নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

গাজীপুর থেকে কক্সবাজার: চার বাইকে ছয় সহকর্মীর ১৪ ঘণ্টার নাইট রাইড অ্যাডভেঞ্চার

২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০২


আমি শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, থাকি সাভার এলাকায়। ভ্রমণের নেশা আর মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা আমার দীর্ঘদিনের। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব গাজীপুর থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের দিকে আমাদের অবিস্মরণীয় এক বাইক ট্যুরের প্রথম পর্বের গল্প।

এবারের দুর্গা পূজার ছুটিটা ছিল একেবারে মনের মতো! ২১ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার ছিল পূজার ছুটি। আর শুক্রবার তো সাপ্তাহিক ছুটি আছেই। মাঝে বৃহস্পতিবার একদিনের ছুটি ম্যানেজ করে বাগিয়ে নিলাম টানা তিন দিনের এক ধামাকা ট্যুর প্ল্যান! অনেক দিন আগে থেকেই মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল—পূজার ছুটিতে যেকোনো মূল্যে বাইক নিয়ে কক্সবাজার যেতেই হবে।



অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত ছুটির আগের রাত। আমরা ছ’জন অফিস কলিগ আর আমাদের সাথে চারটি বাইক। রাইডার ও বাইকের লাইনআপটা ছিল চমৎকার—আমার Honda Dream 110, শামীম ভাইয়ের Suzuki Gixxer 155, শাকিল ভাইয়ের Hero Splendor 100 এবং রাকিব ভাইয়ের রাজকীয় Royal Enfield Hunter 350। আমার আর শাকিল ভাইয়ের বাইক দুটি তুলনামূলক ছোট সিসির হওয়ায় আমরা দু’জন একাই রাইড করছিলাম। আর বাকি দু’টি বড় বাইকে পিলিয়ন হিসেবে ছিলেন আমাদের আরও দুই কলিগ।



যাত্রার সূচনা ও রাতের হাইওয়ে

২০ অক্টোবর ২০২৬, রাত ঠিক ৮টা। অফিস ছুটির পর ফ্যাক্টরি থেকে আমরা ছ’জন চারটি বাইক নিয়ে গাজীপুর থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। হাইওয়েতে ঢোকার সময় আমাদের বাইকের সিরিয়াল ঠিক করা হলো এভাবে—সবার সামনে শামীম ভাইয়ের Suzuki Gixxer 155, তার ঠিক পেছনে আমার Honda Dream 110, আমার পেছনে শাকিল ভাইয়ের Hero Splendor 100 এবং সবাইকে এস্কর্ট করে পেছনে রাকিব ভাইয়ের Royal Enfield Hunter 350।

আমরা গাজীপুর বাইপাস থেকে কাঞ্চন ব্রীজ হয়ে মদনপুর উঠলাম। কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম আর রাস্তা প্রশস্ত করার কাজ চলায় বাইক চালানো বেশ কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। যারা গাজীপুর থেকে চিটাগাং রোডে যাতায়াত করেন, তাদের জন্য পরামর্শ থাকবে—এই রুটটি আপাতত এড়িয়ে চলাই ভালো।

রাত প্রায় ১০টার দিকে আমরা মদনপুর এসে পৌঁছালাম। সেখানে ছোট একটা চা বিরতির সাথে আমাদের যাত্রাপথের কিছু নিয়ম ঠিক করে নেওয়া হলো। সবাই একমত হলাম—যেকোনো মূল্যে বাইকের এই সিরিয়াল ব্রেক করা যাবে না, স্পীড লিমিট সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার রাখা হবে এবং ছোট দুটি বাইককে সামনে-পেছনে থেকে দুটি বড় বাইক স্কোয়াড করে নিয়ে যাবে। ঠিক হলো, আমাদের পরবর্তী ব্রেক হবে দাউদকান্দি ব্রীজ পার হওয়ার পর।



