নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বেঁচে থাকলে বড় হবো....

চারাগাছ

চারাগাছ একদিন ডালপালা ছড়াবে.....

চারাগাছ › বিস্তারিত পোস্টঃ

যে শিশুটির কোনো নাম ছিল না

০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪৫



যে শিশুটির কোনো নাম ছিল না


হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ডরুমে আগুন লাগেনি কোনোদিন। তবু একটা ফাইলের কাগজ প্রতি বছর একটু একটু করে হলুদ হয়ে যাচ্ছিল।
ফাইলের ওপর লেখা ছিল—
কেস নং ১৭৩।
নাম নেই।
বয়স নেই।
ঠিকানা নেই।
শুধু একটা তারিখ।
আর নিচে ডাক্তারের ছোট্ট হাতের লেখা— “Unclaimed.”
রেকর্ডরুমের দায়িত্বে থাকা বৃদ্ধ লোকটা জানত না, ফাইলটা এত বছর ধরে কেন রাখা হয়েছে। একদিন নতুন ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
— এটা কার ফাইল?
বৃদ্ধ লোকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল,
— জানি না স্যার। অনেক পুরোনো।
— ফেলে দেননি কেন?
লোকটা একটু হেসেছিল।
— কিছু জিনিস ফেলে দিতে নেই।
ডাক্তার আর প্রশ্ন করেননি।

পনেরো বছর পর। সেই হাসপাতালের সামনের রাস্তায় প্রায় প্রতিদিন বিকেলে একজন নারী দাঁড়িয়ে থাকত। তার নাম মায়া। সে হাসপাতালে কাজ করত না, কারও রোগীও ছিল না। তবুও প্রায় প্রতিদিন এসে হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত।
একদিন নিরাপত্তারক্ষী জিজ্ঞেস করল,
— আপা, কাউরে দেখতে আসছেন?
মায়া মাথা নাড়ল।
— না।
— তাহলে?
মায়া একটু হেসে বলল,
— কাউকে দেখতে আসিনি।
তারপর হাসপাতালের জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। কেউ জানত না, পনেরো বছর আগে এই হাসপাতালের তৃতীয় তলার একটি ঘরে সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সিদ্ধান্তটা সে একা নেয়নি। তার প্রেমিক ছিল, তার পরিবার ছিল, সমাজ ছিল, ভয় ছিল, অনেকগুলো মানুষের কথা ছিল। শুধু যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার কোনো কথা ছিল না।
সেদিনের পর মায়া আর কখনো সেই ঘরে ফিরে যায়নি। তবুও কিছু জায়গা মানুষ ছেড়ে এলেও জায়গাগুলো মানুষকে ছাড়ে না।

আরেক শহরে তখন রুবিনা নামের একজন নারী তার সাত বছরের মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা হঠাৎ মায়ের হাত ছেড়ে দৌড়ে একটা খেলনার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— মা, এটা কিনে দাও।
ছোট্ট একটা কাপড়ের পুতুল।
রুবিনা পুতুলটা হাতে নিয়ে হাসল।
— তোমার তো পুতুল আছে।
— এটা আমার বাচ্চা হবে।
রুবিনা হেসে ফেলল। তারপর আচমকা হাসিটা থেমে গেল।
কারণ তার মনে পড়ে গেল— কয়েক বছর আগে, এই মেয়েটার জন্মের আগেও আরেকটা সন্তান এসেছিল। সেই সময় তাদের ঘরে টাকা ছিল না। স্বামী চাকরি হারিয়েছিল। বাড়িভাড়া বাকি ছিল। তাদের সামনে ভবিষ্যৎ বলতে শুধু একটা অন্ধকার ঘর। তারা তখন বলেছিল— “এখন না।”
কী আশ্চর্য! জীবনে কিছু সিদ্ধান্তের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শব্দ হয়— “এখন না।” কারণ “এখন না” কখনো কখনো চিরকালের হয়ে যায়।
রুবিনা পুতুলটা কিনে দিল। মেয়েটা খুশিতে মাকে জড়িয়ে ধরল। রুবিনা চোখ নামিয়ে ফেলল। সে চায়নি মেয়েটা তার চোখের পানি দেখুক।
কিছু স্মৃতি কাউকে বলা যায় না। কারণ সেগুলোর কোনো ভাষা নেই।

ডাঃ সাবিহা তখন রাতের ডিউটিতে। হাসপাতাল প্রায় নিস্তব্ধ। একজন নার্স এসে বলল,
— ম্যাডাম, রেকর্ডরুমের পুরোনো ফাইলগুলো ডিজিটাল করা হচ্ছে।
— ভালো।
— একটা অদ্ভুত ফাইল পেয়েছি।
ডাক্তার তাকালেন।
— কী?
নার্স ফাইলটা এগিয়ে দিল। কেস নং ১৭৩।
ডাঃ সাবিহা ফাইল খুললেন। প্রথম পাতায় কিছু নেই। দ্বিতীয় পাতায়ও না। শেষ পাতায় শুধু একটি বাক্য— “মায়ের পরিচয় জানা যায়নি।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
— ফাইলটা আমার কাছে রেখে যাও।
রাত তিনটার দিকে তিনি আবার ফাইলটা খুললেন। ভেতরে একটা ছোট্ট কাগজ ছিল। হাতের লেখা খুব পুরোনো। সম্ভবত কোনো নার্স লিখেছিল—
“মা অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। যাওয়ার আগে শিশুটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।”

