| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বদ্যিদের বদান্যতা-আহসান উদ্দিন ভূঁইয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকাকালে একবার আমার ভীষণ ঠান্ডা লাগলো। নাক বন্ধ -মুখ দিয়ে নিশ্বাস নিতে হচ্ছিলো। কাশির শাসনে রা বেরুচ্ছিলোনা গলা দিয়ে। দুনিয়ার সব খাদ্যই স্বাদহীন হয়ে হয়ে উঠেছিলো। মনে মনে ভাবতাম - শত্রুরও যেনো কখনো এমন দুরাবস্থা না হয়। যাই হোক, এক সহপাঠীর পরামর্শে ওকে নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়েছিলাম।বলা রাখা ভালো, ওই সহপাঠীর অম্বল হয়েছিলো।তাই ডাক্তার দেখাবে । সেখানে গিয়ে হলের এক ছোট ভাইকে পেলাম, তার হাত কেটে গড়গড়িয়ে রক্ত ঝড়ছিলো। ওরও চিকিৎসা প্রয়োজন ।
প্রথমে গেলাম আমি। যাওয়ার সাথে সাথেই চিকিৎসক মশাই আমার কি সমস্যা জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করে দিলেন। কিছুটা বিস্ময় আর খানিকটা বিরক্তি নিয়ে অনেক কসরত করেই তার সামনে আমি আমার নরক যন্ত্রণা সবিস্তরে বর্ণনা করতে লাগলাম। কিন্তু কথা বলতে থাকা অবস্থায়ই হটাৎ প্রেসক্রিশন এগিয়ে দিয়ে দেবতুল্য ডাক্তার সাহেব বললেন, "এই ওষুধগুলো তিন বেলা খাবেন"। আমি প্রশ্ন করতে গেলে মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বললেন, "এর চেয়ে বেটার ট্রিটমেন্ট পেতে হলে ডিএমসিতে যান নয়তো প্রাইভেট চেম্বাররে দেখান"। আমি বিষম খেয়ে চেয়ার ছাড়তে না ছাড়তেই তিনি জোরে হাঁক ছাড়লেন - next!
ঢুকলো আমার বন্ধু এবং অনুর্ধ এক মিনিটের মধ্যেই তার প্রস্থান এবং সেই ছোট ভাইয়ের এক মিনিট ৩০ সেকেন্ড লেগেছিলো বোধ হয়। মহামান্য ডাক্তার মশাইর তুলো ছিড়তে হয়েছে, তাতে স্যাভলন লাগিয়ে ক্ষতস্থানে ওই তুলো প্রতিস্থাপনের পর তিনি প্রেসক্রিশন লেখায় মনোযোগী হয়েছিলেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞতো আর কম সময় সাপেক্ষ ব্যাপার না ! ছোট ভাই বের হবার পর তিন জনের প্রেস্ক্রিপশন মিলিয়ে দেখলাম তিন জনকেই একই ঔষধ দিয়েছেন। দেশীয় দুটো প্রকারের ট্যাবলেট। একটা পেইন কিলার আরেকটা জ্বরের ঔষধ।
আমাদের গ্রামের 'পাঁচ কেলাশ পাশ' খুরশিদ মিঞা ডাক্তারের কথা খুব মনে পড়ছিলো সে দিন। খুশি ডাক্তারের কাছে যে যেই রোগের জন্যই যেতো তাকেই তিনি প্যারাসিটামল আর কুইনাইন ধরিয়ে দিতেন। তবে, আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, আমার শৈশবের বদহজমের রোগটা তিনিই সাড়িয়েছিলেন।
এই দুই মহান চিকিৎসকের নাম মেমোরিতে হঠাৎ হানা দেওয়ার কারণ হলো - যে বিষয়টা সবাই জানে অথচ আমি জানতাম না এমন একটা তত্ত্ব কোভিড রোগের কল্যাণে আবিষ্কারের উত্তেজনা কোনোমতেই সামলাতে পারছিলাম না। আর সেই আবিষ্কার হলো -যে কোনো মহামারী বা অসুখ-বিসুখের বিস্তরণের সময় সব রোগের মহৌষধের বটিকা ও পত্ত নিয়ে তৎক্ষণাৎ ধরাধামে আবির্ভুত হন এমন মহামবের সংখ্যা এই বঙ্গদেশে অপ্রতুল।
