নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আবু সিদ

আবু সিদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

শব্দের সীমা (জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সতর্কতা!)

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০

“সুন্দর শব্দ মধুচক্রের মতো, আত্মার জন্য সুমিষ্ট এবং অস্থির জন্য আরোগ্য।” — প্রবচন ১৬:২৪, বাইবেল

প্রতিদিন বাসা থেকে বের হলেই হাজারো শব্দ উড়ে এসে আছড়ে পড়ে আমাদের কানে। দূর ও নিকট থেকে অজস্র শব্দরাশি নিজ নিজ গতিতে নোঙ্গর ফেলে আমাদের জীবনে। সাইকেল, রিকশা, মোটর সাইকেল আর বিভিন্ন ধরনের গাড়ি তাদের ভিন্ন ভিন্ন আওয়াজ দিয়ে যেন হয়রান করে তোলে। এমনও হয় যে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছি। কিন্তু এই ফুটপাতে সাইকেল আর মোটর সাইকেল দারুণ প্রতাপে হর্ন দিয়ে চলেছে। দেখার আছে সবাই কিন্তু বলার কেউ নেই!

প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে হাজার হাজার হর্ন প্রতি মুহূর্তে বাজছে। এমনকি গাড়ির চাকা চলার জায়গা না থাকলেও হর্ন ঠিকই বেজে চলে। ট্রাফিক জ্যামেও হর্ন। অ্যাম্বুলেন্স আর ভিআইপি গাড়ি আকাশ-পাতাল মথিত করে সাইরেন বাজিয়ে চলেছে!

অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়টা বুঝলাম যে ওর জরুরি জীবন বাঁচানোর তাগিদ। কিন্তু ভি.আই.পি গাড়ির বিষয়টা কী? দেখে মনে হয় এ দেশে কেউ যখন ভিআইপি হয় তখন সে রাস্তায় আর কোন মানুষ দেখতে পায় না! তাদের অবস্থা প্রাচীন কালের মহামহিমদেরও ছাড়িয়ে যায়। আগেকার দিনে আমির ওমরাহ মহামান্যরা রাস্তা ঘাটে অন্তত প্রজাদের অভিবাদন জানাতে বা তার উত্তর দিতে মাথা নুইয়ে দিত। কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশ সে রূপ ও রঙ আর দেখতে পায় না। শুধু শুনতে পায় অতি নির্বোধ আর হামবড়া আওয়াজ; গং-গং ... বং বং... অং...

অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারের আর দোষ কী? সে তো জানে না যে মানুষের জন্য শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবেলের (dB) নিচে হওয়া দরকার। তা না হলে তা শ্রবণশক্তি ও স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করে। অবশ্য শুনলেই বা কী হতো? কোটি কোটি আদম সন্তানের সকলেই জানেন যে ঘুষ এবং দুর্নীতি অর্থনীতি ও ধর্মীয় নীতি দুইদিক দিয়েই খারাপ। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা নিয়মিতভাবে পৃথিবীর সব দেশের মধ্যে দুর্নীতিতে প্রথম সারিতে আছি। আর কিছু পারি বা না পারি দুর্নীতিতে কেউ আমাদের হারাতে পারবে না!

যাই হোক, আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশে যত শব্দ তৈরি করি তার মাত্রা মোটামুটি এ রকমঃ


শব্দের পরিমাপ
শিশুর হাসি, পাখির ডাক, নদীর কলকল, গানের সুর —সবই শব্দ। কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে গেলে শব্দ হয়ে ওঠে অশান্ত ও কর্কশ। গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজের শব্দ, লাউডস্পিকারের আওয়াজ সবই আমাদের জীবনে অদৃশ্য চাপ তৈরি করে। করে তোলে বিরক্ত ও ক্লান্ত । তাহলে কিভাবে পরিমাপ করা হয় শব্দ? শব্দের তীব্রতা (Intensity) মাপা হয় Sound Level Meter (SLM) বা Noise Meter যন্ত্র দিয়ে ।

