নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শুণ্যতার নিচে পিয়ানো শুনি...

রাজসোহান

প্রিয় অন্ধকার, আমার পুরোনো বন্ধু তুমি...

রাজসোহান › বিস্তারিত পোস্টঃ

সিনেমা সীমানা পেরিয়ে - বালির দাগে রাজনীতি

০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:০২



১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ভোলা সাইক্লোন। দশ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস উঠে আসে ব-দ্বীপের নিচু চরে। মৃতের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ লাখ। আজ পর্যন্ত কেউ সঠিক হিসাব দিতে পারেনি। কারণ যারা মরেছিল তাদের নাম কোনো খাতায় লেখা ছিল না।

তিন মাস পর ঢাকার একটি পত্রিকায় ছোট্ট খবর ছাপা হয়। বরিশালের দক্ষিণে সামুদ্রিক চরে একজোড়া নারী-পুরুষকে জীবিত পাওয়া গেছে। প্রায় আদিম অবস্থায়। তিন মাস ধরে ওরা ওখানে ছিল।

খবরটা অনেকেই পড়েছিল। বেশিরভাগ মানুষই অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার গল্প হিসেবে পড়ে ভুলে গেছে। ব্যতিক্রম ছিলেন আলমগীর কবির। তিনি ওই খবরে যা দেখেছিলেন, বাকিরা তা দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন একটা প্রশ্ন: সমাজের একদম উপরতলার একজন আর একদম নিচতলার একজন, যাদের মাঝখানে শত বছরের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, তারা যদি এমন এক জায়গায় গিয়ে পড়ে যেখানে ওই দেয়াল টিকিয়ে রাখার মতো কোনো পুলিশ নাই, কোনো আদালত নাই, কোনো আত্মীয়স্বজন নাই, তবে দেয়ালটা কি টিকবে?

পাঁচ বছর সময় নিয়ে তিনি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। ফলাফল ১৯৭৭ সালের ‘সীমানা পেরিয়ে’।

কাঠমিস্ত্রির কাজ শেখা এক ছেলে
এই সিনেমা বুঝতে হলে আলমগীর কবির সম্পর্কে একটু জানাশোনা প্রয়োজন।

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে তখন নিয়মিত পড়ার পাশাপাশি একটা ব্যবহারিক বিষয় নিতে হতো। বিকল্পগুলোর মধ্যে ছিল কাঠের কাজ। শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা ছেলেরা কেউ এই কাজ নিত না, কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখতে কে যায়? আলমগীর কবির নিয়েছিলেন। সহপাঠীদের ঠাট্টা হজম করে নিয়েছিলেন। এই ঘটনা আমরা জেনেছি সৈয়দ শামসুল হকের জবানিতে, যিনি ওই স্কুলেই তাঁর অগ্রজ ছিলেন।

পঁচিশ বছর পর আলমগীর কবিরই এমন একটা সিনেমা বানালেন যার কেন্দ্রীয় দৃশ্য একজন লোকের নিজ হাতে পাহাড়চূড়ায় দুইটা ঘর বানানো। কাকতালীয় হতে পারে। আমার মনে হয়নি।

পদার্থবিজ্ঞানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে তিনি অক্সফোর্ডে যান ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। সেখানে ইংমার বার্গম্যানের ‘দ্য সেভেনথ সিল’ দেখেন। একবার নয়, কয়েকবার। ওই সিনেমা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে তিনি চলচ্চিত্রের ইতিহাস আর নন্দনতত্ত্বের কোর্স করতে থাকেন।

তারপরের ঘটনাগুলো শুনলে সিনেমা মনে হয়। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন। পার্টির কাগজ ‘ডেইলি ওয়ার্কার’-এ সাংবাদিকতা শুরু করলেন। ষাটের দশকে কিউবায় গিয়ে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিলেন এবং ফিদেল কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার নিলেন। ফিলিস্তিন আর আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিলেন। আলজেরিয়া তখন ফরাসি উপনিবেশ, ফরাসি সরকার তাঁকে কয়েক মাস জেলে পুরে রাখলো। ১৯৬৬ সালে দেশে ফিরলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করলো, ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো।

একাত্তরে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। ‘দিস ইজ রেডিও বাংলাদেশ, মুজিবনগর’, খাঁটি ব্রিটিশ উচ্চারণে বলা ওই কণ্ঠ তাঁর। প্রবাসী সরকারের প্রধান প্রতিবেদক। জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর সহকারী পরিচালক এবং ধারাভাষ্যের কণ্ঠ। মালদা সীমান্তে ওই প্রামাণ্যচিত্রের কাজ করতে গিয়ে তিনি আর জহির রায়হান একটা মাইনফিল্ডের ভেতর দিয়ে না জেনেই হেঁটে পার হয়েছিলেন। তাঁর আগে যারা ওই পথে গিয়েছিল, তারা মারা গিয়েছে।

