| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
লেখকের নোট:
এই গল্পটি ১৯৭৪ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঐতিহাসিক হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে পটভূমি হিসেবে নিয়ে নির্মিত সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম থ্রিলার। ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট তদন্ত এবং সব অপরাধমূলক ঘটনা কাল্পনিক।
সিউল, ১৫ আগস্ট ১৯৭৪
১৫ আগস্টের সিউলের আকাশ সেদিন অস্বাভাবিক পরিষ্কার ছিল। শরতের হালকা ঠান্ডা বাতাস আর রোদের আলোয় ঝলমল করছিল পুরো শহর।
জাতীয় মুক্তি দিবসের বার্ষিকী উপলক্ষে কোরিয়া ন্যাশনাল থিয়েটারের চারপাশে তখন উৎসুক মানুষের ঢল। সারি সারি টাঙানো দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়ছিল। মূল ফটক থেকে শুরু করে মিলনায়তনের ভেতর পর্যন্ত সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীর পোশাক পরা জোয়ানদের কড়া নিরাপত্তা বলয়। প্রেস বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে রাখা ক্যামেরাগুলোর ফ্ল্যাশগান অনবরত জ্বলছে আর নিভছে।
মঞ্চের মাঝখানে রাখা পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি পার্ক চুং-হি। মাইকে তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসছিল গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষণ।
সবকিছুই চলছিল একেবারে পূর্বনির্ধারিত ছক মেনে। সময়, সিকিউরিটি প্রোটোকল, ভিড়ের গুঞ্জন—সব।
শুধু একটি জিনিস ছিল হিসাবের বাইরে।
গুলির বিকট শব্দ।
প্রথম শব্দটি বাতাসে ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মিলনায়তনজুড়ে থমথমে এক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে রাজকীয় অনুষ্ঠানটি এক নরককুণ্ডে রূপ নিল।
দ্বিতীয় শব্দের পর ভিড়ের মানুষ আতঙ্কে মাটিতে বসে পড়ল, চিৎকার আর হুড়োহুড়িতে চশমা ও জুতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল মেঝেতে।
তৃতীয় গুলির শব্দ হওয়ার সাথে সাথেই সিকিউরিটি টিমের সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মঞ্চের দিকে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে থেমে গেল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতিকে দ্রুত ঘেরাও করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও, ধোঁয়া আর চিৎকারের আড়ালে মঞ্চের কার্পেটে ঢলে পড়লেন ফার্স্ট লেডি ইউক ইয়ং-সু।
ঘটনাস্থল থেকেই রক্তে ভেজা হাতে আটক করা হলো এক তরুণ বন্দুকধারীকে—মু মুন-সে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সরকারি রেডিও এবং টিভিতে অতি জরুরি ঘোষণা প্রচার করা হলো—
“এটি নিশ্চিতভাবে একজন একক আততায়ীর বিচ্ছিন্ন কাজ। রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত নস্যাৎ করা হয়েছে।”
শোকে মূহ্যমান পুরো দেশ একপ্রকার আশ্বস্ত হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু পুরো সিউল শহরের মধ্যে কেবল একজন মানুষ বিন্দুমাত্র স্বস্তি পেলেন না।
তিনি সিউলের সেন্ট্রাল মেডিকেল হাসপাতালের মূল ভবনের নিচে অবস্থিত ফরেনসিক পরীক্ষাগারে একা দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞ কাং মিন-জুন।
কাং-এর হাতে তখন সদ্য তৈরি হওয়া ব্যালিস্টিক ও ময়না-তদন্তের প্রাথমিক ড্রাফট। সাদা কাগজের নিচে অফিশিয়াল লাল কালির সিল আর বোল্ড অক্ষরে লেখা—ONE SHOOTER.
কাং দীর্ঘক্ষণ বিষণ্ন চোখে কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার কপালে ভাঁজ স্পষ্ট। তারপর ল্যাবের মৃদু গুঞ্জনের মাঝে খুব নিচু স্বরে নিজের মনেই বলল, “না... এটা সম্ভব নয়।”
পাশে থাকা সহকর্মী চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে থমকে তাকাল। “কী বললে কাং?”
