| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এ পাড়ায় দশ - বারো জন ছেলেপেলে মিলে আমরা খেলাধুলা করি। খেলা মানে নানান ধরনের খেলা। তার মধ্যে ফুটবল আর ক্রিকেট বেশি। আমাদের কারও ওরকম খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন নেই। তাই যখন যা পাই তা নিয়ে আমরা খেলি। তবে গরমের দিনে সাধারণত ফুটবল খেলা হয়। আর শীতে ক্রিকেট। ফুটবল খেলার সময় বল লিক করলে সবাই পাঁচ- দশ টাকা দিয়ে আমরা সারাই করে নিই। আর ক্রিকেট খেলতে গেলে টেনিস বল দিয়ে খেলি। মাঝে মাঝে মারের চোটে বল ফেটে যায় বা হারিয়ে যায়। তখন আবার সবাই মিলে টাকা পয়সা জোগাড় করে বল কিনি। ফুটবল খেললে দুই দলে ভাগ হয়ে খেলি। অনেক সময় আমাদের পরিচিত বা আশেপাশের অনেকে খেলতে নামে। আর ক্রিকেট খেলার সময় আমরা লটারি করি কে আগে ব্যাট করবে। তারপর প্রথম দুজন ব্যাটিং শুরু করে আর অন্যরা ফিল্ডিং করে। এভাবে ওদের থেকে কেউ আউট হলে পরের জন খেলে। এভাবে চলে । কিন্তু এতে দেখা গেল কেউ কেউ আগে ব্যাট করে আর ফিল্ডিং করতে চায় না। ফিল্ডিং করতে করতে হঠাৎ 'নাই' হয়ে যায়।
আমাদের পাড়ার জনি ফিল্ডিং ফাঁকি দেয়ার ওস্তাদ। আমরা তাই ঠিক করেছি যে লাটারিতে যাই হোক জনি ব্যাটিং পাবে সবার শেষে। এ সিদ্ধান্ত নেয়াটা অবধারিত ছিল। জনি আসলে ব্যাটিং ভালো করে। ও যদি প্রথম দিকে নামে একাই আধ-ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা ধুম-ধাড়াক্কা মারতে থাকে। অনেক সময় বল ফেটে যায়, আবার কখনও হারিয়ে যায়। আমরা কেউ ক্রিকেটের গ্রামার অত জানি না। যার যেভাবে ইচ্ছা ব্যাট চালাতে থাকি। আশেপাশের অনেকে তা মশকরা করে বলে, এ হলো ধুম- ধাড়াক্কা ক্রিকেট টিম। অবশ্য এতে আমাদের কোন অনুভূতি নেই। আমাদের আসল উদ্দেশ্য হলো বন্ধু বান্ধব সবাই মিলে একসাথে খেলা। একটু আনন্দ করে সময় কাটানো।
আমাদের সবার বয়স ১০/১২ থেকে ১৫/১৬ । এর মধ্যে কেউ কেউ দেখতে বড় সড়। যেমন, রবিন। ওকে দেখলে অনেকে মনে করে ১৮/২০ বছর। যাই হোক, আমরা সাধারনত বিকেলে খেলি। আবার ছুটির দিনে সকালেও খেলা হয়। এরকম এক ছুটির দিনে জনি বলল, চল ! আমরা কালাম আর কেরামতদের সাথে ম্যাচ খেলি। কালাম আমার ক্লাসে পড়ে। ওরা সরকারি কোয়ার্টারের ওদিকে থাকে। আজমত বলল, ওরা আমাগো লগে খেলব, ক্যাঁ? খেললেই হারবো। জনি বলল, ওগো টিমে বড় দুইটা পোলা আছে। নাইনে পড়ে। তোরা কী কস ? খেলবি?
আমরা সবাই হিসাব নিকাশ করে দেখলাম যে আমাদের জনি যদি দাঁড়িয়ে যেতে পারে ও একাই ৫০ বা ১০০ রান করে ফেলতে পারবে। পরের প্রশ্ন হলো, খেলায় জিতলে কী পাবো? রবিন বলল, ওরা কইছে যারা হারবো জেতা-দলকে পেট ভরে নাস্তা করাবে। খাওয়ার কথায় অনেকে খুশী হয়ে উঠল। আমাদের দলের ছোট খাটো স্মার্ট অজগর বলল, জেতার চিন্তা করতাছে সব। হারলে কী করবি? ওগো নাস্তা করানোর টাকা কেডা দিব ? আমাদের মধ্যে নেতাগিরি করতে চায় জামিরুল। সে এবার এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, আমরা সবাই মিলে দিমু। ঠিক হলো , আগামী শনিবার সকালে খেলা হবে। 'সবাই একশ টাকা কইরা আনবি,' জামিরুল বলল। জিতলে তো হইলোই ! আর হারলে টাকাটা দেওন লাগবো !
