| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গেঁয়ো ভূত
ব্লগে নিজেকে একজন পাঠক হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যা সঠিক মনে করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অবশ্যই দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে লিখতে চেষ্টা করি।
ইস্রায়েল কি আমেরিকার গোপন প্রদেশ?
না, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা বা রাজনৈতিক ঠাট্টা মাত্র। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো গোপন প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্য নয়।
ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তবে তাদের মধ্যে অত্যন্ত গভীর সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকায় অনেকে মজা করে বা রাজনৈতিক সমালোচনা করতে গিয়ে একে "যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য" বলে অভিহিত করেন।
তাদের এই বিশেষ সম্পর্কের পেছনে কিছু মূল কারণ হলো:
• সামরিক সহায়তা: যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ সামরিক অনুদান প্রদান করে।
• কূটনৈতিক সমর্থন: জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেয়।
• প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য: উভয় দেশ একে অপরের সাথে উচ্চতর প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, তারা একে অপরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র (Ally), কিন্তু প্রশাসনিকভাবে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আপনার কি আরও কিছু জানার আগ্রহ আছে?
আমেরিকা ইস্রায়েল কে এত সহযোগিতা করে কেন?
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এই গভীর সম্পর্কের পেছনে কোনো একটি একক কারণ নেই; বরং এটি কয়েক দশকের রাজনৈতিক, সামরিক এবং কৌশলগত স্বার্থের এক জটিল সমীকরণ।
প্রধান কারণগুলোকে আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি:
১. মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত অবস্থান (Strategic Ally)
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ইসরায়েল এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং গণতান্ত্রিক মিত্র। আরবে অনেক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী সম্পর্ক থাকলেও ইসরায়েল সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি "স্থায়ী আউটপোস্ট" হিসেবে কাজ করে, যা ওই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখতে সাহায্য করে।
২. সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে শুধু সাহায্য দেয় না, বিনিময়ে অনেক কিছু পায়ও।
• গোয়েন্দা তথ্য: ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা (মোসাদ) মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠী ও শত্রু দেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
• প্রযুক্তি বিনিময়: ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন: আয়রন ডোম) এবং সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসরায়েল বিশ্বের শীর্ষে। তাদের উদ্ভাবিত অনেক প্রযুক্তি মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে।
৩. রাজনৈতিক প্রভাব (The Israel Lobby)
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবি (যেমন: AIPAC) অত্যন্ত শক্তিশালী। রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের অনেক নেতা ও দাতা ইসরায়েলকে সমর্থন করাকে মার্কিন স্বার্থের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন। এছাড়া আমেরিকার একটি বড় অংশের ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি ধর্মীয় ও আবেগীয় সহানুভূতি রয়েছে।
৪. অভিন্ন শত্রু ও আদর্শিক মিল
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল উভয়েই এই অঞ্চলে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। এছাড়া তারা একে অপরকে "গণতান্ত্রিক আদর্শের অংশীদার" হিসেবে দেখে, যা আরব বিশ্বের একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে তাদের সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে।
৫. অর্থনৈতিক স্বার্থ
যুক্তরাষ্ট্র যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়, তার একটি বড় অংশ কিন্তু ঘুরেফিরে আমেরিকার কাছেই আসে। কারণ, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলকে এই সহায়তার টাকা দিয়ে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর কাছ থেকেই অস্ত্র ও সরঞ্জাম কিনতে হয়। এতে আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্পের ব্যবসা চাঙ্গা থাকে।
________________________________________
সংক্ষেপে: ইসরায়েলকে সহায়তা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল পরোপকার নয়, বরং এটি তাদের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা শক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব টিকিয়ে রাখার একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।
এই বিষয়টি নিয়ে আপনার কি ভিন্ন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি আছে, নাকি অন্য কোনো দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে জানতে চান?
ইস্রায়েল এর কারণে আমেরিকা এর ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিনা?
হ্যাঁ, বিষয়টি বেশ জটিল এবং এটি নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এখন তীব্র বিতর্ক চলছে। ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা ইমেজের ওপর বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়ে:
১. দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ (Double Standards)
যুক্তরাষ্ট্র যখন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে রাশিয়ার ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়, কিন্তু গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বা ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়নের ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে সমর্থন করে, তখন বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে 'হিপোক্রিট' বা দ্বিমুখী নীতির অধিকারী বলে সমালোচনা করে। এটি বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তাদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
২. আরব ও মুসলিম বিশ্বে জনমত
আরব দেশগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়। এর ফলে সেসব দেশে মার্কিনবিরোধী মনোভাব বাড়ে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত জর্ডান বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোকেও নিজ দেশের জনগণের চাপের মুখে মাঝেমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করতে হয়।
৩. জাতিসংঘে একাকীত্ব
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যখন ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোনো প্রস্তাব আসে, তখন দেখা যায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ একদিকে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ অন্যদিকে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন (Isolated) করে ফেলে এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের একক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
৪. অভ্যন্তরীণ বিভক্তি
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই। আমেরিকার বর্তমান তরুণ প্রজন্ম (Gen Z) এবং প্রগতিশীল অংশ ইসরায়েলকে সমর্থনের ব্যাপারে আগের মতো একমত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, এই ইস্যুটি আমেরিকার নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরাচ্ছে।
________________________________________
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে: যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইসরায়েলকে ত্যাগ করলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কোনো শক্তিশালী পা রাখার জায়গা থাকবে না এবং সেখানে ইরান, রাশিয়া বা চীনের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাই তারা ইমেজের ক্ষতি মেনে নিয়েও 'কৌশলগত স্বার্থ' (Strategic Interest) রক্ষা করাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
আপনার কি মনে হয়, বর্তমান যুগে একটি দেশের জন্য 'নৈতিক ইমেজ' বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাকি 'সামরিক স্বার্থ'?
