নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আবু সিদ

আবু সিদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

যেমন প্রশাসন চাই (মালিক আশতারকে লেখা হযরত আলী (রাঃ)-র চিঠি অবলম্বনে)

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

হযরত আলী (রাঃ)-র নামে দর্শন, ধর্ম, আইন এবং রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অন্তত ৪৮০টি চুক্তি, বক্তৃতা এবং পত্রের উল্লেখ পাওয়া যায় যা জায়েদ ইবনে ওয়াহাব (Zaid Ibn Wahab) আলী (রাঃ)র জীবদ্দশায় সংগ্রহ করেছিলেন। এই রচনাগুলোর বিষয়বস্তু এবং সাহিত্যিক মান এতোটা উঁচু যে, ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মুসলিম শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে এগুলো পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। রেনেসাঁর (Renaissance) সময় তাঁর খ্যাতি ইউরোপে গিয়ে পৌঁছে । অধ্যাপক এডওয়ার্ড পোকক (Edward Pococke, 1604-1691) তাঁর ‘বাণীসমূহ’ (Sayings)-এর প্রথম ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন এবং ১৬৩৯ সালে তাঁর ‘বাগ্মিতা’ (Rhetoric)-এর ওপর সিরিজ বক্তব্য প্রদান করেন।

এটি সুশাসন (Governance), ন্যায়বিচার এবং প্রশাসনের (Administration) একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা হিসেবে গণ্য। এই চিঠিতে তিনি যে প্রধান মূলনীতিগুলো (Principles) বর্ণনা করেছেন তা হলো:
নৈতিক নেতৃত্ব ও জবাবদিহিতা: শাসকের নৈতিকতা এবং জনগণের কাছে তাঁর দায়বদ্ধতা।
সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগ: সশস্ত্র বাহিনী এবং আদালত পরিচালনার সঠিক পদ্ধতি।
অসহায়দের সুরক্ষা: দরিদ্র এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা।

রশীদ তুরাবীর (Rasheed Turabi, 1908 – 1973) মতো আধুনিক ব্যক্তিত্বরা এই চিঠির গুরুত্ব এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক নৈতিকতার (Political Ethics) সাথে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে গভীর গবেষণা ও অনুবাদ করেছেন। চিঠিটি আজও সুশাসন ও ন্যায়বিচারের এক চিরন্তন দলিল (Timeless Document) হিসেবে স্বীকৃত। বিভিন্ন দেশে এই চিঠির একাধিক উৎস (online open source) রয়েছে; যেমনঃ
Click This Link
Click This Link
Click This Link

চিঠিটির রশীদ তুরাবীর (Rasheed Turabi, 1908 – 1973) ইংরেজি অনুবাদের সংক্ষিপ্ত বাংলা নিচে তুলে ধরা হলো:

সর্বোত্তম সম্পদ
প্রিয় মালিক, আমি আপনাকে এমন এক দেশে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছি যা ন্যায় এবং অন্যায় উভয় ধরনের শাসকই দেখেছে। মনে রাখবেন, মানুষ আপনার কাজকে ঠিক সেভাবেই পর্যবেক্ষণ করবে, যেভাবে আপনি আপনার পূর্ববর্তীদের কাজ দেখতেন।

"যে মহত্তম সম্পদ আপনি সঞ্চয় করতে পারেন তা হলো ভালো কাজ।"

আপনার প্রজাদের জন্য অন্তরে ভালোবাসা ও দয়া জাগিয়ে রাখুন। তাদের সাথে বর্বরোচিত আচরণ করবেন না। মনে রাখবেন, আপনার রাজ্যে দুই ধরনের মানুষ রয়েছে: একদল ধর্মীয় সূত্রে আপনার ভাই, অন্য দল সৃষ্টির দিক থেকে আপনার সমান। মানুষ হিসেবে তারা ভুল করতে পারে; তাই আপনিও তাদের ক্ষমা করুন, যেমনটা আপনি আল্লাহর কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন।

