদিন এমন কোন ঘটনা ঘটে যাতে সে কষ্ট পায় সেদিন রাতে আকাশে চাঁদ থাকে না। চাঁদের পাশে তারা না দেখতে পেলে মিথিলার মন খারাপ হয়। আজ মিথিলার মন খারাপ।

মাঝেমাঝে মিথিলার তারা হতে ইচ্ছা করে। মানুষ মরলে নাকি তারা হয়। এজন্য তার মাঝেমাঝে তারা হতে ইচ্ছা করে। আকাশের তারারা কি মানুষের মতো ভাবতে পারে?

মিথিলার ঘোর ফিরলো ভিতরের ঘরে বাবার আওয়াজ এ। সাথে আর একটি লোকের কন্ঠস্বর। লোকটি কে?

লোকটির নাম জহির।
মিথিলার বাবা বললো, দ্যাখ মা কে এসেছে! জহির!

মিথিলা জহিরকে এর আগেও দুবার দেখেছে। একবার দেখেছে বইয়ের দোকানে। বাবার সাথে বই কেনার সময় অপরিচিত এক ছেলে এসে সালাম দিয়ে বসলো। মিথিলার বাবা প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে পড়ায় চিৎকার দিয়ে বললো, তুমি নজরুলের ছেলে না?

মিথিলার সাথে জহিরের সেদিনই প্রথম পরিচয়।

মিথিলার বাবা ওদের দুজনকে রেখে ভিতরের ঘরে চলে গেল।
জহির বললো, কেমন আছেন?
ভাল।
আপনার চেহারা দেখে সেটা মনে হচ্ছে না।
মিথিলা বিরক্ত হলো। বললো, কি মনে হচ্ছে?
মনে হচ্ছে আপনার মন খারাপ।
শুনুন? আমার মন আসলেই খারাপ। আপনাকে দেখে আমার মেজাজও খারাপ হয়ে গেছে।
কেন?
আগে বলুন আপনি নিজে থেকে এসেছেন নাকি বাবা আসতে বলেছে?
আপনার বাবা।
আপনি জানেন কেন?
হ্যাঁ জানি। আপনার আমার বিয়ের একটা কথা চলছে।
আপনার কি মত?
জহির হাসলো। বললো, আমার মত আমার কাছেই থাকুক। যদি একান্তভাবে জানতে চান তবে বলি, হ্যাঁ। আপনাকে আমার ভাল লাগে।
শুনুন?
আপনি বলুন। আমি শুনছি।
আমি অন্য কাউকে ভালবাসি। সে নিজেও জানে না আমি যে তাকে ভালবাসি। তবে আশার কথা হলো সেও আমাকে ভালবাসে। আপনি কি আরো কিছু শুনবেন?
হ্যাঁ। আপনার পরিবার কি একথা জানে?
অবশ্যই না! যাকে নিয়ে ঘটনা তাকেই তো বলিনি।

জহির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
আমি কি আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারি?
মনে হয় লাগবে না।
কেন যেন জহিরের খুব হাসি পেল। সে হেসেই ফেললো।
মিথিলা বললো, হাসছেন যে?
না এমনি।
আপনার হাসিটা খুব সুন্দর। কোন পুরুষের হাসি এতো সুন্দর হয় জানতাম না।
জহির বললো, রাতের খাবার কি এখানে খেতে পারি? আপনার বাবা আমাকে দাওয়াত করেছেন।
অবশ্যই।

মিথিলা কথাগুলো সরাসরি বলতে পেরে খুব শান্তি অনুভব করলো।
শুনুন জহির সাহেব, আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে। আমি ভেতরে যাই?
আচ্ছা।