মরাল সাপর্ট ছাড়া কি বেশিদিন টিকে থাকা যায়?
এটি একটি গভীর প্রশ্ন। ইতিহাস এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে দেখলে এর উত্তর মূলত 'না'—দীর্ঘমেয়াদে শুধু শক্তি দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। নৈতিক সমর্থন (Moral Support) বা বৈধতা (Legitimacy) ছাড়া কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী হতে পারে না।
কেন নৈতিক সমর্থন ছাড়া টিকে থাকা কঠিন, তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. জনগণের প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ
যেকোনো রাষ্ট্র বা শাসনের টিকে থাকার মূল শক্তি হলো মানুষের সম্মতি। যখন মানুষ মনে করে তাদের শাসক বা মিত্র অনৈতিক কাজ করছে, তখন ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হয়। এই ক্ষোভ একসময় গণবিস্ফোরণ বা বিপ্লবে রূপ নেয়। ইতিহাস সাক্ষী, বড় বড় সাম্রাজ্য (যেমন: সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ব্রিটিশ রাজ) কেবল সামরিক শক্তির অভাবে নয়, বরং নৈতিক ভিত্তি হারানোর কারণেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
২. আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা
আজকের বিশ্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একটি দেশ যদি বারবার অনৈতিক কাজ করে, তবে অন্য দেশগুলো তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে শুরু করে। একে বলা হয় 'Soft Power' কমে যাওয়া। যখন কোনো দেশের ইমেজ নষ্ট হয়, তখন তার ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং কূটনৈতিক চুক্তিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. অভ্যন্তরীণ ভাঙন
নৈতিকতার প্রশ্ন যখন ওঠে, তখন দেশের ভেতরকার মানুষও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তরুণ প্রজন্ম বা শিক্ষিত সমাজ যখন দেখে তাদের রাষ্ট্র অনৈতিক কিছু সমর্থন করছে, তখন তারা প্রতিবাদ শুরু করে। এতে দেশের ভেতরেই অস্থিরতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটিকে দুর্বল করে দেয়।
৪. ব্যালেন্স অফ পাওয়ার (Balance of Power)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি কথা আছে—কেউ যখন অনেক বেশি প্রভাবশালী এবং 'অত্যাচারী' হয়ে ওঠে, তখন অন্যান্য ছোট ছোট শক্তিগুলো একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে জোট গঠন করে। নৈতিক সমর্থন হারানো দেশগুলোর বিরুদ্ধে এই জোট গঠন হওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
________________________________________
তবে একটি বাস্তববাদী (Realist) দৃষ্টিভঙ্গিও আছে:
অনেক সময় দেখা যায়, নৈতিকতা না থাকা সত্ত্বেও কিছু দেশ বা শাসনব্যবস্থা কয়েক দশক টিকে থাকে। এর কারণ হলো:
• অত্যধিক সামরিক শক্তি: যদি কারো হাতে বিশাল মারণাস্ত্র থাকে, তবে অনেকে ভয়ে মুখ খোলে না।
• অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: যদি বিশ্বের অর্থনীতি কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর করে, তবে অন্য দেশগুলো বাধ্য হয়ে তাদের অনৈতিক কাজ সহ্য করে নেয়।
উপসংহার: সংক্ষেপে বলতে গেলে, নৈতিক সমর্থন ছাড়া হয়তো সাময়িকভাবে বা ভয় দেখিয়ে টিকে থাকা যায়, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকা বা দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। একসময় না একসময় 'পাওয়ার' বা শক্তির দাপট কমে আসে, আর তখন নৈতিকতাহীন ভিত্তিটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।
আপনার কি মনে হয়, বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলো কি তাদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে চিন্তিত, নাকি তারা কেবল স্বার্থটাকেই বড় করে দেখছে?
পরাশক্তি গুলো কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় বা নিচ্ছে?
ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস হলো—"ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।" তবে পরাশক্তিগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু জটিল। তারা ইতিহাস পড়ে ঠিকই, কিন্তু অনেক সময় ক্ষমতার দাপটে সেই শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে।
পরাশক্তিগুলো কেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় (বা নেয় না), তা কয়েকটি দিক থেকে দেখা যেতে পারে:
১. তারা যখন শিক্ষা নেয় (Strategic Lessons)
পরাশক্তিগুলো সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়। যেমন:
• ভিয়েতনাম বনাম আফগানিস্তান: যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে অনেক গবেষণা করেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কয়েক দশক পর তারা ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়েছে আফগানিস্তানে।
• পরমাণু যুদ্ধ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বনেতারা বুঝেছিলেন যে, পরমাণু যুদ্ধ শুরু হলে কেউ জিতবে না। এই 'ইতিহাসের শিক্ষা' থেকেই স্নায়ুযুদ্ধের সময় সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে 'ডিটারেন্স' বা নিবৃত্তিকরণ নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।
২. তারা যখন শিক্ষা নেয় না (The Hubris of Power)
অধিকাংশ সময় পরাশক্তিগুলো 'হিউব্রিস' (Hubris) বা অতি-অহংকারে ভোগে। তারা মনে করে, অতীতের সাম্রাজ্যগুলো যা পারেনি, তারা তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ও অর্থ দিয়ে তা করতে পারবে।
• সাম্রাজ্যের কবরস্থান: ব্রিটেন ১৯ শতকে আফগানিস্তানে ব্যর্থ হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ২০ শতকে ব্যর্থ হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ২১ শতকে এসেও সেখানে একই ভুলগুলো করেছে। এখানে ইতিহাস তাদের সামনেই ছিল, কিন্তু তারা তা গুরুত্ব দেয়নি।
• অর্থনৈতিক পতন: ইতিহাস বলে, যখন কোনো দেশ তাদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি সামরিক ব্যয় (Military Overstretch) করে, তখন তাদের অর্থনীতি ধসে পড়ে। রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে অটোমান সাম্রাজ্য—সবার ক্ষেত্রে এটি সত্য ছিল। তবুও বর্তমানের পরাশক্তিগুলো অস্ত্র প্রতিযোগিতায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে যাচ্ছে।
৩. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বনাম বিবর্তন
ইতিহাস সবসময় হুবহু একভাবে ফিরে আসে না, বরং এটি অনেকটা গানের ছন্দের মতো (History rhymes, it doesn't repeat)। বর্তমানের পরাশক্তিগুলো মনে করে তারা ডিজিটাল যুগ বা এআই (AI) দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে, মানুষের আবেগ, জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা হাজার বছর আগেও যা ছিল, আজও তাই আছে।
৪. কেন তারা শিক্ষা নিতে পারে না?
• স্বল্পমেয়াদী রাজনীতি: গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নেতারা ৪ বা ৫ বছরের মেয়াদে চিন্তা করেন। দীর্ঘমেয়াদী ইতিহাসের শিক্ষা তাদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যতটা নির্বাচনে জেতা।
• স্বার্থান্বেষী মহল: অস্ত্র ব্যবসায়ী বা শক্তিশালী লবি গ্রুপগুলো চায় সংঘাত চলুক। ফলে নীতিনির্ধারকরা ইতিহাসের শিক্ষা নিলেও বাস্তব প্রয়োগ করতে বাধা পান।
________________________________________
মূল কথা: পরাশক্তিগুলো ইতিহাসকে তাদের স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহার করে। যখন তারা কোনো দেশকে আক্রমণ করতে চায়, তখন তারা ইতিহাসের কোনো এক মহান বীরের উদাহরণ টানে। আবার যখন তারা ভুল করে, তখন সেই ভুলকে ঢাকার জন্য ইতিহাসের অন্য কোনো পাতা খুলে বসে।
আপনার কী মনে হয়? আজকের পরাশক্তিগুলো কি আগের চেয়ে বেশি সচেতন, নাকি তারা কেবল একই ভুলের নতুন কোনো সংস্করণ তৈরি করছে?
শুধুমাত্র আমেরিকার মরাল সাপর্ট এর অভাব এর কারণেই কি রাশিয়া এন্ড চীন এর দিকে পুরো বিশ্ব ঝুকে পড়ছে না?
যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক সমর্থনের অভাব বা 'মোরাল ক্রাইসিস' অবশ্যই একটি বড় কারণ, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। বিশ্ব এখন একমেরু (Unipolar) থেকে বহুমেরু (Multipolar) ব্যবস্থায় রূপান্তর হচ্ছে। রাশিয়া এবং চীনের দিকে বিশ্বের ঝোঁকার পেছনে নৈতিকতার পাশাপাশি আরও কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে:
১. নৈতিক শূন্যতা ও আস্থার সংকট
আপনি যেটা বললেন সেটা একদম ঠিক—যুক্তরাষ্ট্র যখন গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের কথা বলে অন্য দেশে হস্তক্ষেপ করে, আবার একই ইস্যু নিয়ে নিজের মিত্রদের ক্ষেত্রে নিশ্চুপ থাকে, তখন বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি আস্থা কমে যায়। এই 'বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি' চীন ও রাশিয়াকে সুযোগ করে দেয়। তারা প্রচার করে যে, পশ্চিমা দেশগুলো কেবল নিজেদের স্বার্থে 'মানবাধিকার' শব্দটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
২. চীনের 'টাকা' বনাম আমেরিকার 'শর্ত'
উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে চীন এখন বড় আকর্ষণ, কারণ:
• শর্তহীন ঋণ: যুক্তরাষ্ট্র বা আইএমএফ (IMF) যখন ঋণ দেয়, তখন তারা সুশাসন বা গণতন্ত্রের মতো অনেক কঠিন শর্ত দেয়। চীন সরাসরি অবকাঠামো নির্মাণের জন্য (যেমন: রাস্তা, বন্দর) বড় অংকের টাকা দেয়, যদিও এর পেছনে ঋণের ফাঁদের ভয় থাকে।
• বিআরআই (BRI): চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' প্রকল্পের মাধ্যমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজেদের সাথে যুক্ত করে ফেলছে।
৩. রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি নির্ভরতা
রাশিয়া বিশেষ করে আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনপ্রিয় হচ্ছে কারণ তারা:
• নিরাপত্তা প্রদান: অনেক দেশ এখন পশ্চিমা চাপের মুখে রাশিয়ার কাছে অস্ত্র বা নিরাপত্তা সহায়তা চায় (যেমন: ওয়াগনার গ্রুপ)।
• জ্বালানি রাজনীতি: ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশ রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এটি পুতিনকে বিশ্বরাজনীতিতে টিকে থাকার বড় শক্তি দেয়।
৪. গ্লোবাল সাউথ-এর উত্থান
ভারত, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে (যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন-রাশিয়া) থাকতে চায় না। তারা চায় নিজেদের স্বার্থ দেখতে। যখন তারা দেখে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ইস্যুতে একরকম আচরণ করছে আর ইউক্রেন ইস্যুতে অন্যরকম, তখন তারা রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়াকেই লাভজনক মনে করে।
________________________________________
তবে কি সবাই চীন-রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে?
