নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাজিদ উল হক আবির

সাধু সাবধান ! ব্লগের মালিক বঙ্গালা সাহিত্যকে ধরিয়া বিশাল মাপের ঝাঁকি দিতে নিজেকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত করিতেছেন। সেই মর্মে তিনি এখন কিটো ডায়েটিং, ডন-বৈঠক ও ভারোত্তলন প্রশিক্ষণে ব্যস্ত। প্রকাশিত গ্রন্থঃ১। শেষ বসন্তের গল্প । (২০১৪)২। মিসিং পারসন - প্যাত্রিক মোদিয়ানো, ২০১৪ সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী (অনুবাদ, ২০১৫) ৩। আয়াজ আলীর ডানা (গল্পগ্রন্থ - ২০১৬ ৪। কোমা ও অন্যান্য গল্প(গল্প গ্রন্থ, ২০১৮) ৫। হেমন্তের মর্সিয়া (কবিতা, ২০১৮) ৬। কাঁচের দেয়াল (গল্পগ্রন্থ, ২০১৯) ৭।শহরনামা (উপন্যাস, মাওলা ব্রাদার্স, ২০২২), ৮। মুরাকামির শেহেরজাদ ও অন্যান্য গল্প (অনুবাদ, ২০২৩), ৯। নির্বাচিত দেবদূত(গল্পগ্রন্থ, ২০২৪), ১০। দেওয়ানেগির চল্লিশ কানুন/ফরটি রুলস অফ লাভ (অনুবাদ, ঐতিহ্য, ২০২৪)

সাজিদ উল হক আবির › বিস্তারিত পোস্টঃ

বুকের ভেতর বটবৃক্ষ, পর্ব ৬ঃ ক্ষমতাললুপ পৃথিবীতে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:১৮


ছবিঃ এন্টি ভিয়েতনাম ওয়ার প্রটেস্ট, ১৯৬৭, পেন্টাগন, আমেরিকা

১।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং বেসরকারি কর্মজীবী হিসেবে এতদিন পেরেশানি ছিল কেবল একমুখী। প্রতিবছর ইংরেজি বিভাগের অ্যালামনাই কিছু কিছু জুনিয়র বিসিএস এ পররাষ্ট্র – পুলিশ – প্রশাসনে চাকুরী পেতো, অথবা কিছু সিনিয়র সরকারী চাকুরীজীবীরা প্রমোশন ইত্যাদি পেতো – আর ফেসবুক ছেয়ে যেত তাদের প্রশংসা আর স্তুতিতে। অমুক ভাই পুলিশের এসপি হয়েছেন, তমুক ভাই জেলা প্রশাসক হিসেবে সমুক জেলার দায়িত্ব নিচ্ছেন এই বলে অনেকে তেলতেলে ক্যাপশন সহ ছবি আপলোড করতো।

গত ক’দিন ধরে ঢাবির ইংরেজি বিভাগের অ্যালামনাইদের ভিন্ন আরেকধাঁচের তৈলাক্ত উদ্দীপনা লক্ষ্য করছি, যার যন্ত্রণায় সোশ্যাল মিডিয়া ডিঅ্যাক্টিভ করে বসে আছি গতরাত থেকে। ইংরেজি বিভাগ থেকে গত ৬ – ৭ বছরে মাত্র পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়া দু’জন শিক্ষার্থী ২০২৬ সালের ইলেকশনে এমপি নির্বাচিত হয়ে এসেছে। একজন, ভিপি নূর; আরেকজন হাসনাত আবদুল্লাহ। সমসাময়িক স্টুডেন্ট হওয়ায় এই দুই এমপির এমন এমন ছবি তাদের প্রাক্তন বন্ধুবান্ধবেরা শেয়ার করছে ফেসবুকে, যেগুলো অনেক পুরনো। ছবিগুলোতে তারা ঢাবির ইংরেজি বিভাগের শুরুর দিকের ছাত্র। তখনও তাদের প্রতিবাদী, কর্তৃত্বপরায়ণ, ক্ষমতাশীল পাবলিক ইমেজ তৈরি হয় নি। ছবিগুলোতে তাদের ক্যাবলা লাগছে। তাদের পার্সোনাল ফেসবুক প্রোফাইলে ট্যাগ করে শেয়ার করায়, তারা চাইলেও ছবিগুলো এড়াতে পারছে না। খ্যাতির বিড়ম্বনা।

সবচে অবাক হয়েছি (যদিও অবাক হওয়াটা আমার নিজেরই বেকুবি এবং দুনিয়াদারী কম বোঝার পরিচয়), আমাদের ইংরেজি বিভাগের সিনিয়র সব শিক্ষক, চেয়ারম্যান – সবাই নানা মিষ্টি মিষ্টি কথা লিখে তাদের প্রশংসা করে স্ট্যাটাস প্রসব করে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাবিত করে ফেলছেন বলে। যদি ক্ষমতাসীনদের তোয়াজ তোষামোদ করা এতোটা গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে ইংরেজি বিভাগের ক্লাসরুমে জ্ঞানই সত্য, জ্ঞানই মুক্তি – এ জাতীয় আলাপ তারা ক্লাসে কেন দিতেন? নর্টনের প্রকাশিত মোটা মোটা অ্যানথলজি, আর থিওরির ভারী ভারী বই ডিপার্টমেন্টের করিডোরে বহন করে বেড়ানোর মাঝে আমাদের স্মার্টনেস খুঁজে নিতে কেন শিখিয়েছিলেন?

