নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

একটি ব্যক্তিগত সৃষ্টির আঁতুড়ঘর

ত্রয়োদশ ভূঁইয়া

ত্রয়োদশ ভূঁইয়া › বিস্তারিত পোস্টঃ

করোনাকালে ল্যাঙ্গুয়েজের ল্যাং : পাগল কইলো, \'আমারে ফাগল ফাইসো?\' পর্ব-৮

১৩ ই মে, ২০২০ দুপুর ১:৫৮

২০০১ সালের কথা। মাধ্যমিকের রেজাল্ট দিয়েছে। মোবাইল প্রযুক্তি দেশে তখন আসি আসি করছে। ফলে মোবাইল ফোনে রেজাল্ট দেখার প্রযুক্তি তখন 'এলিয়েন কনসেপ্ট' ছিলো। আর ইন্টারনেট? একসময় এদেশের সব ছাত্র-ছাত্রীরা যে নেটিজেন হয়ে যাবে সেটা তো কল্পনাতীত ছিলো তখন। কারণ ডিজিটালইজেশনের ছোঁয়া তখনো লাগেনি দেশে। রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে গুটি কয় সাইবার ক্যাফে গড়ে উঠেছিলো। কিন্তু সেখানে গিয়েও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারা লোকের সংখ্যা ছিলো হাতেগোনা। তাই ইন্টারনেটে ফলাফল দেখার তো প্রশ্নই আসে না। সেই সাদাকালো আর ল্যান্ডফোনের যুগের কথা বলছি। তখন ফলাফল জানতে হতো স্কুলে গিয়ে। আমিও যাচ্ছিলাম। ভেতরে তোলপাড়। কি হলে কি হবে শুধু এই হিসেবে নিকাশ চলছে মনে। স্কুলে গেলাম। নোটিশ বোর্ডের রেজাল্টও দেখলাম। কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। কারণ আমরা ছিলাম গ্রেডিং সিস্টেমের প্রথম গিনিপিগের দল। ফলাফল দেখে উচ্ছাসের চেয়ে বিস্ময় বেশি ছিল। ফলাফল হিসেবে যে সংখ্যা এলো সেটা কি? কিচ্ছু বুঝলাম না ? বাবা-মাকে কি বুঝাবো কত পেয়েছি? লোকজনকে কি জানাবো? অগত্যা স্যারের কাছে গেলাম বুঝতে।স্যার জানালেন তিনিও কিছু বুঝেন না। তবে যা হয়েছে বেশ ভালো কিছু।

এই 'জিপিএ' শব্দটাই এদেশে স্হায়ী হলো। এর আর বাংলা হলো না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা 'শিক্ষিৎ' সাহেব হয়েছে। ইংরেজি নাম পেয়েছে সালাম, বরকতের দেশে। এখন নাম্বার পত্রকে বলা হয় 'একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট'। ঈশপের কাক আর ময়ূরের গল্পটা এখানে প্রাসঙ্গিক। তবে সবার জানা আছে ধরে নিয়ে বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি না।

এবার আসি কনটেম্পোরারি প্রসঙ্গে। দেশে করোনা এলো। মানুষ জানলো নতুন ব্যাধি এসেছে। সেই ব্যাধির বাহক দেবীও ওলা দেবীর মতো ভয়ংকর। যেই দিক দিয়ে যাচ্ছে সাফ করে যাচ্ছে। সমানে মানুষ মরছে। বিলেতি ডাক্তার, ইরানি মন্ত্রী, আফ্রিকান নিগ্রো, মেরিকান দাদা কাওকেই পরোয়া করছেনা এই নতুন ভাইরাস। এদিকে কেউ একজন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদান্যতায়। ভানু নাকি বলেছিলেন, "ডাক্তাররা রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হলে সেই রোগের নাম হয় ভাইরাস "। কেউ কেউ পরিসংখ্যান নিয়ে হাজির হলেন। প্রতিদিন কতজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করে, ক্ষুধায় মারা যায়, অন্য রোগে মারা যায় ইত্যাদি সংখ্যাগুলো সব করোনার চেয়ে আকারে বড় । অতএব, মানবকূল আতংকিত হয়ো না। কেউ কেউ আবাবিলের সাথে তুলনা করেছেন এই এককোষী জীবাণুকে। কিন্তু, সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে যখন রোগটি মহা দাপটের সাথে এই দেশেও তার নিরঙ্কুশ দাপুটে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলো তখন এই সকল বহুমাত্রিক ইন্টেলেকচুয়ালগণ মুখে কুলুপ আঁটলেন। কিন্তু ঝামেলা ঘটলো অন্যখানে। যা এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য। আর তা হলো করোনার বিলেতি লেবাস।

