| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সাজিদ উল হক আবির
সাধু সাবধান ! ব্লগের মালিক বঙ্গালা সাহিত্যকে ধরিয়া বিশাল মাপের ঝাঁকি দিতে নিজেকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত করিতেছেন। সেই মর্মে তিনি এখন কিটো ডায়েটিং, ডন-বৈঠক ও ভারোত্তলন প্রশিক্ষণে ব্যস্ত। প্রকাশিত গ্রন্থঃ১। শেষ বসন্তের গল্প । (২০১৪)২। মিসিং পারসন - প্যাত্রিক মোদিয়ানো, ২০১৪ সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী (অনুবাদ, ২০১৫) ৩। আয়াজ আলীর ডানা (গল্পগ্রন্থ - ২০১৬ ৪। কোমা ও অন্যান্য গল্প(গল্প গ্রন্থ, ২০১৮) ৫। হেমন্তের মর্সিয়া (কবিতা, ২০১৮) ৬। কাঁচের দেয়াল (গল্পগ্রন্থ, ২০১৯) ৭।শহরনামা (উপন্যাস, মাওলা ব্রাদার্স, ২০২২), ৮। মুরাকামির শেহেরজাদ ও অন্যান্য গল্প (অনুবাদ, ২০২৩), ৯। নির্বাচিত দেবদূত(গল্পগ্রন্থ, ২০২৪), ১০। দেওয়ানেগির চল্লিশ কানুন/ফরটি রুলস অফ লাভ (অনুবাদ, ঐতিহ্য, ২০২৪)
১।
আজ সাতসকালে কর্মস্থলে এসে হাজির হয়েছি, বিগত ৮ বছরের মতো, কেননা আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, সেখানে বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতাদিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলিকে উৎযাপন করা হয় যথোপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গে, এবং খুব সিরিয়াসভাবে। এই ধরণের অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নেয়াও মোটের ওপর আমাদের চাকুরীর এক অলিখিত দায়িত্ব। আজ সকালের প্রভাতফেরীতে হাঁটতে হাঁটতে সদ্য ইরাসমাস স্কলারশিপে মাস্টার্স করে আসা সোশিয়লজি বিভাগের এক কলিগের সঙ্গে আলাপ করছিলাম তার সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণা ইত্যাদি নিয়ে। এভাবে এককথায় দু’কথায় চলে এলো নির্বাচন পূর্ববর্তী ভাষিক বিতর্কের বিষয়টি। ন্যায্যতার বদলে ইনসাফ, বিপ্লবের বদলে ইনকিলাব, জয় হোক / চিরজীবী হোকের বদলে জিন্দাবাদ, ধন্যবাদের বদলে শুকরিয়া – বাংলার বদলে শ্লোগান - সম্ভাষণের হঠাৎ উর্দুকরণ, এই প্রবণতা বাংলাভাষাকে কতোটুকু বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে?
আমরা দু’জনেই কমবেশী একমত হলাম এই বিষয়ে যে, একটা নির্দিষ্ট কনটেক্সটে, নির্দিষ্ট আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, এবং মূলত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে হিন্দি – উর্দু – ফার্সি – আরবি শ্লোগান রাজনৈতিকভাবে বেছে নেয়ার দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক আমাদের মাতৃভাষার ওপর পড়বে না।
আমি দীর্ঘদিন ধরে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে হিস্টরি অফ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সটি পড়াচ্ছি। জার্মানিক গ্রুপ অফ ল্যাঙ্গুয়েজেস থেকে গত প্রায় দেড় হাজার বছরে ইংরেজি ভাষার যে ধারাবাহিক ক্রমবিকাশঃ ওল্ড ইংলিশ থেকে মিডল ইংলিশ, মিডল ইংলিশ থেকে মডার্ন ইংলিশ – এখানে একটি জিনিস নিশ্চিতঃ ভাষা গৃহীত হয়, মর্যাদা পায়, চর্চিত হয় ও পরিপুষ্টি লাভ করে আমজনতার ক্রোড়ে। যদ্দিন একটি ভাষা দেশের সাধারণ মানুষ এবং অপেক্ষাকৃত দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা, ততদিন সে ভাষা বিলীন হবার সম্ভাবনা নেই।
কিন্তু ভাষার গতিপ্রবাহ কোন দিকে বাঁক নেবে, তা কি স্থির করা সম্ভব?
