নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

২০২৬ সালে আবারও দেখা মিলল ‘রাবেয়া’র ..।

২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


তানভীর মোকাম্মেল। স্বনামধন্য পরিচালক হিসেবে যাঁর দেশজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। তিনি কতগুলো ছবি নির্মাণ করেছেন, আমার জানা নেই। তানভীর সাহেবের কয়টা ছবি দেখেছি, সেটাও মনে নেই। তবে একটা ছবির কথা আজ বিশেষ একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে পড়ে গেল। ছবিটির নাম ছিল ‘রাবেয়া’।

২০০৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ছবিটি নির্মাণ করা হয়েছিল। গল্পের সময় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। খুলনার রূপসা নদীর তীরে ইব্রাহীমপুর নামের একটি গ্রাম। সেই গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি এমদাদ কাজী। তিনি মুসলিম লীগপন্থী এবং স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করে নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ধরে রাখতে চান।

এমদাদ কাজীর বাড়িতে থাকে দুই এতিম বোন, রাবেয়া ও রোকেয়া। তাদের ভাই খালেদ একজন কলেজছাত্র। সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। এমদাদ কাজী চান, নিজের ছেলে তরিকুলের সঙ্গে রাবেয়ার বিয়ে দিতে। কিন্তু রাবেয়া তার ভাই ও প্রয়াত বাবার প্রগতিশীল চিন্তাধারায় প্রভাবিত।

একদিন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা অভিযানে খালেদ নিহত হয়। এরপরই শুরু হয় সিনেমার মূল সংঘাত। পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ও এমদাদ কাজী সিদ্ধান্ত নেন, খালেদের লাশ দাফন করতে দেওয়া হবে না। লাশ নদীর পাড়ে ফেলে রাখা হবে, যাতে গ্রামের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিণতি দেখে ভয় পায়। রাজাকারদের দায়িত্ব দেওয়া হয় লাশ পাহারা দেওয়ার।

কিন্তু রাবেয়া নিজের ভাইয়ের মৃতদেহের এই অপমান মেনে নিতে পারে না। সে যেভাবেই হোক ভাইকে কবর দিতে চায়। কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর এক রাতে একাই ভাইয়ের লাশ দাফন করতে যায়। কিন্তু রাজাকারদের গুলিতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। রাবেয়ার মৃত্যুতে গ্রামের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এতদিন যারা পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের ভয়ে চুপ করে ছিল, তারাও প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামে বিজয় অর্জন করেন।

‘রাবেয়া’ তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। ছবিটির কাহিনি গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের বিখ্যাত নাটক ‘অ্যান্টিগোনি’র ছায়া অবলম্বনে নির্মিত। এতদিন ছবিটিকে চলচ্চিত্রের গল্প হিসেবেই দেখেছি। ২০০৮ সালে পর্দায় দেখা সেই কাহিনি যে ১৮ বছর পর বাংলাদেশের একটি বাস্তব ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেবে, তা ভাবিনি।

গত ২৪ অক্টোবর মারা যান মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একই সঙ্গে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে পিরোজপুরে নিয়ে আসা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, নিজ এলাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হবে। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা সত্যিই দুঃখজনক।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তাঁর গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হলেও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পরে বিকেল ৫ টার দিকে পুলিশ লাইন্সের ভেতরে গোপনে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

পরিবারের অভিযোগ, মরদেহ নিয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও দাফনের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট আশ্বাস পাওয়া যায়নি। ফলে একজন মৃত মানুষকে শেষ বিদায় জানাতেও তাঁর পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।

পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, মানিক পশারী একজন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’। তাঁকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তাঁর লাশ দাফন করতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে।

খবরটি পড়ার পর আবারও ‘রাবেয়া’ চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়ে গেল। সিনেমায় একজন মুক্তিযোদ্ধার লাশ দাফন করতে দেওয়া হয়নি। আর ২০২৬ সালে এসে স্বাধীন বাংলাদেশে একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠল। দুটি ঘটনার সময় ও প্রেক্ষাপট আলাদা। কিন্তু মৃত মানুষের প্রতি এমন আচরণের কথা ভাবলে মিলটুকু উপেক্ষা করা কঠিন।

একজন মানুষকে কবর দেওয়া যে কতটা কঠিন কাজ , তা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানি। আমার নানুকে কবর দেওয়ার সময় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। কাছের একজন মানুষকে হারানোর পর পরিবারের মানুষ চায়, অন্তত শেষ বিদায়টুকু যেন সম্মানের সঙ্গে জানাতে পারে। সেই সময় পরিবারের সদস্যদের কতটা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা বলে বোঝানো কঠিন। সেখানে তিনজন নারীর পক্ষে নিজের হাতে কবর খোঁড়া কতটা কষ্টের, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

মানিক পশারী তো একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, তাঁর পরিবারের প্রতি ন্যূনতম মানবিক আচরণটুকু কি করা যেত না? একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তাঁর দাফন নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করার কী দরকার ছিল? রাজনৈতিক বিরোধ কি মানুষের মৃত্যুর পরও শেষ হতে পারে না?

পরিচালক হয়তো এমন কোনো ঘটনার কথা কল্পনাও করেননি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অমানবিক আচরণের যে চিত্র তাঁর ছবিতে দেখা গিয়েছিল, বর্তমানের এই ঘটনা তার সঙ্গে অস্বস্তিকর এক মিল তৈরি করেছে। পরিচালক কি তাহলে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন ?

আমার কাছে আরও বিস্ময়কর লাগে অন্য একটা বিষয়। গত ১৭ বছর যারা নিজেদের নিপীড়িত হওয়ার ঢোল পিটিয়েছে ,আজ তাদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অবস্থান বদলানোর সাথে সাথেই এদের মুখোশ খসে পড়া শুরু করেছে । আসলে যার হয় না নয় বছরে, তার হয় না নব্বই বছরেও।

মানুষ যদি নিজের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, তাহলে শুধু সময় বদলালেই তার মানসিকতা বদলায় না। এরা বারবার ভুলে যায়, এই দিনই শেষ দিন নয়, সামনে আরও দিন আছে। আজ যারা ক্ষমতা বা প্রভাবের জোরে অন্যের প্রতি অন্যায় করছে, কাল তারা পালাবার পথ খুঁজে পাবে না ।

সাঈদীর মামলার বাদীর লাশ দাফনে বাধা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়েছিল মুক্তিযোদ্ধার লাশ- বাংলা ট্রিবিউন

সাঈদীর মামলার বাদি মানিক পাশারির দাফনে বাধা, দ্বিতীয় বার কবর খোঁড়ার কাজ করছেন তার মেয়ে ও বোন- দৈনিক ইনকিলাব

রাবেয়া : Click This Link
ফটোকার্ড ক্রেডিট : বাংলা ট্রিবিউন




মন্তব্য ৩ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৫৩

মাথা পাগলা বলেছেন: দাফনে বাধা দেয়া কালপ্রিটদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন? দেশে কি আইন-কানুন নাই?

২| ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৪৩

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: জামাত নেতারা বলছেন তিনি নাকি ভূয়া মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন ।

৩| ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৪:৩২

মাথা পাগলা বলেছেন:

নতুন আপডেট


মধ্যরাতে মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর কবর খুঁড়ছে তাঁর মেয়ে ও বোন। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিদারুণ নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হলো গোটা বাংলাদেশ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.