| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এক উল্টো দেশের গল্প -আহসান উদ্দিন ভূঁইয়া
নচিকেতার একটা গান খুব করে মাথায় ঘুরছে ক'দিন ধরে। গানের নাম-উল্টো রাজার দেশে। ওখানে একটা জায়গা এমন, "সে দেশে, সোজা পথ পড়ে পায়ে সোজা পথে কেউ চলে না / বাঁকা পথ জ্যাম হরদম, জমজমাট ভিড় কমে না "। কেনো হঠাৎ এই গানের ভুত আমার ঘাড়ে চেপে বসলো? বলছি। চারপাশে এতো কৌতুক এবং উদ্ভট কর্মকান্ড হচ্ছে যা দেখে সম্ভবতঃ স্বয়ং স্রষ্টারও কান্ডজ্ঞান হারাবার দশা হয়েছে।
লকডাউন চলাকালে গজামায়েতের উপর সরসতম কৌতুকটা রটেছে বরিশালবাসীকে নিয়ে। কৌতুকটা এমন- 'একজন করোনা সনাক্ত রোগী হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়েছেন। তাকে খুঁজতে বেড়োলো গ্রামবাসী। চার-পাঁচ জন মিলে বাজার থেকে তাকে খোঁজে পেয়ে আড়কোলে করে থানায় পৌঁছে দিলো। এই পাঁচজনকে সংবর্ধণা দিয়ে মিছিল করলো গ্রামের সবাই'।
এই অমানবিক এবং একটি বিশেষ অঞ্চলকে হেয় প্রতিপন্ন করে এমন কৌতুকের নির্মাতা আমি হলে নিশ্চিত পরের লাইন হতো-ওই গ্রামকে 'বীরের গ্রাম' আখ্যা দিতে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনার আয়োজনে লাখো মানুষের ভিড়।
আমার এই কথা শুনে পাশে বসে থাকা বন্ধুটি বলে উঠলো, "নোয়াখালী বিভাগ চাই!" কি সার্কাস্টিক জাতি আমরা !
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক ভিডিও কনফারেন্সে কিশোরগঞ্জের ডিসিকে বললেন, 'কিশোরগঞ্জ এখনো কিশোরই রয়ে গেলো'। এর কারণ তাদের পর্যাপ্ত কৃষিজ সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উদাসীনতা। এই কিশোর সুলভ আচরণের আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেলো করোনা দুর্যোগের দিনে। সাধারণ ছুটি ঘোষণা মাত্রই ওই জেলার ঢাকানিবাসী সবাই গ্রামে ফিরে যেতে থাকলো। সরকার সাধারণ পরিবহণ বন্ধ করলো। তারা মাইক্রো ভাড়া করে যেতে আরম্ভ করলো। সরকার এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াতের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তারা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য মধ্যরাতে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে নিজ গ্রামে ফিরে যাওয়া অব্যাহত রাখলো। ফলে গ্রামকে গ্রাম উৎসব আর মিলনমেলায় পরিণত হলো। এই গেলো একটা দিক।
তাদের আরেকটা ইমম্যাচিউরড এটিটিউড হলো-অত্যুত্সাহ। কারোর মধ্যে করোনার সিম্পটম পাওয়া গেছে এর অর্থ হলো ওই অঞ্চলের লোকজন হাতের কাছে এলিয়েল পেয়ে গেলো। সদলবলে একে দেখতে না গেলে যেনো সোনার যৌবন বৃথা হয়ে যাবে। জীবনের অনেক স্বাদ আহ্লাদ অপূর্ণ থাকবে। ফলে তারা স্বেচ্ছায় এগিয়ে গেছে করোনাকে সাদরে বরণ করতে। কিশোরগঞ্জ বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর হটস্পটগুলোর একটা হয়ে উঠার পেছেনে ওই অঞ্চলের মানুষের এইসব শিশুসুলভ আচরণ-ই দায়ী।
