নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৪


আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার ডক্টর উপাধিটি মুছে দিও
জ্ঞানী, কবি, দরবেশ, সাধক, সফল, ব্যর্থ
এসব কোনো শব্দই যেন
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে আলাদা না করে।

কারণ আমি দেখেছি
অহংকার খুব সূক্ষ্ম পোশাক পরে আসে
কখনো রাজমুকুট হয়ে
কখনো জ্ঞানের আলো হয়ে
কখনো পবিত্রতার দাবিতে
কখনো আবার বিনয়ের মুখোশে।

নফস বড় কৌশলী
সে সিজদার মধ্যেও নিজের ছায়া খুঁজে নেয়
তসবিহের দানাতেও নিজের মর্যাদা গোনে
অশ্রুর মধ্যেও
নিজেকে সাধু বলে ভাবতে শেখে।

হে পথিক
যদি কোনোদিন আমার কবরের
পাশে এসে দাঁড়াও
আমার জন্য শোক করার আগে
নিজের অন্তরে হাত রেখো।
দেখো-
সেখানে কি এখনো একটি সিংহাসন আছে
যেখানে তুমি নিজেকেই বসিয়ে রেখেছ?
যদি থাকে
সেই সিংহাসন ভেঙে দিও।

কারণ আল্লাহর নৈকট্যের পথে
সবচেয়ে দীর্ঘ দূরত্ব
আকাশ থেকে আকাশ নয়
‘আমি’ থেকে ‘আমি নই’এর দূরত্ব।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
যে পাথরে নাম খোদাই করবে
সেই পাথরও একদিন ক্ষয়ে যাবে
বৃষ্টি তার অক্ষর মুছে দেবে
শেওলা তার বুকে সবুজ নীরবতা লিখবে,
সময়ের আঙুল
ধীরে ধীরে মুছে দেবে
আমার অস্তিত্বের সমস্ত চিহ্ন।

তবু ভয় নেই
কারণ মুছে যাওয়াই যদি
তাঁর দিকে ফেরার পথ হয়
তবে আমাকে মুছে দাও।
আমার স্মৃতি মুছে দাও
আমার অহংকার মুছে দাও
আমার কৃতিত্বের গল্প মুছে দাও
আমার নিজের কাছে নিজের যে পরিচয়
সেটুকুও মুছে দাও।

শুধু তাঁর স্মরণটি রেখো
যে নাম উচ্চারণ করলে
অন্তরের অন্ধকারে
অদৃশ্য কোনো দরজা খুলে যায়
যে নামের কাছে এসে
সব প্রশ্ন ধীরে ধীরে নত হয়ে যায়
যে নামের আলোয়
‘আমি’ নামের দীর্ঘ ছায়াটি
একদিন ক্ষীণ হয়ে আসে
সেই নামই যথেষ্ট।

আমি একদিন বুঝেছিলাম
স্রষ্টাকে খুঁজতে গিয়ে
আমি দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম
অথচ তিনি ছিলেন
আমার অশ্রুরও অধিক নিকটে।

আমি মরুভূমিতে জল খুঁজেছি
পর্বতের চূড়ায় উত্তর খুঁজেছি
গ্রন্থের অক্ষরে অক্ষরে
অসীমের মানচিত্র এঁকেছি
তারপর একদিন
এক ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে
নিজের রবের করুণা দেখলাম।

এক অপরাধীর অনুতাপে
তাঁর দরজা দেখলাম
এক মায়ের ক্ষমায়
তাঁর রহমতের স্পর্শ পেলাম
এক নিঃসঙ্গ মানুষের দীর্ঘশ্বাসে
শুনলাম সেই প্রাচীন আহ্বান
ফিরে এসো
ফিরে এসো সেই ঘরে
যেখান থেকে তোমার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

তাই আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না।
বরং কবরের মাটিতে
একটি বীজ রেখে যেয়ো।
যদি বৃষ্টি আসে
সে বীজ অঙ্কুরিত হোক
যদি বসন্ত আসে
সে মাটির বুক চিরে উঠুক
যদি কোনো পাখি এসে
তার ডালে বসে গান গায়
তবে ভাববে
মৃত মানুষটির জন্য নয়
জীবিত মানুষের হৃদয়ের জন্যই
প্রকৃতি এখনো গান গায়।

আমার কবরের ওপর
ফুল ফুটলে তাকে আমার ফুল বলো না
সে তো তাঁরই সৃষ্টি।
বাতাস এলে বলো না
মৃতের আত্মা ফিরে এসেছে
বাতাস তো তাঁরই নিঃশ্বাসের
এক ক্ষুদ্র ইশারা।

