| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রহস্যকে আরো রহস্যের মোড়কে ঢেকে উপস্থাপন করা ধর্মগুরুদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রহস্যের শেকড় ধরে টান দিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন বিজ্ঞানীদের কাজ । আবিষ্কারের আনন্দে কখনো মসৃণতার নিশ্চিতি নেই । সভ্যতার শুরু থেকেই সৃজকদের সাথে নানা শ্রেনি ও প্রতিষ্ঠানের সংঘাত সৃজনশীলতাকে আরো উৎসাহ যুগিয়েছে । মধ্যযুগের ইউরোপে ধর্মের উন্মুক্ত তরবারি যখন বিজ্ঞান আর গণিতের শিরচ্ছেদে ব্যস্ত , তখনই অনির্বাণ উজ্জ্বলতায় আলোকবর্তিকা হয়ে এলেন পোলান্ডের বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস ইতালির জিওর্দানো ব্রুনো। সেই আলোর পুণ্যধারাতে সিক্ত হয়ে ডেনমার্কের জ্যোতির্বিজ্ঞানী তিখ ব্রাহে , জার্মানির ঈয়োনেস কেপলার ও ইতালির গ্যালিলিও পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে বাইবেলের সাথে সম্পর্কযুক্ত তৎকালীন সময়ে প্রচলিত এরিস্টটল ও টলেমির জিওসেন্ট্রিক (পৃথিবী কেন্দ্রিক) মডেলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন । মধ্যযুগে প্রচলিত এরিস্টটল ও টলেমির পৃথিবী কেন্দ্রিক কসমোলজিক্যাল মডেলে পৃথিবী ছিল সৌরজগতের কেন্দ্রে । যেহেতু তাঁদের মডেলে সবকিছুই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরত , তাই মহাবিশ্বে পৃথিবীর অবস্থান ছিল অনন্য । কিন্তু বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস দেখান যে , এই মতবাদ ভুল। পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে কোপার্নিকাস বলেন সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য আর পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে এবং সৌরজগতে পৃথিবী কোন বিশেষ অবস্থায় নেই বা পদার্থ বিজ্ঞানে বিশেষ পর্যবেক্ষক বলে কিছুই নেই । এটাকে বলা হয় কোপার্নিকাসের প্রিন্সিপাল ও প্রস্তাবিত এই মডেলকে বলা হয় হেলিওসেন্ট্রিক ( মহাবিশ্বের সৌরকেন্দ্রিক মডেল) । জ্যোতির্বিজ্ঞানী তিখ ব্রাহের আকাশের তারকারাজির পর্যবেক্ষণ লব্ধ ফলাফল , জ্যোতির্বিজ্ঞানী ঈয়োনেস কেপলার ও গ্যালিলিও এর পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিক গবেষণা কোপার্নিকাসের মহাবিশ্বের সৌরকেন্দ্রিক মডেলকে প্রতিষ্ঠা পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ।
পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করা যায়: খালি চোখে পর্যবেক্ষণের যুগ, দূরবীক্ষণযন্ত্রের যুগ এবং রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের যুগ ।
তিখ ব্রাহে (১৫৪৬-১৬০১
তিখ ব্রাহে (১৫৪৬-১৬০১) ছিলেন শেষ জ্যোতির্বিদদের একজন যিনি টেলিস্কোপ ছাড়া কেবল খালি চোখে সকল পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তার নির্ভুল মতামত ব্যক্ত করেছেন । তিনি বহু বছর ধরে আকাশের তারকারাজির অবস্থান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। ১৫৭৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ De Nova Stella (নতুন তারা সম্পর্কে) । 
বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ De Nova Stella র প্রচ্ছদ