আলমগীর কবির ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি বগুড়া থেকে ফেরার পথে নগরবাড়ি ফেরিঘাটে ট্রাকের ধাক্কায় গাড়িসহ নদীতে পড়ে মারা যান। তাঁর ছাত্ররা ছিলেন তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম। তাঁর প্রিয় ছাত্র তারেক মাসুদও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

গেরিলা প্রশিক্ষণ নেওয়া, জেল খাটা, মাইনফিল্ড পেরোনো এই মানুষ যখন প্রেমের সিনেমা বানাতে বসেন, তখন সেটা আর প্রেমের সিনেমা থাকে না।

দাগ কে টানে
গল্পটা সংক্ষেপে বলি। টিনা জমিদার বাড়ির মেয়ে, ঢাকায় পড়াশোনা শেষ, দুই মাসের মধ্যে লন্ডন যাবে উচ্চশিক্ষার জন্য। মাকে নিয়ে গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। কালু জেলে, সাম্পান চালায়, তোতলা। প্রথম দেখাতেই কালু টিনার দিকে অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে।

কেন তাকিয়ে থাকে, তা টিনা জানতে পারে একটু পরেই। খাজনা বাকি থাকার অপরাধে টিনার দাদা কালুর বাবা আর দাদাকে পুড়িয়ে মেরেছিলেন।

সেই রাতেই জলোচ্ছ্বাস। সব ভেসে যায়। জ্ঞান ফিরলে কালু দেখে তার সাম্পান একটা অচেনা দ্বীপের বালিতে আটকে আছে, সঙ্গের ছেলেটা মরে গেছে। পানি আনতে গিয়ে সে দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ওই জমিদার বাড়ির মেয়ে।

দ্বীপে আর কোনো মানুষ নাই। এটুকু বুঝে ফেলার পর টিনার ভেতরে যে ভয় ঢোকে, ওই ভয় সাপের ভয় নয় কিংবা ক্ষুধার ভয়ও নয়। ওই ভয় কালুর। সে ভাবে, বাপ-দাদার হত্যার প্রতিশোধ নিতে ছেলেটা এবার তার ক্ষতি করবে।

এখানে গ্রিক ট্র্যাজেডির একটা পুরোনো ধারণা কাজ করে। এস্কাইলাসের ‘ওরেস্তিয়া’-য় ওরেস্তেস বাবার প্রতিশোধ নিতে মাকে হত্যা করে, আর তারপর এরিনিস নামের প্রতিহিংসার দেবীরা তাকে সারা জীবন তাড়া করে ফেরে; রক্তের দায় বংশ থেকে বংশে বাহিত হয়, কেউ ওটা থেকে ছাড় পায় না। টিনা আসলে কালুকে ভয় পাচ্ছে না। সে একটা মিথকে ভয় পাচ্ছে। সে ধরেই নিয়েছে রক্তের বদলা রক্ত দিয়েই মেটে।

কালু বদলা মেটাতে যায় না। সে টিনাকে পাহাড়ে তোলে দড়ি ফেলে, মাটি কেটে পথ বানায়, দুইটা আলাদা ঘর বানায়। তারপর দুই ঘরের মাঝখানে বালির উপর দাগ টেনে দেয় এবং টিনাকে বলে দেয়, এই দাগ পেরিয়ে আসবেন না।

এই দাগ থেকেই সিনেমার নাম।

আর এই দাগই সিনেমার লুকানো রাজনৈতিক ভাষা।

কারণ এই ছবিতে দাগ দুইবার টানা হয়। প্রথমবার টেনেছিলেন টিনার দাদা, খাজনার দাগ, জমিদারির দাগ, যে দাগের ওপারে দাঁড়ানো দুইজন মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার টেনেছে কালু, খালি হাতে, বালির উপর, কোনো কাগজ ছাড়া, কোনো লাঠিয়াল ছাড়া।

দুই দাগের মধ্যে পার্থক্য একটাই। প্রথম দাগ টানা হয়েছিল কেড়ে নেওয়ার জন্য। দ্বিতীয় দাগ টানা হয়েছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।