কাং দ্রুত কাগজটা ভাঁজ করে কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। “কিছু একটা ভুল আছে। কেমিক্যাল রেসিডিউ আর বুলেটের ট্র্যাজেক্টরি মেলানো যাচ্ছে না।”
সহকর্মী হেসে উঠে বলল, “আরে রাখো তো! সিআইডি এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ ইতিমধ্যে ফাইল ক্লোজ করে দিয়েছে। অফিশিয়াল রিপ্রোডাকশনের ওপর কথা বলার সাহস তোমার আমার নেই।”
কাং কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক সেই একই মুহূর্তে সিউল শহরের উত্তর প্রান্তের এক নির্জন, ঐতিহ্যবাহী হোটেলের ঘরে নিস্তব্ধতায় বসে ছিলেন এক মধ্যবয়স্ক মানুষ।
পাসপোর্ট আর আন্তর্জাতিক নথিপত্র অনুযায়ী তিনি—Professor Rehan Ashraf।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের একজন প্রবীণ ও অত্যন্ত সম্মানিত অধ্যাপক।
সিউলে চলমান আন্তর্জাতিক কেমিক্যাল সায়েন্স কনফারেন্সের সরকারি অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন তিনি। পাসপোর্টে তাঁর নাম, ভিজিটিং ভিসা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র, এমনকি কনফারেন্সে উপস্থাপন করা জটিল গবেষণাপত্র—সবকিছুই একদম নির্ভেজাল ও নিখুঁত।
রেহান হোটেলের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হাতে কাচের গ্লাসে ঠাণ্ডা পানি নিয়ে শান্ত মনে টেলিভিশন দেখছিলেন।
পর্দায় ভেসে উঠছে রাষ্ট্রপতির ওপর হামলার ব্রেকিং নিউজ, ফার্স্ট লেডির করুণ বিদায়, আর ধৃত বন্দুকধারীর রক্তমাখা মুখের ছবি।
রেহান রিমোট তুলে টেলিভিশনের শব্দ একবারে নিঃশব্দ (Mute) করে দিলেন। তারপর শান্ত পায়ে এসে বসলেন কাঠের তৈরি মেহগনি টেবিলটির সামনে।
টেবিলে খোলা রাখা ছিল তাঁর পুরোনো চামড়ায় বাঁধানো নোটবুকটি।
পাতার একেবারে ওপরে কালো ফাউন্টেন পেনের টানে লেখা—ASSIGNMENT 02।
আর ঠিক তার নিচে তিনটি বুলেট পয়েন্ট:
Political.
Forensic.
Memory.
রেহান পেনটির মুখ সাবধানে আটকে টেবিলে রাখলেন। দরজার কোণে রাখা চশমাটা খুলে কাপড়ে পরিষ্কার করলেন। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে নীরবে কথা বললেন, “মানুষ সবসময় বড় কোনো দৃশ্যমান ঘটনা মনে রাখে।”
তিনি এক মুহূর্ত থামলেন। তাঁর চোখে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত শীতলতা।
“কিন্তু সাধারণ মানুষ কখনোই প্রমাণের সূক্ষ্ম অনুপস্থিতি খেয়াল করে না। আর সেখানেই আসল বিজ্ঞানের খেলা।”
ঘটনার তিন দিন পর।
সিউলের এক ঐতিহ্যবাহী কিন্তু পুরোনো সংবাদপত্র 'সিউল ডেইলির' অফিশিয়াল ভবন। রাত তখন প্রায় এগারোটা। পুরো ভবনের আলো নিভে এলেও নিউজ রুমের এক কোণে একটা ছোট টেবিল ল্যাম্প জ্বলছিল।
সেখানে একা বসে একের পর এক পুরোনো ফাইল ঘেঁটে যাচ্ছিলেন সমাজবিষয়ক ও রাজনৈতিক বিভাগের প্রধান হান জে-উ।
পঁচাত্তর বছর বয়সে পা দিতে যাওয়া হান জে-উ-এর সাংবাদিকতার বয়স প্রায় তিন দশক। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরকারের অগণিত সেন্সরশিপের মুখে দাঁড়িয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে।
তিনি খুব ভালো করেই জানতেন—
কোন খবর পত্রিকা বিক্রি বাড়ায়;
কোন খবর প্রকাশ করলে গভীর রাতে সরকারের লোক এসে প্রেস বন্ধ করে দেয়;
আর কোন 'সত্য' প্রকাশ করার আগে অন্তত দশবার নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়।
হঠাৎ নিউজ রুমের কাঠের দরজায় হালকা টোকা পড়ল।
তরুণ শিক্ষানবিস সাংবাদিক কিম দো-হিউন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখেমুখে চরম ক্লান্তি আর ভয় মেশানো এক কৌতূহল।
হান চোখ তুলে চশমার উপর দিয়ে তাকালেন। “কী ব্যাপার কিম? এত রাতে তুমি এখনো বাড়ি যাওনি?”
“স্যার... এই ফাইলটা একটু দেখুন।” কিম থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতে একটা বাদামী রঙের কভার ফাইল হানের টেবিলের ওপর রাখল।
“কী এটা? ব্যালিস্টিক রিপোর্টের অনুলিপি? আমি তো জানি সরকারি তদন্ত দল ইতিমধ্যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দিয়েছে।”
“এটা অফিশিয়াল রিপোর্ট নয়, স্যার।” কিম নিচু গলায় বলল। “হাসপাতালের এক তরুণ ফরেনসিক কর্মীর কাছ থেকে এই খসড়াটা আমার হাতে এসেছে।”
হান জে-উ চশমাটা ঠিক করে ফাইলটি খুললেন। ভেতরে বেশ কিছু হাতে লেখা বৈজ্ঞানিক নোট, বুলেটের ইমপ্যাক্ট কোণ আর দূরত্বের স্কেচ। কোনো সরকারি সিল নেই।
তবে মাঝখানের পাতায় লাল কালিতে আন্ডারলাইন করে একটি ইংরেজি বাক্য লেখা—
"Recovered evidence does not fully correspond with the official reconstruction."
