| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ধানকাটা অথবা একটি পোস্টমডার্ন রূপকথা -আহসান উদ্দিন ভূঁইয়া
সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটু ফেসবুকে ঢু না মারলে ঠিক সকাল হয়েছে বলে মনে হয় না। দুই দশক আগেও বাংলাদেশের গ্রাম গুলোতে মোরগ না ডাকলে যেমন সকাল হতো না বা শহুরে সাহেবদের জানলা দিয়ে চুরি করে সূর্যালোক ঢুকে মুখ আলতো পরশ বুলালে চোখ খুলে সাথে সাথেই ব্যাড টি'তে চুমুক না দিলে যেমন তারা আড়মোড়া ভাঙতে পারতেন না, ঠিক তেমনি প্রত্যুষে টাইমলাইন সফর না করে আমি দিন শুরু করতে পারি না। আজও তার বেত্তয় ঘটেনি। ঘটার মধ্যে যা ঘটলো তা হলো আমার পিলে চমকে গেলো। কিসে? বিশ্বজুড়ে এখন যেমন একটাই শব্দ সারাক্ষণ সর্বত্র ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে-'করোনা' ঠিক তেমনি আমার টাইমলাইন জুড়ে শুধু একটাই ছবি বারবার ঘুরে ফিরে আসছে।
এ আর এমন কি? এতে পিলে চমকানোর কি আছে? আমার এখন আঁতের ডাক্তার দেখানো উচিত বলে মনে হচ্ছে?
উত্তর অবশ্যই, না। কারণ তো আছেই। তবে, পিলে চমকানোর কারণ বলার আগে ছবিটার সাথে পরিচয় জরুরি। ছবিটা অতি সাধারণ। এতে নাই কোনো লাস্যময়ী সুন্দরীর উপস্থিতি। নাই লারা-শচীন-সাকিব-মাশরাফিদের কেউ, না আছেন মেসি-রোনালদো-পগবা-এমবাপের মতো মহাতারকা। রাজনীতি বা চলচ্চিত্র জগতের কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্রও এখানে নাই। এখানে যে নক্ষত্রদের উপস্থিতি ছিলো তারা রুধিরের আঁড়ালে থাকা আরো আলোকময় জোতিষ্ক। একদল তরুণ। যারা এই দুর্যোগে যখন বিচ্ছিন্নতা বাদই অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র মন্ত্র, সেই সময়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গরিব কৃষিকদের ধান কেটে দেয়ার ব্রত নিয়ে মাঠে নেমেছে। বেশভুষাই বলে দেয় এরা হালের আধুনিক ছেলে সবাই। কোনোদিনই কৃষিকাজের সাথে এরা জড়িত ছিলো না। তবু অসহায় কৃষকের সোনার ধান তার ঘরে পৌঁছে দিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা যতার্থই বীর। সেই ছবিতেও তারা বিজয়ের স্মারক 'ভি' চিহ্ন দেখাচ্ছিলো। কারো হাতে ছিলো কাস্তে হাতুড়ি। কারো হাতে একমুঠো ধান। প্রাণজুড়ানো দৃশ্য। কিন্তু বিপত্তিটা অন্যখানে।
আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে দেশের মোটামোটি সবকয়টা প্রথম সারির রাজনৈতিক দলের কোনো না কোনো উচ্চ পদাধিকারী নেতা-নেত্রী আছেন। খুব অবাক হয়ে দেখলাম, সবাই দাবি করছেন ওই ছবির ছেলেগুলো তাদের দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মী।মানবতার এই ক্রান্তিলগ্নে তাদের উত্তরসূরিদের প্রশংসার জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছেন সবাই। আমার ছোট মাথায় কিছুতেই ঢুকলোনা, এই কয়েকটা ছেলে কিভাবে সব রাজনৈতিক দলের কর্মী হয়! হতেও পাড়ে। এই বঙ্গদেশের অতি নতুন পুরোনো রঙ্গমঞ্চ হলো রাজনীতির মঞ্চ। এখানে অসম্ভব বলে কিছুই নাই। সে কারো পিলেই চমকাক আর পিত্তিই জ্বলুক।
স্ক্রল করতে করতে নিচে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ একই ছবি দিয়ে একজন বেশ গ্রহণযোগ্য বাম নেত্রী দাবী করলেন- এটি একটি অরাজনৈতিক লেফটিস্ট ছাত্র সংগঠণের কর্মীদের ছবি যা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন সব রাজনৈতিক দলই নিজেদের ছেলেদের কীর্তি বলে চালিয়ে দিয়ে পোস্ট করছেন। রহস্যের জট ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। গতকাল সত্যজিতের জন্ম শতবার্ষিকী গেছে তবু এমন মিস্টিরিয়াস ছবির রহস্য উদ্ঘাটনের নিমিত্ত্বে ফেলুদা সাজার সুযোগটা গ্রহণ করার ইচ্ছে হলো না আমার।