২।
ইন্দো ইয়োরোপিয়ান গ্রুপ অফ ল্যাঙ্গুয়েজেস থেকে প্রোটো বা প্রিমিটিভ(আদি) জার্মানিক ভাষার জন্ম। আর এই প্রোটো জার্মানিক ভেঙ্গে ইস্টার্ন জার্মানিক (গথ ভাষা), নর্দার্ন জার্মানিক (নরওয়েজিন, সুইডিশ, ডেনিশ সহ বিবিধ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষা), এবং ওয়েস্ট জার্মানিক ( ওল্ড স্যাক্সন, ওল্ড জার্মান, এবং ওল্ড ইংলিশ) – ভাষাগুচ্ছের জন্ম।
জার্মান ভাষার একটা আদি চরিত্র হল, নতুন কোন এক্সপ্রেশান, বা বিষয়বস্তু যদি তাদের সামনে উপস্থিত হত, তবে তারা অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার করার বদলে কাছাকাছি অন্যান্য শব্দ থেকে সিলেবল বা শব্দাংশ ধার করে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করতেন। ওল্ড ইংলিশ যেহেতু জার্মান ভাষা থেকে উদ্গত, কাজেই ওল্ড ইংলিশেরও এই প্রবণতা ছিল। তখন ওল্ড ইংলিশের শব্দভাণ্ডার ছিল সাকুল্যে ৫০০০০। মিডল ইংলিশে, বিশেষত নর্মাণ ফ্রেঞ্চদের দ্বারা ১০৬৬ সালের পর প্রায় ২০০ বছরের জন্য ইংল্যান্ড অধিকৃত হবার পর ইংরেজদের মধ্যে এই প্রবণতা হ্রাস পায়। তখন ইংরেজি শব্দভাণ্ডারের সাইজ দাঁড়ায় ১ লাখ থেকে সোয়া ১ লাখের মধ্যে। কলোনিয়াল এক্সপ্যানশনের পর, এবং বর্তমানে প্রযুক্তির ছয়লাবের যুগে এসে ইংরেজরা দেদারসে শব্দ ধার করা শুরু করে। বর্তমানে তাদের ইংরেজি লেক্সিকন/শব্দ - প্রায় ৫ লাখের মতো। তাতে লাখ লাখ ধারকৃত শব্দ আছে, সেটা বলাই বাহুল্য।
৩।
কিন্তু তাতে ইংরেজি ভাষার “ইংরেজিত্ব” (ইংলিশনেস) – কি কমেছে আদৌ?
এখানেই ইতিহাস পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে পড়ে।
ইংরেজি ভাষার ইতিহাস পড়াতে গিয়ে একটা কথা আমার বারবার বলা লাগে। সেটা হচ্ছেঃ ব্রিটিশ ভূখণ্ডে ভাষার ইতিহাস, আর ইংরেজি ভাষার ইতিহাস – এ’দুটো জিনিস এক নয়। বিশেষ করে ১১ শতকের ইংল্যান্ডের দিকে তাকালে স্যাক্সনরা যে রাজনৈতিকভাবে ইংল্যান্ডে স্থায়ী হবে, আর ইংরেজি ভাষা, ভাষা হিসেবে টিকে যাবে, সেটা বোঝার কোন উপায় ছিল না।
ইংল্যান্ডের আদিবাসীদের মধ্যে আছে আইবেরিয়ান এবং কেল্টরা (জি এম ট্রাভেলিয়নের ইংল্যান্ডের ইতিহাসের ওপর রচিত বিখ্যাত বই দ্রষ্টব্য)। রোমান সাম্রাজ্য যখন ইংল্যান্ডকে আক্রমণ করে, তখন ইংল্যান্ডের ভূমিপুত্র আইবেরিয়ান এবং কেল্টরা গিয়ে আশ্রয় নেয় ইংল্যান্ডের মানচিত্রের প্রান্তিক জায়গাগুলিতে (স্কটল্যান্ড, ওয়েলস – ইত্যাদি)। অথচ এই কেল্টিক জনগোষ্ঠী একসময় ব্রিটেনের ম্যাপ জুড়ে ছিল, তাদের এক জীবন্ত ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গা, এবং নদনদীর নাম কেল্টিক ভাষায়।
কে জানত, এই কেল্টরা একদিন হারিয়ে যাবে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক পটভূমি থেকে?
