| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একটা মাস হয়ে গেল।
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছে রিপা। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, নার্সরা ডিউটি বদলাচ্ছে, ডাক্তাররা আসছেন, যাচ্ছেন। শুধু একটা জিনিস বদলাচ্ছে না, কাঁচের ওপাশে শুয়ে থাকা মানুষটা আবুল হাসান সাহেব।
আমি প্রথম দিন থেকেই প্রতিদিন হাসপাতালে আসছি। রিপা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবী, রীপার একমাত্র ভাই অপু কানাডা থাকে, এরকম বিপদের সময় একজন ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করতেই এখানে আসতে হচ্ছে রোজ।
এই এক মাসে মেয়েটাকে যেন দশ বছর বয়স্ক মনে হচ্ছে, চোখের নিচে কালি, চুলগুলো এলোমেলো, ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে অথচ কেউ কাউকে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না।
সেদিন বিকেলে করিডোরের এক কোণে বসে ও হঠাৎ বলল,
- আচ্ছা রিংকু, মানুষ এতদিন ধরে কি করে ঘুমিয়ে থাকতে পারে বলতো?
আমি উত্তর দিতে পারলাম না,
- ডাক্তাররা বলে, আব্বু শুনতে পান কি না, নিশ্চিত না। কিন্তু আমি প্রতিদিন ভিজিটিং আওয়ারে আব্বুকে কত কথা বলি। যদি শোনে,
আমি রিপার কথা শুনে চুপ করে রইলাম।
কাঁচের ভেতরে তাকিয়ে দেখি, আবুল হাসান সাহেবের বুকটা ওঠানামা করছে না; যন্ত্রটা করছে। নাক মুখে নল, বুকজুড়ে তার, মনিটরের সবুজ রেখাটা মাঝে মাঝে উঠছে, আবার নেমে যাচ্ছে।
একসময় এই মানুষটাকে আমি কত অন্যরকম দেখেছি কত উচ্ছল আনন্দ আর ছেলেমানুষীতে ভরপুর একটা মানুষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কতবার রিপাদের বাসায় গিয়েছি। নকল গম্ভীর হয়ে কড়া চোখে তাকিয়ে বলতেন,
আগে পড়াশোনা পরে আড্ডা।
আমরা ভয় পেতাম। কিন্তু শেষের দিকে সেই আমাদের সাথে গল্পে মেতে উঠতেন।
রিপা আস্তে করে বলল,
- ডাক্তার আজ আবার একই কথা বলেছে।
- কী?
- বলেছে যদি আর উন্নতি না হয়; তাহলে....
ও বাকিটুকু বলতে পারল না।
রিপা তখন মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বসেছিল; ওর মা তাহমিনা খাতুনের ঠোঁট নড়ছে, বুঝলাম, দোয়া পড়ছেন। গত এক মাসে তাঁকে তেমন কিছু বলতে শুনিনি শুধু একটা কথাই বারবার বলেন,
- আল্লাহ, মানুষটা অনেক কষ্ট করছে। যদি বাঁচিয়ে রাখেন, সুস্থ করে দিন, আর যদি নিয়ে যান, উনার কষ্ট কমিয়ে দিন হে আল্লাহ।
করিডোরটা অদ্ভুত নীরব হয়ে গেল, ঠিক তখনই আইসিইউর দরজা খুলে একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
- আপনারা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন। আমরা গত এক মাস অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু তার কোন উন্নতি হচ্ছে না, আপনাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে ভেন্টিলেটর খুলে দেওয়ার ব্যাপারে; আসলে হসপিটালে তো আরো রোগী আছে তাদেরকেও তো সুযোগ দিতে হবে নাকি?
রিপার মুখ ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গেল, রিপার ছোট ভাই অপু পরিবারের একমাত্র ছেলে। চার বছর হলো কানাডা গিয়েছে উচ্চশিক্ষার জন্য। একমাত্র ছেলেকে কানাডা পাঠিয়েছিলেন আবুল হাসান সাহেব; বলেছিলেন
- জীবনে অনেক এগিয়ে যা অপু, আমি তোর পাশে আছি বাবা।
আজ সেই মানুষটাই যন্ত্রের ওপর ভর করে বেঁচে আছেন।
সিদ্ধান্ত হলো, আর কটা দিন যেন সময় দেয়া হয়, অপু দেশে আসুক তারপর যন্ত্রটা খুলে ফেলবে কিনা; যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার, সবাই মিলে নেওয়া হবে।
তিন দিন পরে গভীর রাতে বিমানবন্দর থেকে সোজা হাসপাতালে এলো অপু; একটা লাগেজ পর্যন্ত সাথে আনেনি। এতদিন অপুকে জানানো হয়েছিল যে ওর বাবা অসুস্থ কিন্তু লাইফ সাপোর্টে আছে সেটা জানানো হয়নি।
সাততলার করিডোর ধরে যখন ছেলেটা দৌড়ে আসছিল, তখন মনে হচ্ছিল, গত এক মাসের সমস্ত অপেক্ষা যেন তার পায়ের শব্দ হয়ে এগিয়ে আসছে, এসেই মাকে জড়িয়ে ধরে অপু বলল,
- আব্বু কোথায়?
কেউ উত্তর দিল না।
সবাই কেবল কাঁচের দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে অপু ধীরে ধীরে সিসিইউর ভেতরে ঢুকল।
চারদিকে শুধু যন্ত্রের শব্দ।
বিপ... বিপ... বিপ...