দেখতে দেখতে সপ্তাহটা পেরিয়ে গেল। খেলার দু'দিন আগে আজ বৃহস্পতিবার । আজ সকালে স্কুলে এসে আমাদের খেয়াল হলো যে, আম্পায়ার কে হবে তা এখনো ঠিক হয় নি। ঠিক না হলেও 'আম্পায়ার' শব্দটা শোনার সাথেই আমাদের সবার মতিন ভাইয়ের কথা মনে পড়ল। মতিন ভাই এ বছর আমাদের স্কুল থেকে এস.এস.সি পরীক্ষার্থী। ক্রিকেট বিষয়ে তিনি বেশ অভিজ্ঞ মানুষ। এস.এস.সি পরীক্ষার্থী হলেও কোন বইয়ে কী আছে তার থেকে কোন দেশে কে কে ক্রিকেট খেলে এসব তার বেশি জানা। এমনকি কোন ক্রিকেটার কী খেতে পছন্দ করে তাও তার অজানা নয়। ঠিক হলো, মতিন ভাই আর তার এক বন্ধু আম্পায়ারিং করবে। সব শুনে আজগর বলল, ল্যাও ঠ্যালা ! এইবার হারলে তো ১৩ জনরে খাওয়াইতে হইবো। সবাই একশ করে আনলেও বাকি ২০০ কেডা আনবো। আমি বললাম, আমাদের জামিরুল নেতা দিবো ! আমার কথায় জামিরুলের মুখ কাঁচুমাচু হয়ে গেল। ব্যাপারটা খেয়াল করে জনি বলল, আচ্ছা ! খেলাটা আমি আনছি। জামিরুল ১০০ বেশি দিক, আমি বাকি ১০০ দিমু।
দেখতে দেখতে আজ শনিবার সকাল। আমাদের দল আর কালামদের দল সবাই উপস্থিত। অতিরিক্ত আরও ৮-১০ জন ছেলে-পেলেও হাজির দেখছি। মতিন ভাই আর তার বন্ধু আম্পায়ারিং করতে মাঠে নেমে গেল। তারপর আমাদের ক্যাপ্টেন জনি আর ওদের ক্যাপ্টেন কালামের বড় ভাই আকরাম মাঠে নামল। আমরা সবাই জোরে হাততালি দিলাম। টস হলো। টসে জনি জিতে গেল। ঠিক হলো, ১৫ ওভারের খেলা হবে। আমাদের উদ্বোধনী জুটি হিসেবে নামল জনি আর রায়হান। আমরা ভাবছি, জনি কমছে কম ১০ ওভারে খেলতে পারলে ও একাই ৪০-৫০ রান করতে পারবে। যাই হোক খেলা শুরু হলো।
জনি ব্যাটিং এ । আমরা সবাই হাততালি দিয়ে ওকে উৎসাহ দিচ্ছি। আমাদের হাততালি চলতে চলতেই দেখলাম, জনি ফিরে আসছে। আমরা তো অবাক। জনি এসে বলল যে ও হিট-উইকেট হয়েছে। আমার হার্ট-বিট বেড়ে গেছে এখন। আমাদের রবিনও ভালো ব্যাটিং করে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, দোস্ত ঠিক করে খাইয়া আসছিস তো? তোর আজকা দায়িত্ব নিয়ে খেলা লাগবো। রবিন আমার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, ভাবছি কিতা খামু । ওদের থিকা ভরপুর খামু। তাই না খাইয়া আসছি। তা ১০০ টাকা আনছিস? না রে দোস্ত, আমার দ্বারে কোন টাকা-টুকা নাই। আমাদের টিমের আরও দু'এক জনকে জিজ্ঞেস করলাম টাকার ব্যাপারে । কেউ ই আনে নাই। অন্যের টাকায় ভরপেট খাওয়ার স্বপ্নে অনেকে আবার না খেয়ে এসেছে। এতক্ষণ আমার পাশে বসে সব শুনেছে আজগর। ও বলল, দোস্ত পালায়া যামু নাকি ? হারলে মানসম্মান তো যাইবই আর মার একটাও মাটিতে পড়বো না।