আর কিছু নেই।
ডাঃ সাবিহা কাগজটা হাতে নিয়ে বসে রইলেন। তিনি জানতেন না কেন তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে। হয়তো কারণ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে জন্মের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে তিনি বুঝেছেন— সব সন্তান পৃথিবীতে আসে না। কেউ কেউ শুধু মানুষের জীবনে একটা ফাঁকা জায়গা হয়ে আসে। এমন ফাঁকা জায়গা, যার কোনো নাম নেই। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটার আকার যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পরদিন সকালে মায়া হাসপাতালে ঢুকল। অনেক বছর পর। রিসেপশনে দাঁড়িয়ে বলল,
— আমি একটা পুরোনো রিপোর্ট নিতে এসেছি।
রিসেপশনিস্ট নাম জানতে চাইল। মায়া নাম বলল। কম্পিউটারে খুঁজে কিছু পাওয়া গেল না।
— কত সালের?
মায়া সালটা বলল। রিসেপশনিস্ট পুরোনো রেকর্ডরুমে ফোন করল। কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
— “কেস নং ১৭৩।”
মায়ার মুখ সাদা হয়ে গেল। সে কিছু বলল না। শুধু চেয়ারটায় বসে পড়ল।
ডাঃ সাবিহা দূর থেকে তাকে দেখছিলেন। হঠাৎ বুঝলেন— পনেরো বছর আগে যে নারী চলে গিয়েছিল, সে-ই আজ ফিরে এসেছে। কেন? কেউ জানে না। মায়াও জানে না। সে শুধু বলল,
— ডাক্তার, একটা কথা জানতে চাই।
— বলুন।
— ওটা ছেলে ছিল, না মেয়ে?
ডাঃ সাবিহা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন,
— রিপোর্টে লেখা নেই।
মায়া মাথা নিচু করল। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— নামও তো রাখিনি।
ডাক্তার কিছু বললেন না।
মায়া উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
— ডাক্তার...
— হ্যাঁ?
— এত বছর পরেও কি... তাকে মনে রাখা যায়?
ডাঃ সাবিহা জানালার বাইরে তাকালেন। সকালের আলো তখন হাসপাতালের সাদা দেয়ালে এসে পড়েছে। তিনি বললেন,
— যার কোনো নাম রাখা হয়নি, তাকে মনে রাখার জন্য নাম লাগে না।
মায়া বেরিয়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় ডাঃ সাবিহা কেস নং ১৭৩-এর ফাইলটা বন্ধ করলেন। ফাইলের ওপর নতুন করে লিখলেন— “নামহীন।”
তারপর একটু ভেবে কলম থামালেন। “নামহীন” কথাটার নিচে খুব ছোট করে লিখলেন— “কিন্তু বিস্মৃত নয়।”
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হাসপাতালের করিডোরে এক নবজাতকের কান্না ভেসে আসছে। ডাঃ সাবিহা কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সেই কান্না শুনলেন। তারপর ঘড়ির দিকে তাকালেন। ৩টা ২৭।

তিনি জানতেন, রাতের হাসপাতাল অদ্ভুত সব শব্দ তৈরি করে। বৃষ্টির শব্দ। দূরের কোনো যন্ত্রের শব্দ। করিডোরে পায়ের শব্দ। কখনো নিজের হৃদস্পন্দনও। তবু সেদিন তিনি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কারণ কিছু সময় ক্যালেন্ডারের নয়। কিছু সময় মানুষের ভেতরে আটকে থাকে।

পনেরো বছর আগে যে সিদ্ধান্তের কোনো নাম ছিল না, তারও হয়তো কোনো শব্দ ছিল না। শুধু ছিল একটি অনুপস্থিতি। একটি না-আসা মানুষ। একটি অসমাপ্ত সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনার জন্য কারও বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা এক অদৃশ্য ডাক। কেউ শুনতে পায় না। তবু কেউ কেউ সারাজীবন শুনতে থাকে।
বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে নামল। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গেল। ৩টা ২৮।

এক মিনিট কেটে গেল।
এই এক মিনিটে—
হয়তো পৃথিবীর কোথাও তখন কোনো মা ঘুম ভেঙে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
হয়তো কোনো পুরোনো কথা মনে পড়েছিল।
হয়তো না।
কারণ সব স্মৃতিরও তো প্রমাণ থাকে না।
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসার আগেই আমাদের জীবনের অংশ হয়ে যায়।
তাদের ছবি থাকে না।
জন্মদিন থাকে না।
কখনো নামও থাকে না।
শুধু জীবনের কোথাও একটি ছোট্ট জায়গা খালি থেকে যায়।
বছর যায়।
মানুষ বড় হয়।
সংসার হয়।
নতুন সন্তান আসে।
তবু সেই জায়গাটা পুরোপুরি ভরে না।
কেউ তাকে দেখে না।
কেউ তার কথা জানে না।
শুধু যে মানুষটি সেই শূন্যতাটা বহন করে, সে জানে—
কেউ একজন ছিল।
নামহীন।
ছবিহীন।
জন্মদিনহীন।
এপিটাফহীন।
তবু—
বিস্মৃত নয়।
বরং—
ভীষণভাবে মনে থাকা।


** জীবনে অনেক নস্টালজিক লেখা ভাবতে গিয়ে লিখতে গিয়ে চোখ ঝাপসা হয়েছে। এই প্রথম নিজের ঘরানার বাইরে কিছু লিখতে গিয়ে চোখটা ঝাপসা হচ্ছে। কারণ অজানা।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৫১

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: জীবনে অনেক নস্টালজিক লেখা ভাবতে গিয়ে লিখতে গিয়ে চোখ ঝাপসা হয়েছে।
.............................................................................................................
পৃথিবীতে এমন কোন দেশ আছে যার কোন নাম নেই ?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.