| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ডঃ এম এ আলী
সাধারণ পাঠক ও লেখক

রাবিয়া বসরী (রহ,) কে নিয়ে আলোচনার পুর্বে সুফিবাদ কী এবং সুফিবাদের ইতিহাস নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করে নেয়া হল। (এখানে উল্লেখ্য এ পোস্টে দেয়া রাবিয়া বসরী(র,) সম্পৃক্ত সবগুলি ছবিই প্রতিকী ছবি , উনার কোন সত্যিকার ছবি নেই )
সুফিবাদ ইসলামের এক আধ্যাত্মিক ও রহস্যময় বিশ্বাস ও সাধনার ধারা, যার মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর সঙ্গে নিবীর সান্নিধ্য অনুভবের মাধ্যমে ঐশী প্রেম ও জ্ঞানের সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন। এটি বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সাধনার পথের সমষ্টি, যার লক্ষ্য মানবসত্তা ও সৃষ্টিকর্তার প্রকৃতি অনুধাবন করা এবং পৃথিবীতে ঐশী প্রেম ও প্রজ্ঞার উপস্থিতির অভিজ্ঞতা লাভে সহায়তা করা।
আরবি ভাষায় ইসলামী আধ্যাত্মিকতাকে বলা হয় তাসাওউফ যার আক্ষরিক অর্থ “উলের পোশাক পরিধান করা”। তবে উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পাশ্চাত্য ভাষায় এটি সুফিবাদ তথা Sufism নামে পরিচিত। ‘সুফিবাদ’ একটি বিমূর্ত শব্দ, যা আরবি সুফি শব্দ থেকে এসেছে; আর সুফি শব্দটির উৎস সুফ , অর্থাৎ উল ; সম্ভবত প্রাচীন মুসলিম সাধকদের উলের পোশাক পরিধানের প্রতি ইঙ্গিত করে। সুফিদের সাধারণভাবে দরিদ্র বলেও অভিহিত করা হয়। আরবিতে ফুকারা , যা ফকীর -এর বহুবচন; পারসিতে দরবেশ , যেখান থেকে ইংরেজি fakir ও dervish শব্দের উৎপত্তি।
একসময় ধারণা করা হতো যে ইসলামী আধ্যাত্মিকতার শিকড় প্রাচীন ইউরোপ কিংবা ভারতসহ বিভিন্ন অ-ইসলামী উৎস থেকে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, এই আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে ইসলামের প্রাথমিক যুগের সংযমী ও ত্যাগমূলক জীবনধারা (asceticism) থেকে, যা দ্রুত সম্প্রসারিত মুসলিম সমাজে ক্রমবর্ধমান ভোগবাদিতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে কেবল সেইসব বিদেশি উপাদান গ্রহণ করা হয়, যা আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও সাধনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে নেওয়া হয়।
সাধারণ মানুষের শিক্ষা ও মুসলমানদের আধ্যাত্মিক চেতনা গভীরতর করার মাধ্যমে সুফিবাদ মুসলিম সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় ফিকাবিদদের(আইনবিদদের) শুষ্ক তর্কধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করলেও সুফিরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শরিয়তের বিধান পালন করেন। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ধর্মপ্রচার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও সুফিদের বিশেষ অবদান রয়েছে, যা আজও অব্যাহত। ইসলামের প্রবর্তক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর ব্যক্তিত্ব ও আদর্শকে সুফিরা এক বিশেষ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন, যার ফলে মুসলিম ধর্মীয় অনুভূতি ও ভক্তি-চেতনার ওপর গভীর প্রভাব পড়েছে। পারসি ভাষা এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত তুর্কি, উর্দু, সিন্ধি, পশতু ও পাঞ্জাবি সাহিত্যেও সুফি পরিভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। এসব ভাষার কাব্যধারার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। কিছু দেশে সুফি নেতারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
ইসলামী আধ্যাত্মিকতার বিকাশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
(১) প্রাথমিক যুগের সংযমী সাধনা বা ত্যাগবাদ (asceticism)-এর আবির্ভাব,
(২) ঐশী প্রেমকেন্দ্রিক ধ্রুপদী ( ক্লাসিক্যল) আধ্যাত্মিকতার বিকাশ, এবং
(৩) সুফি ভ্রাতৃসংঘ বা তরিকা-ভিত্তিক সংগঠনের উত্থান ও বিস্তার।
তবে এসব সাধারণ ধাপ থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস মূলত ব্যক্তিগত সাধক-অভিজ্ঞতার ইতিহাস।