মিথিলা ঘরে চলে এল। লাইট বন্ধ করল। হালকা শীত লাগছে। বোধহয় জ্বর আসবে। মাথা ব্যাথাও শুরু হয়েছে। প্রচন্ড যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমানো যায়না। সে জেগে রইল। বাইরের ঘরে তাঁর বাবা জহিরের সাথে আলাপ ক্রছে। রাজনীতির আলাপ। এবারের সরকার হচ্ছে একেবারে ছাগলা সরকার। দুর্নিতিতে দেশ ভর্তি। সরকার কিচ্ছু করছেনা। আর করবেই বা কি করে? নিজেরাই তো আসলে চোর।
একসময় মিথিলা ঘুমিয়ে পরল। সে স্বপ্নে দেখল সে তারা হ্যে গেছে। তাঁর পাশে আরেকটি তারা। মিথিলার মনে হলে সেই তারাটি নীরব। সে নীরবকে ডাকলো। এই নীরব, এই! নীরব উত্তর দিল না।
মিথিলা বললো, তারা হয়ে ভাব বেড়ে গেছে? কথা বল। অ্যাই শোন, তোমার দেয়া ব্রেসলেট আমি পেয়েছি। তারা হয়ে বিপদে পরে গেছি। মানুষ হলে পড়ে দেখাতে পারতাম। আর তুমি এত দূরে কেন?
নীরব নামের তারাটি চুপ থাকে।
রাগ করেছ?
একসময় দুটো তারা কোন এক শক্তিতে দূরে যেতে শুরু করল। মিথিলা চিৎকার করে বলল, নীরব? নীরব?


মিথিলার ঘুম ভাঙল প্রদিন সকাল এগারোটায়। তাঁর খুব জ্বর। মাথার চুল ভেজা। বোধহয় কেও মাথায় পানি দিয়েছে। চোখ খুলে মিথিলা দেখল তাঁর পাশের চেয়ারে স্যুট পড়ে রফিক সাহেব বসা।
কেমন আছেন এখন?
জি, ভাল। আপনি এখানে?
রফিক সাহেব উত্তর দেবার আগে শারমিন ঘরে এসে ঢুকল। হাতে ট্রে। নাস্তা ভর্তি।
রফিক সাহেব বললেন, জ্বর কত?
শারমিন বলল, আধঘণ্টা আগে মেপেছি। একশ দুই ছিল।
রফিক সাহেব বললেন, আমার স্ত্রীর ব্যাবহারে আমি লজ্জিত। শুনলাম আপনাকে বাজে কথা বলেছে। তাই ক্ষমা চাইতে এসেছি। তিন্নি সকাল থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। একবার গাড়ি এসে ফেরত গেছে। তখন জানতে পারলাম আপনার জ্বর। নিজের কাছে কেমন যেন লাগল হঠাৎ। তাই ভাবলাম একবার দেখা করে যাই।
প্রথমে রাগ লেগেছিল। এখন ভুলে গেছি। তিন্নির মায়ের সমস্যা যেহেতু তাই সেটা আর মাথায় রাখিনি।
তিন্নি জানে না যে, আপনার জ্বর। জানলে চলে আসতো।
মিথিলা বলল, তিন্নির মাকে কোন সাইক্রিয়াটিস্ট দেখিয়েছেন?
হ্যাঁ। কিন্তু ওর মায়ের সন্দেহ গুলো খুব প্রবল। তাই আর একসাথে থাকা সম্ভব হয় নি।
আপনাদের মেয়ের কথা চিন্তা করে যদি...
রফিক সাহেব বললেন, এখন এসব কথা থাক। আর কাল রাতে সাহানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তিন্নিকে তাঁর কাছে রাখবে। তিন্নিও রাজি হয়েছে।
সত্যি?
হ্যাঁ।
তিন্নি রাজি হয়েছে?
হুম।
আপনি কিছু বলেননি?
আমি কি বলবো?
মিথিলা কিছু বলল না।
রফিক সাহেব বললেন, আগামি বৃহস্পতিবার তিন্নি ওর মায়ের কাছে চলে যাবে। আপনি সুস্থ হতে পারলে একবার দেখে আসবেন। মেয়েটা খুশি হবে।
আচ্ছা।
আপনার বাবা তো রিটায়ার্ড। না?
হ্যাঁ।
আপনাকে একটা প্রপোজাল করব?
কি?
আমার অফিসে একটা পোস্টে আপনি কাজ করতে পারেন। আপনার ইচ্ছা।
মিথিলা চুপ করে রইল?
রফিক সাহেব উঠলেন, আমি আসি।






