| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এক
উপনিবেশিকতা (Colonialism) হলো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। Colonialism শব্দটি এসেছে লাতিন Colonia থেকে, যার অর্থ বসতি বা সম্পত্তি। এটি সাধারণত উপনিবেশ স্থাপন, সম্পদ লুট এবং স্থানীয় জনগণের উপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে ঘটে।
উপনিবেশিকতা বা Colonialism এর প্রধান বৈশিষ্ট্য:
o রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক আধিপত্য
o অর্থনৈতিক শোষণ ও সম্পদ লুট
o সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার ও স্থানীয় সংস্কৃতির দমন
১৬শ শতাব্দী থেকে ২০শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, যার প্রভাব শিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজে গভীরভাবে পড়ে। এশিয়া, আমেরিকা আফ্রিকার বহু দেশে ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও অন্য অনেক ইউরোপীয় দেশের উপনিবেশ ছিল।
বাংলা ভাষায় ‘ঔপনিবেশিক শব্দ’ (Colonial Words) মূলত সেইসব শব্দ যা ব্রিটিশ শাসন আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭) ইংরেজি বা অন্য ইউরোপীয় ভাষা থেকে বাংলা শব্দভাণ্ডারে প্রবেশ করেছে। প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের ফলে প্রশাসনিক, বিচারবিভাগীয়, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি শব্দের গভীর প্রভাব তৈরি হয়েছে । এই ঔপনিবেশিক শব্দগুলো কেবল ভাষাগত উপাদান নয়, বরং ইতিহাসের সাক্ষী।
দুই
ঔপনিবেশিক শব্দগুলো এক, দুই বা কয়েক প্রজন্ম ধরে বাংলায় আসেনি। বরং, কয়েকশ বছর ধরে তারা ধীরে ধীরে বাংলায় প্রবেশ করেছে। বাংলায় ঔপনিবেশিক যুগে প্রায় ৩–৪ হাজার শব্দ এসেছে। আরবি ও ফারসি থেকে এসেছে আরও ৯–১১ হাজার শব্দ। সব মিলিয়ে, ১৬শ–২০শ শতক ও পূর্ববর্তী সময়ে প্রায় ১২–১৫ হাজার বিদেশি শব্দ বাংলার শব্দভাণ্ডারে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
নিচে কয়েকটি ঔপনিবেশিক শব্দ নিয়ে আলোচনা করা হলো:
১. ভারতীয় উপমহাদেশ (Indian Subcontinent)
ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিক গুরুত্ব: ব্রিটিশ শাসনামলে এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ বা সংক্ষেপে ‘ইন্ডিয়া’ বলা হতো। ‘উপমহাদেশ’ শব্দটি একটি ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক একককে নির্দেশ করে, যা হিমালয় পর্বতমালা দ্বারা এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। ঔপনিবেশিক শাসকরা প্রশাসনিক সুবিধার্থে এই বৈচিত্র্যময় অঞ্চলকে একটি সুসংহত রূপ দেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করা ছিল তাদের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য।
আধুনিক সময়: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ‘উপমহাদেশীয়’ পরিচয়ের চেয়ে জাতীয় পরিচয় (যেমনঃ বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি ইত্যাদি) বেশি জোরালো হয়ে ওঠে। বর্তমানে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ‘ভারতীয় উপমহাদেশ’ শব্দের চেয়ে ‘দক্ষিণ এশিয়া’ শব্দটি বেশি যুক্তিযুক্ত । এটি নির্দিষ্ট কোনো দেশের নামের প্রভাবমুক্ত একটি পরিচয় দেয়। এ ছাড়া বর্তমানের শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থা এবং পৃথক পাসপোর্ট ও ভিসা নীতির কারণে ব্রিটিশ আমলের উপমহাদেশের ধারণাটি আজ আর বাস্তব সম্মত নয়। বরং, অনেক সময় তা বিভ্রান্তিকর!