সুফিবাদের প্রথম পর্যায় গড়ে ওঠে ধর্মপরায়ণ মানুষের মহলে, উমাইয়া যুগের (৬৬১–৭৪৯) ক্রমবর্ধমান জাগতিক ভোগবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কুরআনের কিয়ামত সংক্রান্ত আয়াতসমূহ নিয়ে নিরন্তর ধ্যান করার ফলে এসব সাধক “সর্বদা ক্রন্দনকারী” নামে পরিচিত হন এবং তারা এই পৃথিবীকে “দুঃখের কুটির” বলে মনে করতেন। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ কঠোরভাবে পালন, অধিক ইবাদত, এবং বিশেষত রাতের নামাজে গভীর অনুরাগ এসব বৈশিষ্ট্যে তারা পরিচিত ছিলেন।
সংযমী সাধনাকে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে “ঐশী প্রেম” এর ধারণা যুক্ত হওয়াকে সাধারণত বসরার সাধিকা রাবেয়া আল-আদাবিয়্যা ( জন্ম আনুমানিক ৭১৩–৭১৭ খ্রি. - মৃত্যু ৮০১ খ্রি.)-এর কৃতিত্ব বলে ধরা হয়। তিনিই প্রথম এমন এক সুফি আদর্শ তুলে ধরেন, যেখানে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হবে নিঃস্বার্থ, জান্নাতের আশায় নয়, জাহান্নামের ভয়ে নয।
তাঁর জীবনের কাহিনি মূলত পরবর্তী যুগের সুফি জীবনীগ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে কিছু বিবরণ ঐতিহাসিকের চেয়ে ভক্তিমূলক হলেও, এগুলো প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদাকে কীভাবে উপলব্ধি করতেন তা প্রকাশ করে।
রাবেয়া আল আদাবিয়া (Rābiʿah al-ʿAdawīyah) যিনি প্রায়ই রাবেয়া আল-বসরী নামে পরিচিত ,অর্থাৎ বসরার রাবেয়া আনুমানিক ৭১৩–৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের প্রাথমিক যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র Basra নগরে এক দরিত্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 
তাঁর শৈশব ও জীবনের প্রারম্ভিক অধ্যায় সম্পর্কে যে বিবরণ আজ আমাদের কাছে পৌঁছেছে, তার অধিকাংশই সংরক্ষিত হয়েছে পরবর্তী যুগের প্রসিদ্ধ সুফি সাধক ও কবি ফরিদউদ্দিন আত্তারের রচনায়। আত্তার নিজেও পূর্ববর্তী নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এসব কাহিনি সংগ্রহ করেছিলেন। ( ফরিদ উদ্দিন আত্তার অন্তত ৩০ টি বই লিখে গেছেন। তার একটি বিখ্যাত বই হচ্ছে "মানতিকে তাইয়ার" বা "পাখির সমাবেশ"। আত্তারের কবিতা রুমিসহ বহু আধ্যাত্মিক কবির জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তিনি কিছু আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে দীর্ঘ দিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনি গবেষণার মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করেন,তা কবিতার আকারে লিখে গেছেন। হিজরী ৮১১ সালে ইরানের এই বিখ্যাত কবি মোঙ্গলদের হামলার সময় মৃত্যুবরণ করেন। ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিশাপুর শহরে তার কবরস্থান রয়েছে) ।
বিস্ময়ের বিষয়, আধ্যাত্মিক মহিমায় উজ্জ্বল এই নারী স্বাধিকা রাবিয়া নিজে কোনো গ্রন্থ বা লিখিত রচনা রেখে যাননি; তাঁর জীবনই হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত শিক্ষা।
পরিবারের চতুর্থ কন্যা হিসেবে জন্ম নেওয়ায় তাঁর নাম রাখা হয় “রাবিয়া”, যার অর্থ‘চতুর্থ’। তিনি জন্মেছিলেন স্বাধীন অবস্থায়, এক দরিদ্র কিন্তু সম্মানিত ও ধর্মপরায়ণ পরিবারে; যেখানে অভাব ছিল, কিন্তু মর্যাদা ও ঈমানের দীপ্তি ছিল অক্ষুণ্ণ।
ফরিদউদ্দিন আত্তারের বর্ণনায় জানা যায়, তাঁদের দারিদ্র্য ছিল এতই গভীর যে ঘরে একটি প্রদীপ জ্বালানোর মতো তেলও ছিল না, এমনকি নবজাতক শিশুকে জড়িয়ে রাখার মতো কাপড়ও অনুপস্থিত ছিল। এক রাতে তাঁর মা নবজাতক কন্যার জন্য সামান্য তেল ধার করে আনতে স্বামীকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি আজীবন এই অঙ্গীকার করেছিলেন যে, সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত আর কারও কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করবেন না। অতএব তিনি প্রতিবেশীর দরজার দিকে যাওয়ার ভান করলেন, কিন্তু কারও কাছে হাত না বাড়িয়ে নীরবে খালি হাতেই ঘরে ফিরে এলেন, যেন তাঁর নির্ভরতা কেবল আল্লাহর ওপরই অটল থাকে।
