| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আহ! কি সব দিন!
বাসার সামনে বড় বড় মাঠ। তেপান্তরের মাঠ যাকে বলে। আর পেছনে প্রবাহমান ভৈরব।
সারাদিন সেই তেপান্তরের মাঠে ঘুড়ি উড়িয়ে কেটে গেছে। অথবা বাঁকা আলপিনে বানানো বড়সি নিয়ে ভৈরবের কুলে।
অথচ সেই তেপান্তরের মাঠে এখন ইট কংক্রিটের বুনন আর রোগাক্রান্ত চেহারা নিয়ে পড়ে আছে ভৈরব নদী।
পুরণো সব লেখকদের বইয়ে মাঠের পরে তেপান্তর শব্দটি অনেক বার পড়েছি।
বেশ মজবুত শব্দটি।
বিশাল অর্থে ব্যাবহার করা হয়েছে কিনা কখনো জানার চেষ্টাও করিনি।
খুব ছোটবেলা।
স্কুলে ভর্তি হয়েছি কি হইনি। এমন সময়কার কথা।
বাবা সরকারের একজন কনিষ্ঠ কর্মচারি। সেই সুবাদে থাকি যশোর হাউজিং স্টাফ কোয়ার্টারে।
এখানেই আমার জীবনের সবচেয়ে মধুরতম শিশু বেলাটি কেটে গেছে।
এখনো দেখতে পাই। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই। মাঠের পর মাঠ। একেবারে বিমান অফিস ছাড়িয়ে।
পাশেই বাবলা তলা ছাড়িয়ে আমার স্কুল।
ঘোপ সেবাসংঘ।
সেখানে কি জাতীয় ছাত্র ছিলাম তা নিজেই বুঝে উঠতে পারি না। প্রথম দ্বিতীয় থেকে সব ধরণের ফলাফলের অভিজ্ঞতা নিয়েই বড় হয়েছি।
আমার কর্মব্যাস্ত বাবা।
দিনের অধিকাংশ সময়ই দেখা হয়না। প্রচণ্ড রাগের কারণে অসম্ভব ভয়ে ভয়ে বাবার থেকে দূরেও থাকি।
একদিন রাতের বেলা। ঘুমিয়েই আছি।
মুখে কাটা কাটা খোচার স্পর্শে বাবাকে কাছে পেলাম।
পরম মমতায় মুখখানি তার ছুয়ে যাচ্ছে মুখে, গলায়। আর আমি কিছুটা ভয়, অনেকটা সমীহ নিয়েই ঘাপটি মেরে ঘুমের কাদা হয়ে পড়ে আছি।
এখনো মনে আছে এমন দিনটির কথা। আর আদর মাখা কথাগুলি তার।
- আমার পাগল ছেলেটা। একটুও দেখিনা। সারাদিন কোথায় কোথায় যে টইটই করে ঘুরে বেড়ায়!
এই সেদিনের কথা। মনে হচ্ছে একটু পরেই হয়তো বাবা আবারো তেমন করে বলে উঠবেন।
- সারাদিন কোথায় থাকিস?
শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েই মহম্মদপুর।
সারাদিন কেটে গেলো মধুমতির পাড়েই।
গতবারও গেছি। কিন্তু এবার মনে হলো নদীতে অনেক পানি। নৌকাও যেন অনেক এবং বেশ বড় বড়।
ঘুর্ণিঝড় নাডা'র প্রভাবে সারাদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি।
রুমালে মাথা বাঁচাবার চেষ্টা।
কিন্তু কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি তা মর্মে মর্মে বুঝছি এখন।
মুখে খুক খুক শব্দেই মাথার ভিতর এলোমেলো ব্যথা জানান দিচ্ছে।
বাধ্য হয়েই অন্যদিনের চেয়ে আগেই বাড়ি ফেরা।
যদিও আজও বৃষ্টি সারাদিন।
তারপরও ঠাণ্ডা কি আজ একটু বেশিই।
নভেম্বরের পাঁচ।
শীত মনে হয় পড়েই গেলো।
ঘরে ঢুকেই ছেলের বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
এমন একটি পেশা।
সহকর্মীদের অনেকের জীবন যেখানে গোছানো।
সেখানে আমি যেন একেবারেই অন্য ভিন্ন!
অনেকটা কি বোহেমিয়ান? নাকি দায়িত্বহীন?
জানিনা।
আমার প্রিয় বন্ধুটি আমাকে এক সময় ভ্যাগাবণ্ড বলে ডাকতো। এখন আর বলে না। হয়তো আমি তাও না। আমি কিছুই না!
নাহ! শীত এসেই গেলো।
একটু উষ্ণতার জন্য ছেলেকে জড়িয়ে ধরলাম। ঘুমিয়ে থাকা শিশুদের মুখখানি কি দারুন মায়াময়!
সারাদিনে ওর জন্যে আমার কোনই সময় নেই।
সেই অপরাধ বোধ মিশ্রিত কণ্ঠেই মুখে মুখ ছুইয়ে বললাম,
- ছেলেটিকে সারাদিন দেখতে পাই না। কোথায় যে এত টইটই করে ঘুরে বেড়ায়।
বাবার বুলিটা কেমন অবচেতন মনেই মুখ ফুটে বেরিয়ে এলো!
প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে আরো রাতে দুটি কম্বলে আশ্রয় নিলাম।
চার নম্বর সতর্ক সংকেত চলছে। নাডা এখন পর্যন্ত কোথায়ও আঘাত করেনি।
কিন্তু এই বোহেমিয়ান জীবনের অযত্নে পড়ে থাকা অনেকগুলো পাতাই ফিরে গেছে সেই কবে!
বাবাকে দেখিনা কতদিন!
কেমন আছেন বাবা! যেখনেই থাকুন
ভাল থাকুন।
©somewhere in net ltd.