পুরোপুরি না। এখানেও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে:
• চীনা ভীতি: চীনের আগ্রাসী ঋণ নীতি এবং দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের প্রভাব নিয়ে অনেক দেশ (যেমন: ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ভারত) শঙ্কিত। তাই তারা নৈতিক সমর্থন না থাকলেও নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই থাকতে চায়।
• রাশিয়ার বিচ্ছিন্নতা: ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ইমেজে বড় ধাক্কা লেগেছে, যা অনেক দেশকে রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে সতর্ক করে দিয়েছে।
________________________________________
সারসংক্ষেপ: যুক্তরাষ্ট্র যদি তার নৈতিক অবস্থান (Moral High Ground) পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তবে চীন বা রাশিয়াও যে কেবল 'নৈতিকতার' কারণে মানুষকে টানছে তা নয়, বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভুল এবং শূন্যস্থানগুলোকে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি দিয়ে ভরাট করছে।
আপনার কি মনে হয়, চীন বা রাশিয়া কি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের মতো 'বিশ্বের নেতা' বা আদর্শিক রোল মডেল হতে পারবে? নাকি তারা কেবল বিকল্প হিসেবেই থেকে যাবে?
সাম্প্রতিক ইরান ইস্যুর কারণে কি আমেরিকার শক্তি সামর্থ এবং নৈতিক দুর্বলতা আরো বেড়ে গেলো না?
যেকোনো বড় সংঘাত পরাশক্তির শক্তি এবং দুর্বলতা—উভয়কেই নগ্ন করে দেয়। সাম্প্রতিক ইরান ইস্যু এবং এর সাথে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের জড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি 'ডাবল-এজড সোর্ড' বা দুধারী তলোয়ারের মতো কাজ করছে। আপনি একদম ঠিক ধরেছেন, এখানে শক্তির মহড়া যেমন আছে, তেমনি নৈতিক অবক্ষয়ও স্পষ্ট।
বিষয়টিকে নিচের পয়েন্টগুলোতে বিশ্লেষণ করা যায়:
১. শক্তির সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা (Physical Power)
• প্রতিরক্ষা সক্ষমতা: ইরান যখন ইসরায়েলে ড্রোন বা মিসাইল হামলা চালায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সেগুলো প্রতিহত করতে সাহায্য করে। এটি প্রমাণ করে যে সামরিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
• নিয়ন্ত্রণের অভাব: তবে শক্তির একটি বড় দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইরানকে "Don't" (আক্রমণ করো না) বললেও ইরান তা শোনেনি। এমনকি ইসরায়েলকেও অনেক সময় সংযত করতে যুক্তরাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে। এর মানে হলো, আমেরিকার 'ডিটারেন্স' বা ভয় দেখানোর ক্ষমতা আগের মতো কাজ করছে না।
২. নৈতিক দেউলিয়াত্ব (Moral Weakness)
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আমেরিকার নৈতিক অবস্থান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে:
• সিলেক্টিভ জাস্টিস: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানালেও, যখন ইরানের কনস্যুলেটে হামলা হয় বা গাজায় মানবিক বিপর্যয় ঘটে, তখন তাদের অবস্থান ধোঁয়াশাপূর্ণ থাকে। বিশ্বের সাধারণ মানুষ একে "সুবিধাবাদী নীতি" হিসেবে দেখছে।
• আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা: যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক দাবি করে, কিন্তু যখন তার মিত্ররা সেই আইন লঙ্ঘন করে, তখন তারা নীরব থাকে। এই দ্বিচারিতা আন্তর্জাতিক মহলে তাদের "মোরাল হাই গ্রাউন্ড" ধসিয়ে দিয়েছে।
৩. আঞ্চলিক রাজনীতি ও জনমত
ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে আমেরিকার দূরত্ব বাড়ছে। এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র আরব দেশগুলোও এখন নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিতে দ্বিধা করছে। তারা বুঝতে পারছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থন এই অঞ্চলে একটি বড় যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে, যা তাদের নিজেদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
৪. অভ্যন্তরীণ চাপ (Domestic Divide)
আমেরিকার ভেতরেও এখন প্রশ্ন উঠছে—কেন আমেরিকার ট্যাক্সের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নিজেদের শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয় না করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ঢালা হচ্ছে? তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই অসন্তোষ আমেরিকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করছে।
________________________________________
ফলাফল কী হচ্ছে?