এক গভীর রজনীতে রাবিয়ার পিতা এক অপূর্ব স্বপ্ন দর্শন করলেন। স্বপ্নে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন। নবীজি স্নেহভরা কণ্ঠে তাঁকে বললেন;
“তোমার নবজাত কন্যা আল্লাহর অতি প্রিয় এক বান্দি। সে বহু মুসলমানকে সত্য ও সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করবে। তুমি বসরার আমীরের কাছে যাও এবং তার হাতে একটি পত্র পৌঁছে দাও। সেখানে লিখবে—
‘আপনি প্রতি রাত্রে নবীর প্রতি একশতবার দরূদ শরীফ পাঠ করেন এবং প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে চারশতবার দরূদ পাঠ করার অভ্যাস রয়েছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার আপনি এই নিয়ম পালন করতে পারেননি। অতএব এর কাফফারা হিসেবে এই পত্রবাহককে চারশত দিনার প্রদান করুন।’”
স্বপ্নভঙ্গ হতেই রাবিয়ার পিতা গভীর আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠলেন। আনন্দাশ্রু তাঁর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি বিলম্ব না করে সরাসরি বসরার আমীরের দরবারে উপস্থিত হলেন এবং স্বপ্নে প্রাপ্ত বার্তাটি পৌঁছে দিলেন।
বার্তাটি শুনে আমীর বিস্ময় ও আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়লেন। তিনি উপলব্ধি করলেন মহানবীর দৃষ্টিতে তিনি স্মরণীয় হয়েছেন, যা তাঁর জন্য এক বিরাট সৌভাগ্য। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে তিনি দরিদ্রদের মধ্যে এক হাজার দিনার দান করলেন এবং পরম আনন্দের সঙ্গে রাবিয়ার পিতার হাতে চারশত দিনার তুলে দিলেন। এরপর তিনি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, যখনই তাঁর কোনো প্রয়োজন হবে, যেন তিনি নির্দ্বিধায় তাঁর কাছে আসেন; কারণ আল্লাহর প্রিয়জনদের সান্নিধ্য লাভ করা তাঁর জন্য বরকত ও কল্যাণের উৎস।
কিন্তু পার্থিব জীবনের পরীক্ষা দ্রুতই নেমে এলো। রাবিয়ার পিতার ইন্তেকালের পর বসরা নগরী ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হলো। অভাব ও দুর্যোগের সেই কঠিন সময়ে রাবিয়া তাঁর বোনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। জনশ্রুতি অনুসারে, তিনি এক কাফেলার সঙ্গে যাত্রা করছিলেন; কিন্তু পথিমধ্যে কাফেলাটি ডাকাতদের হাতে আক্রান্ত হয়। ডাকাতদলের নেতা রাবিয়াকে বন্দি করে এবং পরে বাজারে তাকে দাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়।নতুন মালিকের গৃহে তাঁর জীবনের সূচনা হয় কঠোর শ্রম ও দুঃসহ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।
Source : Click This Link
কিন্তু সেই দুঃখ-দুর্দশার অন্তরালেই ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছিল এক মহিমান্বিত আত্মা যার হৃদয় পরবর্তীকালে আল্লাহপ্রেমের এক উজ্জ্বল প্রদীপ হয়ে মানবতার পথ আলোকিত করবে।

রাবিয়া আল-বাসরীর দাসত্ব জীবনেও ছিল দিব্য প্রেমের এক নিরব আলোকযাত্রা।দুঃসহ দাসজীবনের মধ্যেও রাবিয়া আল-বাসরীর অন্তর ছিল মুক্ত আকাশের মতো বিস্তৃত। দিনের বেলায় তিনি গৃহস্থালির কঠোর কাজ সম্পন্ন করতেন, আর রাত নেমে এলে তাঁর জীবন ডুবে যেত ইবাদতের নীরব সাগরে। সব কাজ শেষ করে তিনি সারারাত নামাজ ও প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকতেন। বহু দিন তিনি রোজা রেখে কাটাতেন যেন ক্ষুধা ও ক্লান্তিকে অতিক্রম করে আত্মাকে আল্লাহর সান্নিধ্যের দিকে উত্তোলন করছেন।
এক গভীর রাতে গৃহস্বামী হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে ওঠেন। নিস্তব্ধতার মাঝে ভেসে আসা এক করুণ, হৃদয়বিদারক প্রার্থনার ধ্বনি তাঁকে আকর্ষণ করল। তিনি লক্ষ্য করলেন রাবিয়া সেজদায় লুটিয়ে পড়ে তাঁর প্রতিপালকের কাছে মিনতি করছেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল আকুলতা, প্রেম ও আত্মসমর্পণের এক অপার্থিব সুর;
“হে আমার প্রভু! আপনি জানেন, আপনার আদেশ পালন করা এবং সমগ্র হৃদয় দিয়ে আপনার ইবাদত করাই আমার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা, হে আমার নয়নের আলো। যদি আমি স্বাধীন হতাম, তবে দিন-রাত অবিরাম আপনারই ইবাদতে কাটাতাম। কিন্তু আমি কী করতে পারি, যখন আপনি আমাকে মানুষের দাসী করে রেখেছেন?”