(উদ্ধার করা আলামত ও বুলেটের টুকরো সরকারি অফিশিয়াল ব্যাখ্যার সাথে পুরোপুরি মেলে না।)
হান জে-উ প্রায় এক মিনিট এক দৃষ্টিতে সেই লেখাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। পুরো ঘর নিস্তব্ধ।
তারপর তিনি ফাইলটি সাবধানে বন্ধ করে বললেন, “কিম, তুমি কি জানো এই কাগজটার অর্থ কী? এর মানে হলো পুরো সরকারি ভাষ্যটি হয় ভুল, না হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বানানো!”
“আমি জানি স্যার।”
“কাগজটি তোমাকে কে দিয়েছে?”
কিম মাথা নাড়ল। “আমি সেই লোকটির নাম জানি না স্যার। তবে সে আমাকে নিশ্চিত করেছে—এই তথ্যের উত্তর কেবল একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকই বুঝতে পারবেন।”
হান জে-উ চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর অভিজ্ঞ চোখে এক রহস্যের অন্ধকার ঘনিয়ে এল। “কেউ একজন চেয়েছিল এই ফাইলটা যেন আমাদের হাতে আসে... কিন্তু সে কে?”
পরদিন সকালে সিউলের এক নির্জন কফিশপের পেছনের কক্ষে হান জে-উ দেখা করলেন গোয়েন্দা বিভাগের ডাকসাইটে অফিসার Detective Seo Jin-tae-এর সাথে।
ডিটেকটিভ সেও ছিলেন একজন অত্যন্ত বাস্তববাদী লোক। রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না; তাঁর সমস্ত আস্থা ও বিশ্বাস ছিল কেবল অকাট্য প্রমাণের ওপর।
হান জে-উ কোনো ভূমিকা না করে বাদামী ফাইলটি সেও-এর সামনে বাড়িয়ে দিলেন। “এটা একটু পড়ে দেখুন, ডিটেকটিভ।”
সেও ধীরস্থিরভাবে ফাইলটি খুললেন। তিন পাতা পড়ার পর তাঁর মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চোখ দুটো সরু হয়ে এল।
“এই কনফিডেনশিয়াল ডকুমেন্ট আপনি কোথায় পেলেন, হান?” সেও কঠোর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
“একজন সাংবাদিক কখনো তার সোর্স প্রকাশ করে না, ডিটেকটিভ সেও। আপনি শুধু বলুন—এই ফরেনসিক অ্যানালিসিস কি ভুল হতে পারে?”
সেও গভীর এক নিঃশ্বাস ফেললেন। “তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে গেছে। সরকার এই ঘটনায় আর কোনো নতুন মোড় চায় না। আপনি কি বুঝতে পারছেন এটা পত্রিকায় ছাপা হলে কী চরম অরাজকতা তৈরি হবে?”
হান জে-উ তিক্ত হাসি হাসলেন। “তিরিশ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি, সেও। সত্য চেপে রাখলে অরাজকতা কমে না, বরং তা তলে তলে বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। আপনি কি রাষ্ট্রীয় মিথ্যাকে মেনে নেবেন, নাকি প্রমাণের সত্যতা পরীক্ষা করবেন?”
ডিটেকটিভ সেও কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি চুপচাপ ফাইলটি নিজের চামড়ার ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে রাখলেন।
সেদিন বিকেলে সিউলের ডাউনটাউনের এক সাধারণ কফিশপে বসে শান্ত মনে কফি খাচ্ছিলেন প্রফেসর রেহান আশরাফ।
তাঁর সামনে খোলা ছিল স্থানীয় একটি ইংরেজি দৈনিক। পত্রিকার প্রধান পাতার শেষ লাইনে ছোট করে লেখা—Government Declares Official Investigation Closed.