এরপর শুরু হলো আসল হাইওয়ে এক্সপেরিয়েন্স! প্রথম দিকে বেশ সাবধানে ও ধীরগতিতে চালিয়ে হাইওয়ের রাতের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো বড় বাইকের সাথে আমার ১১০ সিসির বাইক দিয়ে তাল মিলিয়ে চলার আসল লড়াই! শামীম ভাইয়ের বাইকের পেছনে থেকে ওনাকে অন্ধের মতো ফলো করছিলাম। আমার বাইকের হেডলাইটের আলো কিছুটা কম থাকায় শামীম ভাইয়ের জিক্সারের শক্তিশালী হেডলাইট আমাকে দারুণ সাপোর্ট দিয়েছে। ডানে-বামে ইন্ডিকেটর জ্বালিয়ে, গতি বাড়িয়ে-কমিয়ে একের পর এক বিশালাকার ট্রাক আর ছোট গাড়ি ওভারটেক করে সামনে এগোতে লাগলাম।

দাউদকান্দি ব্রীজ পার হয়ে একটা চায়ের দোকানে বাইক থামালাম। মূল উদ্দেশ্য ছিল—কারো বাইক রাইডিংয়ে কোনো শারীরিক বা যান্ত্রিক সমস্যা হচ্ছে কি না তা জানা। সবাই ফিট ও চাঙ্গা আছে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ডিনারটা করা হবে কুমিল্লার বিখ্যাত নূরজাহান হোটেলে।



আবার পথ চলা শুরু। শামীম ভাই আমাদের থেকে প্রায় ৫০-৬০ গজ সামনে, আর আমি আমার Honda Dream 110 নিয়ে ওনাকে তাড়া করছি। শাকিল আর রাকিব ভাই আমাদের থেকে খানিকটা পেছনে। প্রথমে স্পীড ৬০ কিমি/ঘণ্টার উপরে তুলতে একটু দ্বিধা হচ্ছিল, কিন্তু হাইওয়েতে রাতে বাইক চালানোর অনুভূতিটা অনেকটা নেশার মতো—গতি যেন অজান্তেই বেড়ে যায়! এক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮৫ কিমি/ঘণ্টা স্পীড তুলে শামীম ভাইকে ফলো করতে লাগলাম।



রাতের খাবার ও বায়েজিদ লিংক রোড

রাত ১২টার দিকে আমরা কুমিল্লার নূরজাহান হোটেলে পৌঁছালাম। ফ্রেশ হয়ে ভুনা খিচুড়ি আর মুরগির মাংস দিয়ে রাতের খাবার শেষ করলাম। ঘণ্টাখানেকের রিল্যাক্সিং ব্রেক শেষে আবার স্টার্ট হলো ইঞ্জিন। এবার টার্গেট—ফেনীর মহীপাল ফ্লাইওভার।

ফেনীর কাছাকাছি পৌঁছাতেই রাস্তায় আবার জ্যামের জটলা! কিন্তু বাইকারের আসল মজা তো এখানেই! প্রাইভেটকার, বাস আর ট্রাক যখন রাস্তায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে প্র প্র করছে, আমরা তখন সাইড দিয়ে মাটির ওপর দিয়ে চিপাচাপা গলি গলে সামনে এগিয়ে গেলাম।

মহীপাল না থেমে আমরা এক টানে মিরসরাই চলে এলাম। সেখানে একটি চায়ের দোকানে সবাই এক হয়ে বাইকগুলোকে কিছুটা বিশ্রাম দিলাম। সেখানে রাকিব ভাইয়ের পরিচিত দুজন ব্যক্তির সাথে কুশল বিনিময় শেষে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক হলো চট্টগ্রাম বায়েজিদ লিংক রোড।

ভোর ৪টার দিকে আমরা বায়েজিদ লিংক রোডের মুখে পৌঁছালাম। গাজীপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই দীর্ঘ নাইট জার্নির পরও আমাদের কারো মুখে ক্লান্তির কোনো ছাপ ছিল না, সবাই দারুণ সতেজ! তবে রাতের অন্ধকারের কারণে লিংক রোডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শতভাগ উপভোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর চট্টগ্রাম নতুন ব্রীজের দিকে এগোলাম। মাঝে রাকিব ভাইয়ের রয়েল এনফিল্ডের জন্য ফুয়েল লাগবে বলে কয়েকটি পাম্পে থামতে হয়েছিল, কিন্তু সেখানে ভিসা কার্ড এক্সেপ্ট করছিল না—অনলি ক্যাশ। যাই হোক, ক্যাশ পেমেন্ট করে তেল রিফিল করে নতুন ব্রীজ পার হয়ে অবশেষে সরাসরি কক্সবাজারের রাস্তায় নামলাম।