১১ শতকে এই একই প্রশ্নের সম্মুখে এসে দাঁড়ায় জার্মানি ও বেলজিয়ামের অংশ বিশেষ থেকে এসে ইংল্যান্ডের দক্ষিন অংশ দখল করে রাখা অ্যাংলো স্যাক্সন জনগোষ্ঠী এবং তাদের প্রণীত – চর্চিত ভাষা ওল্ড ইংলিশ।
১০৬৬ সালের কিছু আগে ব্রিটেনের সিংহাসনে শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তখন একই সঙ্গে ৩ জন ব্যক্তি ইংল্যান্ডের রাজ সিংহাসনের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইংল্যান্ডের উত্তর অংশ অধিকৃত করে রাখা ভাইকিং / নর্থমেন রাজা হ্যারলড হারড্রাডা, ফ্রান্সের নর্মান্ডির ডিউক উইলিয়াম, এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সমস্ত স্যাক্সন হাউজ মিলে নির্বাচিত স্যাক্সন রাজা হ্যারলড গডউইন। হ্যারলড গডউইন ভাইকিং রাজা হ্যারলড হারড্রাডাকে পরাজিত করতে পারলেও, কয়েকদিনের ব্যবধানে ফ্রেঞ্চ ডিউক উইলিয়াম দি কঙ্কয়েরারের নিকট হেস্টিংসের যুদ্ধে নির্মমভাবে পরাজিত হন, এবং সমস্ত স্যাক্সন যোদ্ধাদের লাশ সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকে লন্ডন ব্রিজের সামনে।
ইংল্যান্ডের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ফ্রান্সের কাছে ২০০ বছরের লজ্জাজনক পরাধীনতার ইতিহাস শুরু হয়।
৪।
ইংরেজি ভাষা ফাইটব্যাক করে আমজনতার মুখে।
ফ্রেঞ্চ ভাষা দাপ্তরিক ভাষায় পরিণত হয়। রাজারাজড়া এবং তাদের নৈকট্যপ্রাপ্ত আমত্যরা ফ্রেঞ্চ ভাষায় আলাপচারিতা চালিয়ে যায়। কিন্তু জনতার কোলেকাঁখে বেঁচে থাকে ইংরেজি ভাষা।
তার কয়েকশ’ বছর আগে কেইদমন নামে এক রাখাল বালকের মুখে ইংরেজি ভাষায় রচিত ঈশ্বরপ্রশস্তি মূলক কবিতার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় (ওল্ড ইংলিশ ভাষায়) প্রথম কবিতা রচনার সূচনা হয়েছে। ইংল্যান্ডের মানুষ জানতে পেরেছে, শুধুমাত্র দুর্বোধ্য চার্চ ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাটিন নয়, তাদের মাতৃভাষা ইংরেজিতেও তারা চাইলে ঈশ্বরকে ডাকতে পারে। ইংরেজি ভাষায় প্রথম মহাকাব্য বেউলফ ততদিনে রচনা হয়ে গেছে। মধ্য যুগে এসে ‘দা ফাউন্ডিং ফাদার অফ আওয়ার ফাইনেস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ – অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার জনক জফ্রে চসার চলে এসেছেন, ইংরেজি ভাষাকে (ইংরেজি ভাষা তখন মিডল ইংলিশ) একটা মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে তুলে আনার জন্য। এবং জার্মানিতে প্রটেস্টাণ্ট মুভমেন্ট চালু হবারও ২শ বছর আগে ইংল্যান্ডের সেন্ট্রাল মিডল্যান্ড এলাকায় জন উইক্লিফের তত্ত্বাবধানে উইক্লিফাইট মুভমেন্ট চলে এসেছে, মাতৃভাষা ইংরেজিতে প্রার্থনা করা যার অনেকগুলো দাবীর একটি মূল দাবী ছিল।