জঁ-জাক রুসো ১৭৫৫ সালে অসাম্যের উৎস নিয়ে লেখা তাঁর বিখ্যাত রচনায় বলেছিলেন, যে লোক প্রথম একটুকরা জমি ঘিরে নিয়ে বলেছিল এটা আমার, এবং যে লোকগুলো তা বিশ্বাস করেছিল, তাদের হাতেই সভ্য সমাজের যাবতীয় অপরাধের জন্ম। কালু ওই দ্বীপে প্রথম দাগ টানে ঠিকই, কিন্তু সে নিজেকে ঘিরে, জমিকে নয়। মালিকানার প্রথম ঘোষণা সে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেয়।

লক্ষ্মণরেখা উল্টে দেওয়া
রামায়ণের পরবর্তী ও আঞ্চলিক পাঠগুলোতে একটা দৃশ্য আছে যা বাল্মীকিতে নেই। রাম হরিণের পিছনে গেলে সীতা লক্ষ্মণকেও পাঠান খোঁজ নিতে; যাওয়ার আগে লক্ষ্মণ কুটিরের চারপাশে একটা রেখা টেনে দেন এবং সীতাকে বলে যান, এই রেখা পেরিয়ে বাইরে যাবেন না। সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে আসা রাবণ ভিক্ষা নিতে অস্বীকার করে, সীতা রেখা পেরিয়ে বাইরে পা রাখেন, এবং অপহৃত হন।

এই লক্ষ্মণরেখা উপমহাদেশের সবচেয়ে বিষাক্ত রূপকগুলোর একটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে লোকে এই শব্দ ব্যবহার করে। রেখার ভেতরে থাকলে নিরাপদ, বাইরে গেলে সর্বনাশ। রেখা টানেন একজন পুরুষ, মানতে বাধ্য থাকেন একজন নারী, আর রেখার বাইরে ওত পেতে থাকে আরেকজন পুরুষ।

আলমগীর কবির ১৯৭৭ সালে বসে এই রেখা পুরোপুরি উল্টে দিয়েছেন, এবং আমার সন্দেহ আছে তিনি নিজে সেটা টের পেয়েছিলেন কি না।

কালুর দাগ সীতাকে বাইরের রাবণ থেকে বাঁচানোর জন্য নয়। কালু দাগ টেনেছে টিনাকে কালুর নিজের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। সে নিজেকেই সম্ভাব্য রাবণ ধরে নিয়ে নিজেকে ঘেরাও করে ফেলেছে। এবং সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যে, যেদিন টিনা ঘুম ভেঙে দেখে কালু নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে আর কাছে যেতে গেলে কালু ভাঙা গলায় থামিয়ে দেয়, যদি ছুঁয়ে দিই, যদি কামড়ে দিই, সেদিন টিনা সিদ্ধান্ত নেয় সে দাগ পেরোবে।

রামায়ণে রেখা পেরিয়ে গেলে নারী ধ্বংস হয়। সীমানা পেরিয়েতে রেখা পেরিয়ে গেলে দুইজন মানুষই বাঁচে।

তারপর তারা বিয়ে করে। কাজি নাই, পুরোহিত নাই, অভিভাবক নাই, কোনো সাক্ষী নাই। শুধু মালাবদল। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এত খালি, এত নিরাভরণ, এত সম্পূর্ণভাবে শুধু দুইজন মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়ানো বিয়ে আর কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

তোতলামি সারিয়ে দেওয়ার নিষ্ঠুরতা
কালু তোতলা। কথা বলতে গিয়ে আটকে যায়। এই তোতলামি নিয়ে প্রচলিত পাঠ হলো, শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠরোধ। যার কথা বলার অধিকার নাই, তার জিভও স্বাধীন নয়। সঠিক পাঠ। মাজিদ মাজিদির ‘বারান’-এ আফগান শরণার্থী মেয়েটির একটা সংলাপও নাই, একই কারণে।

কিন্তু সীমানা পেরিয়ে এরপর এমন একটা দৃশ্য আসে, যেটা ছবিটাকে অন্যভাবেও পড়ার সুযোগ দেয়। টিনা কালুর তোতলামি শুধরে দেয়। তার কথ্য ভাষা শুধরে দেয়।

এটাকে সহজেই মুক্তি হিসেবে পড়া যায়। কিন্তু আরেকভাবে পড়াও সম্ভব। যে মুহূর্তে কালু টিনার ভাষায় কথা বলতে শেখে, সেই মুহূর্তে তার কণ্ঠ ফিরে আসে ঠিকই, কিন্তু নিজের ভাষায় নয়। যে শ্রেণী একদিন তার বাপ-দাদাকে আগুনে পুড়িয়েছিলো, সেই শ্রেণী যেন এবার তার ভাষার উপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ছবির সবচেয়ে কোমল দৃশ্য তাই একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব। ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও বদলে যাচ্ছে। কালুর কণ্ঠ ফিরছে, কিন্তু ফিরছে অন্যের সুরে।