• তীব্রতা (dB): শব্দ কতটা জোরে বা আস্তে শোনা যায় তা মাপা হয় ডেসিবেল (dB) এককে। এটি শব্দের চাপ (Sound Pressure Level) অর্থাৎ, শব্দ কতটা জোরে বা আস্তে (Loudness) তা পরিমাপ করে।
• ফ্রিকোয়েন্সি (Hz): শব্দ তরঙ্গ প্রতি সেকেন্ডে কতবার কম্পিত হচ্ছে তা মাপা হয় হার্টজ (Hz) এককে। এটি শব্দ কতটা উঁচু বা নিচু (Pitch) তা বোঝায়। যেমন পুরুষের কণ্ঠস্বর সাধারণত ৮৫–১৮০ Hz, নারীর কণ্ঠস্বর ১৬৫–২৫৫ Hz, আর শিশুদের কণ্ঠস্বর ২৫০–৪০০ Hz। ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তনে শব্দের ধরণ (সুর বা টোন)বদলায় ।

শব্দের বৈজ্ঞানিক সীমা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, ৮৫ dB এর বেশি শব্দে দীর্ঘ সময় থাকলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় (World Health Organization, 2018)। এটি শুধু কানের ক্ষতি নয়, বরং মানুষের শরীর ও মনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।



সচেতনতার অভাব ও শব্দ দূষণ
বাংলাদেশে শব্দ দূষণ বাড়ছে মূলত জনসচেতনতার অভাবে । মানুষ হাইড্রোলিক হর্ন, লাউডস্পিকার/ মাইক, নির্মাণকাজ ও জেনারেটরের শব্দকে স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখে না, ফলে আইন থাকলেও তা কার্যকর হয় না।
• অজ্ঞতা: অনেকেই WHO এর নিরাপদ সীমা জানেন না ।
• লাউডস্পিকার ও মাইক: ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা ও বাজারে অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারকে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক মনে করে।
• হাইড্রোলিক হর্ন: আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার অব্যাহত।
• অ্যাম্বুলেন্সের হর্ন: বাংলাদেশে অ্যাম্বুলেন্সের হর্ন সাধারণত সাইরেন টাইপ। এই সাইরেন সাধারণত ১১০–১২০ dB পর্যন্ত শব্দ তৈরি করে। WHO এর নিরাপদ সীমার প্রায় দেড়গুণ বেশি।
•নীরব অঞ্চল অকার্যকর: হাসপাতাল, স্কুল ও অফিস এলাকায় ‘Silent Zone’ ঘোষণা করা হলেও মানুষ নিয়ম মানে না। CAPS (Stamford University) এর জরিপে দেখা গেছে, নীরব অঞ্চলে ৯৬.৭% সময় শব্দ সীমা অতিক্রম করেছে।
•আইন প্রয়োগে দুর্বলতা: Noise Pollution Control Rules (2006) অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ dB সীমা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। জরিমানা ও শাস্তি খুব কম প্রয়োগ হয়।
•সামাজিক অভ্যাস: অনেকেই মনে করেন জোরে কথা বলা বা হর্ন বাজানো শক্তি ও কর্তৃত্বের প্রতীক, যা সংস্কৃতিগতভাবে শব্দ দূষণকে স্বাভাবিক করে তুলছে।