চাঁদ উঠলে
আমার স্মৃতিতে তাকিয়ো না
চাঁদেরও তো নিজস্ব কোনো আলো নেই
সে কেবল গ্রহণ করে
এবং ফিরিয়ে দেয়।

মানুষও কি তাই নয়?
যে আলোকে নিজের বলে ভেবেছিলাম
সে আলোও তো আমার ছিল না।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার কবরকে তীর্থ বানিয়ো না
আমার নামকে মন্ত্র বানিয়ো না
আমার জীবনের ভুলগুলোকে
পবিত্রতার পোশাক পরিয়ো না।

আমি মানুষ ছিলাম
আমার ভেতরে আলো ছিল
অন্ধকারও ছিল
তাওহিদের আকাঙ্ক্ষা ছিল
নফসের টানও ছিল
সত্যের দিকে পা বাড়িয়েছি
আবার নিজের ছায়াতেও ফিরে গেছি।

আমাকে ফেরেশতা বানিয়ে
আমার সত্যকে হত্যা কোরো না
বরং আমার অসম্পূর্ণতাকে
একটি আয়না হিসেবে রেখো।
যেন তুমি দেখো
মানুষ পতনের মধ্যেও
ফিরে আসতে পারে
পাপের পরেও
তওবার দরজা বন্ধ হয় না
অন্ধকার যত দীর্ঘ হোক
রহমতের ভোর
তার চেয়েও প্রাচীন।

হে অচেনা পথিক
যেদিন আমার কবরের পাশ দিয়ে যাবে
হয়তো তুমি তাড়াহুড়োয় থাকবে
হয়তো হাতে থাকবে
দুনিয়ার কোনো অসমাপ্ত কাজ
চোখে থাকবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন
হৃদয়ে থাকবে কারও প্রতি অভিমান
এক মুহূর্ত থেমো
মাটির দিকে তাকিও।

এই মাটিই একদিন
তোমার সমস্ত পরিকল্পনার ওপর
শেষ স্বাক্ষর দেবে।
তখন বুঝবে-
জীবন আসলে সংগ্রহের নাম নয়
সমর্পণের নাম।
যা ধরে রেখেছিলে
সব ছাড়তে হবে
যাকে নিজের বলেছিলে
সব ফিরিয়ে দিতে হবে
যে শরীরকে এত যত্নে সাজিয়েছিলে
সে শরীরও একদিন
মাটির কাছে আমানত হয়ে যাবে।

শুধু আমল নয়
শুধু সম্পদ নয়
শুধু স্মৃতি নয়
শেষে মানুষকে
নিজেকেই সমর্পণ করতে হয়।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
যদি কিছু লিখতেই হয়
তবে পাথরে নয়
কোনো জীবিত মানুষের হৃদয়ে লিখো
দুনিয়া ক্ষণিক,অহংকার ক্ষণিক
দুঃখ ক্ষণিক, আনন্দও ক্ষণিক।

কিন্তু যে হৃদয়
তার রবের দিকে ফিরে যায়
তার যাত্রা
মৃত্যুতে শেষ হয় না
এই একটি বাক্যই যথেষ্ট
কারণ মৃত্যু
দরজা বন্ধ করে না
দরজা বদলে দেয়।

এখানে যে আলো চোখে দেখা যায়
সেখানে হয়তো অন্য আলো
এখানে যে নীরবতা
কান শুনতে পায়
সেখানে হয়তো
নীরবতারও অতীত কোনো সত্য।

কবর-
সমাপ্তির নাম নয়
এ এক অন্তর্বর্তী নীরবতা
যেখানে মানুষ
দুনিয়ার কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে
নিজের রবের সামনে
নিজের প্রকৃত ওজন অনুভব করে।

হে আমার আত্মা
তুমি এতকাল কী খুঁজলে?
মানুষের ভালোবাসা?
তারা তো পরিবর্তনশীল।
সম্মান?
তা তো বাতাসে লেখা নাম।
জ্ঞান?
জ্ঞানও যদি হৃদয়কে নত না করে
তবে সে কেবল
অহংকারের আরেকটি কক্ষ।