এই দৃশ্যের সঙ্গে আলমগীর কবিরের নিজের জীবনকে পাশাপাশি রাখলে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি নিজে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খাঁটি ব্রিটিশ উচ্চারণে বাংলাদেশের খবর পড়তেন। তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে যত বই লিখেছেন, ‘সিনেমা ইন পাকিস্তান’, ‘ফিল্ম ইন বাংলাদেশ’, সব ইংরেজিতে। ফলে যে দেশের মানুষকে তিনি সিনেমা চেনাতে চেয়েছিলেন, সেই দেশের মানুষ তাঁর লেখা পড়তেই পারেনি। দশকের পর দশক ওই লেখাগুলো সাধারণের চোখের আড়ালে পড়ে ছিল, কিছু উৎসাহী তরুণ ইদানীং সেগুলো বাংলায় অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছেন।

‘চলচ্চিত্রাচার্য’ ডাকনাম পাওয়া আলমগীর কবির সচেতনভাবে এই দৃশ্য লিখেছিলেন কি না জানি না, তবে ফিরে তাকালে মনে হয়, কালুর তোতলামির ভেতর তিনি হয়তো নিজেরই এক ধরনের ভাষাগত দ্বিধা লিখে ফেলেছিলেন।

পতাকা আর সিসিফাস
দ্বীপে টিনার প্রথম কাজ ছিল উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা। সে কলাপাতায় বার্তা লিখে কাচের শিশিতে ভরে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। সে SOS লেখা পতাকা বানিয়ে কালুকে দেয়, বলে জাহাজ দেখলেই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নাড়তে।

জাহাজ আসে। কালু পতাকা নাড়ে। জাহাজ চলে যায়।

আবার জাহাজ আসে। কালু আবার নাড়ে। আবার চলে যায়।

আলবেয়ার কামু ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’-এ দেবতাদের শাস্তি পাওয়া সিসিফাসের কথা বলেছিলেন, যাকে অনন্তকাল ধরে একটা পাথর পাহাড়ে ঠেলে তুলতে হয় আর প্রতিবার চূড়ায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পাথর গড়িয়ে নিচে নেমে যায়। কামুর বিখ্যাত উপসংহার ছিল, সিসিফাসকে আমাদের সুখী মানুষ হিসেবেই কল্পনা করতে হবে, কারণ পাথর ঠেলাই তার জীবন।

কালু ক্লান্ত হয়ে পড়ে পতাকা নাড়তে নাড়তে। কামু এখানেই থেমে যেতেন। আলমগীর কবির থামেননি। তিনি পরের ধাপ দেখিয়েছেন, যেটা আরও ভয়ংকর।

টিনা একদিন পতাকা ছুড়ে ফেলে দেয়।

কারণ ততদিনে সে বুঝে গেছে, উদ্ধার পাওয়া মানে ফিরে যাওয়া, আর ফিরে যাওয়া মানে এই বিয়ে টিকবে না। সমাজ মানবে না, পরিবার মানবে না। পাথর ঠেলা বন্ধ করে দেওয়া সিসিফাস। পাহাড়ের নিচেই থেকে যাওয়া সিসিফাস।

ক্রুসো নিজেই ফ্রাইডে
সিনেমাতে টিনা নিজের মুখেই রবিনসন ক্রুসোর কথা বলে। ড্যানিয়েল ডিফোর ১৭১৯ সালের ওই উপন্যাসে জাহাজডুবি হওয়া এক ইংরেজ আটাশ বছর একটা দ্বীপে একা বাঁচে, একজন স্থানীয় মানুষকে বাঁচিয়ে তার নাম রাখে ফ্রাইডে, তাকে ইংরেজি শেখায় এবং ভৃত্য বানিয়ে রাখে। ইউরোপীয় সাহিত্যে ঔপনিবেশিক মানসিকতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ ওই বই।

টিনা ক্রুসোর নাম নিয়ে নিজেকে ক্রুসো ভাবে। শিক্ষিত মানুষ, বুদ্ধি খাটাচ্ছে, তালিকা বানাচ্ছে, খাবারের রেশন হিসাব করছে, পতাকার নকশা করছে।

অথচ পুরো সিনেমাতে আসল ক্রুসো একজনই। যে সাঁতার জানে, মাছ ধরতে জানে, জঙ্গল থেকে খাবার চিনে আনতে জানে, ঘর তুলতে জানে, মাটি কেটে পথ বানাতে জানে, দুই রাত জেগে জ্বরের রোগীকে জলপট্টি দিতে জানে। কালু।

