নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

দেখিনা চোখে কিছু, অন্ধের মতো ছুটছি শহর থেকে শহরে। আজকাল শহর থেকে শহরে ছুটে চলে আমার দুঃখগুলোও। এইসব শহরের পথোনদে যে জন সমুদ্র তাতে শুধু আমার বেদনার অশ্রু ঘাম হয়ে ঝরে। চোখে পড়েনা বনানীবিমূঢ় ছায়া। অন্ধকার গলিপথ মারিয়ে ঘরে ফিরে তবু প্রত্যহ কাঠ পেন্সিলে আঁকি

ক্যাপ্রিয় সুমন

ক্যাপ্রিয় সুমন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ম্যাচ বৃতান্ত------(গল্প)

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৬ দুপুর ২:৫৩


ছয়তলা বাড়ীর তৃতীয় তলাতে আংকেল দাঁড়িয়ে “ আংকেল আপনার নীচতলাটা ভাড়া হবে?
তোমরা কি ব্যাচেলর? জি মানে হ্যাঁ।
ব্যাচেলর ভাড়া হবেনা। আংকেল সরে গেলেন, কি আর করা এই করে মোট দশ এগারটি বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাচেলরের অভিযোগে দূর দূর ছাই ছাই। বুড়ো ব্যাটা কি কোনদিন ব্যাচেলর ছিলনা। বা তার মেয়েটা কি ব্যাচেলরের সাথে বিয়ে দেবেন না?
আর সমস্যা হবেই বা না কেন, আমরা এক একজন এক রকম ভুতুরে চেহারার কেউ চুলগুলো প্যাঁচিয়ে পাকিয়ে মুচরিয়ে রেখেছে, কারোর জিন্স স্লিপারের তলায় যেতে যেতে হাঁটু পর্যন্ত ক্ষয়ে গেছে। কেউ দিন রাত মোবাইল টিপসে।
কখনও কখনও মনে হয়েছে কোন একজন বন্ধুকে বিয়ে দিয়ে আপাতত ফ্যামীলি বলে উঠে পড়ি, কিন্তু বিয়েটা করবে কে? তাছাড়া এটা তো কোন সমাধান নয়।

এই শহরে অনেক খুঁজা খুঁজির পর যদি ব্যাচেলর বাসা পাওয়াও যায় তবে সেটা নীচ তলা মানে গ্রাউন্ড ফ্লোর। গোমটা গরম, আলো বাতাস একেবারেই নেই, তারপরও জানালা খোলা নিষেধ, রাত এগারটার মধ্যে গেট ছিচিং বন্দ । টিভি চালান যাবেনা। বাসা থেকে বেড়িয়ে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা যাবেনা। বিদ্যুত চলে গেলে এলাকার গলিতে ঘোরাফেরা করা যাবেনা। তার মানে এই শহরে ব্যাচেলর মানে অভিশাপ। ব্যাচেলর মানে অত্যান্ত দূরভাগ্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করা।

দক্ষিন বাড্ডায় বাবুল ভায়ের বাসায় শেষ পর্যন্ত ভাড়া হল। ছয়তলা বাসার নীচ তলা। বাবুল ভাই গুলশানের একটি রেস্তরার বার্বুচী। স্ত্রী ইটালীতে গেছেন সেই সুবাদে নিজের ফ্যামীলি ফ্ল্যাট্টা ম্যাচ করে থাকেন। এনায়েতভাই ও রুহানকে আমরা গিয়ে পেয়েছি। কুড়িগ্রামের মিলন ও জামিল এসে যোগ হল। একদিন রাত প্রায় বারটায় দুটি ছেলে এলো তাদের একজন মিথুন কাব্য দাস। অগোছাল চুল, এলোমেলো পোশাক ও খারু খারু দাঁড়ী গোঁফে ভর্তি ছেলেটা ব্যাবহার অত্যান্ত মোলায়েম। জাতে হিন্দু।