কখনো বলবেন না, "আমি তোমাদের শাসক, তোমাদের উচিত আমার আদেশ পালন করা।" এমন অহংকার মনকে কলুষিত করে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। নিজেকে কখনোই আল্লাহর মহিমা ও বড়ত্বের সাথে তুলনা করবেন না; আল্লাহ স্বৈরাচারীদের ঘৃণা করেন।

জনসাধারণ
শাসক হিসেবে গুটিকয় সুবিধাভোগীর চেয়ে সাধারণ জনগণের সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিন। সুবিধাভোগীরা দুর্দিনে আপনার পাশে থাকবে না এবং তারা সবসময় আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে চায়। মূলত সাধারণ মানুষই হলো রাষ্ট্রের মূল শক্তি।
ছিদ্রান্বেষী ও গুজব রটনাকারীদের থেকে দূরে থাকুন। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করুন এবং তাদের ভুলগুলো সাধ্যমতো ঢেকে রাখুন। শাসনের ভেতরে যেন সাধারণ মানুষের মনে আপনার প্রতি ঘৃণা বা ভীতি তৈরি না হয়।

উপদেষ্টা বা পরামর্শদাতা
পরামর্শদাতা নির্বাচনে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। কৃপণ, ভীরু এবং লোভীদের উপদেষ্টা হিসেবে গ্রহণ করবেন না।
"সবচেয়ে নিকৃষ্ট পরামর্শদাতা তারাই যারা আগে জালিম বা অন্যায়কারী শাসকদের অপরাধে অংশ নিয়েছিল।"
যাদের মেধা ও সততা প্রশ্নাতীত এবং যারা কখনো কোনো অত্যাচারীকে সাহায্য করেনি, তাদেরই পাশে রাখুন। তোষামোদকারীদের প্রশ্রয় দেবেন না, কারণ অতিরিক্ত প্রশংসা অহংকারের জন্ম দেয়। সৎ ও মন্দ ব্যক্তিকে এক চোখে দেখবেন না; এতে ভালো মানুষ নিরুৎসাহিত হয়। পূর্বসূরিদের প্রতিষ্ঠিত মহান ঐতিহ্য ও নিয়মগুলো বজায় রাখুন যা সমাজে শান্তি নিশ্চিত করে।

বিভিন্ন শ্রেণির জনগণ
একটি রাষ্ট্র বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত—সৈন্যবাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, বিচারক, কর সংগ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিক। এরা প্রত্যেকেই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে প্রত্যেকের অধিকার ও কর্তব্যের কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব হলো এই প্রতিটি শ্রেণির অধিকার রক্ষা করা এবং সহিষ্ণুতার সাথে তাদের মঙ্গল নিশ্চিত করা।

সেনাবাহিনী
সেনাবাহিনী হলো দেশের শান্তি ও নিরাপত্তার অজেয় দুর্গ। সেনাপতি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নিন যিনি আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) প্রতি একনিষ্ঠ এবং সৈন্যদের প্রতি দয়ালু। সৈন্যদের প্রয়োজনগুলো এমনভাবে মেটান যেন তারা আপনাকে অভিভাবক মনে করে।

"যোগ্য ব্যক্তিকে পুরস্কার দিতে কখনো দেরি করবেন না এবং একজনের দোষ অন্য কারো ওপর চাপাবেন না।"

সৈন্যদের বীরত্বের প্রশংসা করুন, এতে সাহসী মানুষ উৎসাহিত হয় এবং ভীরুরা সাহস পায়। তাদের সাথে এমন আচরণ করুন যেন তারা সরকারকে বোঝা মনে না করে।

প্রধান বিচারক ও বিচার বিভাগ
বিচারপতি হিসেবে এমন একজনকে নিয়োগ দিন যিনি জনগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নির্লোভ এবং যাঁর চরিত্রে দৃঢ়তা আছে। তিনি যেন কোনো প্রলোভন বা তোষামোদে বিভ্রান্ত না হন।

বিচারক নিয়োগের পর তাঁর কাজের ওপর সতর্ক নজর রাখুন এবং তাঁকে পর্যাপ্ত বেতন দিন যাতে তিনি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাকে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন।