১৫৭২ সালের ১১ নভেম্বরের দিকে তিখ ব্রাহে আকাশে Cassiopeia নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে একটি নতুন উজ্জ্বল বস্তু দেখতে পান । উজ্জ্বলতায় বস্তুটি শুক্রগ্রহকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আসলে এটি ছিল একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণ ( আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে এটাকে Tycho's Supernova SN 1572 বলে ডাকা হয় ) । তাঁর বইতে এটা ছিল এটা অন্যতম আলোচ্য বিষয় । তৎকালীন অনেক পণ্ডিত মনে করেছিলেন এটি হয়তো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কোনো ঘটনা । ব্রাহে বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যবেক্ষণ করে দেখান বস্তুটির কোনো পরিমাপযোগ্য প্যারাল্যাক্স নেই । (জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কোনো বস্তু পৃথিবীর কত দূরে আছে তা বোঝার জন্য প্যারাল্যাক্স ব্যবহার করেন । তিখ ব্রাহে দেখান বস্তুটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কাছে ছিল না । চাঁদের কাছেও ছিল না । এটি অনেক দূরের মহাজাগতিক বস্তু ছিল ।) এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে বস্তুটি চাঁদের অনেক বাইরের অঞ্চলে অবস্থিত । সে সময়ের প্রচলিত অ্যারিস্টটলীয় মত অনুযায়ী চাঁদের ওপরে আকাশ চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় । সেখানে নতুন কিছু সৃষ্টি বা ধ্বংস হতে পারে না । কিন্তু হঠাৎ একটি নতুন উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব এই ধারণাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে । ব্রাহে তাঁর বইয়ে যুক্তি দেন যে বাস্তব পর্যবেক্ষণ পুরোনো দর্শনের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য । বইটির সবচেয়ে আধুনিক বৈশিষ্ট্য ছিল , অনুমানের পরিবর্তে পর্যবেক্ষণের ওপর জোর , পরিমাপের তথ্য উপস্থাপন ও জ্যামিতিক বিশ্লেষণ ব্যবহার । সর্বপরি এই বইটিই পরবর্তীতে কেপলার, গ্যালিলিও ও নিউটনের যুগের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ।
তিখ ব্রাহে তৎকালীন সময়ে ইউরেনিবর্গ ও স্টিয়ের্নেবর্গ মানমন্দিরে গবেষণা করতেন । তাঁর জীবনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর ১৬১০ সালে প্রকাশিত হয় পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিশ্বকাঁপানো গ্রন্থ "Astronomiae Instauratae Progymnasmata" ( নতুন জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাথমিক গবেষণা" )।
Astronomiae Instauratae Progymnasmata" গ্রন্থের প্রচ্ছদ ।
তিনি শত শত নক্ষত্রের অবস্থান অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মেপেছিলেন । এই বইতে তিনি এই তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করেন । দূরবীন ছাড়াই এই নির্ভুলতা অর্জন ছিল অসাধারণ । বইটিতে তিনি নক্ষত্রগুলর অবস্থান জানার জন্য কি পদ্ধতি ব্যাবহার করা হয়েছে , কোন ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে ও পর্যবেক্ষণ লব্ধ ফলাফল কিভাবে যাচাই করা হয়েছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন । এই পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে অনেকটা মিল রাখে । এর মাধ্যমে তিনি শুধু কিছু পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেননি; বরং শতাব্দী-প্রাচীন মহাবিশ্বের ধারণাকে পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
ঈয়োনেস কেপলার ( ১৫৭১ - ১৬৩০)
ঈয়োনেস কেপলার ( ১৫৭১ - ১৬৩০) ১৫৯০ এর দশকে একজন প্রতিভাবান গণিতবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন । তিনি ১৫৯৬ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ Mysterium Cosmographicum (মহাজাগতিক রহস্য) প্রকাশ করে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন ।
Mysterium Cosmographicum গ্রন্থের প্রচ্ছদ