রোগ-গোত্রের এই নবীন সদস্যের এখনো কোনো শত্রু (কেতাবি নাম-প্রতিষেধক) পয়দা হয় নি। একে প্রতিহত করতে যেখানে বিশ্বের বাঘাবাঘা বৈজ্ঞানিকগণ ঘোলাজলে হাবুডুবু খাচ্ছেন, সেখানে মুহূর্তেই এই উপমহাদেশে একেরপর এক থেরাপি চলে আসলো। এই তালিকায় সর্বাগ্রে আসে থানকুনি পাতার নাম। থানকুনি পাতা হলো করোনা রোগের মহৌষধ- এই তত্ত্ব কেউ একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করার পর রাতারাতি থানকুনি'র বন উজাড়! আরো যাদের উপর করোনার গজব পড়েছিলো সেগুলো হলো -নিশিন্দার রস, অড়বড়ই, কালোজিরা, মধু প্রভৃতি।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় চিকনদন্ডী শৈল্য, ষান্ডার তেল বা কলিকাতা হারবাল জাতীয় ঔষধ বিক্রেতাগণ তো বেশ ঘটা করেই করোনা বটিকা বিক্রি করতে গিয়ে শ্রীঘরে ঢুকলেন। দুআ-দুরুদ আর যন্ত্রমন্ত্র থেরাপিস্টের সংখ্যাটা না হয় অনুল্লেখিতই থাকলো।
এদিকে দেশে করোনা রোগের নাম চাউর হওয়া মাত্রই লক্ষ করলাম বাজার থেকে স্যানিটাইজার, হেক্সিসল, স্যাভলন,ডেটল,ব্লিচিং সব উবে গেলো মুহূর্তে! ইত্যাবসরে আরেকদল গেঁজেল তাত্ত্বিকের কথা না বললে অমার্জনীয় অপরাধ হবে। তাদের মতে, যেহেতু সকল জীবাণুনাশকের মূল উপাদান উচ্চমাত্রার এলকোহল, তাই মাদক সেবনকারীরা কোনোমতেই করোনার দ্বারা আক্রান্ত হবে না। যুক্তিটা যুৎসই বটে !
অন্যদিকে মোদি জী'র ভারত তো করোনা চিকিৎসায় মহাবিপ্লব ঘটিয়ে দিলো ! জনৈক ধর্মগুরু ও গোমাতা রক্ষক ঘোষণা করে বসলেন 'পবিত্র গোমূত্রই হলো করোনার একক ও অদ্বিতীয় দাওয়াই'। আর যায় কই ? রাতারাতি মহাভারতের সব বাজার ছেয়ে গেলো বোতলজাত গোমূত্রে। অতি উচ্চদামে বিক্রি হতে থাকলো এইসব জৈব ঔষধ। মানুষজনও সংগ্রহ করে পান করতে থাকলো লিটার কে লিটার। শ্রুত আছে কোনো এক গোমূত্রের গুনকীর্তন প্রচারক পুরুত নিজেই গোমূত্র খেয়ে হস্পিটালাইজড হয়েছিলেন !
বর্জ্য - কাহিনী এখানেই ক্ষান্ত হলো না। ধর্মীয় উশৃক্ষলতা ও প্রতিযোগিতা প্রবণ মানুষকে মলমূত্র পর্যায়ে নামিয়ে ছাড়লো এই করোনা । হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ভারতে গোমূত্রের প্রসার ঘটলে মুসলমান আরব ফতোয়াবাজগণ থেমে থাকবেন কেন! কোনো এক ইরানী মহাজ্ঞ জানালেন উঁটমূত্রের করোনা নিরাময় করার সক্ষমতার কথা। আমাদের দেশের মানুষের উপর গুজবের গজব তবু ভালো যে তা ননভেজ না হয়ে লতাপাতার উপর দিয়ে গেছে।
ঔষধ সমাচার শেষ করার আগে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাংলা রম্য সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট সৈয়দ মুজতবা আলীকে। তিনি তার 'বেঁচে থাকো সর্দিকাশি' গল্পে লিখেছিলেন- "যে ব্যামোর দেখবেন সাতান্ন রকমের ওষুধ, বুঝে নেবেন, সে ব্যামো ওষুধে সারে না"। করোনার ক্ষেত্রেও হলো তাই। চৈনিক favilavi, জাপানী avigan, ফরাসী hydroxychloroquine কিংবা কলকাতা হোমিওপ্যাথির arsenicum album-30 সবাইকে কাঁচকলা দেখিয়ে কোভিড-১৯ তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেই চলেছে; সে বিস্তরণ উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু অব্দি পৌঁছে গেছে। এখন অপেক্ষা সত্যি সত্যি কোনো হন্তারকের আবির্ভাবের।