ফেসবুকে বিকারগ্রস্ত ছবি আপলোডের এসব অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের মধ্যে যে নৈতিক ও মানসিক দৈন্য দেখা দিয়েছে তারই ডিজিটাল প্রতিফলন। তবে, ও সত্যি সরকার ও বিরোধী দলে থাকা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনুগামী ছাত্রসংগঠন এবং বাম ছাত্র জোট গুলোর কর্মীদের মধ্যে গরিব ও অপারগ কৃষকদের ধান কেটে দেওয়ার একটি ভিন্নধারার প্রতিযোগিতায় শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে এমন সুস্থ্য ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতা শেষ কবে হয়েছিলো তা স্বয়ং মুনতাসির মামুনও মেমোরি ঘেঁটে বের করতে গেলে হিমশিম খাবেন। যে দেশে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বার্থেও রাজনৈতিক দলগুলো কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি, সেই দেশেই তাদেরই ছত্রছায়ায় বড় হতে থাকা চারগাছগুলো কি সুন্দর মানবিকতাবোধ ও ভ্রাতৃত্ববোধ নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছায়া বিতরণ করছে অদৃশ্য শত্রু বিস্তরণের দিনে।
সবসময়েই জাতির ক্রান্তিলগ্নে এরা ছিলো অগ্রগামী সৈনিক। অন্যদের কাছে হাত পেতে নিরন্ন মানুষের পেটে ভাত জুটিয়েছে। গায়ে গতরে খাটুনির কথা না হয় অনুক্তই থাকলো। এই যাত্রায় ও এই ছাত্রসমাজ ত্রাণ সংগ্রেহের জন্য টিএসসি, পার্ক বা ফুটপাতে গান গেয়ে, ছবি এঁকে তার প্রদর্শনী বা বিক্রি করে, রাস্তায় রাস্তায় দানবাক্স নিয়ে ঘুরে ঘুরে বা চেনাপরিচিতদের কাছ থেকে হাত পেতে যা জোগাড় করেছে, তাই নিয়ে এগিয়ে এসেছে করোনার প্রভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা মুশকিল এমন মানুষদের পাশে। তাই, আশায় বুক বাঁধতেই পাড়ি, সুদিন আসবেই। এদের হাত ধরেই আসবে। যদি তারা লঙ্কায় পৌঁছে রাবন না হয়ে যায়!
কেননা, তারা যাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে তারাই আজকের হোমরা-চোমরা, রুই-কাতল। ইংরেজিতে যাদের বলে 'বিগ ফিশ'। শুনেছি আগেরদিনের রাজারাজরা যেখানেই যেতেন অশ্ব-হস্তী ও পদাতিক বাহিনীর একটা বিশাল বহর নিয়ে সাথে নিয়ে যেতেন। সময় বদলেছে কিন্তু ওই সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা সম্পন্নদের বুদ্ধি ও রুচির বিবর্তন ঘটেনি। এইযুগের সমাজপতিগণও যেখানেই যান সেখানেও ছত্রধর না হলেও অন্তত স্লোগান ধরার জন্য কিছু আর অন্যদের ধমকানোর জন্য কিছু লোক তো তাদের সাথে রাখেনই । আরেকটা গোষ্ঠি থাকে এই বহরে। ভাড়াটে কিছু মিডিয়া কর্মী। এরা ওই নেতার ছবি তুলে আর তার ভাঁড়ামি করে পকেটে টুপাইস ঢুকিয়ে দিনাতিপাত করে। এরা থাকে সামনে সামনে।
যাইহোক, ধানকেটে হিরো হবার বা জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি হবার এই মওকা তো হাতছাড়া করা যায় না। তাই তারা, মানে কর্তাব্যক্তিগণ ছুটলেন ধান কেটে দিতে। গরিব কৃষকের ধান। কিন্তু ধানের জমিতে তাদের কর্মকান্ড আর সেলফি তোলার আধিক্য দেখে কোনো নিন্দুক বা ধড়িবাজ প্রচার করে দিলো, "উনারা ধান কাটার নামে গরিব কৃষকের পাকা ধানে মই দিচ্ছেন"। নটে গাছটি মুড়োলো, আমার কথাফুরালো।
©somewhere in net ltd.