মিথিলার বাবা আফজাল হোসেন তাঁর ছোট মেয়ে শারমিনকে বলছেন, কি করিস?
কিছু না।
ভাত খেয়ে যা।
খাব না।
কেন?
এমনি।
খেয়ে যা।
কি রান্না করেছে আজ?
জানি না।
আপুকে খাওয়াও। তাঁর শরীর খারাপ।

মিথিলা ঘরে ঢুকল। দাঁড়ালে আগে মাথা ঘুরত, এখন কমেছে।
আফজাল হোসেন বললেন, উঠে এলি কেন?
তোমাদের সাথে গল্প করতে। একা একা ভাল লাগে না।
শারমিন বলল, আমরা গল্প করছি না আপু। ঝগড়া করছি। ঝগড়া করবি?
মিথিলা হাসলো। বলল, হ্যাঁ করব।
ঝগড়া করতে কোন টপিক লাগে। টপিক কি?
আজ কি রান্না হয়েছে সেটা শুনলেই তোর মাথা গরম হ্যে যাবে।
কি রান্না হয়েছে?
চার ধরনের শাক।
শাক?
হুম।
আপু তোরা কেও জানিস না আমি শাক খাই না।
মিথিলা হাসছে। বলল, দেখলি? বলেছিলাম না?
শারমিন মুখ ভোঁতা করে আছে।
আফজাল হোসেন বললেন, শাক খেতে অসুবিধা কি?
শারমিন বলল, শাক হচ্ছে পাতা। পাতা ছাগলের খাবার। আমার না।
তাহলে ছোলাও তো ঘোড়ার খাবার। তোর প্রিয় খাবার। তুই তো ঘোটকী।


শারমিন উঠে চলে গেল। মিথিলা বললো, চলে যাচ্ছিস কেন?
ঝগড়া করতে ভাল লাগছে না।

মিথিলা আজ তিন্নিদের বাড়িতে যাবার আগে কাটাবন গেল। সেখান থেকে একটি ময়না পাখি কিনলো। সে একদিন তিন্নিকে একটি পাখি দেখাবার কথা দিয়েছিল । তবে সমস্যা হলো পাখিটি কথা বলতে পারে না।

তিন্নি পাখিটা দেখে খুব খুশি হলো। তিন্নি বললো, আচ্ছা পাখিটা কথা বলছে না কেন?
পাখিটা তোমাকে দেখছে। তুমি এত সুন্দর একটা মেয়ে!
তিন্নি লজ্জা পেয়ে গেল। বললো, আমার কি ইচ্ছা করছে জানো?
কি?
পাখিটা ছেড়ে দেই?
মিথিলা হাসলো। বললো, আচ্ছা!

তিন্নি পাখিটা ছেড়ে দিল। ছাড়া পেয়ে পাখিটা আকাশের দিকে ছুটতে শুরু করলো। মিথিলা তিন্নিকে জড়িয়ে ধরে হাসছে। আজ তার অনেক হাসতে ইচ্ছা করছে।



মিথিলা বসে আছে নীরবের মেসে। নীরব একটু আগে বাইরে থেকে এসেছে। ভাগ্যিস আগে আসতে পেরেছে। তা না হলে মিথিলাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।

মিথিলা নীরবতা ভেঙ্গে বললো, আপনার সাথে আমার কিছু কাজ আছে। আমার মায়ের জন্য তো অনেক কাজই করেন।আজ আমার জন্য করবেন?
কি কাজ?
আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবেন। পারবেন না?
পারবো। কোথায়?
আমি বিয়ে করবো। কাজী অফিসে যাবেন।
নীরবের ইচ্ছা হলো বলতে, পারবো না। কিন্তু বলতে পারলো না।
সাক্ষী থাকতে হবে?