আর যে টিকে থাকার জন্য পুরোপুরি আরেকজনের উপর নির্ভরশীল, যাকে দড়ি ধরে টেনে পাহাড়ে তুলতে হয়, যে সাম্পান টানতেও রাজি হয় না কারণ সে এসব করে অভ্যস্ত না, সে-ই ফ্রাইডে।

জমিদার বাড়ির মেয়ে আসলে ফ্রাইডে ছিল, এবং তার লন্ডন যাওয়ার টিকিট এই সত্য বদলাতে পারেনি। ডিফোর গল্প আলমগীর কবির শুধু উল্টে দেননি, তিনি দেখিয়েছেন, কে সভ্য আর কে অসভ্য, সেই প্রশ্ন শ্রেণীই ঠিক করে দেয়।

উদ্ধার হওয়াই এই গল্পের ট্র্যাজেডি
প্রায় তিন মাস কেটে যায়। টিনা সন্তানসম্ভবা হয়। এক বিকেলে দ্বীপের তীরে বসে গল্প করার সময় নৌবাহিনীর একটা জাহাজ ওদের দেখে ফেলে। ওরা পালাতে চায়। পারে না।

বেঁচে থাকার অধিকাংশ সিনেমায় উদ্ধার মানেই মুক্তি। এখানে উদ্ধার হওয়াই বিপর্যয়। উদ্ধারকারী দল কাউকে জিজ্ঞেস করেনি। পতাকা ফেলে দিয়ে টিনা যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের কোনো মূল্য ছিল না। সমাজ এসে তাকে তুলে নিয়ে গেল।

আর এই জায়গায় এসে ছবির সব সুতো এক জায়গায় বাঁধা পড়ে।

সিনেমা শুরুর দিকে টিনার মা তাকে বলেছিলেন, বিয়ের পরে তোর বাবা আমাকে রেপ করেছে। ১৯৭৭ সালের বাংলা সিনেমায় এমন সংলাপ কল্পনাও করা কঠিন ছিল। স্ত্রীর কাছ থেকেও সম্মতি নিতে হবে, এই কথা এদেশের পর্দায় আগে বা পরে কেউ এভাবে বলেনি।

টিনার মাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ সে রতনকে ভালোবাসত। জোর করে বিয়ে, তারপর জোর করে সংসার। সম্মতি নামের শব্দ ওই বাড়িতে কখনো উচ্চারিত হয়নি।

দ্বীপের সমীকরণে এই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কালু জ্বরের সময় স্পর্শ করেছে কি না, টিনা জেগে উঠেই জানতে চায়, আর কালু জবাব দেয়, না ছুঁয়ে জলপট্টি কী করে দেব। টিনা প্রথম রাতেই কালুর কাছ থেকে দাঁ চেয়ে নিজের কাছে রাখে। কালু দুই ঘরের মাঝখানে দাগ টেনে অনুমতি ছাড়া ঢুকতে অস্বীকার করে। বিয়েতে কোনো তৃতীয় পক্ষ নাই, শুধু দুইজনের সম্মতি।

আর অন্যদিকে, নৌবাহিনীর জাহাজ না জিজ্ঞেস করে তুলে নেয়। বাবা এসে না জিজ্ঞেস করে বলে দেন, গর্ভের সন্তান নষ্ট করতে হবে।

‘সীমানা পেরিয়ে’ আসলে শ্রেণীর সিনেমা নয়। শ্রেণী এখানে উপলক্ষ। এই সিনেমা সম্মতির সিনেমা। এবং আলমগীর কবির যে সমাজে বসে এটা বানিয়েছেন, সেই সমাজের ভাষায় তখনো ‘কনসেন্ট’ শব্দের কোনো চালু বাংলা প্রতিশব্দ ছিল না।

প্লাবনের পর যে পৃথিবী জন্মায়
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সভ্যতাতেই মহাপ্লাবনের গল্প আছে। আর আশ্চর্যের বিষয়, সবগুলো গল্পই একই জায়গায় গিয়ে মিলে।

গ্রিক পুরাণে জিউস মানবজাতিকে ধ্বংস করতে জলপ্লাবন পাঠান। প্রমিথিউস আগেই সতর্ক করে দেওয়ায় তাঁর পুত্র দেউকালিয়ন আর পুত্রবধূ পিরা একটা কাঠের সিন্দুকে ভেসে নয় দিন পর পার্নাসাস পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ঠেকেন। এই দুইজন থেকেই নতুন মানবজাতির শুরু।