সাদা আলোয় বাবাকে যেন আরও অপরিচিত লাগছে ওর কাছে, মুখভর্তি দাড়ি গজিয়েছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, বুকের ওপর তারের জট, নাক মুখে নল, দুটো হাত নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বিছানার দুই পাশে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল,
তারপর খুব ধীরে এগিয়ে গিয়ে বাবার ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে তুলে নিল,
হাতটা ঠান্ডা।
একসময় এই হাতটাই তাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিল। স্কুলের প্রথম দিন এই হাত ধরে ধরেই স্কুল গেটে পৌঁছেছিল, পরীক্ষার আগে মাথায় এই হাতটাই রেখে বলতো, একদম ভয় পাবি না বাপ তুই পারবি।
আজ তার সেই হাতে কোনো শক্তি নেই।
অপুর গলা কেঁপে উঠল, ক্ষীণ স্বরে বলল
- আব্বু
কোনো উত্তর এল না।
অপু আরও ঝুঁকে বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
- আব্বু আমি এসেছি, আব্বু, নিস্তব্ধতা।
বাইরে কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে রিপা দুহাত মুখে চেপে ধরে তুমুল বেগে কান্নার শব্দ আটকে রাখছে, তাহমিনা খাতুন শুধু তসবিহটা শক্ত করে ধরে একভাবে বিড়বিড় করে যাচ্ছেন কাঁদতে কাঁদতে।
অপু আবার বলল,
- আব্বু আমি চলে গিয়েছিলাম বলেছিলাম খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব পারিনি, আব্বু। আমাকে মাফ করে দাও
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল কান্নায়।
- আমি আর কোথাও যাব না আব্বু। তুমি শুধু একবার চোখ খোলো আব্বু প্লিজ।
হঠাৎ মনিটরের গ্রাফে সামান্য পরিবর্তন দেখা দিল।
ডিউটিতে থাকা নার্স দ্রুত এগিয়ে এলেন,
অপু কিছুই বুঝতে পারছে না, সে শুধু বাবার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রইল।
- আব্বু আব্বু আব্বু আব্বু
কয়েক সেকেন্ড
তারপর.....
আবুল হাসান সাহেবের ডান হাতের আঙুলটা খুব সামান্য নড়ে উঠল, নার্স অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন, স্যার!
তিনি দ্রুত ডাক্তারকে ডাকলেন।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দুজন ডাক্তার এসে দাঁড়ালেন বিছানার পাশে।
একজন টর্চের আলো ফেললেন চোখে। আর ঠিক তখনই
ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল চোখের পাতা।
একবার;
দুবার;
তারপর অনেক কষ্টে চোখ খুললেন আবুল হাসান সাহেব।
ঘোলাটে দৃষ্টিতে তিনি চারদিকে তাকালেন, কিছুই চিনতে পারছেন না।
অপু কান্না চেপে বলল,
- আব্বু; আমি অপু।
চোখদুটো ধীরে ধীরে ছেলের মুখের ওপর স্থির হলো;
একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তাঁর চোখের কোণ বেয়ে।
অপু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
বাবার কপালে মুখ রেখে শিশুদের মতো কাঁদতে লাগল।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তাহমিনা খাতুন সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন, রিপা ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ডাক্তাররা একে অন্যের দিকে তাকালেন।
প্রধান চিকিৎসক মৃদু হাসলেন।
- ভালো লক্ষণ। খুব ভালো লক্ষণ। তবে এখনই নিশ্চিন্ত হওয়ার সময় নয়। সামনে আরও কঠিন পথ বাকি আছে।
সত্যিই ছিল, পরের দিনগুলো ছিল বেশ কঠিন ভেন্টিলেটর
সাপোর্ট ধীরে ধীরে কমানো হলো। শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আবুল হাসান সাহেবের বুক কেঁপে উঠত, ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে যেত। কথা বলতে চাইতেন, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হতো না।
অপু প্রতিদিন ভিজিটিং আওয়ারে সংবাদপত্র পড়ে শোনাতো বাবাকে , পুরোনো দিনের গল্প করতো।
আবুল হাসান সাহেব কিছু বলতে পারতেন না, শুধু ছেলের হাতটা শক্ত করে ধরে থাকতেন।
একদিন বিকেলে ডাক্তার নল খুলে দেওয়ার পর তিনি প্রথম শব্দ উচ্চারণ করলেন।
খুব আস্তে।
প্রায় শোনা যায় না।
- মিনা,
তাহমিনা খাতুন এগিয়ে এলেন,
আবুল হাসান সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কষ্ট করে বললেন,
- তুমি অনেক চোখের জল ঝরিয়েছো এবার তো থামো।
কথাগুলো শেষ করতে তাঁর প্রায় এক মিনিট লেগে গেল,
তাহমিনা খাতুন আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না, স্বামীর হাত চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন তিনি আর কাঁদবেন না; আর না।
সেদিন হাসপাতালের সিসিইউর সেই ছোট্ট কেবিনে উপস্থিত প্রত্যেকেই প্রচন্ড আবেগে কেঁদে ফেলেছিলাম, আসলে মিরাকল তো তখনই হয় যখন মানুষ বাঁচে ভালোবাসায়,
অপেক্ষায়,
আর বেঁচে থাকার এক অসম্ভব ইচ্ছায়।
(সমাপ্ত)
২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৮
সামিয়া বলেছেন: থ্যাংক ইউ সো মাচ আপু ❤️
২|
২৯ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১৯
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: মানুষ বাঁচে ভালোবাসায়,
অপেক্ষায়,আর বেঁচে থাকার এক অসম্ভব ইচ্ছায়।
...............................................................................
বাস্তবতা মানুষকে, মানুষ হতে শেখায়,
গল্পের প্রাণশক্তি অনুভূতি থেকে উচ্চারিত হয় ।
ধন্যবাদ জীবনের গভীরে বিচরন করার জন্য ।
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:১৩
এইচ এন নার্গিস বলেছেন: চমৎকার লিখেছেন