'কোয়ারেন্টাইন', 'আইসোলেশন' এবং 'লকডাউন' এই তিনটি শব্দ রাতারাতি মহাতারকা হয়ে গেলো এই দেশে। এনাদের নাম জানেনা এমন মানুষ নাই, কিন্তু এদের চিনতে পারে এমন মানুষ বিরল। রাষ্ট্র, স্বাস্থ্য গবেষকগণ এবং আমাদের ভাষার কর্ণধারগণ সবাই মিলে এই সাহেবি শব্দ গুলোই বঙ্গবাসীদের উপর চাঁপানো যৌক্তিক ভাবলেন। আর মিডিয়া, যারা কিনা দুর্বোধ্য তথ্যকে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা এবং পারিভাষিক শব্দ তৈরির সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যম। তারাও স্রোতে গাঁ ভাসালেন অথবা বিদেশি শব্দ প্রয়োগ করে রোগের আভিজাত্যও বজায় রাখলেন, সেই সাথে নিজেদের টিআরপি'র পতনও রুখে দিলেন।

এবার শব্দগুলোর ভাষাগত বিপত্তির দিকে পাখির চোখ ফেলা যাক। শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন শব্দদ্বয়ের প্রায়োগিক পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। এখনো অনেকে পারেন না। যাহোক, এদেশে মানে বাংলাদেশে মানুষকে করোনা সম্পর্কে সচেতন করতে গিয়ে 'কোয়ারেন্টাইন' শব্দটি ব্যবহার না করে তার পরিবর্তে প্রথম কোনো বাংলা শব্দ ব্যবহার করেছিলেন একজন ক্রিকেটার। মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি ফেইসবুক লাইভে 'কোয়ারেন্টাইন' বলতে রাজি হননি বরং তার মতোই সহজ সুন্দর শব্দ 'গৃহবন্দি' কে বেছে নিয়েছিলেন প্রতিশব্দ হিসেবে। পরে অনেক সমালোচনার মুখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর 'কোয়ারেন্টাইন' এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে গ্রহণ করেছে 'সঙ্গনিরোধ'। এখন কথা হলো- যে কুলি কারওয়ান বাজারে মাল টানে, যে পাটনী খেঁয়া পাড় করে বা যে কৃষক মাঠে লাঙ্গল চালায় তারা কি এই 'সঙ্গনিরোধ' শব্দটির অর্থ জানে? তারা কি এটি উচ্চারণ করতে পারবে? নাকি তাদের কোনোদিন করোনা আক্রমণ করবে না!

কোয়ারেন্টাইন এর মতো আইসোলেশনের প্রতিশব্দটাও কিম্ভুক কিমাকার 'অন্তরণ'। শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কেনো? আমি হলফ করে বলতে পারি, এই দেশে কাড়িকাড়ি বই পড়া অনেকে এই সঙ্গনিরোধ বা অন্তরণ শব্দ প্রথমবার যখন শুনেছেন তখন 'হিব্রু' বা 'গ্রীক' শব্দ শুনার মতোই চমকে উঠেছেন। প্রশ্ন হলো, দূরত্ব জ্ঞাপক সহজে উচ্চারণযোগ্য শব্দের এতোই সংকট বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে?

এবার আসি 'লকডাউন' প্রসঙ্গে। সরকার একে গ্রহণ করেনি, কিন্তু মিডিয়া একে বর্জন করেনি। ফলে এর বাংলা সমার্থক শব্দ-বিষয়ক বিতর্ক কম। যদিও সংবাদ মাধ্যম এই অজুহাতে দায় এড়াতে পারে না। তবে সুশীল সমাজের কেউকেউ লকডাউন এর পরিবর্তে 'অবরুদ্ধ' শব্দটি ব্যবহার করছেন। এটি বেশ যুৎসই। কিন্তু 'লকডাউন' এর সমস্যা অন্যখানে। যেহেতু সরকার লকডাউন-শব্দ নেয় নি তাই রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত দেশপ্রেমিক নাগরিকগণও নেন নি। সরকারের 'সাধারণ ছুটি' তারা উপভোগ করছেন বেশ উৎসবপূর্ণ আমেজেই। এইখানে 'সাধারণ ছুটি' কথাটি শব্দ হিসেবে সহজ, সর্বজনবোধ্য অবশ্যই। কিন্তু এর তাৎপর্যগত সমস্যা রয়েছে।

করোনার জল যতই গড়াতে থাকে ততই বিদেশি শব্দের আগমন বাড়তে থাকে সোনার বাংলায়। এই যেমন ভেন্টিলেশন, চিকিৎসা কিট, জিনোম সিকুয়েন্স, মিউটেশন প্রভৃতি।