ভারতীয় পুরাণে শতপথ ব্রাহ্মণের মনুর গল্প। মনু হাতে পানি নিতে গিয়ে একটা ছোট মাছ পান। মাছটা তাঁকে বাঁচানোর অনুরোধ করে, বিনিময়ে আসন্ন প্লাবনের খবর দেয়। মাছটা বড় হতে হতে বিশাল হয়ে যায়। মনু নৌকা বেঁধে দেন তার শিঙে, আর মাছ তাঁকে টেনে নিয়ে যায় উত্তরের পাহাড়ে। প্লাবনের পর নতুন পৃথিবীর শুরু মনুকেই দিয়ে।

এই দুই গল্পের কাঠামো লক্ষ করলে একটা মিল চোখে পড়ে। প্লাবন আসে। অল্প কয়েকজন মানুষ বেঁচে থাকে। পাহাড়ের চূড়ায় নতুন পৃথিবীর শুরু হয়।

সীমানা পেরিয়েতেও ঠিক এই তিনটা ধাপ ঘটে। প্লাবন আসে। দুইজন মানুষ বেঁচে যায়। তারা পাহাড়ের চূড়ায় ঘর বাঁধে, একদম আক্ষরিক অর্থেই। তারপর টিনা সন্তানসম্ভবা হয়।

তারপর নতুন পৃথিবী জন্মানোর ঠিক আগমুহূর্তে পুরোনো পৃথিবীর জাহাজ এসে হাজির হয়। আর পুরোনো পৃথিবী নতুন পৃথিবীকে প্রথম যে কথা বলে, তা হলো, এই সন্তান নষ্ট করে ফেলতে হবে।

মনুর গল্পে মানুষকে পাহাড়ে পৌঁছে দেয় মাছ। এখানে যে মাছ ধরে খায়, সেই কালুই টিনাকে পাহাড়ে তুলে দেয়, বাঁচিয়ে রাখে, নতুন জীবনের সম্ভাবনা তৈরি করে। পুরস্কার হিসেবে তাকে বলা হয়, সরে যাও।

কালু সরে যায়ও। মন খারাপ করে চুপচাপ চলে যায় সাম্পানের দিকে। সে ধরেই নিয়েছে টিনা বাবার সঙ্গে চলে যাবে।

তারপর সিনেমার শেষ দৃশ্য।

টিনা বাবার মুখের উপর প্রতিবাদ করে বেরিয়ে আসে, সাগরের পাড়ে গিয়ে কালুকে খুঁজে পায় এবং জিজ্ঞেস করে, কী সাম্পানওয়ালা, তোমার সাম্পানে আমাকে নেবে না?

জমিদারের নাতনি জেলের নাতিকে অনুমতি চাইছে। জিজ্ঞেস করছে, আমাকে নেবে?

সিনেমাজুড়ে মানুষ বারবার অন্যের সীমানা পেরিয়ে গেছে, কাউকে কিছু না জিজ্ঞেস করেই। শেষ দৃশ্যে প্রথমবার একজন আরেকজনের জিজ্ঞেস করে, “আমাকে নেবে?” এর চেয়ে ভালো সমাপ্তি এই গল্পের হতে পারত না।

যে ঝড় একটা দেশও বানিয়েছিল
আলমগীর কবির নিজেই এই ছবিকে বলেছিলেন ফ্যান্টাসি। ট্রিটমেন্টটা ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম, সেটাও তিনি স্বীকার করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল যৌনতা বা সহিংসতা ছাড়া সমাজের একেবারে উপরতলার একজন আর নিচতলার একজন মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্ভব কি না, সেটা পরীক্ষা করা। তিনি বিশ্বাস করতেন সম্পর্ক সম্ভব, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শ্রেণী সেটা সহ্য করবে না। পরে তিনি এটাও বলেছেন, ব্যবসায়িক পুঁজির চাপে ছবির বক্তব্য আর গতি কিছুটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

তিনি নিজেই ছবিকে ফ্যান্টাসি বলেছেন। আর সেটাই তাঁর সততা।

কারণ বাস্তবের ঘূর্ণিঝড় সাম্যবাদী নয়। ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড় জমিদারবাড়ির মেয়েদের মারেনি। মেরেছে চরের মানুষদের, যাদের ঘর ছিল বাঁশের, যাদের মাটি ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাত উঁচু। দুর্যোগ সবসময় গরিবের ঠিকানা খুঁজে নেয়।