রেহান সংবাদপত্রটি যত্ন করে ভাঁজ করে পাশে রাখলেন। পকেট থেকে তাঁর সেই পরিচিত ছোট নোটবুকটি বের করলেন।
কলমের সূক্ষ্ম টানে তিনি নতুন কয়েকটি লাইন লিখলেন:
Phase One: Public certainty. (জনগণের প্রাথমিক আশ্বস্ততা—সম্পন্ন)
Phase Two: Doubt. (মনে সন্দেহের বীজ রোপণ—চলমান)
Phase Three: Conflict. (দ্বন্দ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা—আসন্ন)
Phase Four: Forgetting. (বিস্মৃতি)
রেহান ফাউন্টেন পেনটি বন্ধ করে টেবিলে এক মুহূর্ত টোকা দিলেন।
রেহানের ষড়যন্ত্র কোনো সাধারণ খুনের মিশন ছিল না। তিনি জানতেন, একটা বুলেট স্রেফ একটা মানুষকে মারতে পারে। কিন্তু যদি একটা বুলেটের অস্তিত্ব ও ট্র্যাজেক্টরি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা যায়, তবে তা পুরো একটা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর সত্যতাকে চুরমার করে দিতে পারে।
তাঁর লক্ষ্য স্রেফ হত্যাকাণ্ড ছিল না; তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি সত্যকে শতভাগে বিভক্ত করে দেওয়া, যেন ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদরা কোনোদিন একমত হতে না পারেন—ঠিক কী ঘটেছিল সেই ১৫ আগস্টে!
রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যেমন প্রতিটি ধাপে নতুন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, রাজনৈতিক অপরাধেও ঠিক তেমনই সন্দেহ তৈরি করতে হয়।
তবে রেহান আশরাফের নিখুঁত গাণিতিক সমীকরণেও একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক Variable (পরিবর্তনশীল উপাদান) বাদ পড়ে গিয়েছিল।
সেই উপাদানটির নাম—Detective Seo Jin-tae।
ডিটেকটিভ সেও কোনো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া অফিসার ছিলেন না। তিনি কাজ করতেন অত্যন্ত ধীর গতিতে, কিন্তু প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন প্রায় নির্ভুল।
ফাইলটি পাওয়ার পর থেকে সেও শান্তিতে ঘুমাতে পারছিলেন না। তিনি রাতে গোপনে থিয়েটার চত্বরের মূল ক্রাইম সিনের আর্কাইভাল ছবি, ব্যবহৃত বুলেটের টুকরোর ওজন রিপোর্ট এবং সাউন্ড ওয়েভের রেকর্ড নিয়ে একা বসলেন।
টেবিলে প্রমাণের বিভিন্ন ছবি সাজাতে গিয়ে হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে গেল একটি বিশেষ ফটোতে।
মঞ্চের একেবারে বাঁ-পাশের এক প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দির নিচে লেখা বুলেটের স্প্লিন্টার টাইপ। সেটির সংকেত সরকারি খাতায় জমা হওয়া বুলেটের সাথে মিলছে না!
সেও চেয়ারে হেলান দিয়ে নিজের কপালে হাত দিলেন। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বললেন, “যদি ফরেনসিকের নোটটা সত্যি হয়... তার মানে থিয়েটারের ভেতরে কেবল একজন বন্দুকধারী ছিল না। অন্য কেউ এমন এক কোণ থেকে গুলি চালিয়েছিল, যা স্রেফ বিভ্রান্তি তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর তরুণ সহকারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, আপনি কী বলছেন? তাহলে মূল সরকারি তদন্ত?”
সেও সোজা হয়ে বসলেন। “তার মানে আমরা এতদিন ধরে সম্পূর্ণ ভুল এবং সাজানো প্রশ্ন তাড়া করছিলাম।”
একই রাতে তরুণ সাংবাদিক কিম দো-হিউন প্রেস ক্লাবের পুরোনো নেগেটিভ ফাইলের স্তূপ ঘাঁটছিল।
ঘটনার দিন জাতীয় মুক্তি দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েক ডজন ফটোসাংবাদিকের তুলে রাখা কিন্তু অপ্রকাশিত শত শত ছবি সে প্রোজেক্টরে একটার পর একটা ফেলে দেখছিল।
মঞ্চ... আতঙ্কিত দর্শক... দৌড়ে আসা সিকিউরিটি গার্ড... রক্তাক্ত কার্পেট...
হঠাৎ একটি ছবির একেবারে কোণায় কিমের নজর আটকে গেল।
হামলা চলাকালীন মুহূর্তে থিয়েটারের ব্যাকস্টেজ থেকে বের হওয়ার ইমার্জেন্সি এক্সিট ডোরের কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে যখন মানুষ আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করছে, সেই লোকটির ভঙ্গিতে কোনো আতঙ্ক নেই।
লোকটি পরনে ছাইরঙা ব্লেজার, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, আর হাতে একটি ছোট চামড়ার কেস। তিনি খুব শান্তভাবে ভিড়ের বিপরীত দিকে হেঁটে বের হয়ে যাচ্ছেন।
কিম ছবিটিকে সর্বোচ্চ এনলার্জ (Enlarge) করল। চেহারা ঝাপসা, কিন্তু তাঁর উদাসীন ও বরফশীতল ভঙ্গিটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
কিম দৌড়ে গিয়ে হান জে-উ-কে ঘুম থেকে তুলে ছবিটি দেখাল।
হান জে-উ বেশ কিছুক্ষণ চশমা কাচে ঠেকিয়ে ছবিটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর হলো।
“আপনি কি এই লোকটিকে চেনেন স্যার?” কিম জিজ্ঞেস করল।
“আমি একে কোথাও দেখেছি...” হান অস্পষ্ট স্বরে বললেন। “থিয়েটারের কোনো অফিশিয়াল গেস্ট লিস্টে বা ভিআইপি লাউঞ্জে... কিন্তু ইনি কে?”
