| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এক
'জ্ঞানমুখ মাধ্যমিক বিদ্যালয়' এলাকার সবচেয়ে পরিচিত হাইস্কুল। স্কুলটির প্রধান আফরোজা আপাও সমান পরিচিত এলাকার মানুষের কাছে। বিগত কিছু বছর ধরে তিনি চিন্তিত, হতাশ! তিনি খেয়াল করে দেখেছেন যে, ক্লাস নাইন-টেন-এর অনেকে তাদের বাংলা বই ঠিকমতো পড়তে পারছে না । গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তার এই দুশ্চিন্তা চরমে । শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে কথা বলে, শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করে তিনি কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না! তাই তিনি ভাবেন, হাত গুটিয়ে বসে থাকলে কি সমাধান হবে? তিনি ঠিক করলেন যে এটা নিয়ে বিস্তারিত লেখাপড়া করবেন। কিন্তু তা সময়ের ব্যাপার। এর মধ্যে তিনি এ সমস্যার আসল কারণ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করবেন। তাহলে আপাতত আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য কী করা যায়?
তিনি জানেন যে ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেনের পাঠ্যসূচীতে পড়া শেখানোর কোন সুযোগ নেই। ধরে নেয়া হয়েছে যে প্রাথমিকেই শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে পড়তে শিখেছে। তিনি ঠিক করলেন যে সপ্তাহে একদিন স্কুল শেষে তিনি গণপাঠের ক্লাস করাবেন। তিনি নিজে এর দায়িত্ব নেবেন। ক্লাস সিক্স থেকে টেন যে কেউ এতে অংশ নিতে পারবে। কিন্তু এই ক্লাসের প্রতি শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা তৈরি করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে যাতে নিজ থেকে শিক্ষার্থীরা এই ক্লাসে অংশ নেয়। সারা দিন তিনি ভাবলেন, কী করি? কী করা যায়? ...
স্কুল শেষে তিনি বের হলেন। স্কুলের কোনায় বাদাম, ঝাল-মুড়ি ইত্যাদি বিক্রি করা ছেলেটা এখনও বসে আছে। হঠাৎ কী মনে করে, তিনি তার কাছে গেলেন। দশ টাকার বাদাম কিনলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুই পড়তে পারিস? ছেলেটা উত্তর দিলো, জ্বি আপা! পারি । আপা জানতে চাইলেন, এই বইটা থেকে একটু পড় তো!
আপা তার হাতব্যাগে থাকা ক্লাস টেনের বাংলা বই থেকে পড়তে দিলেন। ছেলেটা বেশ গড়গড় করে পড়ে গেল। তার পড়ার গতি ছন্দ এসব দেখে আপার বেশ ভালো লাগল। নাম কী তোর? আপা জানতে চাইলেন। আমার নাম মতিউর, আপা। সবাই ‘মতি’ বলে। তা মতি, তুই কি প্রতিদিন এখানে আসিস? জি আপা, আমি এই স্কুল আর ওই গার্লস স্কুলে বিক্রি করি। সকালে এখানে আসি। দুপুরে আবার গার্লস স্কুলে যাই। পরে, আবার এখানে আইসা পড়ি। কাল সকালে তাহলে ঠিকমতো চলে আসিস, আপা বললেন। কিছু করা লাগবে, আপা? মতি জিজ্ঞেস করল। আপা বললেন, না! তেমন কিছু না। শুধু তুই আসলেই হবে।
দুই
প্রতিদিনের মতো আজও আফরোজা আপা সকাল সকাল স্কুলে এলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন যে মতিকে ক্লাস টেনে ডাকবেন। পরে কী মনে করে এইটের ক্লাসে ডাকলেন।
মতি ক্লাসে ঢোকার পর আপা জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা একে চেন? অনেকে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। কেউ কেউ বলল, জ্বি, আপা! চিনি। ও মতি। ও কী করে? আপা জানতে চাইলেন। সমস্বরে উত্তর এল, বাদাম বিক্রি করে। পিছন দিক থেকে কেউ কেউ নিচু গলায় বলল, ও মৈত্যা ! বাদাম বেইচ্যা খায় !
লেখাপড়ায় ভালো এমন একজনকে আপা বাংলা বইটা দিতে বললেন। পরে সেখান থেকে পড়তে দিলেন মতিকে। মতি অবলীলায় তা পড়ে গেল। আপা বললেন, এবার তোমরা ও যতটুকু পড়ল সেখান থেকে প্রশ্ন কর। ক্লাসের প্রথম দিকের ছেলেরা একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দিল। আপা বললেন, একজন একজন করে প্রশ্ন কর!
সবাইকে অবাক করে মতি সবগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিল। এতক্ষণ পিছনে বসে যারা গল্প করছিল তারাও চুপ হয়ে গেল। মতিকে তারা নতুন চোখে দেখতে লাগল। এর মধ্যে অতি চতুর একজন নিচু গলায় বলল, আমার মনে হয় ওরে আপা শিখাইয়া পড়াইয়া আনছে ! তার পাশের জন বলল, পড়াটা তো ও নিজেই পড়ছে, নাকি? আর প্রশ্ন তো আপা করে নাই; আমরাই করছি!
ওদের কারও কথা আপা শুনতে পাননি; তবু তিনি ক্লাস ক্যাপ্টেনকে ডেকে বললেন, ক্লাস টেনের বাংলা বইটা নিয়ে আস তো!