প্রথম পনর দিন আমরা বেশ ভালই ছিলাম। তারপর কি এক দরকারে বাবুল ভাই দেশে গেলেন। শুরু হল এলোমেলো বাজার ঘাট খাওয়া দাওয়া। আশিক নামের একটা ছেলের ডায়রিয়া হল, জ্বরে পরল। মিলন সারাদিন মাইক্রল্যাব বক্সে গান শোনে। একবার সাউন্ড বাড়ায় একবার কমায়, তেরে জুলফুকি...। এই সব। জামিল দিন-রাত মেয়েদের সাথে ফোনালাপ করে। মিথুন সারারাত ঘুমায় না। ভোর রাতে ঘুমায় আর ঘুম থেকে উঠে বেলা তিনটায়। খাওয়া দাওয়া করে সন্ধ্যা হলে প্রাইভেট পড়াতে চলে যায়। ঘরে ফেরে অনেক রাতে। আমাদের মধ্যে বাবুল ভায়ের শোয়া অত্যান্ত খারাপ, গায়ের উপর পা তুলে দেয়। মাঝে মাঝে একেবারে প্যাঁচিয়ে ধরে। অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি ভাত আছে তরকারী নেই। ডিম এনে একটা ভাজলে বাঁকী হারিয়ে যায়। আমাদের কোন বুয়া ছিলনা। এনায়েত ভাই রান্না করত। মাঝে মাঝে কি যে বিকট রান্না, প্রায় সকলেরই অরুচী, বমি, পোয়াতি ভাব। এ ওরে রাগায় ও এরে রাগায় “আকামডা তাইলে কে করছে, এইসব ফাজলামী। এরি মাঝে একুশে ফেব্রুয়ারীর বই মেলায় বেড়াতে গিয়ে আমার আই-মোবাইলটা হারিয়ে গেল। রাতে ঘুমের মাঝে চমকে চমকে উঠি। মনে হয় আমার রিংটনটা বাজছে। গিভসন রাসেলের সাথে এক নিউ রুমম্যাট পার্লারে সেভ করতে গিয়ে ২৭০ টাকা বিল দিয়ে কি এক হুলুস্থুল কারবার বাধিয়ে আসল। এই নিয়ে হই হুল্লর হাসা হাসি। আরও সমস্যা হল বাবুল ভাই যখন বাসায় থাকতো তখন নানা ধরনের লোকজন আসতো, তারা সহজে যেত না। চান্স পেলেই জড়িয়ে ধরত। হিজরাদের মতো আচরন করত। আমরা কেউ ভয় পেতাম। কেউ লজ্জা পেতাম। শেষ পর্যন্ত আমরা ম্যাচ করতে না পেরে বাবুলের বাসাটা ছেড়ে দিলাম।

আমাদের নতুন বাসা আদর্শ নগর। সুমন ভাইদের পাঁচতলা বাসার চারতলা পূর্বপাশ। বাসাটা খুঁজে বের করেছিল মিথুন। বেড এরেঞ্জমেন্টের পর দেখা গেল মিথুনেরসই শোবার জায়গা নেই। এ বাসায় বুয়া রাখা হল। আমাদের সাথে নতুন করে যোগ হল লিটনভাই লালমনির হাট, ইলিওট ও সুমন(ডেসটিনি-২০০০)। সকালে আমি যখন অফিসে যায় তখন ওরা সবাই ঘুমায় আর সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরি তখন ওরা কেউ বাসায় থাকেনা। সেই কারনে সকালে বাজার ও রান্না ওরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই হয়ে যায় আর রাতে আমি ফেরার পর বুয়া এসে রেঁধে যায়। মাঝে মাঝে বুয়া আসেনা। বুয়ার ছেলেটার জ্বর করে। বুয়ার খালাত ভইনের স্বামীর পা ভাংগে। দেশের বাড়ী যায় ভোট দিতে। ক’দিন বাজারে বেশ সমস্যা চলছিল, পেটটা ছোঁ ছোঁ করছিল ভাল কিছু খাবার জন্য। অফিস থেকে ফিরে বুয়াকে মুরগী আনতে দিলাম। সেদিন বুয়া আর বাজার করে ফিরল না। ঠিক রাত সারে নটার দিকে একটি আননন নাম্বার থেকে ফোন এলো। বল্ল আপনাদের বুয়া এক্সিডেন্ট করছে। মেডিক্যালে আছে। আপনে পারলে আইসা বাজার লইয়া যান। আমি জিজ্ঞাসা করলাম বুয়ার কি অবস্থা? কোন উত্তর নাই লাইন কাটা। কোথায় যাব কোন মেডিক্যাল, কোথায় বাজার আল্লা জানে। প্রচন্ড বৃষ্টি। বাসায় কেউ নেই। হঠাৎ ডিসটিনি সুমন এল। আমি তাকে রেখে গেলাম বুয়ার খোঁজে। সে আমাকে ঠিকানাটা পরিষ্কার দেয়নি, তাই ব্যার্থ হলাম। ডিম কিনে নিয়ে ফিরে এলাম রাত তখন এগারটা।