২৫ শে এপ্রিল, ২০২০ রাত ১২:২৭
ত্রয়োদশ ভূঁইয়া বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই। আপনি, আমি, আমরা তো এদের চরিত্রটা আঁকতেই পারি। তা লোক থেকে লোকান্তরে একদিন পৌঁছে যাবে এই স্বপ্ন নিয়েই বাঁচি। সৌন্দের্য্যের বহিঃপ্রকাশ অনিবার্য। সত্য জিতবেই। ভোর আসবেই। ভালোবাসা নিবেন।
২|
২৬ শে এপ্রিল, ২০২০ সকাল ১১:০৪
দজিয়েব বলেছেন: বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে তড়িৎ বেগে ব্যবস্থাপত্র লেখার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কিছুটা বিপরীত কিন্তু ভোগান্তিকর অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে। আমি শ্বাসকষ্টের রোগী, তবে এজম্যা এট্যাক হলে ইনহেলারেই কাজ চলে যায়; নেবুলাইজার একদিনই দরকার পড়েছিল- গতবছর ডাকসু নির্বাচনের দিন। একে শ্বাসকষ্ট তারউপর নির্বাচন হওয়ায় রিকশা পাওয়ারও অবস্থা নেই। আধা রাস্তা হেটে একটা রিকশা পেয়ে কোনোমতে মেডিকেল সেন্টারে পৌছালাম। নেবুলাইজার নেয়ার জন্য ডাক্তার সাহেবের ব্যবস্থাপত্র লাগবে শুনে দুতলা থেকে পাশের বিল্ডিংয়ের নিচতলায় আসলাম। এসবে শ্বাসকষ্ট আরো বেড়েছে। কিন্তু এবার ডাক্তার সাহেব আর তড়িৎ ব্যবস্থাপত্র লিখতে গেলেননা। নানান প্রশ্নে জর্জরিত করলেন; যেন আমি নেবুলাইজারের স্লিপ না তার কিডনি চাইতে আসছি!! মিনিট পাঁচেক তীরবিদ্ধ করার পরে তার গতি হলো একটা স্লিপ লিখে আমাকে ধন্য করার!
করোনার আকালে এসব গুজব-গজব তত্ত্ব বিস্তার লাভ করতে পেরেছে এর অন্যতম কারণ আমাদের এই ভেঙে পড়া চিকিৎসাব্যবস্থা! গ্রামের পীরসাহেব বা হুজুরটা অন্তত রোগীটির সাথে ভালো করে কথা বলেন। কিন্তু অধিকাংশ ডাক্তার সাহেব মনে করেন এইসব মূর্খদের সাথে আবার ভালো করে কথা কি! এমনকি বেচারার কি রোগ হয়েছে সেটা বলার প্রয়োজনও তাহারা মনে করেন না। তো এই মূর্খরা ডাক্তারের হুট করে ঝাড়া জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতার চেয়ে হুজুরদের দীর্ঘকাল ঝেড়ে আসা গুজব-গজব তত্ত্বে বিশ্বাস করবে এইতো স্বাভাবিক!
২৭ শে এপ্রিল, ২০২০ রাত ১:৩৫
ত্রয়োদশ ভূঁইয়া বলেছেন: আমাদের সমস্যা হলো- ডাক্তাররা ডাক্তারই, রাজনৈতিকরা নেতাই, আমলারা সবাই কর্মকর্তা, উকিলরা যুক্তিবাদীই। এদের কেউ নিজেকে মানুষের কাতারে ফেলতে শিখছেন না। ধন্যবাদ আপনাকে। শুভকামনা।
©somewhere in net ltd.
১|
২৪ শে এপ্রিল, ২০২০ রাত ৮:১১
আল-ইকরাম বলেছেন: অনেক ভাল লিখেছেন। তথ্য নির্ভর, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা। উপস্থাপনায় সারল্য আছে। আপনার লেখার প্রেক্ষিতে কিছু বলার ইচ্ছা সংবরণ করতে পারছি না। তা হলো, মানুষ যে কোনো বিপদ আপদে যতো না কষ্ট পায় তার চেয়ে বেশী কষ্ট পায় বোকামী ও মুর্খতার দোষে। আর মানুষের এই দু’টি দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মতোই দেখতে কিছু অমানুষ ফায়দা লুটে। এটাই বাস্তবতা। তবে আমাদের উচিত সাধ্য মতো এর বিপক্ষে থাকা ও জোরালো প্রতিবাদ করা। কামড়া তে না পারি ফোঁস তো করতে পারি! শুভ কামনা রইল।