| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রাজীব নুর
আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি। কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।
আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে। আরও কত কি! কিন্তু এক সময় বিক্রমপুর অন্য রকম ছিলো। সহজ সরল গ্রাম ছিলো। আগে কোনো পাকা রাস্তা ছিলো না। যাতায়াতের পথ ছিলো নদী পথ। সদরঘাট থেকে ইঞ্জিনওলা নৌকা করে যেতে হতো। প্রায় সারাদিন লেগে যেতো। এখন গ্রামে যেতে সময় লাগে এক ঘণ্টা। তবু যাই না। ঢাকা একবার যাদের আকড়ে ধরে, তারা আর গ্রামমূখী হয় না। বড়জোর এক-দুই দিনের জন্য যায়। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু'র বাড়ি পার হয়েই আমাদের গ্রামে যেতে হয়। জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন- পদার্থবিদ ও জীববিজ্ঞানী। উনার বাড়িতে একটা বিরাট পুকুর আছে। পুকুর বলা ঠিক না দীঘি বলা যেতে পারে। সে দীঘির পানি কি স্বচ্ছ! আমাদের বিক্রমপুর ঘিরে আছে বিশাল পদ্মানদী। সর্বনাশা পদ্মা নদী।
আমাদের গ্রামে একজন লোক ছিলেন-
তার নাম ছিলো- খোদা বক্স। কিন্তু তাকে সবাই ডাকতো 'যা বাক্স' নামে। আমার ধারনা, আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক লোক 'যা বাক্স'। খুবই গরীব মানুষ। তার বয়স হবে ৭০। তার দুই ছেলে আছে। দুটাই নেশা করে। সেই দুই ছেলে বিয়ে করেছে। কামকাজ কিছু করে না। সুযোগ পেলেই মাওয়া বা টঙ্গীবাড়ি গিয়ে চুরী করে। চুরীর টাকা দিয়ে নেশা করে। তাদের দুই বউ সারাদিন ঝগড়া করে। আর একে অন্যকে খারাপ গালি দেয়। খারাপ গালি গুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভদ্র গালি হচ্ছে- ছিলান মাগী। যা বাক্স বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে কোনো কাজ করতে পারেন না। কিন্তু ক্ষুধা আছে। অবাক ব্যাপার হলো- দাঁত ঠিক আছে। ডায়বেটিকস নেই। এবং যে কোনো খাবার খেয়ে হজম করতে পারে। সমস্যা হলো তার কপালে খাবার জুটে না। কে দিবে তাকে খাবার? দুই ছেলে করে নেশা। বুড়ো বয়সে খাবারের কষ্ট। ক্ষুধা কিছু মানতে চায় না। অভাব মানুষকে অনেক নীচে নামিয়ে দেয়।
সকালবেলা যা বাক্স ঘর থেকে বের হয়ে যেতো।
পুরো গ্রাম তার মূখস্ত। প্রতিটা বাড়ি এবং বাড়ির মানুষজনকে সে চিনে। চিনে গাছপালা। ছোটবেলায় আমি যা বক্সকে দেখেছি। রোজ আমাদের বাড়িতে আসতো। আমার দাদা তাকে নাস্তা খাওয়াতো। ঐ নাস্তার লোভেই সে রোজ আসতো। দাদা বলতেন, খোদা বক্স তুমি পুরান লোক। তোমাকে দেখলে ভালো লাগে। এই গ্রামে তোমার মতো পুরান লোক আর কেউ নেই। দেশভাগের আগে থেকেই তুমি এই গ্রামে এসেছো। দাদী নাস্তা পাঠাতেন। নাস্তা দেখে যা বাক্স মুগ্ধ হয়ে যেতেন। বলতেন, পরোটার মধ্যে ঘি! সাথে আবার ফুলকপির তরকারী! একি বোয়া ভাতও আছে। এলাহি কান্ড দেখি! চার রকমের ভর্তা! আজ দেখি আমার রাজকপাল! যা বাক্স চেটেপুটে খেতেন। খাওয়া শেষে চা-পান। যা বক্স যাওয়ার সময় দাদাকে বলতেন- আপনার বাড়িতে এসে কোনোদিন না খেয়ে যাইনি! আমার দাদী তার নাতনীদের জন্য দুধ দিয়ে দিতেন। কোনো কাজের কথা বললে, যা বক্স কোনোদিন মানা করতো না।
আমাদের গ্রামের কাছে দুটা বাজার।
একটা কামারগাও বাজার। আরেকটা আলামিন বাজার। আমি গ্রামে গেলেই আলামিন বাজারে যাই। বেশ বড় বাজার। প্রায় সব কিছুই পাওয়া যায়। বিকেলে গরুর খাটি দুধ পাওয়া যায়। এখন অবশ্য খাটি দুধ পাওয়া যায় না। কিন্তু সকলেই দাবী করে খাটি দুধ। একদিন বিকেলে আমি আলামিন বাজারে গিয়েছি। দেখি, যা বাক্স একটা চায়ের দোকানে বসে আছেন। লোকজন চা খাচ্ছে, তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখছেন। আমি নিশ্চিত তার চা খাওয়ার টাকা নেই। আমি যা বাক্সকে চা দিলাম। তিনি আবেগে আপ্লুতু হয়ে বললেন, চা দিলি। তুই আমায় চা দিলি! আনন্দে উনি কেদে ফেলবেন। আমি ফুটবল খেলা বাদ দিয়ে তার সাথে গল্প করলাম। জানলাম- উনি জীবনে অনেক কাজ করেছেন। অনেক কিছু শিখেছেন। কাঠ মিস্ত্রির কাজ, রাজ মিস্ত্রির কাজ, গাছির কাজ, জেলে, কামার, কুমার সব কাজ তিনি পারেন। শেষমেষ যা বাক্স বললেন, জীবনে অনেক কাজ করতে গিয়ে- আমার কিছুই হলো না! তিনবেলা খাবার জুটে না।
যা বাক্স আজ বেঁচে নেই।
কবে মারা গেছেন আমি জানি না। তার বংশধর কে কে বেঁচে আছেন, কোথায় আছেন- তাও জানি না। ঢাকায় থাকলে ইচ্ছা করে এবার যা বাক্সের বাড়ি খুঁজে বের করবো। কিন্তু গ্রামে গেলে মনে থাকে না। যা বাক্স আমায় একটা গোপন কথা বলেছিলেন। সেই কথা আমি কাউকে কোনোদিন বলি নাই। গোপন কথাটা হলো-। থাক, গোপন কথা গোপন'ই থাকুক। সবার জীবনেই কম বেশি গোপন কথা থাকে। চাঁদগাজীরও কিছু গোপন কথা আছে। আমার নিজেরই বেশ কিছু গোপন কথা আছে। যা কোনোদিন কাউকে বলি নাই। অথচ আমি মানুষকে বলে বেড়াই আমি খোলা বইয়ের মতোন। আমার কোনো কিছু গোপন নেই। যাইহোক, গ্রামে যাই না অনেকদিন হয়ে গেলো। অবশ্য গ্রামে কেউ আমাকে চিনেও না। আব্বাকে গ্রামে কবর দেওয়া হয়েছে। আব্বা মারা যাওয়ার পর গ্রামে যেতেই ইচ্ছে করে না। কন্যাকে নিয়ে গ্রামে যাওয়া উচিৎ। উঠানে সে খালি পায়ে খেলুক।
©somewhere in net ltd.
১|
০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৮
মোবারক বলেছেন: নিজ গ্রামের গল্প , পড়ে ভালো লাগলো