কিশোরগঞ্জের প্রতিবেশী জেলা ব্রাম্মণবাড়িয়াতো সারা বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিলো। করোনাকে মহিমান্বিত করতে এই জেলার জুড়ি মেলা ভার। প্রথমেই বলতে হয় তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে এখানকার দুই গ্রামের মধ্যে যে কুরুক্ষেত্রের রচিত হয়েছিলো তার কথা। লড়াই হাতাহাতি থেকে লাঠালাঠি, তারপর টেঁটা ছোঁড়াছুড়ি এবং সবশেষে পা কেটে হাতে নিয়ে জাতীয় স্লোগান দিতে দিতে বিজয়োল্লাস।!কি বীভৎস গোটা এলাকাবাসী। তবে এই রণাঙ্গনেও তারা করোনা হাইজিন মেনে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। প্রায় প্রত্যেকে মাস্ক পরে এসেছিলেন (সম্ভবত করোনা থেকে বাঁচার চাইতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যই এই ফন্দি বের করেছিলেন এই নব্য কৌর ও পান্ডব গোষ্ঠী ) ।
বি.বাড়িয়ার বাহারি কীর্তির মধ্যে ওয়াজ ও লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজার কথা বাদ দিলেও ফেইসবুক লাইভে এসে ঘোষণা দিয়ে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করার মতো নৃশংসতা করোনা দুর্যোগেও পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মনে করিয়ে দিয়েছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীর নৃশংসতার কথা। লিখতে লিখতে মনের সাথে হাতও জড়িয়ে আসছে। এতো দুঃখের কথা জানানো আসলে এই লিখার উদ্দেশ্য না। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা এতটাই বিচিত্র যে, আমাদের সামষ্টিক কাজকর্ম হতে যা নির্গত হয়, সেগুলোর মধ্য থেকে হাসি ও কান্নার খোরাক গুলোকে পৃথকীকরণ দুঃসাধ্য বললেও কম বলা হবে, বলতে হবে অসাধ্য।
যাই হোক, বি. বাড়িয়ার গুণ কীর্তন শেষ করবো এবার কিন্তু তার আগে চিকিৎসক এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ত্ব আব্দুন নূর তুষারের জন্য একটু সমবেদনা না জানিয়ে পারছিনা। উপরের সব ঘটনা ঘটে যাবার পর এক ফেবু স্ট্যাটাসে মি. তুষার 'বলদামী' করে বি.বাড়িয়াকে ব্যাঙ্গ করে 'বলদ বাড়িয়া' লিখে মানহানীর মামলা খেয়ে গেলেন। তিনি হয়তো ভুলে গেছেন যে সবসময় স্পেডকে স্পেড বলতে নেই।
আগের প্যারাতেই এই লেখা শেষ হতে পারতো। কিন্তু লেখা চলাকালে সংবাদ মাধ্যম মারফত এক দারুণ খবর পেলাম। নারায়ণগঞ্জের খবর। সেখানে এক চিকিৎসকের পরিবারের ১৮ জনের করোনা সনাক্ত হয়েছে। সচেতন এলাকাবাসী তাই ওই স্বাস্হ্যসেবীর পরিবারকে এলাকা-ছাড়া করার জন্য সংবদ্ধ হয়েছেন। তারা ওই ডাক্তার বাড়ির টিনের চালের কাক তাড়ানোর দায়িত্ব নিলেন। ওই বাড়ির টিনের চলে তারা ইট-সুড়কির বৃষ্টি বইয়ে দিয়েছেন । তাদের জটলা বড় কথা নয়, ওই রোগীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে তাদের বিতাড়িত করা মুখ্য। আর সোজাসাপ্টা ভাষায় বললে বলতে হবে- তারা করোনা আক্রান্তকে সরাতে করোনাকে আলিঙ্গন করার বন্দোবস্ত করেছেন।
উল্লেখ্য, স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে সেই চিকিৎসক পরিবার তখনও নিজ বাসভূমে অবস্থান করতে পারছিলেন।
কোনো একজন দার্শনিক বলেছিলেন, 'বোকারা সবসময়ই সঠিক'। আমি এখনো মাথাই চুলকে যাচ্ছি কিন্তু এই জটিল ভাবকে আর সম্প্রসারিত করতে পারছিনা। তাই রণে ভঙ্গ দিলাম।
©somewhere in net ltd.