এই কথা শুনে গৃহস্বামী গভীরভাবে আলোড়িত হলেন। তিনি অনুভব করলেন, এমন এক সাধ্বীসুলভ নারীকে নিজের সেবায় আবদ্ধ রাখা যেন এক প্রকার ধর্ম অবমাননার শামিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এখন থেকে তিনিই রাবিয়ার সেবা করবেন।
পরদিন সকালে তিনি রাবিয়াকে ডেকে নিজের সিদ্ধান্ত জানালেন। তিনি বললেন, রাবিয়া চাইলে এই গৃহেই গৃহকর্ত্রীর মর্যাদায় বাস করবেন এবং তিনি নিজে তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকবেন। আর যদি তিনি চলে যেতে চান, তবে তিনি আনন্দের সঙ্গেই তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেবেন।
রাবিয়া জানালেন, তিনি নির্জনে থেকে একান্তভাবে ইবাদতে নিমগ্ন হতে চান। গৃহস্বামী তাঁর এই ইচ্ছা মঞ্জুর করলেন, এবং রাবিয়া সেই গৃহ ত্যাগ করলেন এবং নির্জনে ইবাদতে মগ্ন হলেন । জানা যায় তিনি নিরামিশাসি ছিলেন বলে বনের পশু পাখীরাও তার সান্নিধ্যে যেতে ভয় পেতোনা ।

দিব্য ভালবাসার দর্শন
ঐশী প্রেম বা ‘দিব্য ভালোবাসা’র দর্শন সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছিলেন তিনিই। প্রারম্ভিক সুফি কবিদের মধ্যে তাঁকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর জীবন ও ভাবধারা নিয়ে প্রামাণ্য গবেষণাগুলোর মধ্যে মার্গারেট স্মিথ নামে এক গবেষক প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে একটি সংক্ষিপ্ত গবেষণাগ্রন্থ (মাস্টার্স থিসিস হিসেবে রচিত) প্রণয়ন করেন, যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর নামে প্রচলিত বহু কবিতার প্রকৃত উৎস নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কঠোর সংগ্রামময় জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আত্মজ্ঞান বা আত্ম-উপলব্ধির এক উচ্চ অবস্থায় পৌঁছেছিলেন। একবার শেখ হাসান আল-বাসরী তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ,তিনি কীভাবে এই আধ্যাত্মিক রহস্য উপলব্ধি করলেন? উত্তরে রাবিয়া বলেছিলেন;
“আপনি জানেন ’কীভাবে’, কিন্তু আমি অনুভবি ‘কীভাবে-হীন’ সত্যকে।”(
তাঁর জীবনকে ঘিরে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। এর একটি মতে, তাঁর মালিক এক রাতে তাঁকে আলোবেষ্টিত অবস্থায় ইবাদত করতে দেখে উপলব্ধি করেন যে তিনি একজন আল্লাহর ওলি। ভয়ে ও শ্রদ্ধায় তিনি তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।
যদিও তিনি বহু বিবাহপ্রস্তাব পেয়েছিলেন এমনকি শেখ হাসান আল-বাসরী নিজেও তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে, তবুও তিনি আজীবন অবিবাহিত থেকে যান। কঠোর সংযম ও সাধনাময় জীবনযাপন করতে করতে বার্ধক্যে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর অনুসারী শিষ্যরাই তখন তাঁর একমাত্র সঙ্গী ও পরিচর্যাকারী ছিলেন। নারী সুফি সাধিকাদের দীর্ঘ ধারার সূচনাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম।
এমনও ধারণা করা হয় যে, মুসলিম সমাজে দাসদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের প্রথম ভাগে দাসত্বের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি এ প্রথার বিরুদ্ধে গভীরভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে উচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদা লাভের পরও তিনি নিজে কোনো দাস গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।
আধ্যাত্মিক জীবনপথে রাবিয়ার জীবন ছিল—চরম সরলতা,নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত,নিয়মিত রোজা,রাতজাগা সাধনা,এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা (তাওয়াক্কুল)—এই বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত।
স্বপ্নের উপকথা (Dream Fable) তাঁর বয়ানে রচিত একটি লেখার সন্ধান পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলেছেন
আমি নিজেকে দেখলাম এক বিস্তীর্ণ সবুজ বাগানে,
যা আমার বোঝার সীমার চেয়েও বেশি সুন্দর।
সেই বাগানে ছিল এক কিশোরী মেয়ে।
আমি তাকে বললাম,
“এই স্থানটি কতই না অপূর্ব!”
সে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি এর চেয়েও আরও অপূর্ব একটি স্থান দেখতে চাও?”