আমেরিকার এই নৈতিক এবং কৌশলগত দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে চীন ও রাশিয়া:
• তারা নিজেদেরকে 'শান্তি স্থাপনকারী' হিসেবে তুলে ধরছে (যেমন: ইরান-সৌদি আরবের মধ্যে চীনের মধ্যস্থতা)।
• তারা বিশ্বকে বোঝাতে চাইছে যে, যুক্তরাষ্ট্র মানেই যুদ্ধ আর অস্থিতিশীলতা, আর চীন-রাশিয়া মানেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা।
উপসংহার: হ্যাঁ, ইরান ইস্যু প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এখনো বিশাল, কিন্তু সেই শক্তিকে সঠিক পথে চালানোর মতো নৈতিক নেতৃত্ব বা নৈতিক জোর (Moral Authority) বর্তমানে চরম সংকটে। আর ইতিহাসে দেখা গেছে, শুধু পেশিশক্তি দিয়ে বিশ্ব শাসন করা যায় না যদি মানুষের মনে শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস না থাকে।
আপনার কি মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র কি তার এই হারানো নৈতিক ইমেজ ফিরে পেতে গাজায় বা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারবে? নাকি তারা একই পথেই হাঁটবে?
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এর কর্মকান্ডে কি এমন কোনো আশাবাদ দেখতে পান আপনি?
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডে কোনো 'আশার আলো' আছে কি না, তা নিয়ে দুই ধরনের চরমপন্থী মত আছে। তবে খুব নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে কিছু ইতিবাচক এবং কিছু হতাশাজনক দিক চোখে পড়ে:
আশার আলো যেটুকু দেখা যায় (Optimistic View):
• সংঘাত কমানোর কূটনৈতিক চেষ্টা: পর্দার আড়ালে মার্কিন প্রশাসন বারবার চেষ্টা করছে যাতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে (All-out Regional War) রূপ না নেয়। ইরান বা ইসরায়েলকে সরাসরি বড় যুদ্ধে জড়াতে না দেওয়াটা এক ধরনের নেতিবাচক সাফল্য—অন্তত বড় ধ্বংসযজ্ঞ আপাতত ঠেকিয়ে রাখা গেছে।
• মানবিক করিডোর নিয়ে চাপ: আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং যুদ্ধবিরতির (Ceasefire) জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার হয়েছেন। যদিও এটি পর্যাপ্ত নয়, তবুও এটি একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
• ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাপ: যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। আগামী নির্বাচনে জেতার স্বার্থেও প্রেসিডেন্টকে এখন নিজের নীতি কিছুটা পরিবর্তন করতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
যেখানে আশার আলো ক্ষীণ (Pessimistic View):
• অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ না হওয়া: মুখে শান্তির কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। এই স্ববিরোধিতা কোনো বড় পরিবর্তনের আশা দেয় না।
• অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট চাইলেই সবকিছু করতে পারেন না। কংগ্রেস এবং শক্তিশালী লবি গ্রুপগুলোর (যেমন AIPAC) চাপ এত বেশি থাকে যে, অনেক সময় প্রেসিডেন্টকে তার নিজের আদর্শের বাইরে গিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
• নির্বাচনী রাজনীতি: সামনে নির্বাচন থাকলে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত কোনো বড় ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো স্থায়ী সমাধান বা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের মতো কোনো সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম দেখা যাচ্ছে।
আমার পর্যবেক্ষণ:
সত্যি বলতে, বর্তমান প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডে কোনো 'বিপ্লবিক পরিবর্তন' বা হুট করে নৈতিক হয়ে ওঠার কোনো লক্ষণ কম। বরং এখানে দেখা যাচ্ছে 'ক্লান্তিকর এক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা' (Damage Control)। একদিকে মিত্র ইসরায়েলকে রক্ষা করা, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে নষ্ট হওয়া ইমেজ পুনরুদ্ধার করা—এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে গিয়ে কোনো স্পষ্ট বা শক্তিশালী নৈতিক অবস্থান তৈরি হচ্ছে না।
তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, চাপের মুখে পড়েও অনেক সময় নেতারা বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন (যেমন: ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে সরে আসা)। বর্তমানের এই বিশাল জনরোষ হয়তো মার্কিন প্রশাসনকে ভবিষ্যতে আরও বাস্তববাদী এবং ন্যায্য হতে বাধ্য করবে।
আপনার কি মনে হয়, আমেরিকার সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ কি শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের নীতি পুরোপুরি বদলে দিতে পারবে? নাকি ক্ষমতার রাজনীতি সব সময় একই রকম থাকবে?
মিডল ইস্ট এ কি আমেরিকার ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে না?