তবু ওই ঝড় একটা সীমানা সত্যিই পেরিয়েছিল।

১২ নভেম্বরের ওই রাতের ঠিক তিন-চার সপ্তাহ পর পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। ইয়াহিয়া খানের সরকার ত্রাণ পাঠাতে দেরি করেছিল, ঢিলেমি করেছিল, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখিয়েছিল। সাড়ে ছয় কোটি মানুষের একটা প্রদেশে দশ দিনে পাঠানো হয়েছিল হাতে গোনা কয়েকটা উড়োজাহাজ। সাংবাদিক, ছাত্র, শিল্পী আর রাজনৈতিক কর্মীরা সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই ত্রাণ নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন।

তারপর নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগ ভূমিধস জয় পেল। ক্ষমতা হস্তান্তর হলো না। সাত মাস পর শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।

আজ গবেষকেরা দেখিয়েছেন, যেসব এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত বেশি ছিল এবং ত্রাণ পৌঁছাতে দেরি হয়েছিল, সেসব এলাকায় স্বাধীনতাপন্থী রাজনীতির পক্ষেই ভোট তুলনামূলক বেশি পড়েছিল।

যে ঝড় কালু আর টিনাকে একটা দ্বীপে এনে ফেলেছিল, ঠিক সেই ঝড় একটা দেশকে মানচিত্রে এনে ফেলেছিল।

আলমগীর কবির এটা জানতেন। সাংবাদিক হিসেবে তিনি ওই স্থানে ছিলেন, এবং কয়েক মাস পরই প্রবাসী সরকারের প্রধান প্রতিবেদক হয়ে যান। সিনেমাতে তিনি একবারও রাজনীতির কথা বলেননি। কিন্তু তিনি জলোচ্ছ্বাসের দৃশ্যে ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে যে গান বাজিয়েছেন, ওই গানের কথাগুলো পুরোনো নিয়ম ভেঙে দেওয়া আর মিথ্যা তাসের ঘর উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে, আর শেষ করে এই বলে যে ভাঙনের কোনো পারাপার নাই, তুমি আমি সব একাকার।

দর্শক প্রেমের গান শুনেছে। ভেতরে বাজছিল একাত্তর।

ভূপেন হাজারিকা, আবিদা সুলতানা এবং একটা রাত
এই ছবির সংগীত পরিচালক ভূপেন হাজারিকা। সুর তাঁর, বেশিরভাগ গানের কথাও তাঁর।

‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানের জন্য তিনি কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আবিদা সুলতানাকে। কথা লিখেছিলেন নয়ীম গহর। আবিদা সুলতানা পরে বলেছেন, ভূপেন হাজারিকার সুরে গাইতে হবে শুনে তাঁর রীতিমতো ভয় করছিল। হাজারিকা তাঁকে প্রথমে একটাই উপদেশ দিয়েছিলেন: গাওয়ার আগে গানের অর্থ বুঝে নাও।

কলকাতার টেকনিশিয়ানস স্টুডিওতে দুইবার আর মাইক্রোফোনে একবার মহড়ার পর রেকর্ডিং শেষ হয়ে যায়।

আটচল্লিশ বছর পরেও ওই গান বাংলা গানের যেকোনো তালিকায় উপরের দিকে থাকে। অথচ কজন জানে গানটা কোন ছবির?

‘সীমানা পেরিয়ে’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পেয়েছিল বুলবুল আহমেদের জন্য, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য আর শ্রেষ্ঠ সংলাপ পেয়েছিলেন আলমগীর কবির, শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক হয়েছিলেন এম এ মবিন। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্র’ তালিকায় এই ছবি আছে। আলমগীর কবিরের তিনটা ছবিই ওই তালিকায় আছে।

বুলবুল আহমেদ এখানে দুইটা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শুরুতে টিনাকে যে ধনী ছেলে বিয়ে করতে চায় এবং প্রত্যাখ্যাত হয়, সে-ও তিনি। সুট-টাই পরা বুলবুলকে টিনা ফিরিয়ে দেয়, লুঙ্গি পরা তোতলা বুলবুলকে গ্রহণ করে। একই মুখ, দুইটা পোশাক, দুইরকম ভাগ্য। কবির কিছুই আকস্মিক রাখেননি।

আর জয়শ্রী কবির। কলকাতার মেয়ে, আসল নাম জয়শ্রী রায়, সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছাত্রী, ১৯৬৮ সালের মিস ক্যালকাটা। বড়ো পর্দায় তাঁর শুরু সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ দিয়ে। ১৯৭৬ সালে উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ‘সূর্যকন্যা’-য় অভিনয় করতে ঢাকায় আসেন, ১৯৭৫ সালে আলমগীর কবিরকে বিয়ে করে এখানেই থেকে যান।