আমরা যারা ঢাবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা বিভাগীয় পড়াশোনাকে সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম, জোর প্রচেষ্টার মাধ্যমে শেক্সপিয়র, মিলটন, শেলি - কিটস, ব্রাউনিং পড়েছি, আধুনিকতা - উত্তরাধুনিকতা বোঝার চেষ্টা করেছি, আমরা সবাই প্রেক্ষাপট থেকে হারিয়ে গিয়েছি।

২।

আওয়ামী শাসন আমলেই আমার ঢাবির ছাত্রত্ব। পরিবারের কেউই সেভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত না থাকায় রাজনীতি নিয়ে প্রথম থেকেই আমার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। আমার হিরো ছিলেন ক্লাসরুমের শিক্ষকেরা। চোখের সামনে যে ছাত্র রাজনীতি দেখেছি, তাতে সংযুক্ত হবার কোন আগ্রহ কখনো তৈরি হয় নি।

২০০৯ – ১০ সালে, হলে সিটের প্রয়োজন না হলে কেউ রাজনীতি করতো না। সেই সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কোনমতে নাস্তা সেরে হলের বড়ভাইয়ের পেছনে তালি আর শ্লোগান দিতে দিতে গিয়ে মধুতে হাজির হওয়া, সেখানে আরও সিনিয়র রাশভারী ছাত্রনেতাদের সামনে মেরুদণ্ড ঝুঁকিয়ে সালাম করা আর বিগলিত হাসি ধরে রেখে হাত মেলানো – তারপর গ্রুপছবি তুলে ফেরত আসা – এই সব কাজের মধ্যে একজন পড়ুয়া আত্মমর্যাদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীর কোন আনন্দ বা আগ্রহ তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল না। এবং সেই ছাত্র রাজনীতি যে ফলপ্রসূ ছিল না, তার প্রমাণ ছাত্রলীগের ছাতার নীচে আশ্রয় পাওয়া ও পরিপুষ্ট হওয়া অসংখ্য ছাত্রশিবিরের নেতা।

ছাত্ররাজনীতির এই পরিস্থিতি কি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কখনো বদলাবে?

আমার এক ছাত্ররাজনীতি করা বড় ভাই (মহসিন হলের নেতা না ঠিক, তবে ক্যাডার ছিলেন) আমাকে বলতেন – আবির, তুই হয়তো ইংল্যান্ডে গিয়েও রাজনীতি করতে পারবি, কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি তোর জন্য না।

৩।

ছাত্রজীবন পেরিয়ে এসে এখন চাকুরী করছি একটা প্রাইভেট ইউনিভারসিটিতে আজ ১০ বছর। স্টুডেন্ট পড়ানো, আর নিজের পড়া - লেখা নিয়ে ব্যস্ত থেকে মোটামুটি ভালই ছিলাম। ইদানীং নিজেকে একদম অপ্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে দেশজুড়ে প্রবাহিত হওয়া প্রবল রাজনৈতিক হাওয়া ও নির্বাচন নিয়ে।

কেউ কি বই পড়ে এখন? কেউ কি লেখে দু’কলম? কারো সময় আছে খোলা আকাশের নীচে চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা প্রহর পার করে দেবার? যদি তারা থেকেও থাকে এই পোড়া সময়ে, পোড়া জনপদে, তারা কই? তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয় না কেন? এই তো , গতকাল পড়ে শেষ করলাম শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময়ের উপন্যাসের অনুপ্রেরণা ছিল শিবনাথ শাস্ত্রীর এই বইটা। বেঙ্গল রেনেসাঁর সময়, ও তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লেখা একটা সেমিনাল কিতাব। কার সঙ্গে এ বইটা নিয়ে গল্প করা যায়?

বইমেলায় আমার প্রায় সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার দ্বিতীয় উপন্যাস সরীসৃপতন্ত্র বেরুবে। কে কিনবে, কে পড়বে এ বই, প্রথম বই প্রকাশিত হবার ১১ বছর পর, গোটা দশেক বই লিখে, একটা মেজর লিটেরারি অ্যাওয়ার্ড জিতেও নিশ্চিত নই। পরিবার, সমাজ, দেশ – সবকিছু থেকেই নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।

প্রাসঙ্গিক হচ্ছে শুধু ক্ষমতা। মানুষের ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার চিরায়ত লোভ। আমরা যারা একটু কায়দা করে বেঁচে থাকা শিখে নিয়েছিলাম, এখন আর কায়দা করে বাঁচতে পারছি না। ক্ষমতার করাল গ্রাসে আমরাও পরিণত হচ্ছি খাদ্যে।

জুলাই ২০২৪ সালের আন্দোলনে জড়িত সামনের সারির মুখগুলো অনেকেই আজ পার্লামেন্টে। কিন্তু আমার ক্লাসরুমে আজ নির্বাচন পরবর্তী প্রথম ক্লাসে যে আলাপ করলাম তাতে জুলাই আন্দোলনে মাঠ পর্যায়ে জড়িত থাকা অনেক স্টুডেন্টই হতাশা ব্যক্ত করল – এই বলে যে, ওদের জীবনে দুর্দশা ছাড়া তেমন কিছু যুক্ত হয় নি। সবসময় একটা ভয় কাজ করে, কে কখন কোথা থেকে প্রতিশোধ নিতে আসে।

এই ছেলেগুলি, যারা ২০২৪ এ মাঠে নেমেছিল পিওর আবেগ থেকে, দেশ বদলানোর প্রয়াসে, তাদের এই আবেগকে পুঁজি করেই তো তৈরি হচ্ছে, হবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক রূপরেখা। অথচ ক্ষমতা ভাগাভাগির ডামাডোলে তারা আজ কোথাও নেই। অনেকেই এলাকাছাড়া। পড়াশোনা করছে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে।

যারা ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে চায় নি, তারা ক্রমাগত অপ্রাসঙ্গিক থেকে অপ্রাসঙ্গিকতর হয়ে উঠবে ক্ষমতাপূজারী এক নষ্ট পৃথিবীতে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.