তিখ ব্রাহে বইটি পড়েছিলেন । তিনি কেপলারের গণিত প্রতিভায় মুগ্ধ হন, যদিও বইটির অনেক ধারণার সঙ্গে একমত ছিলেন না । এটাই পরে দুজনের পরিচয় ও সহযোগিতার একটি কারণ হয়ে ওঠে। তিখ ব্রাহে তখন ইউরোপের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানী । তিনি জানতেন যে তার কাছে অসাধারণ তথ্য আছে, কিন্তু সেই তথ্য বিশ্লেষণ করার জন্য একজন শক্তিশালী গণিতবিদ দরকার । এই কারণে ১৬০০ সালে কেপলার , ব্রাহের সঙ্গে কাজ করতে যান। ব্রাহের ছিল অসাধারণ পর্যবেক্ষণ , বিশাল তথ্যভাণ্ডার , সর্বোচ্চ নির্ভুল পরিমাপ আর কেপলারের ছিল শক্তিশালী গাণিতিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা । ব্রাহের মৃত্যুর তাঁর পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ১৬০৯ সালে কেপলার প্রকাশ করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বিপ্লবী বই " "Astronomia Nova Aitiologetos, seu Physica Coelestis, tradita commentariis de motibus stellae Martis" (নতুন জ্যোতির্বিজ্ঞান, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান - মঙ্গলগ্রহের গতিবিধি সম্পর্কিত ব্যাখ্যাসহ । )
Astronomia Nova গ্রন্থটির প্রচ্ছদ
Astronomia Nova গ্রন্থটির পাঁচটি অধ্যায় । প্রথম অধ্যায়ে তিনি বিখ্যাত তিন জ্যোতির্বিদ টলেমি , কোপার্নিকাস ও ব্রাহের গ্রহের চলন নিয়ে যে জ্যামিতিক মডেল রচনা করেছিলেন এদের তুলনামুলক আলোচনা করেছেন । কারো জ্যামিতিক মডেলে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে । কারো মডেলে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে । কেপলারের জিজ্ঞাসা ছিল , সূর্য বা পৃথিবী যে-ই হোক , সারাক্ষন সে সমান গতিবেগে ঘুরবে কেন ? কেপলার যখন তৎকালীন সময়ে প্রচলিত জ্যামিতিক মডেল গুলোকে মেলাতে চাইছেন কিছুতেই তিনি মেলাতে পারছিলেন না । মেলেনি বলেই বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি প্রচলিত মডেলগুলোর অনিশ্চয়তার কথা বলে নতুন মডেলের অনুসন্ধান করেন । কেন তিনি মেলাতে পারছিলেন না তা আজ বোঝা যায় । জ্যোতির্বিদ টলেমি , কোপার্নিকাস ও ব্রাহের তিনজনের জ্যামিতিক মডেলেই তো মহাজাগতিক বস্তু বৃত্তাকার পথে ঘুরছে । অথচ বাস্তবে এরা কেউই বৃত্তাকার পথে ঘুরছে না । উপবৃত্তাকার পথে ঘুরছে । তিন নম্বর অধ্যায়ে কেপলার মহাকর্ষ নিয়ে আলোচনা করেন , তিনি ধারণা দেন যে সূর্য কোনো ধরনের শক্তি বা বল প্রয়োগ করছে যা গ্রহের গতিকে প্রভাবিত করছে । চার নম্বর অধ্যায় বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । ব্রাহের মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান , মঙ্গলগ্রহের চলনপথ বৃত্তাকার হতে পারে না বরং বলা যায় সে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরছে । পাঁচ নম্বর বা শেষ অধ্যায়ে তাঁর অভিমত ছিল , মহাশূন্যে সূর্য স্থির নয় । সে-ও একটা চলন পথ অনুসরণ করে । চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি এই সিধান্তে উপনিত হন " বিভিন্ন গ্রহের গতিপথ বৃত্তাকার নয় বরং উপবৃত্তাকার এবং উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্য ঠিক মাঝখানে থাকে না; বরং একটু একপাশে অবস্থান করে । এভাবেই কেপলারের গ্রহগতি সংক্রান্ত প্রথম সূত্রের আবিষ্কার । এই বইতেই ব্রাহের মঙ্গলগ্রহ সংক্রান্ত গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এই সিধান্তে আসেন যে " গ্রহের গতি সমান নয়; সূর্যের কাছাকাছি দ্রুত এবং দূরে ধীর । কেপলার দেখিয়েছিলেন যে এই গতি পরিবর্তন এলোমেলো নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে । এটাই কেপলারের গ্রহগতি সংক্রান্ত দ্বিতীয় সূত্র । Astronomia Nova-এর মূল