সম্পদ?
মৃত্যুর দরজায়
তার কোনো চাবি নেই।
তবে কী খুঁজলে?
একটি চিরস্থায়ী আশ্রয়
আর আশ্রয় কোথায়?
যার কাছে ফিরে গেলে
হারানোর ভয় থাকে না
যার রহমতের সামনে
অপরাধও ক্ষমার সম্ভাবনা হয়ে ওঠে।
যার স্মরণে
বুকের ভিতরকার বিচ্ছিন্ন নদীগুলো
এক সমুদ্রে মিলিত হয়-
সেই একের কাছেই।

তাই আমার সমাধিতে
কোনো ফলক রেখো না
আমার নামকে
সময়ের হাতে তুলে দাও।
সময় তাকে ভাঙুক
মুছে দিক
ভুলে যাক
আমি ভুলে যেতে চাই
আমার নিজের তৈরি মানুষটিকে।

যে মানুষটি বলত-
“আমি করেছি,আমি জানি
আমি পেয়েছি,আমি হয়েছি
তার মৃত্যু হোক
আমার মৃত্যুর আগেই।

যেদিন সত্যিকারের
আমি মরে যাবে
সেদিনই হয়তো
ভেতরে জন্ম নেবে
সেই নিঃশব্দ মানুষটি
যে আর নিজের কিছু দাবি করে না।
সে শুধু বলে-
আমি তোমার বান্দা
আমাকে তুমি যেমন চাও
তেমনই গ্রহণ করো।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না।
যদি কাঁদো
আমার জন্য কেঁদো না
নিজের জন্য কেঁদো
যেন তোমারও ফিরে যাওয়ার আগে
হৃদয়ের দরজা খুলে যায়।

যদি দোয়া করো,
আমার জন্য করো;
কিন্তু দোয়ার শেষে
নিজের নামটিও রেখো।
কারণ একই মাটি
সব অহংকারের শেষ ঠিকানা।

আজ যে কবরের পাশে
তুমি দাঁড়িয়ে আছ,
কাল সেই মাটিই
তোমার জন্য অপেক্ষা করবে।
তখন তোমারও কোনো ফলক চাইবে না মন
চাইবে শুধু
একটি ক্ষমাশীল দৃষ্টি,
একটি গ্রহণযোগ্যতার ইশারা,
একটি রহমতের দরজা
যা বন্ধ হবে না।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
শেষে যদি কিছু রেখেই যেতে চাও
একটি সাদা কাপড়ের মতো
নির্মল নীরবতা রেখে যেয়ো
একটু মাটি।একটু দোয়া
একটি অশ্রু।আর তাঁর নাম।

বাকিটুকু বাতাস নিয়ে যাক।
আমার সমস্ত গল্প
সময়ের নদীতে ভেসে যাক
কারণ আমি কোনো গল্প নই
আমি তাঁরই কাছে ফিরে যাওয়া
এক অসমাপ্ত বাক্য।

আমি কোনো স্মারক নই
আমি মুছে যেতে থাকা
একটি ক্ষণিক চিহ্ন।
আমি কোনো ফলক নই
আমি তাঁর দরজায় পড়ে থাকা
একটি নামহীন আবেদন।

তাই
আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
যেদিন মাটি আমাকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেবে
সেদিন যেন আর কিছুই না থাকে
যা আমাকে দুনিয়ার সঙ্গে বেঁধে রাখে।
শুধু আকাশ থাকুক
শুধু মাটি থাকুক
শুধু নীরবতা থাকুক
আর সেই নীরবতার গভীরে
যদি কোনো শব্দ কখনো জন্ম নেয়
তবে সে শব্দ আমার নয়।
সে হবে
ইয়া রব আমি ফিরে এসেছি।

মন্তব্য ১১ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (১১) মন্তব্য লিখুন

১| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৪

হুমায়রা হারুন বলেছেন: অপূর্ব
সকলের মনের কথা।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২১

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




অপুর্ব অনুভুত হ ওয়ার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ।

শুভেচ্ছা রইল

২| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪৭

হুমায়রা হারুন বলেছেন: ২০০৭ এ লেখা আমার একটি ভবনাঃ
Graveyard
Don’t make my graveyard
I don’t want to be buried
I don’t want to be remembered
From my life nothing I took or I carried.

Neither I want to be recognized
Nor even to be remembered by you
I will rest in peace with myself
With colorless passionate hue.

I won’t try to find myself
I won’t try to think where am I
My passion of search with itself
Revert me when I will die.