ধৈর্যের পরীক্ষা ও স্বপ্নের ডলফিন মোড়

কক্সবাজার রোডে ওঠার পরপরই ভোরের আলো ফুটে উঠল। আর এরই সাথে শুরু হলো আমাদের ভ্রমণের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ! চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার প্রায় ১৫০ কিলোমিটারের পথ। এই শেষ ১৫০ কিমি পথ আমাদের ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে। রাস্তা শেষই হতে চায় না! সড়কের দু'পাশে মাটি কাটার কারণে রাস্তা সরু হয়ে গেছে, এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ পথ, তার ওপর যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ। দীর্ঘ চার ঘণ্টা লড়াইয়ের পর অবশেষে আমরা কক্সবাজার এসে পৌঁছালাম।

আর যখন কলাতলী থেকে সেই ঢালু পথ দিয়ে ডলফিন মোড়ে নামছি—চোখের সামনে বিশাল নীল সমুদ্র ফুটে উঠল! সেই দৃশ্য দেখার সাথে সাথে সারা রাতের ১৪ ঘণ্টার বাইক রাইডিংয়ের সমস্ত ক্লান্তি ও চাপ এক নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল!

২০ অক্টোবর রাত ৮টায় গাজীপুর থেকে রওনা দিয়ে ২১ অক্টোবর সকাল ১০টায় কক্সবাজার পৌঁছানোর মাধ্যমে শেষ হলো আমাদের দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য এক নাইট রাইড। এর পরের দিন, অর্থাৎ ২২ অক্টোবর ২০২৬ ছিল আমাদের টেকনাফ এবং শাহপরীর দ্বীপ ভ্রমণের দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। সেই গল্প শোনাব অন্য কোনো পর্বে। আজ এখানেই বিদায়!

সবাইকে ধন্যবাদ।

মন্তব্য ৫ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (৫) মন্তব্য লিখুন

১| ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৭

দানবিক রাক্ষস বলেছেন: ভাই, আপনি সেরা ! হোন্ডা ড্রিম ১০০ দিয়ে এমন ট্যুর তাও আবার রাতে !
একটানা ১৪ ঘন্টা বাইক রাইডিনং !!! আমার দ্বারা অসম্ভব ! আপনাকে স্যালুট ।

২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:১১

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: ভাই বাইক নয় আপনার রাইডিং স্কীল হচ্ছে মেইন ফ্যাক্টর। বড় বাইক হলে স্পীড এবং পাওয়ার বেশি পাওয়া যায় কিন্তু ছোট বাইক দিয়েও ট্যুর করা সম্ভব। যারা পাহাড়ে বসবাস করেন তারা কিন্তু এই ১০০ সিসির বাইকগুলো বেশি ব্যবহার করেন। দুই তিনজন নিয়ে পাহাড়ে উঠে যায়। অন্যদিকে আমরা বড় বাইক নিয়ে পাহাড়ে উঠতে ভয় পাই।

আপনার মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

২| ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আসলেই আপনি সেরা । এবার দূর্গা পুজা আসলেই ভালো ছিলো। সবাই এনজয় করেছে ।

২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:১৫

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আমি খুব সিম্পল একজন মানুষ ভাই। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

৩| ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:৪৮

অপলক বলেছেন: শুভাশীষ রইল।

আমিও একসময় অনেক ট্যুর দিতাম। লেখাটা পড়ে নিজের কথা মনে পড়ে গেল। আপনার সাথে একটা পার্থক্য: গ্রুপ ট্যুর নিয়ে। গ্রুপে ট্যুর দেয়া খুব বিরক্তিকর। তাই হাতে গোনা দু একটা ট্যুর ছাড়া বাকি সব ট্যুর একাই দিতাম।

আমি সে সময় একটা লজিক দাঁড় করিয়েছিলাম: বুনো কুকুররা, দল বেঁধে শিকার করে। আর টাইগার রা একাই।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.