ইংরেজি ভাষার ইতিহাসের দিকে তাকালে এভাবে আমরা বুঝি, রাজনৈতিকভাবে যতই একটা ভাষা এবং ভাষাভাষী মানুষকে নিপীড়নের মধ্যে রাখা হোক না কেন – যদ্দিন সে ভাষার ব্যবহার আমজনতার মুখে মুখে বেঁচে আছে, সে ভাষা মরবার নয়।
৫।
বাকি রইল ভাষিক শুদ্ধতার ব্যাপার।
এটা ইংরেজি ভাষার দিকে তাকালেই বোঝা যায় – আইডিয়া হিসেবে একটা ভাষাকে ‘বিশুদ্ধ’ রাখা ব্যবহারিক পরামর্শ নয়। কোন একটি ভাষা যদি বিজেতার ভাষা হয়, তবে সে স্বাভাবিকভাবেই পরাজিত জাতিগোষ্ঠীকে শাসন করবার জন্য নিজের ভাষার শব্দভাণ্ডারের আগল খুলে দেয়, যেখান দিয়ে দেদারসে অন্যান্য ভাষার শব্দ বিজেতার ভাষায় প্রবেশ করে। এভাবে ইংরেজি ভাষার শব্দভাণ্ডার আজ প্রায় ৫ লাখের মতো, যেখানে ক্ষুদ্র ওল্ড ইংলিশ ভাষার শব্দভাণ্ডার ছিল তার ১০ ভাগের ১ ভাগ।
ইন্টারনেটের যুগে এসেও মানুষ যার যার পছন্দের ভাষিক পরিচয় তৈরি করে নেয়। পেশাসূত্রে তরুণ ছেলেপেলেদের সংস্পর্শে থাকার কারনে জানি, এখন তাদের অনেকের প্রিয় ভাষা কোরিয়ান। তারা ভালোবাসি, বা লাভ ইউ ইত্যাদি বলার বদলে সারাঙ্গেও এবং তর্জনী এবং ব্রিদ্ধাঙ্গুল একত্রীত করে একটা সাইন তৈরি করে দেখাতে বেশী সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
সর্বোপরি আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যতটুকু শক্তিশালী, আমাদের ভাষা, ভাষা সংশ্লিষ্ট শিল্প – সাহিত্য – সংস্কৃতিও ঠিক ততটুকুই প্রভাবশালী হবে।
একটা মান বা প্রমিত ভাষা নির্মাণের ব্যাপার যেহেতু সর্বদাই ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে সংযুক্ত, এখানে ভাষিক আদারিং, বা আশরাফ – আতরাফ, ব্রাম্মন্যবাদ – বর্ণশূদ্র চিহ্নিত করার ব্যাপার থাকে, সে দায়িত্ব সরকারের কাছেই থাক। আদারিং করার ব্যাপারটা যেহেতু সরাসরি রাজনীতি সংশ্লিষ্ট।
আমজনতা, কবি – সাহিত্যিক – সাংবাদিক সকলের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারে বাংলার যে চেহারা আজ হতে ১০০ বছর পর দাঁড়াবে, সেটাই বাংলার ভবিতব্য। এটা একটা অরগানিক প্রসেস, যেটার মধ্যে বামহাত ঢোকানোর প্রচেষ্টা দিনশেষে একটা ভাষিক ফ্যাসিবাদ হয়েই দাঁড়ায়।
©somewhere in net ltd.