ইলিয়ট পথিক নবীর কন্ঠে খুব ভাল গান গাইতো। মিলন নানা রসাল গল্পে মাতিয়ে রাখতো সব সময়। ফাঁক পেলেই জিয়া উদ্দ্যান আর সংসদ ভবন বেরিয়ে আসতো। ২৩ বছর বয়সে জামিলের দুই তৃতীয়াংশ মাথা টাক পরে যাওয়ায় নানা হিজিবিজি তেল আর মালিশ মাথায় বসাতে লাগল আর পড়ে পড়ে ঘুমাতে লাগল। ডেসটিনি সুমন মাঝে মাঝে ব্যাবসায়ীক গল্পে আর দারুন দারুন অফারের ফাপরে মাথাটায় গন্ডগোল পাকিয়ে চল্ল। সবার শেষে বাসায় ফেরে মিথুন পথোকাব্য। ফিরেই হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে। খাওয়া শেষে কবিতা নিয়ে বসে ফিজিক্স কিংবা ক্যামিস্ট্রির মতো গবেষণা শুরু করে দেয়। মাঝে মাঝে ঘুম থেকে জাগিয়ে কবিতা শোনায়। ওর কবিতা পড়তে পড়তে মাথাটা বেশ ভারী হয়ে গিয়েছিল। একদিন একটা চমৎকার গানের আসর হল। সেই আসরে ইলিয়ট খুব ভাল গান গাইল। তারপর থেকে ইলিয়ট রাতেও খুব কম ঘুমাত। বেল্কুনিতে, বাথরুমে, ডাইনিং রুমে, বেডরুমে প্রায় সবসময় গান গাইতো আর বেসিন থেকে মাথায় পানি নিতো। চুল গুলো ভিজিয়ে খারা করে রাখতো। মাঝে মাঝে একবারেই উন্মাদ পাগলের মতো আঁচরণ করতো। পরে জানলাম ও অনেকটা বেসামাল ছিল। খুব ছোট বেলায় ওকে রেখে ওর বাবা মারা যায়। ওর মা আর বিয়ে শাদী করেননি। ওকে মানুষ করবার প্রত্যয়ে সব জলাঞ্জলী দিয়ে একাই জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ইলিয়ট সেভাবে আগাতে পারেনি। বাবা অঢেল সম্পদ রেখে গেলেও ছেলেটার স্বভাব সিদ্ধ হয়নি। খালাত বোনের সাথে দীর্ঘদিনের প্রেম। ঢাকা ভার্সিটির ছাত্রী। কোর্ট ম্যারেজ করে নিয়েছে। আমি বাসায় না থাকলে মাঝে মধ্যে রুমে আসে। সময় কাটিয়ে চলে যায়। এ নিয়ে একবার অতিযোগও এলো আমার কাছে। আমি জানতাম না। অভিযোগের প্রেক্ষিতে জবাব চেয়েছিলাম বলেই পরে সবটা জানতে পেরেছিলাম। লিটনভাই নতুন বিবাহ করেছিলো আর ওনার চাকরীটাও ছিল নতুন । মেজাজটাও কোমল ছিলনা। ফোনে শুনতে পেতাম বউয়ের সাথে ক্যাট ক্যাট করছেন। আমি অবাক হতাম। নতুন বউয়ের সাথে কেউ ওরকম ক্যাট ক্যাট করে। আমার রুমে নতুন এসে উঠল রাসেল(গিভসন) সাথে রুমন(নীল লোহিত)।

