| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একটা সময় খুব করে চাইতাম - আমি ডাক্তার বিয়ে করবো। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে তো মেডিক্যালের ছাত্রী দেখলেই খুব আপন মনে হতো। ভাবতাম, তুমি কি সেই? এখন, সেদিন গেছে। কিন্তু সত্যি বলতে কি আজও সেই আক্ষেপ আমার আছে। কেন ডাক্তার বউই চাইতাম? তার পেছনে কিছু ছেলেমানুষি ভাবনা কাজ করতো। রংবেরঙের গল্প সাজাতাম সেসব ভাবনাকে ঘিরে। ভাবতাম, বেশি বেশি অসুস্থ হয়ে ডাক্তার স্ত্রীর কাছে যাবো। রোগ না হলেও রোগের ভান করবো মাঝে মাঝেই। তাহলে অনেক মমতা ও আদর নিয়ে বউ পাশে থাকবে। পরশ বুলাবে। ভালোবাসবে। দু-একবার হয়তো ধরাও পড়বো। তখন, মুচকি হেসে, কড়া শাসন করে দিবে। তবে দু-এক ডোজ ভালোবাসাও বাড়িয়ে দেবে। এ সবই ছিলো ফ্যান্টাসি। কিন্তু, এখন কেবলি মনে হয়, ডাক্তার বিয়ে না করে ভালোই করেছি। নাহলে শুধু ইঞ্জেকশনের হুল ফোটাতো।
সম্প্রতি ব্যারিস্টার সুমন ফেইসবুক লাইভ-এ এসে এক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি উল্ল্যেখ করেছেন, 'লক ডাউন' চলাকালে বাংলাদেশে এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে। যার মধ্যে ৯৬% নরমাল ডেলিভারি মানে স্বাভাবিক জন্ম। যেখানে সাধারণ দিনগুলোতে প্রায় ৯৫ ভাগ ডেলিভারি হয় সিজারে। এর অর্থ দাঁড়ায় আমাদের দেশে সি-সেকশন হয়ে থাকে রোগীর জটিলতার কারণে না বরং ডাক্তারদের বাণিজ্যিক মানসিকতার কারণেই।
এ দেশে স্কুল কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের জীবনের একটাই লক্ষ্য থাকে - ডাক্তার হওয়া। সে আর্টসেই পড়ুক আর কমার্সেই পড়ুক সবার পরীক্ষার খাতায় 'Aim in life' রচনা আসলেই ডাক্তারি করার বাসনা এবং সেই বাসনার পেছনে মানবসেবা করার মহৎ উদ্দেশ্যের কথা তারা নিখুঁতভাবে লিখে থাকে। এতে অবশ্য তাদের দোষ নেই। একেতো বিদেশী ভাষার রচনা তার উপর সব বইয়েই Aim in life মানেই ডাক্তারির গুণকীর্তন। আমাদের তোতা পাখিগুলো আর কি করবে!
যে কোনো চিকিৎসক বন্ধু এই লেখা পড়ে বিষদ্গার করতে পারেন। কিন্তু সত্যি বলছি আমি কখনোই ডাক্তার বিদ্বেষী না। তাছাড়া ভালো-মন্দ সব পেশাতেই আছে। এখানে প্রশ্ন হলো -এই 'ইতি' এবং 'নেতি' বাচকদ্বয়ের অনুপাত পঞ্চাশ-পঞ্চাশের নিচে নামা কি উচিৎ? বিশেষতঃ যাদের হাতে জিয়নকাঠি, তাদের ক্ষেত্রে মানবিকতার পাল্লাটা ৯০ শতাংশই হওয়া উচিত বলে আর সবার মতো আমিও মনে করি। কিন্তু বাস্তবে যা ফুটে ওঠে সেখানে দেখতে পাই ব্যবসায়ী আর সেবকের অনুপাত ৯৫ বনাম ৫। নইলে কি আর হাসপাতালের সামনে ভ্যান গাড়ির উপর একজন (অর্থনৈতিকভাবে) দরিদ্র মাকে নিজের সন্তান নিজে প্রসব করতে হয়? হাসপাতালের খরচ জোগাতে পোশাক শ্রমিক দম্পতিকে সদ্যজাত সন্তানকে পঁচিশ হাজার টাকায় বিকোতে হয়? মৃতদেহ জীবিত বলে তিনদিন আইসিইউতে রাখার মতো ঘৃণ্য ব্যবসা হয়?
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ-ও আছে। ডাক্তারি মানসিকতার হেড ও টেইল দুই পিঠ-ই আমার দেখা হয়েছে। পরিচিত মোটামুটি সবাইকে আমার দুই চিকিৎসক বন্ধুর কথা আমি বলে থাকি। এখানে বলার লোভটাও সংবরণ করতে পারছি না। তাই বলছি। কিন্তু সঙ্গত কারণেই তাদের নাম ব্যবহার করছিনা। ধরে নিন একজনের নাম হাবিল আরেকজনের নাম কাবিল। কাবিলকে দিয়েই শুরু করা যাক। একবার আড্ডার ছলে কাবিলকে বললাম, "বন্ধু আমার শুকনো কাশিটা তো খুব ভোগাচ্ছে। যাচ্ছেই না। কি করি বলতো?" কাবিল তৎক্ষণাৎ উত্তর করলো, "সন্ধ্যায় চেম্বারে চলে আসিস।" পাশে বসে থাকা আরেক বন্ধু ফোঁড়ন কাটলো, "বন্ধুকে এইটুকু এডভাইস দিবি তাতেও তোর চেম্বারে যেতে হবে?" সদা হাস্যমুখ ডাক্তার বন্ধু কাবিল চোঁখেমুখে লজ্জা মাখিয়ে বললো, "না হলে ডাক্তার বন্ধুদের তো না খেয়ে মরতে হবে"। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম !
এবার আসি হাবিলের কথায়। কাবিলের সাথে সেই অভিজ্ঞতার পরের সপ্তাহে দেখা হলো হাবিলের সাথে। একটা সোশ্যাল গ্যাদারিং-এ। আমার 'কুহুকুহু' কাশি যথারীতি জ্বালাচ্ছে। কিন্তু হাবিলকে বলার ইচ্ছা বা সাহস কোনোটাই হচ্ছিলো না। অনুষ্ঠান শেষে যাওয়ার আগে হাবিল নিজেই এগিয়ে এসে আমার দিকে তার একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিলো। নিতে নিতে মনে মনে বললাম, "আমি তোরও পেশেন্ট হবো না বন্ধু"। কিন্তু হাবিল জানালো তার কাছে প্রেসক্রিপশন নেই বলে ভিজিটিং কার্ডের পেছনে ওষুধ লিখে দিয়েছে। আমি যেনো খাই আমার চোখ কপালে উঠলো।
এখানেই শেষ না। একদিন বাদেই হাবিল এসে আমার বাসায় হাজির। পুরোদোস্তু ডাক্তারি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। এসেই আমাকে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে সে তার মৌলিক ডাক্তারি কায়দাকানুন অনুসারে আমার নাড়ীনক্ষত্র নিরীক্ষণ করলো। তারপর ঔষধে আর গুটা চারেক পরীক্ষা দিলো। এডভাইস পেপারের উল্টা দিকে লিখে দিলো যেন আমার কাছ থেকে ৪০% কম নেওয়া হয়। এটাও বললো এই টাকাটা ও পেতো। রোগ ডায়াগনসিস করলে ল্যাবের পাশাপাশি ডাক্তারদের লাভ হয় সেটা জানতাম। এবার তার পরিমানটাও জানলাম। যাওয়ার সময় অনেক কসরত করেও হাবিলকে ডিজিট দিতে পারিনি।
হপ্তান্তে রিপোর্ট নিয়ে বন্ধুর চেম্বারে গেলাম। সব দেখে শুনে সে নতুন করে দশ দিনের ঔষধ দিলো। এবং দিন চারেক পরেই হাবিল ফোন দিলো আমার প্রোগ্রেস জানতে। যখন বললাম, কিছুটা ভালো তবে সেরে উঠেনি তখনি ও কলটা কেটে দিলো। মিনিট পাঁচেক পর আবার কল করে বললো - যেই স্যারের আন্ডারে ও স্পেশালাইজেশন করেছে তার কাছে আমার জন্য একটা এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে। তারপর, গুরু শিষ্যের যৌথ আন্তরিক চিকিৎসায় মাসেকের মধ্যেই আমি সেবার সেরে উঠছিলাম।
হাবিল এবং কাবিল দুইজনই আমার খুব ভালো বন্ধু। দুইজনের মধ্যে কাবিল-ই বন্ধু হিসাবে বেশি ঘনিষ্ট। কিন্তু হাবিল আমার কাছে নরদেব। কি মনে হয়? আমাকে এতো সাহায্য করেছে বলে? আমার কাছ থেকে টাকা নেয়নি বলে? পাঠক বলতে পারেন অবশ্যই। কিন্তু আমি জানি, আমি তার দাস হয়ে গেছি তার এপ্রোচে, তার ব্যবহারে, তার আন্তরিকতায়।
কাবিল অবশ্যই ঠিক। অর্থের প্রয়োজন প্রত্যেকেরই আছে। কিন্তু এপ্রোচটা এখানে মুখ্য। একজন টাকা না হলে মুখ খুলবে না। আরেকজন আমার সুস্থতার জন্য ভাইয়ের চেয়েও আপন হয়ে যায়। শুনতে পাই কোনো কোনো চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তাদের কথা শুনলেই রোগী সুস্থ্য হয়ে যায়। এর মূল কারণ সম্ভবত এরা ডাক্তার না হয়ে হাবিলের মতো ভাই, বোন, বাবা বা মা হয়ে যান।
সর্বজন জ্ঞাতার্থে বলি, যশ, উপার্জন এবং পদোন্নতি সব ক্ষেত্রেই কাবিলের চেয়ে হাবিল এগিয়ে। অথচ, সে সপ্তাহে দুই দিন কোন হাই-রেটেড ক্লিনিকে না বসে তার মফস্বলের দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্রে গরিবদের ফ্রি ট্রিটমেন্ট দেয়। সাথে ঔষধও দেয় যতোটা সম্ভব। হাবিলের মুখে শোনা গল্প, শৈশবে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মাকে হারায় সে। তখন বাংলা সিনেমার নায়কদের শিশু চরিত্রটির মতো প্রতিজ্ঞা করেছিলো বড় হয়ে ডাক্তার হবে। মানুষকে চিকিৎসার অভাবে মরতে দেবে না। হলোও তাই। হাবিল এখন ছোটবেলায় পড়া প্রবন্ধ রচনার মতো ডাক্তার।

©somewhere in net ltd.