| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাবা যখন মারা যান আলমগীরের বয়স তখন চৌদ্দ বছরের কিছু বেশি। আজ ষোলো দিন হয় তার বাবা নেই। হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ায় তাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে তার মা এক কঠিন বিপদে পড়েছেন। বাবা টাকা-পয়সা তেমন রেখে যেতে পারেন নি। শুধু আছে বাজারের মধ্যে একটা মুদি দোকান। তাও গত দু'সপ্তার মধ্যে তার দখল তারা হারিয়ে ফেলেছে। আলমগীরের মা বা বাবারও কোন ভাই-বোন ছিল না। তাদের কোন নিকট আত্মীয়ও নেই যারা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে। এরকম একটা দারুণ সুযোগ পেয়ে আলমগীরের পাশের দোকান-মালিক তাদের দোকানটার দখল নিয়ে নিয়েছে। অগত্যা জীবন চালাতে আলমগীর আজ পথে নেমে এসেছে। স্কুল সে বাদ দিয়েছে কারণ গত কয় মাস তার বেতন বাকি। তাছাড়া বেতন দেয়ার মতো টাকাও তাদের কাছে নেই। তাদের সম্বল বলতে ছোট বাড়িটা আর তার মায়ের সঞ্চয় করে রাখা কয়েক হাজার টাকা। টাকাটা ইংরেজি ২০২২ সালের হিসাবে তেমন কিছু না।
বাবা যখন ছিলেন অর্থনৈতিকভাবে তারা ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত। অবস্থাটা নির্ভর করত বাবার ব্যবসার ওপর। এখন অর্থনৈতিক অবস্থাটা অনিশ্চিত। এখন কী ব্যবস্থা করা যায় তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে আলমগীর আর তার মা একটা উপায় বের করল। তারা ঠিক করল যে আটা-ময়দা-চিনি এসব কিনে তাদের বাড়িতে কেক বানাবে। ট্রেন আসার আগে আলমগীর রেলস্টেশনে গিয়ে ফেরি করে সেগুলো বিক্রি করবে।
সকালের ট্রেনের সময় হতে আলমগীরের হাতে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে দিলেন তার মা। বললেন, তোর ছোট ভাইটারেও নিয়ে যা; তোরে সাহায্য করবো। 'ও স্কুলে যাক, মা! প্রাইমারিতে তো আর বেতন লাগত না' - একাই বেরিয়ে পড়ল আলম।
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক পেরিয়ে গেছে। মাথায় ফেরি করে বিক্রি করার চলও কমেছে অনেক। বাড়ি পেরিয়ে রাস্তায় যেতে বন্ধুদের সাথে দেখা হয়ে গেল তার। প্রথমত কিছুটা সংকোচ হলো তার। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলো আলম। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলো, যাইবি না স্কুলে? আলম অনেকটা মন খারাপের সাথে বলল, না রে ! আমার কাজ করা লাগবো । হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল । আলম আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত হাটতে শুরু করল।
ট্রেন আসার ঠিক আগ মুহুর্তে পৌঁছল আলম। প্রথম বার আসায় সে ঘাবড়ে গেল। কী বলবে তা ভুলে গেল ! আগে কখনও এরকম কোন কাজ তাকে করতে হয় নি তাই তার নার্ভাস লাগছে। পরক্ষণে সে সামলে নিলো নিজেকে। ‘এ কাজ করাই লাগবো’, মনে মনে বলল সে। তার সামনে অন্য কোন উপায় নেই। সে তার ছোট কেকের ট্রেটা মাথায় নিয়ে হাঁক ছাড়ল, কেক নেন কেক । হোম মেড কেক ! মজাদার ! সুস্বাদু ! প্লাটফর্মে হেঁটে হেঁটে ট্রেনের বগিগুলোর সামনে দাড়িয়ে সে কেক বেচতে শুরু করল । কয়েক পিস কেক বিক্রি হয়ে গেল । এর মধ্যে একজন যাত্রী কামড়ানো একটা কেক তার দিকে ছুড়ে মারল। চিৎকার দিলো সে, ওই হালার পুত ! এইটা কোন কেক হইলো ? এতো শক্ত ইট । আলম প্রথমত ঘাবড়ে গেল ! সে বা তার মা কেউই কেক বানাতে ওস্তাদ নয়। আবার সেও বানানোর পর সেটা খেয়েও দেখে নি । ছুড়ে মারা কেকটা হাত দিয়ে টিপে তাই সে কেকের টাকাটা ফেরত দিয়ে দিলো। বলল, সরি স্যার ! আজ আমরা ভালো কেক বানাতে পারিনি। আশা করি পরে যেদিন আপনি আবার এই রাস্তায় যাবেন আমি আপনাকে ভাল কেক খাওয়াবো । সে একে একে সবার টাকা ফেরত দিয়ে দিলো। একজন বয়স্ক মহিলা শুধু টাকা ফেরত নিলো না। সে বলল, তোমার কেক আমার খারাপ লাগেনি, বাবা ! সে আলমকে নিঃশেষ প্রায় কেকটা দেখাল । বলল, এই দেখ ! আমি প্রায় পুরোটাই খেয়ে নিয়েছি ।
হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চলে গেল। আলম চুপচাপ স্টেশনে বসে রইল।
এক সপ্তাহ কাজ না করে বসে থাকার মতো অবস্থা নেই আলমের। তাও সে অনেক কষ্টে তার মা কে রাজি করাল যে খারাপ জিনিস বিক্রি করে টাকা আয় করাটা ভালো নয় । পরিবর্তে কিছু সময় নিয়ে জিনিসটা ভালো করা দরকার। তাতে দেরি হলেও গুণমান বজায় থাকবে। তাদের কেকের সুনাম হবে । বিক্রি করা পণ্যের গুণমান বজায় রাখাটা ভালো ব্যবসার প্রথম শর্ত ! যাই হোক, মাকে রাজি করানোর পর আলম গত এক সপ্তাহ নানান জায়গা থেকে কেক বানানোর উপায় শিখে নিয়েছে । শহরের এক বেকারির মালিক তো তার নোট নেয়ার উপায় দেখে অবাক ! সে বলেই ফেলল, আমাগো পথে বসাইবি না তো আবার ! আলম হেসে বলল, কী যে কন কাহা ? আমরা বাসায় বানামু। অল্প কইরা। নিজেগো চলার লাইগা ! এসবের পাশাপাশি আলম ইন্টারনেটেও ঘরোয়াভাবে ভালো কেক তৈরির কিছু উপায় শিখে নিলো ।
দশদিন পর আজ আবার স্টেশনে আলম। আগের মতো একইভাবে সে কেক বিক্রি করে চলল। ট্রেনের যাত্রীরা একটা করে কেক কেনে আর আলম প্রথমবারের কথা মনে করে। মনে মনে সে একটু প্রার্থনাও করে নেয়, আল্লাহ ! আমারে তুমি পার কইরা দাও ! নিজের মা আর ভাইবোনের কথা ভাবে সে।
ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠতে খুশী হলো সে। না, আজ আর কেউ কিছু কইলো না। একদম শেষে যে লোকটা কেক কিনেছিলো তার হাতের কেক এখনও শেষ হয়নি। কেক খেতে খেতে সে আরেকজনের সাথে কথা বলছে । আলম তার মুখের দিকে ভালো করে তাকালো। মানুষটা তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে কি না এটা সে বুঝতে পারছে না কিন্তু তার মুখে যে বিরক্তি নেই এতে আলম খুশী হলো।
এতক্ষণে ট্রেন বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছে। আলম তড়িঘড়ি নেমে পড়ল প্লাটফর্মে। নিজের খালি ট্রে দেখে ভালো লাগছে তার। সে স্টেশনের কথাবার্তা আর অন্য সব ডাকাডাকির দিকে খেয়াল করল না। নিজের মনে আজও সে এক কোণায় বসল। বসে বসে ভাবতে থাকল। প্রথমে দেখতে হবে কিছুদিন পর এই পথের নিয়মিত যাত্রীরা আমার কেকের খোঁজ করে কিনা। সে হবে এক দারুণ ব্যাপার ! যতদিন তা না হয় আমি নিশ্চিত হতে পারব না আমার কেকের কোয়ালিটি কেমন। তারপর হয়তো ব্যবসাটা ঘর থেকে বাইরে, বাইরের এই ছোট শহর থকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারব। আর যদি তা পারি তাহলে বিদেশেও বা কেন আমি এই কেক পাঠাতে পারব না? জগত জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্রান্ডগুলোর কথা মনে পড়ে গেল তার। এসবের মধ্যে নিজের স্বপ্নটাও দেখে ফেলল সে। কখনো না কখনো , কোন না কোন দিন হয়ত 'আলমগীর'স কেক' ছড়িয়ে পড়বে সারা দুনিয়ায় ! 'আচ্ছা দেখাই যাক !' ভাবতে ভাবতে বাজারের পথে এগিয়ে চলল আলম ।
©somewhere in net ltd.
১|
১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৫
শায়মা বলেছেন: আলমগীর কেকস এর জন্য শুভকামনা!