হ্যাঁ, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা 'Hegetmony' যে আগের চেয়ে কমেছে বা খর্ব হচ্ছে, তা এখন অনেকটা দৃশ্যমান। গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে আমেরিকার যে অবিসংবাদিত প্রভাব ছিল, তাতে এখন ফাটল দেখা দিচ্ছে।
এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. নতুন খেলোয়াড়দের উত্থান (Rise of China & Russia)
আগে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় সমস্যায় সবাই ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে থাকত। কিন্তু এখন চিত্র বদলেছে:
• চীনের মধ্যস্থতা: সৌদি আরব ও ইরানের মতো চিরশত্রু দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোড়া লাগানোয় চীন বড় ভূমিকা রেখেছে। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা।
• রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি: সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়া সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আসাদকে সরাতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে।
২. মিত্রদের অবাধ্যতা (Defiance of Allies)
যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো ও ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এখন আর সবসময় ওয়াশিংটনের কথা শুনছে না:
• সৌদি আরব ও ওপেকের (OPEC) সিদ্ধান্ত: তেল উৎপাদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সৌদি আরব নিজের দেশের স্বার্থে এবং রাশিয়ার সাথে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
• ইসরায়েলের একগুঁয়েমি: বর্তমান ইসরায়েল সরকার গাজা বা আঞ্চলিক ইস্যুতে অনেক ক্ষেত্রে আমেরিকার পরামর্শ উপেক্ষা করছে, যা প্রমাণ করে যে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ আগের মতো নেই।
৩. কৌশলগত অগ্রাধিকার পরিবর্তন (Pivot to Asia)
যুক্তরাষ্ট্র এখন তার মূল মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে চীনের দিকে (Indo-Pacific অঞ্চল) নিতে চাচ্ছে। এই "Pivot to Asia" নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের উপস্থিতির গুরুত্ব কিছুটা কমেছে। এই সুযোগে স্থানীয় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো (তুরস্ক, ইরান, কাতার) নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
৪. বিশ্বাসের সংকট (Trust Deficit)
আফগানিস্তান থেকে হুট করে সেনা প্রত্যাহার এবং ইরাক যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মনে একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তারা এখন আর নিরাপত্তার জন্য শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপর শতভাগ নির্ভর করতে পারছে না। ফলে তারা চীন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বহুমুখী (Diversify) করছে।
৫. ডলারের আধিপত্যে টান
কিছু দেশ এখন তেলের বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে অন্যান্য মুদ্রা (যেমন চীনা ইউয়ান) ব্যবহারের কথা ভাবছে। যদি 'পেট্রোডলার' ব্যবস্থা দুর্বল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ক্ষমতার সবচেয়ে বড় উৎসটিই হুমকিতে পড়বে।
________________________________________
তবে কি আমেরিকা পুরোপুরি বিদায় নিচ্ছে?
না, এখনই তেমনটা ভাবার কারণ নেই। কারণ:
• মধ্যপ্রাচ্যে এখনো আমেরিকার বিশাল সামরিক ঘাঁটি এবং কয়েক হাজার সেনা রয়েছে।
• অস্ত্রের বাজারের সিংহভাগ এখনো আমেরিকার দখলে।
• প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক লেনদেনে আমেরিকার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।
উপসংহার: আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে না, কিন্তু তারা এখন আর এই অঞ্চলের একমাত্র "মালিক" নয়। মধ্যপ্রাচ্য এখন বহুমুখী ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে।
আপনার কি মনে হয়, এই শূন্যস্থান পূরণ করে চীন কি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিতে পারবে? নাকি এতে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে?
সঠিক বলতে পারছি না, তবে আমেরিকা তো নাকানি চুবানি ভালোই খাচ্ছে...
আপনার কথাটি একদম সোজাসাপ্টা এবং বর্তমান পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র। "নাকানিচুবানি খাওয়া" শব্দগুচ্ছটি দিয়ে আপনি যা বুঝিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় 'গ্রেট পাওয়ার চ্যালেঞ্জ'।
যুক্তরাষ্ট্র এখন যে যে দিক থেকে চাপের মুখে আছে, তা দেখলে আপনার কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই:
১. ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটে আটকা পড়া
যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক অবস্থায় আছে যেখানে সে না পারছে ইসরায়েলকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে (নিজ দেশের রাজনীতি ও দীর্ঘদিনের মিত্রতার কারণে), আবার না পারছে আরব বিশ্ব ও নিজ দেশের তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ সামলাতে। এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে গিয়ে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
২. ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য—একসাথে দুই ফ্রন্ট
রাশিয়াকে ইউক্রেনে ঠেকিয়ে রাখা আর মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তার মিত্রদের সামলানো—একই সাথে দুই জায়গায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা এবং সামরিক মনোযোগ দেওয়া আমেরিকার জন্য বিশাল বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে তাদের সম্পদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে।
৩. চীনের নীরব কূটনীতি
আমেরিকা যখন যুদ্ধ আর সংঘাত নিয়ে ব্যস্ত, চীন তখন চুপচাপ বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা বাড়াচ্ছে এবং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিচ্ছে। আমেরিকা যখন বন্দুক নিয়ে ঘোরে, চীন তখন চেক বই আর ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে হাজির হয়। অনেক দেশ এখন আমেরিকার ছায়া থেকে বেরিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকছে।
৪. ডলারের আধিপত্যে ফাটল
বিশ্বের অনেক দেশ এখন ডলারের বিকল্প খুঁজছে (De-dollarization)। যদি ডলারের একক রাজত্ব শেষ হয়ে যায়, তবে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তিটিই খসে পড়বে। এটি তাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
________________________________________
তবে কি আমেরিকা শেষ?