সংসারটা টেকেনি। তিন বছরের মাথায় ভাঙন, তারপর বিচ্ছেদ। এক ছেলে, লেনিন সৌরভ কবির। ১৯৮৯ সালে আলমগীর কবিরের মৃত্যুর পর জয়শ্রী ছেলেকে নিয়ে লন্ডনে চলে যান এবং সেখানকার একটা কলেজে বহু বছর ইংরেজি পড়িয়েছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে লন্ডনে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে, খবরটা নিশ্চিত করেছিলেন তাঁর ভাগ্নে।

এই তথ্য আলাদা করে বলার কারণ আছে। পর্দায় টিনা সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কালুর সাম্পানে উঠে পড়েছিল। পর্দার বাইরে যে মেয়েটা ওই দৃশ্য অভিনয় করেছিলেন, তিনি পরিচালককে বিয়ে করে সীমানা পেরিয়েছিলেন, তারপর সংসার ভেঙেছে, তারপর তিনি দেশ ছেড়েছেন, আর বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন লন্ডনে, ঠিক যে শহরে যাওয়ার কথা ছিল টিনার, ঝড় না এলে।

আলমগীর কবির বলেছিলেন সম্পর্ক সম্ভব, কিন্তু শক্তিশালী শ্রেণী সহ্য করবে না।

তিনি সম্ভবত জানতেন না তিনি নিজের সম্পর্কে কথা বলছেন।

সাতচল্লিশ বছর পরেও এই সিনেমা দেখতে বসলে ওই বালির দাগ চোখের সামনে ভাসে। ঢেউ এসে দাগ মুছে দেয় নিশ্চয়ই, প্রতিদিন, প্রতি জোয়ারে। কিন্তু কালু আবার টানে। কারণ দাগ থাকা আর দাগ না থাকার মধ্যে পার্থক্য দাগে নয়, পার্থক্য এই যে কে টানছে আর কেন টানছে।

আমাদের চারপাশে দাগ কমেনি। শুধু কেউ আর বলে না, এই দাগ পেরিয়ে আসবেন না, কারণ আমি নিজেকে বিশ্বাস করি না।

এমন সিনেমা আমাদের ছিল। মাঝেমধ্যে নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার।

মূল লেখা

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ফলাফল ১৯৭৭ সালের ‘সীমানা পেরিয়ে’।
........................................................................
ছবিটা দেখেছিলাম, তখন খুব মনে দাগ কেটেছিলো
কিন্ত এত ভিতরের দাগ সর্ম্পকে কোন জ্ঞান ছিলনা,
ভালোলেগে ছিলো, এটাই চূড়ান্ত কথা !

২| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫

আফলাতুন হায়দার চৌধুরী বলেছেন: প্রিয় লেখক, অনেকদিন পর সামুতে ঢুকলাম। এক নিশ্বাসে পড়লাম।

আপনার এই গভীর ও তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণটি মন ছুঁয়ে গেল! 'সীমানা পেরিয়ে' সিনেমাটির ভেতরের রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং আলমগীর কবিরের নির্মাণশৈলীকে যেভাবে শব্দে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সত্যি অসাধারণ। সিনেমাটি দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাই এক মুহূর্তে বদলে গেল।

এমন সমৃদ্ধ ও আবেগঘন লেখনীর জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইল!

আরো লিখুন।

৩| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪১

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: সুন্দর লেখা। অনেক ইনফরমেশন জানতে পারলাম আপনার লেখার মাধ্যমে। ধন্যবাদ আপনাকে।

৪| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৪

সৈয়দ মোজাদ্দাদ আল হাসানাত বলেছেন: অনেক ভালো লাগলো, অনেক কিছু জানতে পারলাম।

৫| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৪

হুমায়রা হারুন বলেছেন: আলমগীর কবির ছিলেন বাংলাদেশের শিল্পধর্মী চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ। তাঁর কাজ আমাদের চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রেরণার উৎস, কিন্তু তা আমরা সবাই অনুধাবন করতে পারিনা।তাঁর প্রতিভা আমাদের বুঝার অনেক উর্ধ্বে। কিন্তু আজ আপনার লেখার বিশ্লেষণে নিখুঁত ভাবে তা উপস্থাপিত হলো।
পোস্টটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

৬| ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:০৪

ক্লোন রাফা বলেছেন: আমাদের সত‍্যজিত ছিলেন আলমগীর কবির! বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মূল্যায়ন হয় না কখনো!

এই দেশে যে যত বেশি অযোগ্য/ শুধু চাটুকারিতা করে তার চেয়ে অনেক বেশি মর্যাদা লাভ করে!

একটি রাজনৈতিক মন্তব্য করলাম ॥

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.