30th Jan, 2007 Montreal

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৩৫

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



About twenty years ago written this beautiful poem carries a haunting yet beautiful
sense of detachment from life, memory, and identity. Graveyard feels less like a poem
about death and more like a meditation on the desire to disappear quietly, without
monuments, recognition, or the burden of being remembered. The repeated rejection
of remembrance gives the poem a deeply melancholic and philosophical atmosphere.

I particularly love the contrast between rest in peace with myself and the restless passion
of search. It suggests that even in death, the speaker’s search for meaning and
self-understanding continues. The final lines leave a lingering impression, as though
the journey inward is endless and death itself becomes another part of that search.

There is something strikingly vulnerable in the poem, it does not ask to be celebrated or
remembered it asks simply to exist, and eventually to return to silence. The imagery of
a colourless passionate hue beautifully captures that paradox of feeling deeply while
wishing to leave no trace.

A quiet, introspective, and haunting poem one that stays with the us long after the
final line.

Thank you very much for furnishing this beautiful poem here that enrich my blog as well.

My well wish is aways with you.

৩| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৯

আহমেদ জী এস বলেছেন: ডঃ এম এ আলী ,




তাহলে আপনার জন্যে একটি ফারসী কবিতার কয়েকটি চরণ---
বেগিরে সাব্জে নাপুশাদ কাসি মাজ়ারে মার়া,
কে গোর্‌ পোশে গ়ারিবান হামিন গিয়াহ বাস আস্ত।

বাংলা অর্থ --
সবুজ ঘাস ছাড়া কেউ যেন আমার কবর ঢেকে না দেয়,
কারণ এই ঘাসই নিঃসঙ্গ মানুষের কবর ঢাকার জন্য যথেষ্ট।


এই দু'টো পঙ্ক্তি মোঘল সম্রাজ্ঞী জাহান আরার সমাধির সঙ্গে যুক্ত বলে কয়েকটি ফারসি-সাহিত্যবিষয়ক সূত্রে উল্লেখ আছে।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২০

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




সুপ্রিয় আহমেদ জী এস ভাই ,
আপনার উল্লেখ করা মুল্যবান ফারসি পঙ্‌ক্তি দুটির মধ্যে যে গভীর আত্মবোধ ও মরমী সুর আছে, তা সত্যিই
বিস্ময়কর। বিশেষ করে এই পঙ্‌ক্তিগুলো যখন মুঘল রাজকন্যা ও সুফি-মনস্ক সাহিত্যিক জাহান আরা বেগমের
সমাধিলিপির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়, তখন এর তাৎপর্য আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

ফারসি পঙ্‌ক্তি দুটির প্রচলিত পাঠ

“বগ়ায়ের সব্‌যা না-পোশাদ কাসে মাজ়ার-এ মারা,
কে কবর-পোশ গ়রিবাঁ হামীঁ গিয়াহ বাস আস্ত।”

অর্থাৎ
সবুজ ঘাস ছাড়া কেউ যেন আমার কবর ঢেকে না দেয়
কারণ এই ঘাসই তো নিঃস্ব/নিরহংকার মানুষের কবর ঢাকার জন্য যথেষ্ট।

এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে যেন সমগ্র রাজকীয় জীবনের প্রতি এক আশ্চর্য অনাসক্তি লুকিয়ে আছে। জাহান আরা ছিলেন
সম্রাট শাহজাহানের কন্যা অর্থাৎ ঐশ্বর্য, ক্ষমতা ও রাজকীয় জাঁকজমকের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন মানুষ।

অথচ মৃত্যুর জন্য তিনি চেয়েছেন না কোনো বিশাল স্মৃতিসৌধ, না কোনো রাজকীয় অলংকার; তাঁর সমাধি দিল্লির
নিজামুদ্দিন দরগাহ প্রাঙ্গণে অত্যন্ত সরল, আকাশের দিকে উন্মুক্ত, সাদা মার্বেলের একটি সমাধি হিসেবে নির্মিত।
দিল্লির নিজামুদ্দিন পশ্চিম-এ অবস্থিত নিজামুদ্দিন দরগাহ কমপ্লেক্সে জাহানারার সমাধি (বাঁয়ে), নিজামুদ্দিন
আউলিয়ার সমাধি (ডানে)

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলোএই পঙ্‌ক্তিগুলোকে জাহান আরার নিজের রচনা হিসেবে সূত্রগুলো উল্লেখ করে। সমাধির
শিলালিপিতে তিনি নিজেকে রাজকীয় পরিচয়ের চেয়েও একজন ফকির, একজন বিনম্র সাধক হিসেবে উপস্থাপন
করেছেন। গবেষণাতেও তাঁর এই আত্মপরিচয়কে সুফি ভাবনার ফানা অর্থাৎ অহং ও পার্থিব আত্মপরিচয়ের
বিলুপ্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে।