সেটা ছিল এক বৃহস্পতিবার। আরো দুজন গেস্ট এসেছিল সেদিন । রাতে হই হুল্লুর করে ভোর রাতে ঘুমিয়েছিল সবাই। ঘটনাটা হয়তো ভোরেই ঘটেছিল। আমারটা বাদে সব মিলিয়ে সাতটা মোবাইল চুরি গিয়েছিল সেই ভোরে। গেস্টদের তিনটা। ঘটনাটা আমাদের মধ্যেই কেউ ঘটিয়েছিল। যদিও কেউই শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেনি। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ঐদিন আমি অফিসে গেলাম না। সারাদিন বাসায়। সন্ধায় মিথুন তিতুমীর কলেজে পড়ে ওর একজন খুব ভাল বন্ধু কিছু কবিরাজী জানে ও বের করে দিতে পারবে আমাদের মধ্যে কে ঐ মোবাইল গুলো চুরি করেছিল সেই শর্তে বাসায় নিয়ে এলো। পদ্ধতিটা হল কাগজে সবার নাম লিখে একটি একটি করে সেন্ডেলের উপর রেখে একটি লোহা দিয়ে সেন্ডেল্টাকে শুন্যে ধরে রেখে ছেলেটা দোয়া পাঠ করবে আর সেন্ডেলে ফু দিবে। যদি সেন্ডেলে রাখা নামটি অপরাধির হয় তাহলে সেন্ডেলটা ঘুরে তার সত্যতা প্রমান করবে। অথবা নামটি অপরাধির না হলে সেন্ডেল্টা ঘুরবে না। আমরা সবাই চারপাশটায় ঘিরে বসে আছি। অনেক কৌতুহল। অপরাধী আমাদের মধ্যেই আছে। আর সেটা প্রমান হতে লাগবে মাত্র এক মিনিট। অপরাধীর নাম সহ সেন্ডেলটা ঘুরল ঠিকই। কাগজটা খুলে দেখা গেল নামটা আমার। আমি সহ সবাই অবাক। এক গভীর ও ঘন নিস্তব্ধতা নেমে এল আমাদের মাঝে। যে প্রকৃত অপরাধী সে অনেক বড় ও মোটা একটা লাঠি নিয়ে বসে আছে আমাদেরই পাশে। তার নাম উঠলে কবিরাজটার হাত-পা ভেংগে ঢাকা মেডিক্যাল পাঠাবে। ভাগ্যক্রমে আমার নাম উঠে পড়ায় ছেলেটাকে সম্মানে বিদায় করে দেওয়া হল। কিন্তু আমার জিদ হল চোরটাকে কিভাবে প্রমান করা যায়? গেলাম জাকির কবিরাজের কাছে। হুলুস্থুল কান্ড। অপরাধীকে আয়ানার মধ্যে দেখা যাবে। তার চাল পড়া খেলে অপরাধির মাথার সব চুল খুলে যাবে। শরীরের মধ্যে জালাপোড়া করবে। ঘুমালে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখবে তারপর নিজে থেকে এসে দোষ স্বীকার করে জিনিস ফিরিয়ে দেবে। চাল পড়া নিতে এক হাজার বাইশ টাকা হাদিয়া। আজ এক হাজার বাইশ টাকা হাদিয়া পরিশোধ করে গেলে পরের দিন এসে চাল নিয়ে যেতে হবে। চাল খেতে হবে সবাই একসাথে এবং পানি খাওয়া যাবেনা। অপরাধির গলা দিয়ে রক্তও বের হতে পারে। আরও অনেক কিছু। ভয়পেয়ে গেলাম। তিতুমীর কলেজ থেকে আসা ইয়োং ম্যান কবিরাজের মত যদি বিবেচনা ভুল হয় তাহলেত আমার গলা দিয়েও রক্ত উঠতে পারে। ফিরে গেলাম। রাতে আমাদের সন্দেহভাজন রুম ম্যাট এসে হাসতে হাসতে বল্ল, সুমন ভাই অনেক দেখেছি, কোন ম্যাচ থেকে কোন কিছু একবার চুরি গেলে সেটা হাইকোর্ট করলেও আর ফেরত আসেনা। বড় একটা ঢোক গিলে বুঝলাম পাবলিক শেয়ানা। অন্যরা মনে মনে কখনও প্রকাশ্যে অভিশাপ দিতে লাগল। সেটা গলা দিয়ে রক্ত ওঠার চেয়েও জঘন্য ছিল। একজন বলে বসল দেখিস ওর গার্লফ্রেন্ড অন্য ছেলের সাথে ভেগে যাবে আর ও পাগলের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। মাইরি ভীষন শক্তপোক্ত অভিশাপ।
সর্বপরি আমাদের মনে আর তেমন শান্তি ছিলনা। ঘুমের মধ্যেও কেউ কেউ জেগে গিয়ে বালিশের নীচে তার মোবাইল ফোন চেক করছে। জুতা সেন্ডেল ম্যানিব্যাগ বা বেল্টের দিকে রেখেছে কড়া নজরদারী। করায় করায় মিলিয়ে নিচ্চে মিলের হিসাব। কেউ আর কাউকে কিছুই ছাড় দিচ্চে না।