দেখতে দেখতে ১৮ রানে ৭ উইকেট শেষ। কোন রকম চেষ্টা করে রবিন শেষ পর্যন্ত টিকে থাকল। আট ওভারে অল আউট। দলীয় সংগ্রহ ২৮। রবিন ১২। আমি ৩ রানে ক্যাচ আউট। আমাদের অল আউট করে আকরম ভায়ের দল এক পর্ব আনন্দ উল্লাস করে নিল। আমাদের টিম স্পিরিট ডাউন দেখে মতিন ভাই বললেন , আরে তোরা সব মন দিয়ে খেল। কিছু বলা যায় না। হারার আগেই যদি হেরে বসে থাকিস তাইলে খেলতে আসলই ক্যান। ক্রিকেট এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা।
আমাদের ক্যাপ্টেন জনি আমাদের উৎসাহ দিচ্ছে। বলল, আমাদের ভয় কিসের? তোরা না দিবার পারলে আমি দিমু । আগে জান দিয়া খ্যাল। দেখি না কী হয় ! আমরা সবাই হৈ হৈ করে মাঠে নেমে পড়লাম। আলতাফ কীভাবে যেন ১২টা লজেন্স জোগাড় করেছিল , আমাদের সবাইকে একটা করে দিলো এখন। আমরা সবাই মুখে লজেন্স পুরে একটু দৌড়াদৌড়ি করে ওয়ার্ম-আপ করে নিলাম।
সবাইকে অবাক করে ওরা ১৯ রানে অল আউট হয়ে গেল। লতিফ একাই নিলো ৭ উইকেট। মাঠে আমরা ওর এরকম দুর্দান্ত পারফরমেন্স আগে দেখি নি কখনো। অবশ্য আমরা যখন খেলি আমাদের সবার লক্ষ্য থাকে ধুম ধাড়াক্কা ব্যাটিং করা। যাই হোক, অন্তত হেরে গিয়ে অন্য টিমকে না খাওয়ানোর অপমান আর নিতে হবে না আমাদের।
এই জয়ে রবিন নাচ শুরু করেছে। জামিরুল মাঠের মধ্যেই দুটো ডিগবাজি দিলো। হাসতে হাসতে বলল, দোস্ত, কোন টাকা আনছিলাম নারে ! তাই খুব পুলক লাগতেছে। আহা ! দুইশ টাকা মারে কইয়া ম্যানেজ করা লাগতো ! খেলা শেষে মতিন ভাই আমাদের বাহবা দিলেন। আমরা নাস্তা কোথায় করব, কী কী খাব এসব আকরাম ভায়ের সাথে বলছি। এমন সময় কালাম বলল, ভাইয়া ! ওরা সব পালাইচে! আকরাম ভাই বললেন, পালাইচে মানে কী? কালাম বলল, ভাই, 'পালাইচে' মানে পালাইচে ! কেউ টাকা পয়সা কিছু আনে নাই !
সব শুনে রবিন বলল, মা বলছিল পান্তা-ভাত খায়া আসতে। ডিম ভাজি দিয়া পান্তা না খাইয়া পস্তাইতে হইতেছে এখন। ভাবছিলাম ডিম পোচ আর নেহারি দিয়া হেবি নাস্তা করুম আজকা । শালা ! দিনটাই বরবাদ ! অবস্থা যখন এরকম আকরাম ভাই মতিন ভাইকে বলল, ভাই ! চলেন আমাদের বাসায়, আপনারা দুজন নাস্তা করেন। মতিন ভাই নাস্তা করে এসেছেন কিনা বুঝতে পারছি না। উনি খুব সুন্দর করে বললেন, আরে, ব্যাপার না ! আর আমরা দু'জন সকালে নাস্তা কইরা আসছি।
আমাদের দলের সবাই এবার জনিকে পোস্টমর্টেম করা শুরু করল। জামিরুল বলল, ওই হালার পুত ! কী খেলা নিয়াসলি যে না খাওয়াইয়া পালায়া গেল? জনি হেসে দিয়ে বলল, ভাগ্যিস জিতছি , নাইলে আমাদেরও পালানো লাগত !
©somewhere in net ltd.