এই জায়গাতেই আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না কবিতার সঙ্গে একটি আশ্চর্য সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
এখানে তুলে দেয়া আপনার ফার্সী কবিতার কণ্ঠও যেন বলে আমি কারো স্মরণে থাকতে চাইনা ।
আর জাহান আরার সমাধিলিপিও যেন বলে আমার কবরকে রাজকীয় স্মৃতির ভারে ঢেকে রেখো না
কয়েকটি সবুজ ঘাসই যথেষ্ট।

একজন সম্রাজ্ঞী-পরিবারের নারী মৃত্যুর পর নিজের রাজকীয় পরিচয়কে এতখানি সরিয়ে রেখে ঘাসের আচ্ছাদন
বেছে নিচ্ছেন এটি শুধু বিনয়ের প্রকাশ নয়; এর মধ্যে রয়েছে জীবনের সমস্ত পরিচয়, অহংকার, খ্যাতি ও স্মৃতির
ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়ার এক গভীর সুফি দর্শন। তাঁর সমাধির সরলতা তাই কেবল স্থাপত্যের সরলতা নয়, এটি তাঁর
আত্মদর্শনেরও এক নীরব ভাষ্য।

তাই আপনার মন্তব্যের সঙ্গে এই ফারসি কবিতাংশটি যুক্ত হলে আমার মনে হয় একটি সুন্দর দার্শনিক সেতু তৈরি
হয় একদিকে আমার কবিতায় আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না, অন্যদিকে জাহান আরার সবুজ ঘাসই যথেষ্ট।
দুটির ভাষা আলাদা, সময় আলাদা, প্রেক্ষাপট আলাদা, কিন্তু অন্তর্গত অনুভূতিতে যেন একই প্রশ্ন মৃত্যুর পরে মানুষ
কতটা স্মৃতি হয়ে থাকতে চায়, আর কতটা নীরবে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়?

জাহান আরার সমাধির ঘাস তাই আমার কাছে শুধু ঘাস নয় এ যেন রাজমুকুটের বিপরীতে প্রকৃতির একটি নীরব উত্তর।
মানুষ চলে যায়, উপাধি চলে যায়, প্রাসাদ ও ক্ষমতার ইতিহাসও একদিন দূরে সরে যায়; কিন্তু মাটির ওপর জন্ম নেওয়া
একটি ছোট্ট সবুজ ঘাস তখনও বলে যায় শেষ পর্যন্ত মানুষ তার সমস্ত পরিচয় খুলে রেখে প্রকৃতির কাছেই ফিরে যায়।

এই কারণেই আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না কবিতাটি পড়ার পর জাহান আরার সমাধিলিপির কথা আপনার
মত এমন ইতিহাস ও সাহিত্য পড়ুয়া গুণী একজন লেখকের মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। দুটিই যেন মৃত্যুকে সমাপ্তি
হিসেবে নয়, বরং পরিচয়হীন, স্মৃতিহীন এবং অহংকারহীন এক নীরব প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখতে চায়।

মুল্যবানন ইতিহাস বিখ্যাত ফার্সী কবিতাটি এখানে তুলে দিয়ে আমার কবিতার ব্লগটিকে অলংকৃত করার জন্য
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানবেন ।

অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল

৪| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত) বলেছেন: আপনার এই আত্মোপলব্ধি খুবই নরম অথচ গভীর এক আত্মজিজ্ঞাসা। যা আমাদের হৃদয়কেও নাড়িয়ে দিয়েছে। আমার ‘আমি’কে মুছে ‘তাঁর’ কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতিটি সকলের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ফলক নয়—একটু দোয়া, একটু অশ্রু আর তাঁর স্মরণই যেন যথেষ্ট।

“ইয়া রব, আমি ফিরে এসেছি”—এই প্রার্থনাটুকুই থাকুক অন্তরে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর রহমতের ছায়ায় রাখুন। আমিন।


--এতো সুন্দর লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছে - এই ব্লগের কারণেই ! এতো জ্ঞানী ও গুণী মানুষের সাথে ভার্চুয়াল সান্নিধ্যে শিখছি প্রতিনিয়ত।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩০