রাজস্ব ও কর ব্যবস্থাপনা
রাজস্ব সংগ্রহের চেয়ে চাষি ও কৃষিজমির উন্নয়নের দিকে বেশি নজর দিন। ভূমি উৎপাদনশীল না হলে রাজস্ব পাওয়া সম্ভব নয়।

"যে ব্যক্তি চাষিকে তার জমির উন্নয়নে সাহায্য না করে কেবল রাজস্ব দাবি করে, সে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে।"

খরা, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাজনা কমিয়ে দিন। এই সাময়িক ক্ষতি নিয়ে চিন্তিত হবেন না, কারণ সমৃদ্ধ ভূমি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে আরও বেশি প্রতিদান দেবে। প্রজাদের সমৃদ্ধিই আপনার প্রকৃত শক্তি।

শিল্প ও বাণিজ্য
শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারে কার্যকরী নীতি তৈরি করুন। ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে খেয়াল রাখবেন, বণিক সম্প্রদায়ের কেউ যেন অতি-লোভী হয়ে মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে। মজুতদারি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করুন এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করুন।

দরিদ্র ও অসহায় নাগরিক
সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকুন সমাজের নিঃস্ব ও অসহায় মানুষের বিষয়ে। যারা মুখ ফুটে সাহায্য চাইতে পারে না, তাদের অধিকার রক্ষা করা আপনার পবিত্র দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের জন্য অংশ বরাদ্দ করুন। কোনো অজুহাতে বা ব্যস্ততায় এই অবহেলিত মানুষদের ভুলে যাবেন না, কারণ পরকালে আল্লাহর কাছে এর হিসাব দিতে হবে। বয়স্ক এবং উপার্জনহীন ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ মমতা প্রদর্শন করুন।

উন্মুক্ত সভা ও আলোচনা
নিপীড়িত মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য নিয়মিত উন্মুক্ত সভার আয়োজন করুন। সেখানে কোনো সশস্ত্র দেহরক্ষী বা পুলিশ রাখবেন না, যাতে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে তাদের মনের কথা বলতে পারে।

"সেই জাতি কখনো মর্যাদা পায় না, যেখানে শক্তিশালী মানুষেরা দুর্বলদের অধিকার আদায় করে না।"

জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবেন না। শাসক যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তখন তিনি সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারেন না। আত্মীয়-স্বজন বা ঘনিষ্ঠদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন এবং সবার সাথে সমান ন্যায়বিচার করুন।

শান্তি ও শান্তি চুক্তি
শত্রু যদি শান্তির প্রস্তাব দেয়, তবে তা গ্রহণ করুন। শান্তি দেশের স্থিতিশীলতা আনে। তবে চুক্তির পর শত্রুর সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকুন।

"যদি কারো সাথে কোনো অঙ্গীকার বা চুক্তি করেন, তবে নিজের জীবন দিয়ে হলেও তা রক্ষা করুন।"

বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন; এমনকি অমুসলিম শত্রুর সাথেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন না। অহেতুক রক্তপাত এড়িয়ে চলুন। নির্দোষ কাউকে হত্যা করা এমন এক অপরাধ যার ক্ষমা নেই এবং যা শাসনের পতন ত্বরান্বিত করে।

শেষ কথা
সময়ের গুরুত্ব বুঝুন; কোনো কাজে তাড়াহুড়ো করবেন না, আবার সময় আসার পর বিলম্বও করবেন না। ব্যক্তিগত মতামত বা রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন না। পূর্ববর্তী ন্যায়পরায়ণ শাসকদের নীতি এবং পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আদর্শকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করুন।

আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী কাজ করার শক্তি দেন এবং আমাদের মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত রাখেন। নিশ্চয়ই আমাদের সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫

রাজীব নুর বলেছেন: আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি, আবার আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবো। মাঝখানে পৃথিবীতে। কত সমস্যায় জর্জরিত।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.