ক্লাস টেনের বাংলা বই এসে গেল। আপা বললেন, তোমরা যে কোন তিনজন এখানে উঠে এসো। তিনজন ছাত্র উঠে গিয়ে আপার পাশে দাঁড়াল। আপা বললেন, এবার তোমরা তিনজন মিলে ওকে ক্লাস টেনের এই বই থেকে পড়তে দাও। ওরা তিন জনের কেউই ক্লাস টেনের বাংলা বই আগে পড়েনি। বুঝতে পারছে না যে কোনটা পড়তে দেবে। অন্য ছাত্রদের মধ্য থেকে একজন বলল, ‘সময়-জ্ঞান’ গল্পটা পড়তে দে। আমার বোন ক্লাস টেনে পড়ে। আমি গল্পটা পড়ছি একবার।
এটাও মতি সলীলভাবে পড়ে গেল । আপা আগের মতো আবারও গল্প থেকে প্রশ্ন করতে বললেন। মুরাদ ছাড়া আর কারও যেহেতু গল্পটা পড়া নেই তাই ছাত্ররা সবাই মিলে মুরাদকে দায়িত্বটা দিল। কয়েকটা প্রশ্নের পর মুরাদ বলল, শেষ প্রশ্ন: এই গল্পের সারমর্ম কী? এই গল্পের দ্বারা লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন? মতি নিজের মতো করে সুন্দরভাবে গল্পের সারমর্ম বলল। লেখক যা বলতে চেয়েছেন সেটাও সে বলল। সত্যি বলতে তার কাছ থেকে এত সুন্দর উত্তর আপাও আশা করেননি।
সমস্ত ক্লাস এখন নীরব। পিছনের গল্পকরা ছেলেরাও চিন্তায় পড়ে গেছে। অভাবনীয়ভাবে আপা এবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে যে এখানে আসতে পারে? আমি তাকে আমার পছন্দমতো পড়তে দেব, আর পড়ার পর প্রশ্ন করব।
সমস্ত ক্লাস নীরব হয়ে গেল। এতটা নীরব যে শিক্ষার্থীরা নিজেদের হৃৎকম্পন যেন তাদের নিজ নিজ কানে শুনতে পাচ্ছে!
তিন
এর মধ্যে আপার মনে হলো যে মতি যদি এই স্কুল থেকে এস.এস.সি পরীক্ষা দেয় তাহলে তো ও ভালো রেজাল্টও করতে পারে! তিনি বললেনও কথাটা, আমি যদি সব ব্যবস্থা করে দিই তুই এস.এস.সি পরীক্ষা দিবি? খরচের ব্যবস্থা সব আমি করে দেব। আপাকে অবাক করে মতি বলল, আপা! আমার মা বলছে কারও কাছ থেকে কিছু না নিতে। মাথা নিচু করে বলল, মা বলছে যে কারও কাছ থেকে কখনো কিছু নেবে না, কারও কাছে কিছু চাবে না, আর কারও কিছুতে লোভ করবে না। সবসময় পরিশ্রম করে সৎভাবে জীবনযাপন করবে।
আপার মন খারাপ হতে হতে পারে ভেবে মতি বলল, আর আপা আমার চাকরি-বাকরি করার কোন ইচ্ছা নেই! সার্টিফিকেটও আমার দরকার নেই।
মতির কথা শুনে আপা অবাক হলেন। এমন কথা যেন তিনি এই প্রথম শুনলেন! এমন ভাবনা যেন এই প্রথম জানলেন। তার মনে হলো, এই ছেলেটা কোথা থেকে এসব শিখল? আর এত চেষ্টা করেও আমরা কেন আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছি না?
ক্লাসের পরিবেশ হালকা করার জন্য আপা বললেন, তা তুই কোথা থেকে পড়া শিখলি, মতি? আমার বোনের কাছ থেকে, আপা। আমার বোন ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিল। পরে বিয়া হয়ে গেছে। আর এখন আমি পুরনো খবরের কাগজ কিনি আর আমার মা বাদাম বিক্রির জন্য ঠোঙা বানায়। ঠোঙা বানানোর আগে আমি কাগজের লেখাগুলো পড়ে নিই।
মতির কথা শুনে ক্লাসের ছেলেরা সব তাকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করছে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের কোনায় বাদাম বিক্রি করা মতি। পরনে পুরনো একটা শার্ট আর একটা প্যান্ট। পায়ে কোন রকম একটা স্যান্ডেল। এতদিন তারা শুধু মতির এই বাইরের চেহারাটা দেখেছিল। আজ তার অন্তরের পরিচয় পেয়ে তাদের বিস্ময় লাগল!
মতি বলল, আপা। আপনি অনুমতি দিলে আমি যাই। একটু পরে গার্লস স্কুল ছুটি হবে। ওইখানে ভালো বিক্রি হয়! আপার অনুমতি নিয়ে মতি বেরিয়ে পড়ল।
ক্লাসের ছাত্রদের আপা বললেন, যাক হোক। আমি প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটির পর বাংলা পড়াব। যারা চাও থাকতে পার। এ কোন কোচিং না! কোন টাকা পয়সার ব্যাপার নেই এখানে। যারা শিখতে চাও আসবে। ক্লাস সিক্স-টু-টেন! যে কেউ আসতে পার!
ক্লাসের পিছন সারির বুদ্ধিমান সেই ছেলেটা চুপিচুপি কথা বলল আবার। কী অপমানই না হইলাম আজ! একজন বাদামওয়ালা ক্লাস টেনের বই পড়ে আর আমরা ক্লাস এইটের বই পড়তে গলা শুকায়! ধ্যুত! তোগো লগে আমার প্রমিস, আমি মৈত্যার থিকা ভালো পইড়া দেখামু।
©somewhere in net ltd.