| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ব্যবহৃত শব্দের তাৎপর্যগত দিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলচ্চিত্রটিতে 'আমার' শব্দটি সর্বাধিক ৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়ার 'আমি' ৮ বার, আমারে এবং আমায় ৫ বার প্রয়োগ করা হয়েছে। উত্তমপুরুষের এই আধিক্য চলচ্চিত্রটির আগ্রাসী বৈশিষ্ট্য বহন করে যা একটি একশনধর্মী চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের অন্যতম নিয়ামক। এটা এই সিনেমার ভালো দিক। এখানে, প্রশ্নবাচক 'কি' ৮ বার, গতি বোঝাতে 'চলো' ৮ বার, অনুসন্ধ্যান জ্ঞাপক 'প্রমাণ' ৬ বার এবং 'খুইজা' ৮ বার প্রয়োগ করা হয়েছে। এ শব্দ গুলোও অ্যাকশন উপযোগী।এছাড়াও 'দুইটা', 'তুই', 'মাল' ৪ বার করে এবং 'খুন', 'বন্দুক', 'কম', 'ওটা', 'সব', 'কাইটা', 'আঙ্গুল' প্রভৃতি শব্দ ৩ বার করে ব্যবহৃত হয়েছে। এ গুলোও অ্যাকশন এর জন্য কার্যকর শব্দ। উল্লেখ্য, 'মাল' শব্দটি ২বার বস্তু অর্থে এবং ২ বার মানুষ (তাচ্ছিল্য) অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে।
বাংলা Phrase হিসেবে 'বাল ছিড়ছি', 'সুয়ারের বাচ্ছা', 'বালের কাম', 'বানাইছে তো', 'জীবনের ছবক', 'ছাদ থেইকা' প্রভৃতি যুগ্ন শব্দের প্রয়োগ হয়েছে যার অর্ধেকই গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলা শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে উত্তেজক এবং অমার্জিত শব্দকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় বাক্যের পুনরাবৃত্তি ও সেগুলোতে গালির ব্যবহার পর্যালোচনায়। 'সুয়ারের বাচ্ছা' ৪ বার, 'খুন কইরা ফালামু', 'তাড়াতাড়ি চলো' ইত্যাদি ৩ বার করে এবং 'প্রমাণ দাও', 'বোকা চোদা', খানকির পোলা', 'কুত্তার বাচ্ছা' এবং 'গুলি মেরে উড়িয়ে দেবো' বাক্যাংশগুলো উচ্চারিত হয়েছে ২ বার করে। এছাড়াও যে সব গালি বা অশ্লীলতা প্রকাশক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো হলো - বাঁড়া, ফোঁড়, সালা, বালের কাম, মাদারচোদ প্রভৃতি।
অর্থাৎ আক্রমণাত্মক, অশ্লীল ও অনুসন্ধিৎসু শব্দের অপ্রতুল ব্যবহার চলচ্চিত্রটির একশনধর্মী বৈশিষ্ট্যকে যতোটা ত্বরান্বিত করেছে, ভুল উচ্চারণে সেগুলোর প্রয়োগ স্থানীয় মানুষকে ততোটাই হতাশ করেছে।
সংলাপ থেকে প্রপসের দিকে চোখ ঘুরালে দেখা যাবে সেখানকার ভাষাগত অসঙ্গতি আরো দৃষ্টিকটু। পুরান ঢাকার গলির ইলেকট্রিক সাইনবোর্ডে "এই দোকান বিক্রির হবে" লেখা। এই বাক্যটির সঠিক রূপ হয় "এই দোকান বিক্রি হবে" অথবা "এই দোকান বিক্রির জন্য" হওয়ার কথা। সিএনজির গায়ে লিখা "আল্লাহ সার্ভ শক্তিমান" এবং "নাসিব পরিবহন" । বাংলায় উচ্চারিত 'সর্বশক্তিমান' শব্দের হিন্দি উচ্চারণ 'সার্ভ শক্তিমান' সেটাই লিখে দেওয়া হয়েছিল, যা বাংলাদেশের কোনো পরিবহণে লিখা থাকার কথা না। তাছাড়া 'নসিব' শব্দটিও হিন্দিতে 'নাসিব' উচ্চারিত হয়। বাংলাদেশের কোনো পরিবহনে লেখা বাক্যটি হতো "নসিব পরিবহন" অথবা "নাসির পরিবহন"।
এলিট ফোর্স হিসেবে র্যাব এর বিকৃত আদলে যে বাহিনীকে দেখানো হয়েছে সেই বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বজলুর রাশীদ যে আমিরের পক্ষে কাজ করছিলো। তার পরিহিত উর্দিতে 'পুলিশ', 'আর্মি' এবং 'এলিট' তিনটি পৃথক বাহিনীর ব্যাজ ছিলো। এর চেয়েও ভয়াবহ ছিলো সেই বাহিনীগুলোর নামের ভুল বানান। পুলিশ শব্দটি ঠিক থাকলেও "আর্মি ফোস" এবং "ইএলযাইটিই" শব্দদ্বয়ের কোন বাংলা অর্থবাচকতা নেই।
সিনেমাটিতে ব্যবহৃত বাংলা বাক্যের ইংরেজি সাবটাইটেল এর অর্থগত ব্যত্তয়ও ছিলো চোখে পড়ার মতো। "সাম্ভব না হোলে তোমারে দিয়া আমার কি বালের কাম?" এবং "Make it possible, Colonel" কোনো ভাবেই পরস্পরের সমার্থক হতে পারে না। ঠিক তেমনি "কুত্তার বাচ্চারে আমি আটকাইছিলাম" বাক্যের ইংরেজিও "I lost him…" হতে পারেনা। একজন সেনা কর্মকর্তাকে দেখা গেলো অভি মহাজনকে ধাওয়া করতে করতে উচ্চারণ করছেন "সুয়ারের বাচ্ছা" এবং তার সাবটাইটেল উঠলো "come here"।
ভাষাগত এই প্রহসন অথবা নৃতাত্ত্বিক গবেষণার অভাব নেটফ্লিক্সের এই ব্যাবসা-সফল সিনেমাটি বাংলা ভাসাভাসা মানুষের কাছে সমাদৃত হয় নি। সিনেমাটিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সনামধন্য মানুষের সম্পৃক্ততার কথা শুনতে পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, তাদের কি আদৌ কোনো ভূমিকা ছিলো? নাকি তারা কি নাম সর্বস্ব ছিলেন? যদি তাদের কোনো ভূমিকা থেকেই থাকে তাহলে সেটা কি? বাংলাদেশের একজন ভাষা উপদেষ্টা এবং একজন উচ্চারণের প্রশিক্ষকের উপস্থিতিতে বাংলা ভাষার এই হাল হলো কি করে? এই প্রশ্নের সদুত্তর আর সবার মতোই লেখকেরও অজানা।
কোনো একটি জাতি বা সংস্কৃতিকে চিত্রায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ, কুশীলব ও উপাদানের যথাযথ উপস্থাপন একটি চলচ্চিত্রের বড় অলঙ্কার। যা এক্সট্রাকশনে সর্বোতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। 'ভিডিও গেম' তুল্য এই সিনেমাটি শুধু মাত্র তাদের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, যারা কাট-কাট মারামারি আর টানটান উত্তেজনা পছন্দ করে। এদের কাছে অন্য কোনো শৈল্পিক দিক মুখ্য নয়।
-সমাপ্ত -
©somewhere in net ltd.