অবদান- গ্রহের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার ও সূর্য উপবৃত্তের একটি ফোকাসে থাকে এটার গাণিতিক প্রমান , গ্রহের গতি পরিবর্তনশীল এই তত্ত্বের পেছনে অকাট্য যুক্তি এবং পর্যবেক্ষণকে দর্শনের ওপরে স্থান । সংক্ষেপে, Astronomia Nova এমন একটি বই যা ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত "নিখুঁত বৃত্তাকার স্বর্গ" ধারণাকে ভেঙে দিয়ে বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মহাবিশ্বকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছিল । এটি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য হয় ।
Harmonices Mundi গ্রন্থের প্রচ্ছদ
Harmonices Mundi (মহাবিশ্বের সুরেলা সামঞ্জস্য ) হলো কেপলারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ । এটি ১৬১৯ সালে প্রকাশিত হয় এবং এখানেই কেপলার তার তৃতীয় গ্রহগতি সূত্র প্রকাশ করেন - "যে গ্রহ সূর্য থেকে যত দূরে থাকে, তার সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে তত বেশি সময় লাগে।" । যেমন বুধ গ্রহ সূর্যের কাছাকাছি, তাই এক বছর মাত্র ৮৮ দিন। পৃথিবীর এক বছর ৩৬৫ দিন। শনিগ্রহ অনেক দূরে, তাই এক বছর প্রায় ২৯.৫ পৃথিবী-বছর মানে শনি গ্রহের সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যত সময় লাগে, সেই সময়ে পৃথিবীতে ২৯.৫ বছর কেটে যায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গেলিলেই (১৫৬৪-১৬৪২)
এবার আমরা খালি চোখে আকাশ দেখার পাঠ চুকিয়ে দূরবীক্ষণযন্ত্রের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি । প্রথম যুগ থেকে দ্বিতীয় যুগে উত্তরণ ঘটে ১৬০৯ সালে। ১৬০৮ সালে নেদারল্যান্ডের এক চশমা নির্মাতা হেন লিপারশে এমন একটি যন্ত্র প্রদর্শন করেন যা দূরের বস্তু কাছে দেখা যায়। এই আবিষ্কারের খবর দ্রুত ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১৬০৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গেলিলেই (১৫৬৪-১৬৪২) ইতালিতে এই নতুন যন্ত্রের কথা শোনেন । তবে তিনি আসল যন্ত্রটি পাননি । তিনি শুধু শুনেছিলেন যে নেদারল্যান্ডসে এমন একটি যন্ত্র তৈরি হয়েছে । গ্যালিলিও নিজেই ধারণা করেন উত্তল লেন্স ও অবতল লেন্স একসঙ্গে ব্যবহার করলে দূরের বস্তু বড় করে দেখা যেতে পারে । তিনি নিজে লেন্স ঘষে ও তৈরি করে নিজের দূরবীন নির্মাণ করেন । গ্যালিলিও খুব দ্রুত ৮ গুণ , ২০ গুণ, পরে প্রায় ৩০ গুণ বিবর্ধনক্ষম দূরবীন তৈরি করেন । ১৬০৯ সালে গ্যালিলিও তাঁর নিজের তৈরি দূরবীন দিয়ে দেখলেন চাঁদের পাহাড় ও গর্ত , ছায়াপথ , অগণিত নক্ষত্ররাজি , ও বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে প্রদক্ষিণরত এমন চার উপগ্রহ , যাদের ঠিক ঠিকানা এর আগে পৃথিবীর একজনেরও জানা ছিল না । ১৬১০ সালে নিজের দূরবীন দিয়ে করা পর্যবেক্ষণ জনসম্মুখে প্রকাশ করলেন "Sidereus Nuncius" ( নক্ষত্র সংবাদ) নামে পুস্তিকার মাধ্যমে ।
Sidereus Nuncius পুস্তিকার প্রচ্ছদ
Sidereus Nuncius প্রকাশের পর ইউরোপে মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা বদলাতে শুরু করে । বইটি খুব বড় নয়—প্রায় ৬০–৭০ পৃষ্ঠার একটি সংক্ষিপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন । বইটিতে রয়েছে গ্যালালিওর নিজের বানানো দূরবীনের বিবরণ , পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি , নিজের হাতে আঁকা চাঁদের ড্রইং , বিভিন্ন নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ ও বৃহস্পতির উপগ্রহগুলোর অবস্থানের নকশা । তৎকালীন সময়ে গৃহীত অ্যারিস্টটলের মতবাদ অনুসারে আকাশের বস্তুগুলো ছিল নিখুঁত