আমি বললাম, “অবশ্যই চাই।”
তারপর সে আমার হাত ধরে আমাকে নিয়ে চলল।
অবশেষে আমরা পৌঁছালাম এক মহিমান্বিত প্রাসাদের সামনে
যেমনটি মানবচোখ কখনও দেখেনি।
কিশোরীটি দরজায় কড়া নাড়ল,
এবং কেউ দরজা খুলে দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই আমরা দু’জন আলোয় ভেসে গেলাম।
… রচয়িতা: রাবিয়া আল বাসরি
পূর্ববর্তী অনেক সাধক যেখানে জাহান্নামের ভয় বা জান্নাতের আশায় ইবাদত করতেন, সেখানে তিনি এক বিপ্লবাত্মক আধ্যাত্মিক ধারণা উপস্থাপন করেন:আল্লাহকে কেবল তাঁর নিজের জন্যই ভালোবাসতে হবে।পরবর্তীকালের সুফিবাদের অন্যতম মৌলিক নীতি হয়ে ওঠে এই ধারণা।তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত শিক্ষা হলো নিঃস্বার্থ ও বিশুদ্ধ ঐশী প্রেম (মহাব্বাতুল্লাহ)।তাঁর নামে বর্ণিত একটি দোয়া এই আদর্শকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে;
“হে আমার প্রভু, যদি আমি জাহান্নামের ভয়ে তোমার ইবাদত করি, তবে আমাকে জাহান্নামে দগ্ধ করো;
যদি জান্নাতের আশায় ইবাদত করি, তবে আমাকে তা থেকে বঞ্চিত করো;আর যদি কেবল তোমার জন্যই
ইবাদত করি, তবে তোমার চিরন্তন সৌন্দর্য থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না।”
এটি ইসলামী আধ্যাত্মিক চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ কর।যেখানে প্রাথমিক ইসলাম যুগে বড় দাগে ভয় ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দিয়েছে সেখানে রাবেয়ার শিক্ষা ছিল আল্লাহর সঙ্গে প্রেম ও অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ওপর জোর দেয়া ।পরবর্তী সুফি কবিতা, গজল ও দর্শন এই পরিবর্তনের ধারাবাহিক ফল।

ব্যক্তি জীবনে তিনি কখনো বিবাহ করেননি। বলা হয়, তাঁর হৃদয় সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন ছিল। অষ্টম শতকের পুরুষপ্রধান জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সত্ত্বেও বহু খ্যাতিমান আলেম ও সাধক যথা হাসান বসরী তাঁর কাছে আধ্যাত্মিক পরামর্শ নিতে আসতেন যা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তাঁর ব্যক্তিত্বের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর বিনয়,তীক্ষ্ণ আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি,কাব্যিক অভিব্যক্তি, পার্থিব ক্ষমতা ও প্রভাব থেকে স্বাধীনতা ।তিনি খ্যাতি এড়িয়ে চলতেন এবং উপঢৌকন বা পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করতেন না।
তাঁর শিক্ষা ও উক্তি সম্পর্কে বলা হয় যে তিনি নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। তাঁর শিক্ষা সংরক্ষিত হয়েছে মৌখিক পরম্পরায়, পরবর্তী সুফিদের সংকলিত উক্তির মাধ্যমে, এবং শতাব্দী পরে রচিত জীবনীগ্রন্থে।
তাঁর শিক্ষার প্রধান বিষয়গুলো হলো:-
১. আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ প্রেম
২. পার্থিব আকাঙ্ক্ষা থেকে বিমুক্তি
৩. অন্তরের আন্তরিকতা (ইখলাস)
৪. নিরবচ্ছিন্ন আল্লাহস্মরণ
৫. আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আধ্যাত্মিক অন্তরঙ্গতার গুরুত্ব
কোনো আনুষ্ঠানিক তরিকা প্রতিষ্ঠা না করলেও সুফিবাদে তাঁর প্রভাব ছিল অপরিসীম,তিনি ত্যাগবাদী সাধনাকে প্রেমকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তর করেন।পরবর্তী পারসি সুফি কবিরা তাঁর ভাবধারা বিকশিত করেন, যেমন জালাল উদ্দিন রুমী, ফরিদ উদ্দিন আত্তার প্রমুখ।
মাওলানা রুমি রচিত সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ “মসনবী”। ফার্সি সাহিত্য সম্পদ ছয় খন্ডে বিভক্ত মসনবীতে প্রায় ২৬ হাজার ছন্দবদ্ধ দ্বিপদী কবিতা আছে।রুমীর কবিতায় ভাব-ভাষা ও আবেদন সরাসরি পাঠককে এমনভাবে আকর্ষণ করে যা তার নিকট মনে হয় অপ্রতিরোধ্যঃ
মাওলানা রুমির লেখা একেকটি লাইন মানুষের ভেতর নাড়িয়ে দিতে থাকে, ক্ষমতাশীল পৃথিবীকে তুচ্ছ করে দেয়ার মতো সব লেখা লিখতে থাকেন তিনি।সুফি সাধক মাওলানা রুমী প্রতিদিন নিজেকে সঁপে দিতেন স্রষ্টার কাছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন;
আমরা শূন্য থেকে ঘুরতে ঘুরতে এসেছি
যেমনটা তারারা ছড়িয়ে থাকে আকাশে
তারারা মিলে একটি বৃত্তের সৃষ্টি করে