পরদিন ভোর চারটে।
হান জে-উ সিউল বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল আর্কাইভ থেকে ১৫ আগস্ট আয়োজিত আন্তর্জাতিক কেমিক্যাল সায়েন্স কনফারেন্সের আমন্ত্রিত বিদেশি প্রতিনিধিদের পুরো তালিকা বের করলেন।
কয়েক হাজার নামের তালিকা। দেশি-বিদেশি নাম, ডিগ্রি, হোটেলের নাম।
হান পেন্সিল দিয়ে নামগুলো পার করছিলেন। হঠাৎ এক জায়গায় এসে তাঁর হাত থেমে গেল।
Professor Rehan Ashraf
Department of Chemistry, University of Dhaka.
Hotel Grand Seoul, Room 408.
কিম পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে তালিকা দেখে বোকার মতো বলল, “স্যার, ইনি তো বাংলাদেশের একজন সায়েন্টিস্ট। কেমিস্ট্রির প্রফেসর। তিনি পলিটিক্যাল অ্যাটাকের সাথে কীভাবে যুক্ত থাকবেন?”
হান জে-উ আস্তে করে কাগজটি টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর গলার স্বর গম্ভীর হয়ে এল—
“কিম, রাজনীতি আর কেমিস্ট্রির মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই। সাধারণ অপরাধীরা অস্ত্র ব্যবহার করে রক্তপাত ঘটায়, আর আন্তর্জাতিক মাস্টারমাইন্ডরা নিখুঁত সমীকরণ তৈরি করে ব্যাকগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে পুরো সিস্টেমটাকে ভেঙে দেয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষগুলো কখনোই নিজের হাতে বন্দুক তোলে না।”
সেদিন রাত আটটা।
প্রফেসর রেহান আশরাফ নিজের হোটেল রুমে ফিরে দরজা লক করলেন। চাবির রিংটি টেবিলে রেখে জানালার পর্দাটা সরিয়ে বাইরের সিউল শহরের নাইট-ভিউ দেখলেন।
সবকিছু নিখুঁত গতিতে এগোচ্ছে। আগামীকাল সকালেই তাঁর ব্যাংকক হয়ে ঢাকার ফ্লাইট।
তিনি টেবিলে রাখা নিজের ব্রিফকেসটা খুলতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেলেন।
টেবিলের ওপর তাঁর নিজস্ব ডায়েরির ঠিক পাশে একটি ছোট সাদা খাম রাখা। হোটেল স্টাফদের এই ঘরে ঢোকার কথা নয়।
রেহান অত্যন্ত সাবধানে রুমাল দিয়ে খামটি খুললেন। ভেতরে থিয়েটার চত্বরের সেই এনলার্জ করা ছবিটির একটি প্রিন্ট। আর ছবির নিচে টাইপরাইটারে লেখা একটিমাত্র ছোট বাক্য—
"Someone noticed your presence, Professor."
রেহান আশরাফ কয়েক সেকেন্ড একদম নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঘরের ভেতর কেবল ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
তাঁর গাণিতিক মস্তিষ্কে যেন এক সেকেন্ডের জন্য একটা ঝিঁঝিঁ পোকার মতো শব্দ হলো।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর, তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল খুব ধীর, অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং রহস্যময় এক চিলতে হাসি।
তিনি চেয়ারটি টেনে বসলেন। ছবির খামটি টেবিলের একপাশে রেখে মৃদু স্বরে বললেন, “চমৎকার। অবশেষে তাহলে এই শহরে একজন কেউ আছে, যার চিন্তা করার ক্ষমতা সাধারণ ভেড়ার পালের মতো নয়।”
পরদিন সকালে রেহান যখন লাগেজ গুছিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর হোটেল রুমের দরজায় দুটি কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
রেহান আয়নায় নিজের শার্টের কলারটা সোজা করলেন। মুখে তাঁর সেই চিরচেনা সৌজন্যমূলক প্রফেসরি হাসি ফিরিয়ে এনে দরজা খুলে দিলেন।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ওভারকোট পরা এক দীর্ঘদেহী লোক। Detective Seo Jin-tae।
“Yes? কাকে চান?” রেহান সাবলীল ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন।
সেও নিজের পকেট থেকে মেটালের ব্যাজ এবং গোয়েন্দা পরিচয়পত্র বের করে দেখালেন। “প্রফেসর রেহান আশরাফ? আমি সিউল মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিটেকটিভ সেও। আপনার সাথে সামান্য কিছু বিষয়ে কথা ছিল।”
“অবশ্যই, ভেতরে আসুন।” রেহান অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে দরজার রাস্তা ছেড়ে দিলেন।
সেও ঘরের ভেতরে ঢুকে চট করে চারপাশটা দেখে নিলেন। গোছানো লাগেজ, পরিষ্কার ডেস্কে রাখা বিজ্ঞানের বই। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো বা উদ্বেগের চিহ্ন নেই।
দুজনে মুখোমুখি দুটি সোফায় বসলেন। রেহান নিচু হয়ে কফির ফ্লাস্ক থেকে টি-কাপে গরম পানি ঢালতে ঢালতে বললেন, “বলুন ডিটেকটিভ, একজন সাধারণ বিদেশি রসায়নবিদকে আপনার কী প্রয়োজন পড়ল?”