ও মসৃণ । কিন্তু গ্যালিলিও বইটাতে দেখালেন চাঁদে পাহাড় , উপত্যকা ও গর্ত আছে । তার মানে চাঁদ পৃথিবীর মতোই অসমতল । এটি অ্যারিস্টটল ও বাইবেলের "নিখুঁত স্বর্গীয় জগত" ধারণাকে আঘাত করে । "Milky Way" ছায়াপথ কে খালি চোখে একটি সাদা কুয়াশার মতো দেখা যায় । এটি আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র তারার সমষ্টি । ১৬১০ সালের জানুয়ারিতে গ্যালিলিও বৃহস্পতি গ্রহের পাশে কয়েকটি ছোট আলোকবিন্দু দেখেন । কয়েক রাত পর্যবেক্ষণ করে তিনি বুঝতে পারেন এগুলো তারা নয় । এগুলো বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এবং এগুলো বৃহস্পতি গ্রহের চারটি উপগ্রহ । বর্তমানে এগুলোকে সম্মিলিতভাবে "Galilean Moons" বলা হয় । এই বইতেই তিনি দেখালেন সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না । একটি গ্রহেরও নিজস্ব উপগ্রহ থাকতে পারে। এটি কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক ধারণার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে । পাঠক একটু খেয়াল করবেন কেপলার গ্রহগতি সম্পর্কিত প্রথম সূত্রটি আবিস্কার করেন ১৬০৯ সালে । এর অল্প কিছুদিন পর গ্যালিলিও দূরবীন দিয়ে দেখলেন , বৃহস্পতির চারপাশে কতগুলো উপগ্রহ রয়েছে । এরা সকলে উপবৃত্তকার পথে ঘুরছে । তৎকালীন ধর্মপ্রচারকদের কাছে একাজ গোদের উপর বিষফোঁড়া । তবে গ্যালিলিও ও কেপলার - একাজে উপকার হল দুজনেরই । কেপলারের সূত্র গ্যালেলিওর পর্যবেক্ষণের ফলে সমর্থিত হল । দূরবীনে চোখ রেখে গ্যালিলিও যখন দেখলেন , উপগ্রহগুলো কেপলারের প্রস্তাবিত উপবৃত্তকার পথে ঘুরছে , নিজের পর্যবেক্ষণে তাঁর প্রত্যয় বাড়ল । কাজেই বুঝতেই পারছেন পাঠক , "Sidereus Nuncius" ( নক্ষত্র সংবাদ) প্রকাশ হওয়ার পর যে মানুষটির অভিমত নেওয়া গ্যালিলিওর কাছে আবশ্যিক মনে হয়েছে তিনি ঈয়োনেস কেপলার ।
ওই সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ঈয়োনেস কেপলার রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট Rudolph II-এর রাজকীয় গণিতজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ছিলেন । গ্যালিলিও নিজেই কেপলারের প্রতিক্রিয়া জানতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন । এই উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর বইয়ের একটি কপি প্রাগে অবস্থিত টাস্কান রাষ্ট্রদূতের কাছে পাঠান । একই সঙ্গে তিনি কেপলারের লিখিত প্রতিক্রিয়া চেয়ে একটি অনুরোধও পাঠান । ১৬১০ সালের ৮ এপ্রিল রাষ্ট্রদূত গ্যালিলিওর বইটি কেপলারের হাতে পৌঁছে দেন । কেপলার বইটি পড়ে গভীরভাবে মুগ্ধ হন । অনেক মানুষই গ্যালিলিওর বইটি সম্পর্কে কেপলারের মতামত জানতে আগ্রহী ছিল। তাই প্রত্যেককে আলাদা করে উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে কেপলার সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের খরচে গ্যালিলিওকে প্রতিউত্তরে লেখা চিঠিটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করবেন । কেপলার এক সপ্তাহের মধ্যেই "Dissertatio cum Nuncio Sidereo" (নাক্ষত্রিক বার্তাবাহকের সঙ্গে কথোপকথন) নামে পুস্তিকা প্রকাশ করে গ্যালালিওর আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনাকালের নতুন পর্যবেক্ষণ, নতুন যন্ত্র এবং নতুন বিশ্বদর্শনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।
Dissertatio cum Nuncio Sidereo পুস্তিকার প্রচ্ছদ