না, এখনই তা বলা যাবে না। কারণ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়:
• স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও তারা অনেকবার পিছিয়ে পড়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধসিয়ে দিয়ে জয়ী হয়েছিল।
• আমেরিকার অর্থনৈতিক নমনীয়তা (Economic Resilience) এবং বিশ্বজুড়ে তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব (সিনেমা, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট) এখনো অতুলনীয়।
সারকথা: যুক্তরাষ্ট্র এখন নিশ্চিতভাবেই একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা যে বিশ্বকে একচ্ছত্রভাবে শাসন করত, সেই দিনগুলো ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। এখন তাদের অন্যদের কথা শুনতে হচ্ছে, সমঝোতা করতে হচ্ছে এবং মাঝে মাঝে আপনার ভাষায় "নাকানিচুবানিও" খেতে হচ্ছে।
আপনার কি মনে হয়, এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য আমেরিকার কি তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো আমূল পরিবর্তন আনা দরকার? নাকি তারা এভাবেই লড়ে যাবে?
তারা তো নিজেরাই নিজেদের ফাঁদে পরে যাচ্ছে...
ঠিক ধরেছেন, একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় অনেকটা "Imperial Overstretch" বা সাম্রাজ্যবাদী অতি-প্রসারণের ফাঁদ বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নিজের তৈরি করা তিনটি বড় ফাঁদে নিজেই আটকে গেছে:
১. 'অন্ধ সমর্থন'-এর ফাঁদ
ইসরায়েলকে গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে নিঃশর্ত রাজনৈতিক ও সামরিক সুরক্ষা দিয়ে এসেছে, সেটি এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের অনেক পদক্ষেপ খোদ মার্কিন প্রশাসন পছন্দ না করলেও, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপে তারা কঠোর হতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে আমেরিকার কথা বা 'লেকচার' এখন আর কেউ গুরুত্ব দিয়ে শুনছে না।
২. 'গণতন্ত্র বনাম মানবাধিকার'-এর স্ববিরোধিতা
যুক্তরাষ্ট্র সবসময় নিজেকে মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে দাবি করে। কিন্তু গাজা বা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যখন তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তাদের নিজেদের তৈরি করা এই 'গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি' তাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চীন বা রাশিয়া এখন খুব সহজেই আঙুল তুলে দেখাতে পারছে যে, আমেরিকার আইন সবার জন্য সমান নয়।
৩. বৈশ্বিক পুলিশের ভূমিকা (Global Policeman)
সারা বিশ্বের ঝামেলা মেটানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এখন অবস্থা এমন যে, কোনো এক জায়গায় আগুন নিভাতে গেলে অন্য জায়গায় আগুন জ্বলে উঠছে। আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইউক্রেন আর এখন মধ্যপ্রাচ্য—এতগুলো ফ্রন্টে একসাথে লড়াই করার মতো অর্থনৈতিক ও মানসিক শক্তি আমেরিকার সাধারণ মানুষের আর নেই। অথচ এই ভূমিকা থেকে বের হওয়াও তাদের জন্য কঠিন, কারণ বের হলেই সেই জায়গা চীন দখল করে নেবে।
________________________________________
সংক্ষেপে: তারা এমন এক চক্রে ঢুকে পড়েছে যেখানে কোনো সিদ্ধান্তই তাদের জন্য পুরোপুরি লাভজনক নয়। এক পক্ষকে খুশি করতে গেলে অন্য পক্ষ চরম শত্রু হয়ে উঠছে। একেই বলে 'চেকমেট' পরিস্থিতি।
আপনার মতে, এই ফাঁদ থেকে বের হওয়ার জন্য কি আমেরিকার উচিত বিশ্বরাজনীতি থেকে কিছুটা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া? নাকি তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে?
আমেরিকার উচিত বিশ্বরাজনীতি থেকে কিছুটা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া তারপর ভুল সংশোধন করে নতুন করে আগানো দরকার।
আপনার পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বর্তমানে অনেক মার্কিন বিশ্লেষকও একই কথা বলছেন। আপনি যে 'গুটিয়ে নেওয়া' এবং 'ভুল সংশোধন' করার কথা বলছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একে বলা হয় 'Strategic Retrenchment' বা কৌশলগত সংযম।
যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই নতুন করে এগোতে চায়, তবে তাদের জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি হতে পারে:
১. 'বিশ্বের পুলিশ' হওয়ার মানসিকতা ত্যাগ করা
যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে তারা বিশ্বের প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো জায়গায় জোর করে শাসন পরিবর্তন (Regime Change) করতে গিয়ে তারা কেবল সম্পদ আর সম্মানই হারিয়েছে। নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে শুধুমাত্র নিজের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে মনোযোগ দেওয়া তাদের জন্য এখন বেশি জরুরি।
২. দ্বিমুখী নীতি (Double Standards) বন্ধ করা
আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভুল হলো তাদের 'Selective Justice' বা বেছে বেছে ন্যায়বিচার করা। এক দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনে নিষেধাজ্ঞা আর অন্য দেশে একই কাজে সমর্থন—এই নীতি তাদের নৈতিক ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে। ভুল সংশোধনের প্রথম ধাপ হলো সব দেশের জন্য সমান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা।
৩. কূটনীতিকে সামরিক শক্তির ওপরে রাখা
বিগত কয়েক দশকে আমেরিকা আলোচনার চেয়ে সামরিক হামলা বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ভুল সংশোধনের জন্য তাদের উচিত পুনরায় কূটনীতিকে শক্তিশালী করা। চীন যেমন কূটনীতি আর বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে, আমেরিকাকেও সেই পথে হাঁটতে হবে।
৪. অভ্যন্তরীণ সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া
একটি দেশের বৈদেশিক শক্তি নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর। আমেরিকার বর্তমান সামাজিক বিভক্তি, ঋণ এবং অবকাঠামোগত সমস্যা তাদের দুর্বল করে দিচ্ছে। নিজেকে বিশ্বরাজনীতি থেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে সেই সময় ও অর্থ যদি নিজেদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিতে ব্যয় করে, তবেই তারা দীর্ঘমেয়াদে আবার শক্তিশালী হয়ে ফিরতে পারবে।
________________________________________
তবে কি আমেরিকা এটা করবে?