২. জমিদার (Zamindar)
ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিক গুরুত্ব: ফারসি ‘জমিন’ ও ‘দার’ থেকে আগত এই শব্দটি মুঘল আমলে রাজস্ব সংগ্রাহকদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তবে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) এই পদের চরিত্র বদলে দেয়। ব্রিটিশরা জমিদারদের জমির চূড়ান্ত মালিকানা প্রদান করে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব প্রদানের ‘সূর্যাস্ত আইন’ প্রবর্তন করে। এর ফলে এক নতুন অনুগত সামন্ত শ্রেণি তৈরি হয়, যারা গ্রামীণ বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করত।
আধুনিক সময়: ১৯৫০ সালের ‘পূর্ববঙ্গ জমিদারি দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে জমিদারি প্রথা চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হয়। এর ফলে বংশপরম্পরায় ভূমি ভোগের আইনগত অধিকার শেষ হয়ে যায়। আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার উৎস আর ভূমি নয়, বরং জনগণের ভোট। ফলে জমিদারদের সেই একচ্ছত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এখন বিলুপ্ত। শব্দটি এখন কেবল অতীতের বিলাসিতা বা আভিজাত্য বোঝাতে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
‘ভারতীয় উপমহাদেশ’ এবং ‘জমিদার’ শব্দ দুটি সেই সময়কার রাজনৈতিক ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। শব্দ দুটি এখন আর ক্ষমতা বা প্রশাসনিক এককের প্রতীক নয়। সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক সীমানা ও আইনি সংস্কারের ফলে শব্দ দুটি তাদের গুরুত্ব হারিয়েছে।
৩. কাচারি বা কাছারি (Kachari / Cutcherry)
[মূল শব্দটি তামিল ‘kaccēri’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘অফিস’ বা ‘প্রশাসনিক সভাকক্ষ’। ঔপনিবেশিক যুগে এটি ইংরেজিতে cutcherry রূপে গৃহীত হয়েছিল। অর্থাৎ, শব্দটি প্রথমে দক্ষিণ ভারতের তামিল থেকে এসেছে, পরে উত্তর ভারতের ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে, এবং শেষ পর্যন্ত বাংলায় ও ইংরেজিতে ব্যবহৃত হয়েছে।]
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: 'কাছারি' শব্দটি মূলত ফারসি থেকে এলেও ব্রিটিশ আমলে এটি একটি বিশেষ প্রশাসনিক ও বিচারিক অর্থ লাভ করে। এটি ছিল জমিদারদের খাজনা আদায়ের অফিস কিংবা সরকারের নিম্ন আদালতের কার্যালয়। গ্রামীণ বাংলায় ‘কাছারি বাড়ি’ ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। ব্রিটিশ শাসকরা এই কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত।
আধুনিক প্রেক্ষাপট: জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সাথে সাথে ‘কাচারি’/‘কাছারি’ বাড়ি তার প্রতাপ হারিয়েছে । বর্তমানে এটি আদালতের সমার্থক হিসেবে বা পুরনো কোনো ভবনের নাম হিসেবে টিকে আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘কাচারি’/ ‘কাছারি’ শব্দের জায়গা দখল করেছে আধুনিক ‘অফিস’ বা ‘কোর্ট’ শব্দটি।
৪. কালেক্টর (Collector)
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস এই পদটি সৃষ্টি করেন। জেলা পর্যায়ে রাজস্ব আদায় (collection) করা ছিল এই পদের প্রধান কাজ, তাই এর নাম হয় ‘কালেক্টর’। এটি ছিল জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ। ব্রিটিশ আমলে একজন কালেক্টর একাধারে রাজস্ব আদায়কারী, ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারকের ভূমিকা পালন করতেন, যা তাকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী করে তুলেছিল।
আধুনিক প্রেক্ষাপট: বর্তমানে বাংলাদেশে এই পদের নাম ‘ডেপুটি কমিশনার’ বা ডিসি (DC)। তবে, ভারতে এখনও অনেক জায়গায় এই পদটিকে ‘কালেক্টর’ বলা হয়।
৫. কেরানি (Clerk / Kerani)
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: পর্তুগিজ 'Escrivao' থেকে শব্দটি এলেও ব্রিটিশ আমলে এটি একটি বিশাল কর্মীবাহিনীকে বোঝাতো। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের হিসাবপত্র রাখার জন্য স্থানীয়দের মধ্যে থেকে যে নিম্নপদস্থ কর্মচারী নিয়োগ করত, তাদের বলা হতো ‘কেরানি’।
আধুনিক প্রেক্ষাপট: ডিজিটাল যুগে ‘কেরানি’ শব্দটি তার পুরনো গুরুত্ব হারিয়েছে। এখন এই পদের নাম ‘অফিস সহকারী’ বা ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্টাফ’। তবে পুরনো দাপ্তরিক জটিলতা বোঝাতে ‘কেরানিগিরি’ শব্দটি এখনও ব্যবহৃত হয়।
৬. দারোগা (Darogha)
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: মুঘল আমলে এই পদটি থাকলেও ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস যখন প্রতিটি জেলায় পুলিশি থানা বা 'Circle' ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তখন 'দারোগা' পদটি ব্রিটিশ পুলিশের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে। গ্রামীণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ছায়া। তৎকালীন সাহিত্যে দারোগারা প্রায়-সময় শোষক বা ভীতিকর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
আধুনিক প্রেক্ষাপট: বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই পদের নাম ‘সাব-ইন্সপেক্টর’ (SI)। তবে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে বা বয়স্কদের কাছে পুলিশের এই পদটি এখনও ‘দারোগা’ নামে বেশি পরিচিত।
৭. মুন্সি (Munshi)
ঐতিহাস গুরুত্ব: ফারসি শব্দ 'মুন্সি' মূলত লেখক বা সচিবকে বোঝাত। ব্রিটিশ আমলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের পাশাপাশি অনেক মুসলিম পণ্ডিতও ইংরেজদের ভাষা ও প্রশাসনিক কাজে সাহায্য করতেন, যাদের মুন্সি বলা হতো। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের স্থানীয় ভাষা শেখানোর কাজে তাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
আধুনিক প্রেক্ষাপট: সময়ের সাথে সাথে ‘মুন্সি’ শব্দটি তার দাপ্তরিক গাম্ভীর্য হারিয়েছে। বর্তমানে এটি মূলত কারো পারিবারিক উপাধি হিসেবে টিকে আছে ।
(সংক্ষেপিত)
তথ্যসূত্র
• Chatterji, S. K. (1926). The Origin and Development of the Bengali Language. Calcutta University Press.
• Guha, R. (1999). Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India. Duke University Press.
• Hunter, W. W. (1868). The Annals of Rural Bengal. Smith, Elder, and Co.
• শহীদুল্লাহ, মু. (১৯৯৮). বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত. মাওলা ব্রাদার্স। (এই গ্রন্থে বাংলা ভাষার বিভিন্ন স্তরে বিদেশী শব্দের অনুপ্রবেশের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে)।
©somewhere in net ltd.