সেও সোজা রেহানের চোখের দিকে তাকালেন। “১৫ আগস্ট সকাল ১১টায় আপনি কোথায় ছিলেন, প্রফেসর?”
রেহান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উত্তর দিলেন, “আমি ন্যাশনাল থিয়েটারে ছিলাম। আমার কাছে আন্তর্জাতিক অতিথিদের স্পেশাল পাস ছিল।”
“রাষ্ট্রপতির ওপর হামলার ঠিক পরপরই আপনি সেখান থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু সিকিউরিটি প্রোটোকল অনুযায়ী সবাইকে নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল। আপনি কীভাবে বের হলেন?”
রেহান চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। “ডিটেকটিভ, যখন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তখন সিকিউরিটি গার্ডরা কেবল ভিড় সামলাতে ব্যস্ত থাকে। আমি একজন বিদেশি নাগরিক, হট্টগোল আমার পছন্দ নয়। তাই ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে শান্তভাবে বের হয়ে নিজের হোটেলে ফিরে এসেছি। এটা কি কোনো অপরাধ?”
সেও এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। “না, অপরাধ নয়। তবে ইন্টারেস্টিং। আপনার মূল গবেষণার বিষয় কী?”
“Chemical reaction under controlled conditions.” রেহান শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন। “নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় কীভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের প্রতিক্রিয়া ঘটানো যায়।”
সেও মৃদু হাসলেন। “খুব ইন্টারেস্টিং বিষয়। কিন্তু গত কয়েক দিনে সিউলে আপনার চলাফেরা আর এই শহরের বাতাসে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে সায়েন্সের চেয়ে রাজনীতির ঘ্রাণ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।”
রেহান কাপটি ট্রেতে রাখলেন। “আমি অপরাধ বিজ্ঞান বা রাজনীতি বুঝি না, ডিটেকটিভ। তবে আমি ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করতে পছন্দ করি।”
“ইতিহাস?”
“হ্যাঁ। বিশেষ করে মানুষ কীভাবে কোনো ইতিহাস মনে রাখে, আর কীভাবে ইতিহাস ভুলে যায়—এই মানসিক প্রক্রিয়া আমাকে মুগ্ধ করে।”
সেও এবার সোফায় একটু ঝুঁকে এলেন। রেহানের খুব কাছাকাছি গিয়ে একদম নিচু ও বরফশীতল কণ্ঠে বললেন, “আপনি কি মনে করেন, ফরেনসিক প্রমাণ গায়েব করে দিলে মানুষ চিরকালের জন্য মিথ্যাকে ইতিহাস বলে মেনে নেবে?”
রেহানের চোখের মণি এক চুলও নড়ল না। তিনি একইভাবে মুচকি হেসে বললেন, “প্রমাণ তো আপেক্ষিক বস্তু, ডিটেকটিভ সেও। আপনি যা প্রমাণ বলে বিশ্বাস করছেন, তা হয়তো অন্য কারো সাজানো একটা দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র।”
কক্ষের মধ্যকার বাতাস যেন জমে পাথর হয়ে গেল। দুটি মহাশক্তিশালী মস্তিষ্কের নিঃশব্দ যুদ্ধ চলছিল সেই কয়েক স্কোয়ার ফিটের ঘরে।
অবশেষে ডিটেকটিভ সেও ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“আপনি আজ বিকেলে ঢাকা ফিরে যাচ্ছেন, তাই তো?”
“হ্যাঁ, আমার কনফারেন্স শেষ।”
সেও দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। হাতল ধরে থেমে পেছনে তাকালেন। “প্রফেসর, আপনার কেমিস্ট্রি ক্লাসে কি Equilibrium বা 'সাম্যাবস্থা' পড়ানো হয়?”