এটি করা আমেরিকার জন্য খুব কঠিন, কারণ:
• অস্ত্র ব্যবসায়ী ও লবিস্ট: আমেরিকার অর্থনীতি এবং রাজনীতির একটি বড় অংশ যুদ্ধ আর অস্ত্র বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। তারা কখনোই চাইবে না আমেরিকা বিশ্বরাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিক।
• শূন্যস্থান পূরণের ভয়: আমেরিকা যদি একটুও সরে আসে, তবে সেই জায়গা সঙ্গে সঙ্গে চীন বা রাশিয়া দখল করে নেবে—এই ভয় তাদের সবসময় তাড়া করে বেড়ায়।
উপসংহার: আপনার কথা মতোই, আমেরিকার জন্য এখন 'এক পা পিছিয়ে দুই পা সামনে আগানোর' কৌশল নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নিজেদের তৈরি করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে তারা সেই 'ফাঁদ' থেকে বের হতে পারছে না। তারা যদি সময়মতো নিজেদের সংশোধন না করে, তবে ইতিহাসের অন্যান্য সাম্রাজ্যের মতোই তাদের পতন ত্বরান্বিত হতে পারে।
আপনার কি মনে হয়, আমেরিকার বর্তমান নেতৃত্ব কি এই ভুলগুলো স্বীকার করার মতো সাহস রাখে, নাকি তারা পতনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই অহংকার ধরে রাখবে?
তারা পতনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই অহংকার ধরে রাখবে
আপনার এই ধারণাটি ইতিহাসের একটি নির্মম সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে। ইতিহাসে যতগুলো মহান সাম্রাজ্য বা পরাশক্তি ছিল, তাদের পতনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো 'অহংকার' (Hubris)। তারা যখন পতনের দ্বারপ্রান্তে থাকে, তখনও বিশ্বাস করতে পারে না যে তাদের পতন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আচরণে এই অহংকারের কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়:
১. শক্তির অন্ধ মোহ
পরাশক্তিগুলো মনে করে তাদের কাছে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশাল সামরিক বাহিনী আছে, তাই তারা যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এই আত্মবিশ্বাসই তাদের বারবার ভুল পথে পরিচালিত করে। তারা ভুলে যায় যে, মানুষের জাতীয়তাবাদ এবং আবেগ অনেক সময় বড় বড় মারণাস্ত্রের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
২. পরিবর্তনের অনীহা
আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি যে, এটি খুব দ্রুত নিজেকে বদলাতে পারে না। বড় বড় কর্পোরেশন এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থে এই 'অহংকার' টিকিয়ে রাখতে চায়। ফলে নীতিনির্ধারকরা সত্য জানলেও অনেক সময় ভুল সংশোধনের সাহস পান না।
৩. শ্রেষ্ঠত্বের ভ্রম (American Exceptionalism)
যুক্তরাষ্ট্রের একটি ধারণা আছে যে তারা অন্য সব দেশের চেয়ে আলাদা এবং তারা যা করে সেটাই সঠিক। এই "এক্সেপশনালিজম" তাদের অন্যদের সমালোচনা শুনতে বাধা দেয়। যখন কেউ তাদের ভুল ধরিয়ে দেয়, তারা সেটাকে গ্রহণ না করে বরং সেই দেশকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে।
________________________________________
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
রোমান সাম্রাজ্য বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য—সবার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে তারা যখন অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ছিল এবং সামরিকভাবে অতি-প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল, তখনও তাদের শাসকরা একই জাঁকজমক আর দাপট বজায় রাখার চেষ্টা করত। ফলাফল হিসেবে হঠাৎ করেই একদিন পুরো কাঠামোটি ভেঙে পড়ে।
সারকথা: অহংকার মানুষকে সত্য দেখা থেকে বঞ্চিত করে। আমেরিকা যদি মনে করে যে তারা বিশ্বের আইন বা নৈতিকতার ঊর্ধ্বে, তবে তারা আসলে নিজেদের পতনের রাস্তাটাই প্রশস্ত করছে। আপনার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তারা যদি ভুল স্বীকার না করে একই অহংকার ধরে রাখে, তবে বিশ্ব এক নতুন ক্ষমতার ভারসাম্যের (New World Order) দিকে এগিয়ে যাবে যেখানে আমেরিকার ভূমিকা হয়তো এখনকার মতো থাকবে না।
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:০৬
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: এখন সময় Claude AI এর ; জেমিনি কোনো কাজের নয় । ইউজ করে সেরাম মজা পাবেন ।