তিনি বুঝেছিলেন যে নতুন পর্যবেক্ষণ পুরোনো মতবাদকে চ্যালেঞ্জ করছে। এ বইতে তিনি ঘোষণা করেন যে কর্তৃত্বের চেয়ে সত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গ্যালালিওকে কেপলার অভিনন্দিত করেছিলেন এই বলে " তুমি যে পর্যবেক্ষণের কথা লিখেছো তা আগে যারা এই বিষয়ে বলেছেন তার সঙ্গে ভীষণ মিল। স্বভাবতই তোমার বই নিয়ে আমার মনে কোনো প্রশ্ন জাগেনি । তোমায় আমার বলতে ইচ্ছে করে , হাতে দূরবীন নাও , মঙ্গলের দুটো উপগ্রহ আবিষ্কার কর , শনির ছয় কিংবা আটটি উপগ্রহ খুঁজে নাও । শুক্র ও বুধের একটি করে উপগ্রহ দেখে নাও । " তৎকালীন সময়ে অনেক পণ্ডিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের তথ্য বিশ্বাস করতেন না। কেপলার লেখেন খালি চোখ সীমাবদ্ধ । দূরবীক্ষণ সেই সীমা বাড়ায়। অতএব নতুন যন্ত্রের মাধ্যমে পাওয়া সত্যকে অস্বীকার করা উচিত নয়। অ্যারিস্টটলের মতে স্বর্গীয় বস্তু নিখুঁত ছিল। গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণ দেখে কেপলার বলেন চাঁদও একটি বাস্তব জগত, পৃথিবীর মতো তারও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য আছে। এই কথা মধ্যযুগীয় বিশ্বদর্শনের বিরুদ্ধে বড় আঘাত ছিল। পুস্তিকায় তিনি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন গ্যালিলিও প্রমাণ করেছেন “বৃহস্পতির নিজস্ব উপগ্রহ রয়েছে । সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। অন্য গ্রহকেও কেন্দ্র করে বস্তু ঘুরতে পারে। " । এটি সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খালি চোখে মিল্কি ওয়ে বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ কেবল সাদা কুয়াশার মতো দেখায়। কেপলার গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন যে গ্যালিলিওর দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা গেল সেখানে অগণিত নক্ষত্র রয়েছে । তিনি লেখেন “যারা দেখার আগেই অস্বীকার করে, তারা সত্যকে নিজেদের থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়।” অনেক সমালোচক দূরবীক্ষণে তাকাতেই রাজি ছিলেন না । কেপলার এ মনোভাবের বিরোধিতা করেন । বিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ আগে, মতবাদ পরে । কেপলার উপলব্ধি করেছিলেন যে দূরবীক্ষণ শুধু একটি যন্ত্র নয় । এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের পদ্ধতি বদলে দিয়েছে, পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিজ্ঞানের নতুন যুগ শুরু করেছে । বইটির সর্বাধিক আলোচিত ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অংশ “যখন আকাশের বাতাসে চলার উপযোগী জাহাজ তৈরি হবে, তখন এমন মানুষও থাকবে যারা সেই বিশাল শূন্যতাকে ভয় পাবে না ।” এটি আধুনিক মহাকাশযাত্রার ধারণার অন্যতম প্রাচীন পূর্বাভাস। কেপলার কার্যত কল্পনা করেছিলেন মহাকাশযান, আন্তঃগ্রহ ভ্রমণ, এবং ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযাত্রীদের।
তিনি ১৫৯৬ সালে কেপলার তাঁর প্রথম গ্রন্থ Mysterium Cosmographicum (মহাজাগতিক রহস্য) প্রকাশ হওয়ার পর গ্যালিলিও কে পাঠিয়েছিলেন । বইটা হাতে পাওয়ার পর গ্যালিলিও , কেপলারকে লিখেছিলেন " বহুদিন ধরে আমি কোপার্নিকাস ভাবনার সমর্থক । প্রচলিত নানা ব্যাখ্যা থেকে যে সকল প্রাকৃতিক ঘটনা উপলব্ধির অসাধ্য , কোপার্নিকাসের ভাবনা তা ব্যাখ্যা করতে পারে বলেই আমি সমর্থন করি । প্রচলিত বহু ব্যাখ্যা ভুল প্রমান করার তথ্য আমার হাতে রয়েছে । আমি প্রকাশ করছি না । আমাদের শিক্ষক কোপার্নিকাসের পরিনতি আমি জানি। একথা হয়তো ঠিক , অল্প কিছু মানুষের চোখে তিনি চিরভাস্বর খ্যাতি অর্জন করেছেন । যে ভাবনা আমাকে বিচলিত করে তা হল এই , অসংখ্য মানুষ তাঁকে নিন্দা করতে অভ্যস্ত । নির্বোধের সংখ্যাই যে অনেক বেশি । । তোমার মত মানুষ বেশি