এবং তার মাঝে আমরা নাচতে থাকি।
সুত্র: Click This Link
কোন বিষয় নিয়ে লিখতে বসে প্রথমেই আমি খুঁজে দেখি এই সামু ব্লগে সে বিষয়ে কোন লেখা আছে কিনা।
চেস্টায় সফল হয়েছি ।মাওলানা রুমীকে নিয়ে এটি আধ্যাত্মিক সুফিবাদের সম্রাট মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (র) পেয়ে যাই সামুতে ।
যাহোক, ফিরে যাই আমার মুল লেখার বিষয়ে । মাওলানা রুমী ও ফরিদ উদ্দীন আত্তার এর মত বিখ্যাত সুফী সাধকদের জীবনালেখ্য থেকেই বুঝা যায় রাবেয়া বসরী ইসলামে নারী আধ্যাত্মিক সাধকের এক আদর্শ প্রতীক হয়ে ওঠেন। সুফি কবিতায় ব্যবহৃত ঐশী প্রেমের ভাষা তাঁর দর্শনের সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার : রাবেয়া বসরী( রহ,) আনুমানিক ৮০১ খ্রিস্টাব্দে বাসরায় ইন্তিকাল করেন।
রাবিয়া আল-আদাবিয়্যার মাকাম (সমাধিস্থল)

Source: Click This Link
১৯৯৫ সালে পরিচালিত স্থাপত্যগত পরীক্ষা ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলাফল থেকে জানা যায় যে এই মাকামটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের নির্মাণসমূহের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে আবিষ্কৃত কিছু মৃৎপাত্রের খণ্ড থেকে বোঝা যায় যে স্থাপনাটির প্রাচীনতম নিদর্শন বাইজান্টাইন যুগের। পশ্চিম দেয়ালে একটি গ্রিক ভাষার শিলালিপি রয়েছে, যেখানে লেখা আছে: “সাহসী হও, তোমরা। কেউ অমর নয়।”
কিছু মানুষের মতে স্থানটি মূলত একটি সমাধিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানে প্রাথমিক ইসলামী যুগের একটি কুফি লিপির শিলালিপি পাওয়া গেছে; যদিও তা এখনো পাঠোদ্ধার করা যায়নি, তবু ধারণা করা হয় এর ধর্মীয় গুরুত্ব থাকতে পারে। কারণ ষষ্ঠ/দ্বাদশ শতাব্দী থেকে প্রচলিত বহু কাহিনিতে Rābiʿah al-ʿAdawīyah-এর সমাধিস্থল হিসেবে এই স্থানটির উল্লেখ পাওয়া যায়।এছাড়া এখানে আবিষ্কৃত মৃৎপাত্রের নিদর্শন উমাইয়া ও মামলুক যুগের বলে চিহ্নিত হয়েছে। তদুপরি একটি দেয়াল সপ্তম/ত্রয়োদশ থেকে অষ্টম/চতুর্দশ শতাব্দীর সময়কার বলে ধারণা করা হয়।
বর্তমানে স্থানটি রাবিয়া আল-আদাবিয়্যার নামে পরিচিত। তবে ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্রে একই নামে একাধিক ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলেন উম্মুল খায়র রাবেয়া আল-আদাবিয়্যা আল-বাসরিয়্যা তথা আমাদের প্রখ্যাত সুফি সাধিকা রাবেয়া বসরী , যিনি ১৮৫ হিজরি / ৮০১ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের Basra নগরে ইন্তিকাল করেন। আরেকজন ছিলেন আহমদ ইবন আবু আল-হাওয়ারির স্ত্রী রাবেয়া, যিনি সম্ভবত এই স্থানেই সমাহিত।
১৯৩০-এর দশকে আবদুল্লাহ আল-মুখলিস সামে বিখ্যাত এক যুক্তিবাদী ইসলামী চিন্তাবিদ ও আরবীয় ঐতিহাসিক ( ১৮৭৮-১৯৪৭) এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন:
“সম্ভবত অলিভ পর্বতে এবং জাওইয়া আল-আসআদিয়্যার নিচে যিনি সমাহিত আছেন, তিনি না আল-আদাবিয়্যা, না আহমদ ইবন আবু আল-হাওয়ারির স্ত্রী; বরং অন্য কোনো রাবেয়া, যার ইতিহাস সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে, কিন্তু যার নাম টিকে আছে।”
সমাধিটির একটি অন্যতম স্থাপত্য বৈশিষ্ট হল এর পশ্চিমাংশে একটি বর্গাকার কক্ষ রয়েছে, যা অর্ধবৃত্তাকার ছাদ দ্বারা আচ্ছাদিত।দক্ষিণ দেয়ালে একটি মিহরাব রয়েছে, যা নির্দেশ করে যে স্থানটি নামাজ আদায়ের জন্য ব্যবহৃত হতো।
যাহোক তার সমাধিস্থল যেখানেই হোক না কেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে একজন আধ্যাত্মিক সাধিকা (অলি) হিসেবে সম্মানিত করা হয়,তাঁর জীবনকাহিনি সমগ্র ইসলামী বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে,এবং তিনি আধ্যাত্মিক ভক্তি ও প্রেমের অন্যতম প্রাচীন ও মহান প্রতীক হয়ে ওঠেন।
আজ তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন সুফিবাদে ঐশী প্রেমের অগ্রদূত হিসেবে,ইসলামের শ্রেষ্ঠ নারী আধ্যাত্মিক সাধিকাদের একজন হিসেবে,এবং প্রাথমিক ত্যাগবাদী ইসলাম ও পরবর্তী রহস্যময় আধ্যাত্মিক দর্শনের মধ্যকার এক সেতুবন্ধন হিসেবে।