শব্দের নেতিবাচক প্রভাব
1. শ্রবণশক্তি হ্রাস: অতিরিক্ত শব্দে কানের ভেতরের সূক্ষ্ম কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একবার ক্ষতি হলে তা আর ফিরে আসে না। WHO এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪৬৬ মিলিয়ন মানুষ শ্রবণ সমস্যায় ভুগছে (World Health Organization, 2018)।
হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ সাধারণত ১২০–১৩০ dB পর্যন্ত পৌঁছায়, যা WHO এর নিরাপদ সীমা (৮৫ dB) থেকে অনেক বেশি। ট্রাফিক পুলিশ, চালক ও পথচারীরা দ্রুত শ্রবণ সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
2. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: শব্দ শুধু কানে বাজে না, মনের ভেতরেও বাজে। গবেষণায় দেখা গেছে, শব্দ দূষণ মানসিক চাপ, বিরক্তি ও উদ্বেগ বাড়ায় (Basner et al., 2014)। মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে, মনোযোগ হারায়, এমনকি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়।
3. ঘুমের সমস্যা: রাতের বেলা শব্দ দূষণ ঘুম নষ্ট করে। ঘুম ভেঙে গেলে শরীরের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়।
4. হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ: শব্দ দূষণ শুধু কানে নয়, হৃদয়েও আঘাত করে। দীর্ঘ সময় শব্দে থাকলে রক্তচাপ বেড়ে যায়, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়। ইউরোপে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, শব্দ দূষণ হৃদরোগের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কারণ (Basner et al., 2014)।
5. শিশুদের উপর প্রভাব: শিশুরা শব্দে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্কুলের পাশে বড় রাস্তা থাকলে তারা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। শব্দ তাদের শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
6. পরিবেশগত প্রভাব: শব্দ শুধু মানুষ নয়, প্রাণীকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। শহরের কোলাহলে পাখিরা তাদের স্বাভাবিক ডাক হারায়, প্রাণীরা বিভ্রান্ত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়।
করণীয়:

• ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে হর্ন ব্যবহারে সীমা আরোপ করা। BRTA- এর মাধ্যমে ড্রাইভারদের সচেতন করা এবং জনসাধারণের কাছে তা প্রচার করা — শব্দ দূষণ শুধু বিরক্তি নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি।
• স্কুল, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায় শব্দ নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
• শিল্পকারখানায় শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা।

সব শেষে বলা যেতে পারে যে, শব্দ যেন এক অদৃশ্য নদী! সঠিক পথে প্রবাহিত হলে তা হয়ে ওঠে শ্রুতি মধুর কোন ধ্বনি, সুর বা সঙ্গীত। কিন্তু বাঁধ ভেঙে গেলে হয়ে ওঠে তা বন্যা। সীমার ওপারের শব্দ যেন বিভীষিকাময় এক ব্যগ্র দানব।

তথ্য সূত্র
• World Health Organization. (2018). Environmental noise guidelines for the European region. WHO Regional Office for Europe.
• Basner, M., Babisch, W., Davis, A., Brink, M., Clark, C., Janssen, S., & Stansfeld, S. (2014). Auditory and non-auditory effects of noise on health. The Lancet, 383(9925), 1325–1332.
• Singh, N., & Davar, S. C. (2004). Noise pollution—sources, effects and control. Journal of Human Ecology, 16(3), 181–187.
• Department of Environment, Bangladesh. (2020). Noise pollution survey report in major cities of Bangladesh. Dhaka: Government of Bangladesh.
• Lee, M., Bayazid, A. R., & Lau, R. (2025). Spatiotemporal patterns in air pollution and sound in Dhaka, Bangladesh. Scientific Reports, 15, 1825. https://doi.org/10.1038/s41598-025-1825
• Dhaka Tribune: Dhaka’s battle against noise pollution (2025)
• Bangladesh Post: Fighting noise pollution: Tougher rules (2025)
• New Age Editorial: Noise pollution demands decisive action (2026)

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: শিশুর হাসি, পাখির ডাক, নদীর কলকল, গানের সুর —সবই শব্দ।
.................................................................................................
মবতন্ত্রর শব্ধকে আপনি কিভাবে বিচার করবেন ?
ঐ পৈশাচিক শব্দগুলো মানুষের মন ও স্বাস্হ্যর উপর যে চাপ সৃষ্টি করে
তার পরিমাপ কত ???
................................................................................................
আমরা কোন আইন মানিনা এরপর আবার যুক্ত হয়েছে এসব !
কিভাবে একটি আগামী প্রজন্মর স্বাস্হ্য ভালো থাকবে ?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.