মিথিলার ইচ্ছা হলো নীরবের মাথায় একটা গাট্টা মারতে। রাগ আটকে বললো, হ্যাঁ।

নীরন ফ্যালফ্যাল করে মিথিলার দিকে তাকিয়ে রইলো।
ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন? একদিন না বলেছি বিশ্রী লাগে? আপনি জানেন অন্য মানুষের হাসি কত সুন্দর? রাজপুত্রের মতো লাগে একজনকে হাসলে।

নীরব চোখ নামিয়ে ফেললো।

মিথিলা বললো, আপনার শরীরে তো ঘামের গন্ধ। শার্টটা পাল্টে নিন। আর শুনুন? নীল রঙের শার্ট আছে?

কেন?
মিথিলার মেজাজটা সত্যিই খারাপ হল।
আমি নীল রঙের শাড়ি পরেছি তাই। আমি লাল পড়লে আপনিও লাল পড়বেন, আমি সবুজ পড়লে আপনিও সবুজ পড়বেন।
নীল রঙের শার্ট নেই।
সমস্যা নেই। আগে কিনবো। তারপর।
ছেলেটা কে?
ছেলে যে-ই হোক না কেন, তাতে আপনার কি?
না। কিছুই না। আপনার বাবা মা জানেন?
না। কারন তাদের জামাই হলো অপদার্থ জামাই। এক কথায়
ছাগলা মার্কা।
ও।

নীরব আর মিথিলা রাস্তায় বের হলো। নীরব বললো, ছেলেটার নাম কি?
নাম নাই।
ও।
ছেলেটা দেয়া একটা উপহার না দেখালে শান্তি পাচ্ছি না। দেখবেন?
দেখান।

মিথিলা ব্যাগ থেকে একটি ব্রেসলেট বের করলো। নীরবের চোখ বড় হয়ে গেছে। তার চোখে বিস্ময়।
মিথিলা ধমক দিল। বললো, এভাবে দেখছেন কেন? আমাকে বিয়ে করবেন না? চোখ নিচু করেন। দেখতে ভালও লাগে না একদম।

নীরব তাও চোখ নামাচ্ছে না। তাঁর চোখে বিস্ময়। মিথিলা বললো, নীল রঙের শার্ট কিনবো। চলো!! রাস্তা পার হবো। এই আমার হাত ধরে পার করো তো। একা একা পার হতে ভয় লাগছে।

নীরব মিথিলার হাত ধরলো।

মিথিলা ঠিক করেছে তার চাকরিটা সে নীরবকে দেবে। জহির আর শফিককে খবর দেয়া হয়েছে। তারা সাক্ষী থাকবে।

রাস্তা পার হবার সময় দুজনেরই মনে হলো বৃষ্টি পড়ছে।
নীরব বললো, এই সময়ে বৃষ্টি এল কিভাবে?
মিথিলা হেসে বললো, আরে বুদ্ধু! এটা বৃষ্টি না। উপর থেকে ট্যাংকের পানি পড়ছে!
হঠাৎ করে একটি গাড়ি সামনে আসার ফলে নীরব মিথিলার হাত ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে সরে গেল। মিথিলার খুব রাগ হলো। কি স্বার্থপর! ওমা, নীরব দেখি ফিরে আসছে।

নীরব বললো, মিথিলা?
কি?
তোমায় ভালবাসি মিথিলা!
মিথিলা কথা বলছে না। হঠাত বললো, এই গান জানো?
না। পারি না।
না পারলেও গাও। এক্ষুনি।
সবাই হাসবে। আমার গলায় সুর হয় না।
না হোক। আমি বলেছি,তাই তুমি গাইবে। সুরের দরকার আছে?
না।
তো গাও।

নীরব গান গাইছে।
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা,
মনে মনে মেলে দিলেম গানের সুরের এই ডানা।

নীরবের গানের গলা তো খুবই খারাপ! তবু ভালবাসা সময়কে আনন্দ দিয়ে আঁকড়ে নিয়েছে। মিথিলার মনে হলো এই সময়ে গানটা খারাপ লাগছে না। প্রিয় মানুষের কন্ঠে গান শোনার থেকে মধুর জিনিস আর কিছু কি আছে? নেই!



yeasir yunus
15-4-2013

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.