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




আপনার এমন আন্তরিক ও হৃদয়স্পর্শী কথাগুলো লেখাটিকে যেন নতুন এক অর্থ দিল। সত্যি বলতে, লেখা যতটা
না আমার নিজের, তার চেয়েও বেশি পাঠকের হৃদয়ে তার যে প্রতিধ্বনি তৈরি হয় সেখানেই তার সার্থকতা।

এই ভার্চুয়াল পরিসরটির সবচেয়ে সুন্দর দিক বোধহয় এটাই দূরত্বের দেয়াল পেরিয়ে কিছু নির্মল মন একে অন্যের
ভাবনা, অনুভব ও আত্মজিজ্ঞাসার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। আপনাদের মতো সংবেদনশীল পাঠকের সান্নিধ্যেই
আমিও প্রতিনিয়ত শিখি, ভাবি এবং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করি। আমাদের এই সামান্য লেখালেখি যদি
কারও হৃদয়ে একটু নরম আলো জ্বালায়, একটু আত্মজিজ্ঞাসার জন্ম দেয়, কিংবা নিঃশব্দে তাঁকে স্মরণ করার সুযোগ '
করে দেয়তবেই তো এই পথচলা সার্থক।

আসুন, জ্ঞান ও গুণের অহংকার নয় একে অন্যের কাছ থেকে শেখার এই সুন্দর বিনয়টুকুই ধরে রাখি।
আর সবশেষে সেই প্রার্থনাই থাকুক ইয়া রব, আমাদের হৃদয়কে তোমার দিকে ফিরিয়ে রেখো; আমাদের অশ্রু,
আমাদের নীরবতা, আমাদের সামান্য চেষ্টাগুলো কবুল করে নিও।

আপনার জন্যও রইল আন্তরিক দোয়া ও কৃতজ্ঞতা। এই সুন্দর সান্নিধ্য যেন আরও দীর্ঘ, আরও অর্থময় হয়।

৫| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:




ভাইয়া,
আপনার কবিতা পড়ে Marc Scibilia -এর 'No One Knows My Name' গানটি আবারও শুনলাম।
নিচে তাঁর গানের লিরিক্স।

This world is a circus and people love a clown
So you better entertain ′em if you wanna win the crowd
There's no parade or protests for callouses on hands
Sunday attendance and doin′ what you can

Why do the best men restin' in unmarked graves?
Why do the good ones never find the front page?
I can't help but thinkin′ now if that′s the case
I'll be lucky when I go if no one knows my name

My grandfather was simple, he gave more than he took
There′s no better man than Jesus, and He never wrote a book
The odds are when I go, it probably won't leave much
But honey, I loved you so, and I hope that′s enough


মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।
কিনতু, মৃত্যুর আগে মানুষের মন জয় করা জরুরী।
আর, মানুষের মন জয়ের মূল মাধ্যম কি তাঁদের উপকারে আসা নয়?

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




ভাইয়া সারারাত জেগে জেগে শুধু লিখেই চলেছি । এখন ফজরের নামজ পড়ে ঘুমুতে যাবো।
বিকালে নিয়ে বসব আপনার এই সুন্দর গানের কথামালাতে ।

শুভেচ্ছা রইল

৬| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: আপনার কবিতাটি পড়ে মনে হোলো,
ইহা বাতেনি আকাশের দিকে রুহকে
উড়ানোর এক মন্ত্র
তাহলে আমিও একই পথের পথিক হতে চাই,
যদিও আমার বয়স এখন তরুন,
কিন্তু মৃত্যু চিনেনা কোনো তরুনকে,
এবং চিনেনা কোনো বৃদ্ধকেও।
তাকে যার কাছেই পাঠানো হয়,
তাকেই সে সঙ্গী করে নিয়ে যায়।

সুতরাং,তোমরা আমার কবরে কোনো
ফলক রেখোনা।
আমাকে রেখে দিও নির্জন কোনো প্রান্তরে,
যেখানে আমি থাকব,
আর আমার প্রতিপালক থাকবেন।
খবরদার,তৃতীয় কেউ যেন সেখানে
উৎপাত না করে।
তোমরা আমার কবরে কোনো ফলক রেখোনা
আমাকে আর আমার অহংকে মাটি দিয়ে দিও,
তারপর আর আমাকে মনে রেখোনা,
শরীরকে মাটি খেয়ে ফেললেও,
অহংকে কখোনো মাটিতে খেতে পারেনা।
সুতরাং আমার জন্য দূর থেকেই দোয়া কোরো,
যেন আমার রুহ উর্ধ্বাকাশ ভ্রমন করে

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.