রেহান একইভাবে বসে থেকে বললেন, “অবশ্যই। এটা কেমিস্ট্রির মূল ভিত্তি।”
সেও সোজাসুজি রেহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন—কোনো কেমিক্যাল সিস্টেমকে যদি বাইরে থেকে অতিরিক্ত ফোর্স দিয়ে কৃত্রিমভাবে কন্ট্রোল করতে যান, তবে সিস্টেম একদিন না একদিন নিজের শক্তিতেই বিস্ফোরিত হয়। মিথ্যার সমীকরণও তাই।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সেও চলে গেলেন।
রেহান আশরাফ দীর্ঘক্ষণ বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি গভীর থেকে আরও গভীরতর হলো।
তিনি ধীরে ধীরে টেবিল থেকে নোটবুকটি বের করলেন। প্রথমবারের মতো তাঁর হাতঘড়ির টিকটিক শব্দের সাথে সাথে ফাউন্টেন পেনটি ধীরগতিতে চলল।
তিনি খাতায় লিখলেন—Variable detected: Detective Seo Jin-tae.
প্রফেসর রেহানের চলে যাওয়ার দুই দিন পর, সিউল ডেইলিতে হান জে-উ-এর একটি দুর্ধর্ষ বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো।
হান কোনো সস্তা চক্রান্তের গল্প লেখেননি। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে কেবল তিনটি সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন:
১. ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সমস্ত ফরেনসিক ও ব্যালিস্টিক প্রমাণের সঙ্গে সরকারি 'একক বন্দুকধারী'র দাবির ফারাক কেন?
২. হাসপাতালের ফরেনসিক টিমের প্রাথমিক নোট এবং হারানো বুলেটের ব্যাখ্যার কোনো স্পষ্টিকরণ সরকারের কাছে আছে কি?
৩. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে কি আসল সত্যকে আড়াল করা হচ্ছে?
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়া মাত্রই পুরো দক্ষিণ কোরিয়ায় দাবানলের মতো খবরটি ছড়িয়ে পড়ল।
সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সিউল ডেইলির সেই সংস্করণটি বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা করল এবং প্রতিবেদনটিকে “রাষ্ট্রবিরোধী অনুমাননির্ভর গুজব” বলে আখ্যা দিল।
কিন্তু যা ঘটার তা আগেই ঘটে গেছে।
সংবাদপত্র থেকে তথ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ রাজপথে এসে প্রশ্ন তুলতে শুরু করল। পুরো দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম অচলাবস্থা তৈরি হলো।
কেউ বলল সরকারি তদন্তই সঠিক, কেউ বলল সামরিক বাহিনীর ভেতরে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল, আবার কেউ বলল এটি বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কাজ।
রেহান আশরাফের সাজানো সমীকরণ নিখুঁতভাবে কাজ করছিল—সত্য এখন হাজারটা টুকরোয় বিভক্ত!
গিম্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ।
রেহান আশরাফ নিজের ট্রাভেল ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। পাসপোর্টে সিল পড়ল, সিকিউরিটি স্ক্যানার নির্বিঘ্নে পার হলো।
কারো কাছে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই। আন্তর্জাতিক কোনো গোয়েন্দা সংস্থাও ঘুণাক্ষরে টের পায়নি যে—একটি দেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া মূল লোকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের প্রথম শ্রেণীর সিটে গিয়ে বসছেন!
বিমানের জানালার পাশে বসে রেহান শেষবারের মতো নিচে সিউল শহরের দিকে তাকালেন। মেঘের স্তরে ঢেকে যাচ্ছে রানওয়ে।
তাঁর ব্যাগে কোনো অস্ত্র ছিল না, কোনো গোপন ডকিয়ুমেন্ট ছিল না।
রেহান পকেট থেকে তাঁর নোটবুকটি বের করে অ্যাসাইনমেন্টের শেষ পাতায় লিখলেন:
Assignment 02: Objective Completed.
(উদ্দেশ্য সফল: সত্য চিরকালের জন্য বিভক্ত।)
তবে তার ঠিক নিচে এক সেকেন্ড থেমে একটি নতুন লাইন যোগ করলেন:
"But the Investigation survived. Interesting."
তিনি মৃদু হেসে নোটবুকটা বন্ধ করে জ্যাকেটের ভেতর রেখে দিলেন। বিমানের ইঞ্জিন গর্জে উঠল।
দুই দিন পর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের ঐতিহাসিক লাল ইটের ভবনের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন প্রফেসর রেহান আশরাফ।
হাতে কেমিস্ট্রির মোটা জার্নাল। সহকর্মীরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে অভিবাদন জানাচ্ছে।
“আরে প্রফেসর আশরাফ! সিউলের কনফারেন্স কেমন হলো?” ডিপার্টমেন্টের প্রধান এগিয়ে এসে হাত মেলালেন।
রেহান মৃদু ও অমায়িক হেসে বললেন, “অত্যন্ত চমৎকার অভিজ্ঞতা। কোরিয়ার বিজ্ঞান চর্চা সত্যি প্রশংসনীয়।”
“নতুন কোনো রিসার্চ স্কোপ পেলেন?”