আমাদের ম্যাচিংটা ভেংগে গেল মার্চের শেষের দিকে। লিটনভাই ও ডিসটিনি সুমন চলে গেল খিলখেত, জামিল চলে গেল দেশে, মিলন অন্যদের সাথে কোথায় যেন মিল করল, ইলিয়ট চলে গেল ভার্সিটি এলাকায়, গিভসন রাসেল ও নীললোহিত চলে গেল খিলগাঁও। আমি দু-মাসের জন্য আমার অফিসের একজন সিনিয়র কো-অর্ডিনেটরের সাথে থাকব বলে কথা বললাম। নাম জাহাংগীর, দেশের বাড়ী ব্রাম্মনবাড়ীয়া। অতি ভদ্র। অত্যান্ত শুদ্ধ চলিত ভাষায় কথা বলেন। সপ্তাহে একদিন দেশে কাটিয়ে আসেন। তার একটা মেজর সমস্যা ছিল। তিনি প্রায়ই কোন বিষয় নিয়ে কনফিউজ হয়ে যেতেন। ব্যাচেলর মানে আপদ। হয় নীচ তলা না হয় ছাঁদ। সেই অনুপাতে সাততলা। লিফট নেই। হেইয়ো বলো হেইয়ো বলো করে ওঠো আর নামো। চারটি বেডরুম সম্বলিত বিশাল ইউনিট। স্যারের রুমটা ছিল দক্ষিনে। দিন-রাত হরহরিয়ে বাতাস আর বাতাস। আগে থেকেই জেনে নিলাম। মিলের কোয়ালিটি ক্যামন। স্যার বললেন ভাল। আপনার অনেক ভাল লাগবে। খুশি হলাম। সারাদিনে বাসা বদলিয়ে রাতে খুব ভাল ঘুম হল। একটা মশাও গায়ে এসে পড়ল না। না ছারপোকা না তেলাপোকা। প্রথম সকাল। স্যার তরিঘরি করে অফিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফ্যান ছেড়ে রুটি শুকাচ্ছেন। আমি গোসল দিয়ে এলে স্যার বললেন, দ্রুত খেয়ে নিন তাছাড়া অফিস ধরতে পারবেন না। রুটির চেহারা আর স্বাস্থ্য দেখে খুব লোভ হল। মনে হল বিশ বাইশটা খেয়ে ফেলি। কিন্তু উপায় নেই। বরাদ্দ মাত্র তিনটি। স্যারকে বললাম এত ঠান্ডা করছেন ক্যান? গরম গরম খেয়ে নিন। স্যার জবাব দিলেন এটা অফিসে নিয়ে যাব। দুপুরের জন্য। মানে? স্যার বললেন হ্যাঁ আমি দুপুরেও রুটি খাই। মাত্র তিনটা? আমি প্রশ্ন করলাম। আপনার ডায়াবেটিস? না, না। আমাদের এখানে সিসটেমটাই এমন। সকালেও রুটি। দুপুরেও রুটি। আমি বলে উঠলাম ও মাই গাড! স্যার বললেন হ্যাঁ। আমার ভেতরটা এতটা শুকে গেল যেন ভাতের সাথে আমার আর এহ জনমে দেখা হবেনা। স্যার তো আগে বললেন না। দুবেলা রুটি, তাও তিনটা, শালা জেলখানাও এর চেয়ে ভাল। সিস্টেমের গুষ্টিমারী। দুমাস থেকে বিদেয় হলেম। দুমাসে হোটেলে ভাতের বিল এলো ছ’হাজার। ঢাকাতে অনেক সমস্যায় পড়লেও একটানা এতদিন হোটেলে খাইনি। স্বাস্থ্যেরও কিছুটা অবনতি হল।