রাবিয়ার পরবর্তী দশকগুলোতে ইসলামী বিশ্বজুড়ে আধ্যাত্মিক চিন্তার বিস্তার ঘটে; প্রাথমিক যুগের অনেক সুফি তাওয়াক্কুল অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেন, যা পরে সুফিবাদের কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়।তাই রাবিয়া আল-বাসরীর জীবন কেবল একজন সাধিকার জীবনী নয়; এটি মানব আত্মার মুক্তির ইতিহাস। দারিদ্র্য, দাসত্ব, কষ্ট ও নিঃসঙ্গতার অন্ধকার অতিক্রম করে তিনি পৌঁছেছিলেন এমন এক আলোর কাছে, যেখানে ইবাদত হয়ে ওঠে প্রেম, আর প্রেম হয়ে ওঠে আল্লাহর সঙ্গে আত্মার অন্তহীন সংলাপ।তাঁর জীবন আজও স্মরণ করিয়ে দেয় সত্যিকারের স্বাধীনতা বাহ্যিক নয়; তা জন্ম নেয় হৃদয়ের গভীরে, যখন মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিজেকে স্রষ্টার প্রেমে সমর্পণ করে।
এতক্ষন ধৈর্য ধরে সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।
সুফিবাদ নিয়ে আলোচনার পরবর্তী পর্ব দেখার জন্য আমন্ত্রণ রইল ।
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:০৭
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
লেখাটি প্রিয়তে নেয়ায় কৃতজ্ঞতা জানবেন । আশা করি বাকিটা পড়বেন । পরিশোষনের কিছু বিষয় থাকলে
জানালে কৃতার্থ হব। আমরা ভুলের সাগরে আছি। হৃদয় পবিত্র হলে জ্ঞানের দরজা খুলতে পারে।বদ্ধ অন্তরে
জ্ঞানের আলো প্রবেশ করেনা, সে যত যুক্তিবাদই হোক না কেন । সারাদিন যুক্তিতে ভরা ওয়াজ শুনেও
মানুষের ভিতর কোন পরিবর্তন হয়না । পক্ষ্ন্তরে লালন ফকিরের গানের একটি ছোট ৪ শব্দের লাইনে থাকা
কথা -দয়াল পার কর আমারে- শ্রোতাকে নিয়ে যায়য় ভাবের অতলে , নিরবে বসে চিন্তা করে কি করলে
দয়াল পার করবে তারে । অন্তর পবিত্র না হলে কোন যুক্তির কথাই আছর করবে না তাকে । অজু করতে
হয় অন্তর বাহির দুটিই পবিত্র করার জন্য, শুধু বাহ্যিক হলেই হবেনা , নামাজ কবুলের জন্য অন্তরও পবিত্র
হতে হবে । শুধু এরিস্টলের বাহ্যিক পদ্ধতিতে কাজ হবেনা রাবিয়ার পদ্ধতিতে ভিতর বাহির দুদিকেই
পবিত্র হতে হবে নীজের না শুধু সমাজের মঙ্গলের জন্যও।যাহোক নীচে থাকা বিজ্ঞ পাঠকের মন্তব্যের
প্রেক্ষিতে এই প্রতিমন্তব্য একটু বড়ই হয়ে গেল ।
শুভেচ্ছা রইল
২|
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৩৬
রাজীব নুর বলেছেন: পুরো লেখাটা পড়লাম।
সুন্দর সাজিয়ে গুছিয়ে লিখেছেন।
কিন্তু রাবেয়া বসরী সম্পর্কে যা জানা যায় সেগুলো সত্য না-ও হতে পারে। সব মানুষের ধারনা করে লেখা। যাইহোক, এই বিশ্ব সংসারে কার অবদান বেশি রাবেয়া বসরীর না এরিস্টলের?
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:১৮
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
একটি গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন রেখে যাওয়ার জন্য ধন্যবাদ । প্রথমেই বলি , অনেক খেটে খুটে এদিক সেদিক থেকে তথ্য
নিয়ে সাজাতে হয়েছে পোস্টটি। তাই পেটে কিছু দিয়ে পিঠে দিলে সয়। যতটুকু ভাল বলেছেন তাতেই আমি তুষ্ট।
যাহোক আপনার প্রশ্নেই কথান বলি। অ্যারিস্টটল ও রাবিয়া বসরী যুক্তি ও ঐশী প্রেমের দুই ধারা । মানব
সভ্যতার চিন্তা ও আধ্যাত্মিক ইতিহাস গড়ে উঠেছে দুই শক্তিশালী প্রবাহের মাধ্যমে যুক্তিনির্ভর দর্শন এবং
আত্মিক প্রেমভিত্তিক সাধনা। এই দুই ধারার উজ্জ্বল প্রতিনিধিত্ব করেন এরিস্টটল ও রাবিয়া বসরী (রহ.) ।
ভিন্ন সময়, সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও তাঁরা মানবজীবনের উদ্দেশ্য, নৈতিকতা এবং সত্য অনুসন্ধানের
ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন।
অ্যারিস্টটল হলেন যুক্তিবাদী চিন্তার স্থপতি। খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪–৩২২ অব্দে জীবিত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল
পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চার অন্যতম ভিত্তি নির্মাণ করেন। যুক্তিবিদ্যা, নৈতিক দর্শন, রাজনীতি, জীববিজ্ঞান, ভাষণশাস্ত্র
প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান যুগান্তকারী।তিনি দেখিয়েছিলেন যে জ্ঞান অর্জনের প্রধান উপায় হলো পর্যবেক্ষণ
ও যুক্তি। নৈতিক দর্শনে তিনি “মধ্যপন্থা” ধারণা তুলে ধরেন অর্থাৎ চরম দুই অবস্থার মাঝামাঝি ভারসাম্যই