রেহান এক মুহূর্ত থামলেন। তাঁর চোখের ফ্রেমে রোদের আলো ঠিকরে পড়ল। “হ্যাঁ... মানুষের আচরণ এবং তাদের মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশ কিছু নতুন উপাত্ত পেলাম।”
সহকর্মী হেসে উঠে বললেন, “আপনি আবার কেমিস্ট্রি ছেড়ে সাইকোলজি নিয়ে পড়া শুরু করলেন নাকি!”
রেহান কোনো উত্তর না দিয়ে মৃদু হেসে নিজের রুমে ঢুকলেন।
ঘরের ভারী কাঠের দরজা বন্ধ করে চাবি ঘুরিয়ে দিলেন। ডেস্কে গিয়ে বসলেন। ড্রয়ারের গোপন লক খুলে ভেতর থেকে একটি ছোট পাতলা ফাইল বের করলেন।
ফাইলের মলাটে নতুন একটা নাম লেখা—SEO JIN-TAE।
ভেতরে সেও-এর একটি ছোট পাসপোর্ট সাইজ ছবি, যা সিউলের হোটেল থেকে আসার আগে রেহানের নেটওয়ার্ক সংগ্রহ করেছিল।
রেহান লাল কালির কলম দিয়ে ছবির নিচে নিজের হাতে লিখলেন:
"He saw the reaction.
He did not see the catalyst."
(সে প্রতিক্রিয়াটি দেখতে পেয়েছে। কিন্তু অনুঘটকটিকে দেখতে পায়নি।)
কয়েক দিন পর। গভীর রাত।
পুরান ঢাকার সেই জরাজীর্ণ বাড়ির নিচে গোপন ল্যাবরেটরির আবছা আলোয় বসে আছেন প্রফেসর রেহান আশরাফ।
টেবিলে প্রাবল্যের সাথে জ্বলছে মনিটরের সবুজ ডিজিটাল ফন্ট। স্ক্রিনে একটি নতুন ডিরেক্টরি ওপেন হয়েছে।
কোনো পরিচয় নেই, কেবল এনক্রিপ্টেড কোড লেখা—CASE FILE 03।
রেহান চেয়ারে হেলান দিয়ে কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রইলেন। ল্যাবের এক কোণে কাচের গ্লাসে টেস্টটিউবের কেমিক্যাল সলিউশন মৃদু নীল আলো ছড়াচ্ছিল।
তিনি স্বগতভাষণের মতো করে বললেন, “একটি সাকসেসফুল এক্সপেরিমেন্ট মানেই সম্পূর্ণ জয় নয়। কখনো কখনো আসল শিক্ষা পাওয়া যায়...”
তিনি চোখ খুললেন। মনিটরের সবুজ আলোর দিকে তাকিয়ে বাক্যটি শেষ করলেন—
“...যে উপাদানটি আপনার ধারণার বাইরে গিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেখান থেকে।”
হঠাৎ কম্পিউটারের এনক্রিপ্টেড স্ক্রিনে সিউলের একটি বিশেষ ডাটা ফাইল আপডেট হলো—
SEO JIN-TAE — RE-OPENING THE DRAFT.
রেহান আশরাফের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পরিচিত বরফশীতল ও ধূর্ত হাসি।
“খেলোয়াড় যদি দক্ষ হয়, তবে খেলা খেলে আনন্দ পাওয়া যায়। খেলা এখনো শেষ হয়নি, ডিটেকটিভ।”
তিনি ল্যাবের গোপন মেইন সুইচ বন্ধ করে দিলেন। অন্ধকার নেমে এল ঘরে।
পৃথিবীর এক প্রান্তে—সিউলের এক নির্জন ডেস্কে বসে ডিটেকটিভ সেও জিন-তে একটা পুরোনো বুলেটের রহস্যের উত্তর খুঁজছিলেন; আর অন্য প্রান্তে—ঢাকার ল্যাবে বসে একজন কেমিস্ট্রি প্রফেসর তাঁর পরবর্তী বিশ্বকাঁপানো বিষাক্ত সমীকরণ ছকে যাচ্ছিলেন।
দুই মেরুর দুই মানুষের এই অদৃশ্য যুদ্ধ কেবল শুরু হলো!
(চলবে...)
২|
০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪০
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: পড়লাম।
©somewhere in net ltd.
১|
০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৮
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: সে প্রতিক্রিয়াটি দেখতে পেয়েছে। কিন্তু অনুঘটকটিকে দেখতে পায়নি।
..................................................................................................
সঠিক সময়ে ধরতে না পারলে তার মূল্য থাকেনা ।
চমৎকার বুদ্ধির খেলায় জম জমাট গল্প ভালই লাগল ।