কোনো এক স্কুলের শিক্ষক এক ছাত্রের বাবাকে ডেকে নালিশ করলেন, "আপনার ছেলে বাসায় লেখা পড়া কিছু করে ? হাতের লেখা দেখেছেন? কিচ্ছু বুঝা যায় না। " বাবা এই কথা শুনে রাগ হওয়ার পরিবর্তে খুশি হয়ে বললেন, "এ তো আনন্দের বিষয়। আমার ছেলে ডাক্তার হবে। " এই পুরোনো বস্তাপঁচা কৌতুকটা এখানে টেনেআনার একটা যৌক্তিক কারণ আছে। আমার পরিচিত বেশ কয়েকজন চিকিৎসক আছেন যাদের হ্যান্ডরাইটিং স্কুল কলেজের দিনগুলোতে ছিলো মুক্তার মালার মতো কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার পর তা সদ্য হাতেখড়ি হওয়া শিশুর লেখার মতোই শ্রীহীন আর দুর্বোধ্য হয়ে গেছে।

দুষ্ট লোকেরা বলে, ডাক্তারগণ নিজেদের অভিজাত প্রমান করতে ও অন্যদের কাছ থেকে নিজেদের আলাদা রাখতে দুইটা ভাষাগত হাতিয়ার ব্যবহার করেন। এক, কিউনিফর্ম যুগের হস্তলিপি আর দুই, দাঁত ভাঙ্গা ঔষধের নাম। শুনতে পাই ঔষধ শিল্পে বাংলাদেশ শুধু স্বয়ং সম্পূর্ণই না, বরং পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি দেশে ঔষধ রপ্তানি করে। অথচ এখানকার সব ঔষধের নাম ল্যাটিন বা তার সমগোত্রীয় ভাষায় রাখা হয়। এখন কথা হলো, ঔষধের গোত্র নির্দেশক অনুসর্গ 'মাইসিন', লাইসিস', মাইসিস' ইত্যাদি বাংলা ধাতু'র সাথে যুক্ত করে 'জীবানুমাইসিন', 'দাহোমাইসিস', 'কুষ্ঠলাইসিস' প্রভৃতি রাখা যেতো না? এই নামগুলো পড়ে চিকিৎসক, ঔষধ প্রস্তুতকারক ও রসায়নবিদগণ হাসছেন? কিন্তু আপনাদের বিদঘুটে নামের ঔষধগুলো অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠির মানুষজন দাঁতে-দাঁত কিটমিট করে সেবন করে, সে দিকটাও একটু খেয়াল রাখবেন।

যারা এই যুক্তি দাঁড় করান যে ঔষধের বাংলা নামে হাঁতুড়ে চিকিৎসকদের দাপটে টিকা যাবে না কিংবা শৈল্য পত্যের সাথে গুলিয়ে যাবে অথবা ষান্ডার তেল বানানো লোকজন বিজ্ঞানী হয়ে যাবে সেই সব সার্টিফিকেটধারী মূর্খদের তর্কের বাইরে রাখাই শ্রেয়।

ঔষধের বাংলা নাম করণের দাবির পিছনে আমার আরো একটা শক্ত যুক্তি আছে। তা হলো এই শিল্প সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের একটু সদিচ্ছা থাকলে তারা বাংলা ভাষাকে পৌঁছে দিতে পারেন সারা পৃথিবীতে। ভারত যেভাবে হিন্দিকে ছড়িয়েছে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, চীন মান্দারিন ছড়িয়েছে তাদের স্বল্পমূল্যের প্রযুক্তির মাধ্যমে।

আরেকটা সাম্প্রিতক বিষয় দিয়ে এই লেখার ইতি টানবো। আমাদের দেশে উচ্চ আদালতের রায় ইংরেজিতে দেওয়া হয়। এ নিয়ে অনেক আপত্তি বিপত্তি আছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী আদালতের রায় বাংলায় দেওয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখতে বিচারপতিগণকে অনুরোধ করেছেন। যারা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক তারাও কি এমন উচ্চপদস্ত তাগিদ বা আদেশ অথবা অনুরোধের অপেক্ষায় গাল ফুলিয়ে বসে আছেন? ভাষাকে ভালোবাসার ও টিকিয়ে রাখার দায় সাংবাদিক, টকশো'র বিশ্লেষক, কলামনিস্ট, লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষকদেরই বেশি। সামনের জন বা পেছনের জনের প্রতি আঙ্গুল না তুলে বরং নিজ দায়িত্বেই ভিনদেশি বা দুর্বোধ্য শব্দকে সার্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রত্যেকের নিজের কাঁধেই নেওয়া উচিৎ।'পাছে লোকে কিছু বলে' জাতীয় ভাবনা এদের জন্য বেমানান।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.