নৈতিক উৎকর্ষ। তাঁর মতে মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইউডাইমনিয়া তথামানবিক বিকাশ ও কল্যাণ,
যা অর্জিত হয় যুক্তিনির্ভর সৎ জীবনযাপনের মাধ্যমে।অ্যারিস্টটলের চিন্তা পরবর্তীকালে ইসলামি দর্শন,
খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে রাবিয়া আল বসরী হলেন ঐশী প্রেমের পথিকৃৎ। অষ্টম শতাব্দীর বিখ্যাত সুফি সাধিকা রাবিয়া
বসরী ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আল্লাহর প্রতি নির্মোহ ও নিঃস্বার্থ প্রেম
(মাহাব্বাহ) এর শিক্ষা দেন।
তাঁর আগে অনেক সাধক আল্লাহর ইবাদত করতেন জান্নাতের আশা বা জাহান্নামের ভয়ে। কিন্তু রাবিয়া শিক্ষা
দেন আল্লাহকে ভালোবাসতে হবে কেবল তাঁর জন্যই, কোনো পুরস্কার বা ভয়ের কারণে নয়। তাঁর বিখ্যাত
দোয়া এই আদর্শকে প্রকাশ করে: ইবাদত হবে নিখাদ প্রেমের প্রকাশ।তাঁর জীবন ও শিক্ষা পরবর্তী সুফি
দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে অন্তরের বিশুদ্ধতা ও প্রেমকে
স্থাপন করে।
এরিস্টটল আর রাবিয়া মুলত যুক্তি বনাম প্রেম তাই এই দুই পথের একটি সহজ তুলনা তুলে দিলাম ।
এরিস্টটল বলেছেন জ্ঞান আসে যুক্তি ও পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে , রাবিয়া বলেছেন জ্ঞান আসে আধ্যাতিক
অভিজ্ঞতার মাধ্যমে । এরিস্টটল বলেছেন নৈতিকতা যুক্তিনির্ভর জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত, রাবিয়া বলেছেন নৈতিকতা
ঐশী প্রেমে প্রতিষ্ঠিত। এরিস্টটলের লক্ষ্য মানবিক কল্যান ও বিকাশ, রাবিয়ার লক্ষ্য আল্লাহর প্রেমে আত্মিক
একাত্মতা । এরিস্টলীয় পদ্ধতি হল বাহ্যিক বাস্তবতার বিশ্লেষন, অপরদিকে রাবিয়ার পদ্ধতি হল অন্তরের রূপান্তর ।
তাই তাদের দুজন পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। অ্যারিস্টটল ও রাবেয়া দুজন যেন মানব অনুসন্ধানের
দুই দিক: চিন্তা ও প্রেম। সভ্যতার জ্ঞানভিত্তি গড়ে উঠেছে যুক্তির শক্তিতে, আবার মানুষের অন্তর্জগত আলোকিত
হয়েছে আধ্যাত্মিক প্রেমের মাধ্যমে।
তাঁদের শিক্ষা আমাদের মানবকুলকে স্মরণ করিয়ে দেয় পূর্ণাঙ্গ প্রজ্ঞা হয়তো তখনই অর্জিত হয়, যখন যুক্তিবোধ ও
হৃদয়ের গভীরতা একসঙ্গে কাজ করে।অর্থাৎ সত্যের পথে মানুষকে একই সঙ্গে চিন্তাশীল এবং প্রেমময় হতে হয়।
ব্লগে পাঠক খরা ও মন্তব্য খরার সন্ধিক্ষনে কষ্ট করে এসে মন্তব্য করে কিছু পারস্পরিক কথা বলার
সুযোগ তৈরী করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ ।
শুভেচ্ছা রইল
৩|
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪২
সুলাইমান হোসেন বলেছেন: রাজীব নূর@রাবীয়া বসরী এবং এরিস্টল একই পথের যাত্রী নয়।সুতরাং উভয়ের মধ্যে আপনি কোনদিক দিয়ে মিল খুঁজে পেলেন।
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৫
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
দুজনের দর্শনই সৎ ও মানব কল্যানের লক্ষ্যমুখী ।
এরিস্টটলরের পদ্ধতি ও বাহ্যিক যুক্তি নির্ভর ।
রাবিয়া বসরীর পদ্ধতি হল ভিতর বাহির দুদিকেই
মানব অন্তর পরিস্কারের মাধ্যমে কহ্যিক ও
অভ্যন্তরীন মানব কল্যান । এরিস্টল হলেন
ইহলোকের মুক্তির দিশারী আর রাবিয়া
বসরী হলেন ইহকাল পরকাল দুজগতেই
মানব কল্যালের দিশারী ।
শুভেচ্ছা রইল
৪|
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:০৪
মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন: ভালো বিষয় উপস্থাপন করছেন। পাঠক এতে আল্লাহর পথে চলতে উৎসাহিত হলে আপনি এর সাওয়াব পাবেন।
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৭
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
খুবই মুল্যবান কথা বলার জন্য ধন্যবাদ ।
কামনা করি আল্লাহ আপনার কথা কবুল
করুণ ।
শুভেচ্ছা রইল
৫|
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:১১
সামিউল ইসলাম বাবু বলেছেন: চলতে থাক এমন ব্লগ
©somewhere in net ltd.
১|
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৫৮
সুলাইমান হোসেন বলেছেন: চমৎকার লেখাটি সরাসরি প্রিয়তে,রেখে দিলাম প্রিয় আলী ভাই।কিছুটা পড়েছি,বাকিটাও পড়বো ইনশাআল্লাহ।যাযাকাল্লাহু খইরান কাসিরা