ডিওএইচএস বারিধারা ও বারিধারার সাথে নাইন্টি ডিগ্রী এংগেলে একটি লোকাল এলাকা রয়েছে।নাম কাঁলাচাদপুর। আমি এখন এখানে থাকি। বৌ’বাজারের পাশে ইঞ্জিনিয়র সাহেবের ছ’তলা বাড়ীর ২য় তলায়। পথে একদিন প্রদীপ দা’র সাথে দেখা। পরে হয়ে গেলেন রুম ম্যাট। প্রদীপদা আমার আগের অফিসের বস। দেখতে শুনতে ভাল। অত্যান্ত ভদ্র ও চলিত রীতিতে কথা বলেন। অনেকটা সৃজনশীল। সারা জীবন সখ আর আহল্লাদের পিছে দৌঁড়েছেন। সেই তুলনায় স্বস্থি খুব কমই পেয়েছেন। মাথায় চুল কমে গ্যাছে। বউদির বয়স অল্প। বস খুব চাপে রেখেছেন। কুমিল্লা দাউদকান্দি থেকে প্রতিদিন আসা যাওয়াতে অনেক টাকা খরচ, আবার বিশ্রামও পাননা। ইতোমধ্যেই গাড়ীর চাকায় আঘাত পেয়ে ডান পা’টায় চোট পেয়েছেন। কিছুটা খুরিয়ে হাঁটেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে রাম-সীতা আর লোকনাথ পাঠ করেন। ঠিক টাইম মত অফিস ধরে আবার ঠিকঠাক বাসায় ফেরেন। কোথায় কোন আড্ডা নেই। নেই কোন বাড়তি খরচের ঝামেলা। প্রতিদিনের মিলের হিসাব আর টাকার হিসাব ঠিকঠাক মিলিয়ে যাচ্ছেন। ডাল আলু ভর্তা বা পেঁপে ভাজির মাঝে মাঝে মুরগী। গরু একেবারে নিষেধ। কারন আমরা সাত জন রুম ম্যাটের ছ’জনই হিন্দু।দারুন মিলেছিল এখানে। সেই অর্থে সুচীবাই, নিরামিষ ভোজন, হালুয়া লুচী বা ফলফলারির অতটা ভোজন বিলাস ছিলনা। শীতলদা’র সাথে পরিচয় হল পরে। কোন এক অফিসের একাউন্টেন্ড। চিকোন গলায় কথা বলেন। অতি ভদ্র। বসের মন যুগিয়ে চলা তার উত্তম স্বভাব। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন। খেয়ে দেয়ে ন’টায় ঘুমিয়ে যান। রাশভারী মানুষ, গরগরিয়ে নাক ডাকেন। বিকট আওয়াজটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রোলার কোষ্টারের মতো সমস্ত ইউনিট টায় হামাগুড়ি খেলে ভোর রাত পর্যন্ত। এখানে আর একজন পুরাতন ম্যাটস মিথুন পথোকাব্যকে পেলাম। পরিচয় হল কৌশিক ও পার্থ’র সাথে। মিথুন পথোকাব্য ব্যাতীত ওদের কারোরই রাত করে বাসায় ফেরার অভ্যাস ছিলনা। বই পত্র ছাপাছাপির কাজে ব্যাস্ত থেকে আমি প্রায়ই মধ্যরাতে ফিরতাম। একদিন মধ্যরাতে বাসায় ফিরে খুব সকালে উঠে দেখি আমার প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগ নেই। টেবিলের উপর মোবাইল বা ঘরিটাও নেই। কিন্তু দরজা জানালা আটকানো। প্রথমে ভাবছিলাম ওরা কেউ দুষ্টামী করেছে হয়ত। কিছু পড়ে দেখি বাহিরে