থাকলে আমি প্রকাশের সাহস পেতাম । কিন্তু তা যে হবার নয় ......... কেপলার কিন্তু গ্যালিলিওর চিঠি পেয়ে নিরবতা অবলম্বন করেন নি । একটি অসামান্য চিঠি গ্যালিলিও কে লিখলেন । ১৯৫৭ সালেই - " তোমার দৃষ্টান্তই আমাদের উপদেশ দেয় , অজ্ঞানতাকে আক্রমণ করার , নির্বুদ্ধিতার কাছে মাথা নত না করবার , পণ্ডিতদের উপর হিংস্র আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার । আমাদের সমকালে এক বিশাল কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হচ্ছে । প্রথমে কোপার্নিকাস এই কাজ শুরু করেছেন ও পরে বহু প্রাজ্ঞ গণিতজ্ঞ এই কাজে যোগ দিয়েছেন । আমাদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমরা সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি । আমাদের যে সহযোদ্ধারা সত্য উচ্চারণ করতে গিয়ে নানা অবিচারের শিকার হচ্ছেন , তোমার যুক্তি ও প্রভাবশালী উপস্থিতি তাকে প্রতিরোধ করতে পারে । সংকুল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা আমাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি ...। প্রফুল্লতা অর্জন করো গ্যালিলিও , মানুষের মুখোমুখি হও । যদি মনে হয় ইতালিতে তুমি তোমার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছো না , যদি কোনরকম প্রতিবন্ধকতা অনুভব করো , সম্ভবত জার্মানিতে তোমায় আমরা সেই স্বাধীনতা দিতে পারবো ।"
১৬৩৩ সাল । গ্যালিলিওর লেখা Dialogo sopra i due massimi sistemi del mondo (বিশ্বের দুই প্রধান ব্যবস্থার সম্পর্কে সংলাপ") বইটিতে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে - বাইবেলবিরোধী এই সত্য বলার অপরাধে চার্চ খ্যাতনামা বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে অভিযুক্ত করল ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে । গ্যালিলিও তখন প্রায় অন্ধ , বয়সের ভারে ন্যুব্জ । অসুস্থ ও বৃদ্ধ বিজ্ঞানীকে জোর করে ফ্লোরেনস থেকে রোমে নিয়ে যাওয়া হল , হাঁটু ভেঙ্গে সবার সামনে জোড় হাতে ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়ে বলতে বাধ্য করা হল , এতদিন গ্যালিলিও যা প্রচার করেছিলেন তা ধর্মবিরোধী , ভুল ও মিথ্যা । বাইবেলে যা বলা হয়েছে সেটিই আসলে সঠিক - পৃথিবী স্থির - অনড় - সৌর জগতের কেন্দ্রে । গ্যালিলিও প্রাণ বাঁচাতে তাই করলেন । শোনা যায় এর মধ্যেও একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ গণিতজ্ঞ - জ্যোতির্বিদ স্বগতোক্তি করেছিলেন - তার পরেও কিন্তু পৃথিবী ঠিকই ঘুরছে । ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ নিয়েই গ্যালিলিওর মৃত্যু হয় , ১৬৪২ সালে নিজ গৃহে অন্তরীন অবস্থায় । তারপরেও কি সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘোরা ঠেকানো গেল ? গ্যালেলিওর করুণ কাহিনী সেকালের খ্রিষ্টধর্মের করুণা ও ক্ষমার আদর্শের চেয়ে বরং মধ্যযুগের পৈশাচিক রূপটাই বেশি ফুটিয়ে তুলেছিল । দুঃখের বিষয় যে কোন কোন ধর্মের সেই পৈশাচিক রুপ আজকের অত্যাধুনিক যান্ত্রিক যুগেও নির্মূল হয়ে যায় নি ।
তথ্যসুত্রঃ Gespräch mit dem Sternenboten" - Universität Münster
০১ লা জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৫
জ্যোতির্ময় ধর বলেছেন: আপনাকে ধন্যবাদ । আইনস্টাইন একমাত্র বিজ্ঞানী এবং রবীন্দ্রনাথ একমাত্র কবি যারা দুজনেই কখনো ধর্মীয় গুরুদের শিকারে পরিনত হন নি ।
©somewhere in net ltd.
১|
০১ লা জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২০
রাজীব নুর বলেছেন: মনে পড়ে গেলো রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টানের কথোপকথন।