হই হুল্লর। থাই জানালা খুলে এই সর্বনাশটা ছিচকে চোর করেছে। শুধু আমাদের ফ্ল্যাট না তিনতলা ও পাঁচতলা থেকেও একি কায়দায় চুরি করেছে। মাস ব্যাপী খরচার টাকা চুরি গেল। মোবাইলটা যাওয়াতে ভীষন খারাপ ও লাগছে। বেশ কিছুদিন ফোনটা খোলা পেয়েছি। রিকোয়েস্ট করেছি ভাই ছিমটা দিলে খুব উপকার হত। বলেছে অফিস থেকে উঠ্যাইয়া ন্যান। বলেছি, আমার নাম্বারগুলো ? বলে, নাম্বার তো সব ডিলিট হয়্যা গ্যাছে ভাই। চুরির ঘটনাটি নিয়ে আমরা বাড়ীয়ালাকে জোর অভিযোগ করেছি। তার মাস খানেক বাদে হঠাৎ একটা ফোন এল। অন্য কেউ না, মিথুন পথোকাব্য, ভায়া আপনি কখন আসবেন? আমি বললাম। সাতটা বাজবে। বল্ল, এখানে একটা ঝামেলা হয়ে গেছে আপনি একটু তাড়াতাড়ী এলে ভাল হয়। কি ঝামেলা? বাড়ীয়ালা আমাদের না করে দিয়েছেন। ১৫ দিনের শর্ট নোটিশে আমাদের চলে যেতে হবে। আর আমরা যে এডভান্স করেছিলাম ঐ ১৪ হাজার টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা মিস্লেনিউয়াস কেটে নেবেন, বলেছেন। রানিং মাসের ভাড়াও পরিশোধ করে যেতে হবে। এখন আমরা কি করব বুঝতে পারছি না। ওকে, আমি আসছি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ব্যাচেলর বাসা পাওয়া যায়না। শর্ট নোটিশে বাসা পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। তারপর এডভান্সের টাকাটা ফেরত না পেলে আমরা আপাতত আর বাসাভাড়াও নিতে পারব না। অতএব বাড়ীয়ালার সাথে একটা বোঝা পড়া করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাই করতে হল। বোঝাপড়ার পূর্বেই প্রদীপ’দা অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। দাউদকান্দি চলে গেলেন। শীতল দা চলে গেলেন স্ত্রীর অসুস্থ্যতার কথা বলে। আরেকজন রুমম্যাট অনুপস্থিত রইল। আমরা চারজন শেষ পর্যন্ত গুলশান থানাতে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে সাধারন ডাইরীর আবেদন করলাম। ছ’শ টাকা খরচা গেল। বাড়ীয়ালা এডভান্সের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হল। প্রদীপ দা আর ফিরল না। শীতল দার সাথে আর দেখা হলনা। আমরাও আর বাসা পেলাম না। সবাই যার যার মতো ফ্রেন্ড বা আত্নীয়দের কাছে গেস্ট হয়ে গেলাম। আমি গেলাম এক পরিচিত ফ্যামিলিতে সাবলেট হয়ে।
আমার ম্যাচ লাইফের ম্যাচিং চেতনার সমাপ্তি ঘটল। ---০০০---

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.